ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৭

জসীম উদ্দীন মাসুদ

প্রকাশিত: ০১:৪১, ১৪ নভেম্বর ২০২০
আপডেট: ১৯:৩৫, ১৪ নভেম্বর ২০২০

কোদালিছড়া : পরিবর্তনের গল্প

কোদালিছড়ায় এখন নৌকা চলে

কোদালিছড়ায় এখন নৌকা চলে

একদা কোদালিছড়া ছিল বিস্তৃত জলরাশির এক আধার। পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক উৎস শতাব্দী প্রাচীন কোদালিছড়া খাল বহু ভাঙ্গা-গড়ার ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে। আকারে-আয়তনে-প্রবাহে ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসা কোদালিছড়ার একসময় জৌলুস ছিল আকাশ সমান।

এই কোদালিছড়া দিয়ে পাল তুলে বড় বড় নৌকা চলতো, নানান পসরা নিয়ে গ্রামের মানুষ আসতো শহরে। এক সময় বর্ষিজোড়া পাহাড় আর আথানগিরির দিনারপুর পাহাড়ের মাঝে ছিল দীর্ঘ খেয়া পারাপার।

পুরণো সেই দিনের কথা

অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পর্যটন জেলা মৌলভীবাজার। চায়ের দেশ মৌলভীবাজারের আরেক পরিচয় প্রকৃতি কন্যা। ত্রিমাত্রিক এই জেলার কোথাও পাহাড়-টিলা, কোথাও সমতল আবার কোথাও বা বিস্তৃত জলরাশির হাওড়-বাওড়-খাল-বিল। একদা কোদালিছড়া ছিল সেরকম বিস্তৃত জলরাশির এক আধার। পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক উৎস শতাব্দী প্রাচীন কোদালিছড়া খাল বহু ভাঙ্গা-গড়ার ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে। আকারে-আয়তনে-প্রবাহে ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসা কোদালিছড়ার একসময় জৌলুস ছিল আকাশ সমান।

এই কোদালিছড়া দিয়ে পাল তুলে বড় বড় নৌকা চলতো, নানান পসরা নিয়ে গ্রামের মানুষ আসতো শহরে। এক সময় বর্ষিজোড়া পাহাড় আর আথানগিরির দিনারপুর পাহাড়ের মাঝে ছিল দীর্ঘ খেয়া পারাপার। দু’পাড়ের বিস্তৃর্ণ জমিতে ছিল সোনালি ফসলের সমারোহ। অনেকের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎসই ছিল এই খালের মৎস্য আহরণ। গ্রামের কত নববধূ যে প্রথমবারের মতো এই পথ দিয়ে স্বামীর বাড়ী গেছে তাদের অনেকেই সেই সুখ স্মৃতি নিয়ে এখনও বেঁচে আছে।

গ্রামের সাথে শহরের এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে দিয়েছিল এই কোদালিছড়া। কিন্তু স্বদেশী বর্গীদের লোলুপ দৃষ্টি শতভাগে ব্যবচ্ছেদ করে সতেরো কিলোমিটার দীর্ঘ এক ভালোবাসার। জায়গায় জায়গায় বাঁধাগ্রস্ত হয়ে এলোমেলো হয়ে যায় চিরচেনা মসৃণ পথ। নাব্যতা হারাতে হারাতে খালের উদার বুকে পলি জমে। আমন-বোরোর সোনালী ফসল হারিয়ে কৃষক এক বুক কষ্ট নিয়ে খুঁজে ফিরে নবান্নের আনন্দকে। অবৈধ দখল, যত্রতত্র আবর্জনার স্তুপ, নাব্য সংকট ও ঝোপঝাড়ের কবলে পড়ে চিরতরে হারাতে বসে তাদের সব সুখ স্মৃতি। শহরের যত্রতত্র অসহনীয় জলাবদ্ধতায় মানুষ ক্রমাগত হাঁপিয়ে উঠে।

কোদালিছড়া, উপত্তি যার বর্ষিজোড়া

মৌলভীবাজার শহরের পূর্বপ্রান্ত বর্ষীজোড়া পাহাড় থেকে উৎপত্তি হওয়া কোদালিছড়া জেলা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিমে হাইল হাওরে গিয়ে মিশেছে। যুগের কালপরিক্রমায় এ ছড়াটি মৌলভীবাজার শহরের বর্জ্যপানি নিস্কাশনের একমাত্র পথ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। ১৭ কি.মি. লম্বা কোদালিছড়ার ৩ দশমিক ৭ কি.মি. প্রবাহিত হয়েছে মৌলভীবাজার পৌর শহরের ভেতর দিয়ে। বাকি অংশটুকু শহরের বাইরে সদর উপজেলার মোস্তফাপুর, গিয়াসনগর ও নাজিরাবাদ ইউনিয়নে বিস্তৃত। ভূমি খেকোদের দখল আর অবকাঠামো নির্মাণের ফলে কোদালীছড়া একসময় ৩০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্থ থাকলেও এখন দীর্ঘ পথের কোথাও ১০ থেকে ১৫ ফুটের অধিক নেই বললেই চলে।

দ্রোহ সর্বত্র

সকল সংকটে বাঙালি জাতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে বারবার। দেয়ালে যখন যতবার পিঠ ঠেকে গেছে বাঙালি ততবার ঠিকই অসীম সাহসে দাবী আদায়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। চোখের সামনে বাপ-দাদার স্মৃতি বিজড়িত কোদালিছড়ার আপন অস্তিত্ব হারাতে দেখে মানুষ ফুঁসে উঠেছে প্রতিবাদে। লেখা-কবিতা-সংবাদে সর্বত্রই দ্রোহের প্রকাশ ঘটতে থাকে। কোদালিছড়া খননের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবী জানিয়ে আসছিলেন জেলার সচেতন নাগরিকবৃন্দ। অনুষ্ঠিত হয়েছে অজস্র মানববন্ধন। বারবার স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে প্রশাসনে ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। গণমাধ্যমকর্মীরা একের পর এক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করতে থাকেন কোদালিছড়া নিয়ে সচেতনতামূলক সংবাদ। হাসানাত কামাল ও ডোরা প্রেন্টিসের মতো স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীরা কোদালিছড়া নিয়ে খুলে বসেন আকর্ষণীয় ইভেন্ট ‘গড়ব স্বপ্নের শহর মৌলভীবাজার’। ফেসবুকের এই পেইজে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করে মৌলভীবাজারের সর্বস্তরের মানুষ কোদালিছড়া আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।

বিভিন্ন উদ্যোগ

কোদালিছড়ার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে প্রথম থেকেই মৌলভীবাজার পৌরসভা সচেষ্ট ছিল। পূর্ববর্তী সকল চেয়ারম্যান ও মেয়রগণ খালের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে কিছু কিছু কাজও করেছিলেন। কিন্তু অতলান্ত বাঁধা ও সমস্যাকে তা ছুঁতে পারেনি। এ অঞ্চলের হাজারো কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে সিলেট বিভাগ ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বিএডিসি কোদালিছড়ায় ৪ কিলোমিটার জুড়ে খাল খনন করেছিল। এরও আগে এলজিইডি সার্ভেসহ নানাবিধ কাজ করেছে এ খালে। পানি উন্নয়ন বোর্ডও কোদালিছড়া নিয়ে প্রকল্প তৈরির কাজ করেছে। অনেকে বলছেন চার কিলোমিটার খাল খনন হলেও জলাবদ্ধতা ও সঠিক প্রবাহ পুরোপুরি ঠিক হবে না যতক্ষন না বাকি অংশ অর্থাৎ গিয়াসনগর ইউনিয়নের আনিকেলীবড়, নয়ানছিড়ি ও মারকোনা গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া অংশ খনন হবে না। আর এসব কাজ করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় কোদালিছড়ার অসংখ্য জায়গা দখলমুক্ত করা।

দখলমুক্ত করা ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ

মৌলভীবাজার শহরের পানি নিস্কাশনের একমাত্র পথ কোদালিছড়া খাল দখলমুক্ত করতে গিয়ে পৌরসভার মেয়রের নেতৃত্বে এলাকার নেতৃস্থানীয় মানুষ ও পৌর কাউন্সিলরদের সহযোগিতায় ওয়ার্ডভিত্তিক বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠিত হয়। কখনও প্রশাসনের, কখনও পুলিশের, কখনও প্রবাসীদের সমর্থন ও সহযোগিতায় পৌরসভা একসময় কোদালিছড়া খালের অধিকাংশ এলাকা দখলমুক্ত করতে সমর্থ হয় পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। যেসব জায়গা দখলমুক্ত করে খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় সেসব স্থানের পানিপ্রবাহ নতুন করে সকলের মনে আশা জাগায়।

সে আগুন ছড়িয়ে গেলো সবখানে

জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলামের সভাপতিত্বে ১০ জানুয়ারি ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কোদালিছড়া নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ২০১৬ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসানের উদ্যোগে কোদালিছড়ায় চার কিলোমিটার খনন কাজ হয়। কাজটি অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)।

অনলাইনে অফলাইনে কোদালিছড়া নিয়ে ব্যাপকভাবে সচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা তখন তুঙ্গে এবং স্বেচ্ছাশ্রমে কোদালিছড়া খননের উদ্যোগ স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে চলেছে। দ্বিতীয় সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি। জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলামের সভাপতিত্বে মৌলভীবাজারের জনপ্রতিনিধি, নির্বাহী প্রকৌশলী, সরকারি-বেসরকারি দফতরের কর্মকর্তা, সাংবাদিক, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত হয় ১০ ফেব্রুয়ারি স্বেচ্ছাশ্রমে কোদালিছড়া খনন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হবে। এতে শহরের সকল সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সরকারি-বেরসকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করবেন। এ উপলক্ষে ৮ ফেব্রুয়ারি একটি সচেতনতামূলক র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে। স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহী সংগঠন, প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের জন্য ২৫ জানুয়ারির মধ্যে উক্ত কর্মসূচির সমন্বয়কারী অতিরিক্ত জেল প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আলম খান, মৌলভীবাজার পৌরসভার নির্বাহি প্রকৌশলী আবুল হোসেন খান, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা জসিম উদ্দীন মাসুদ এবং বিটিভি'র জেলা প্রতিনিধি হাসানাত কামালের সাথে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়।

২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে স্বেচ্ছাশ্রমে কোদালিছড়া খনন নিয়ে আরেকটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, স্বেচ্ছাশ্রমে কোদালিছড়া খননের কাজ মৌলভীবাজার টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ হতে দক্ষিণ কলিমাবাদ পর্যন্ত পৌরসভার শহর এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার পর্যন্ত এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হবে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানে স্বেচ্ছাসেবীদের ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমভাগে মৌলভীবাজার বিজনেস ফোরামের নেতৃত্বে মৌলভীবাজার টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ হতে টিভি হাসপাতাল রোডের কালভার্ট পর্যন্ত, দ্বিতীয় ভাগে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টিভি হাসপাতালের কালভার্ট থেকে মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব, তৃতীয় ভাগে মৌলভীবাজার পৌরসভার উদ্যোগে প্রেসক্লাব হতে সুলতানপুর কালভার্ট, জেলা পরিষদের উদ্যোগে চতুর্থ ভাগে সুলতানপুর কালভার্ট থেকে টিক্করবাড়ি গোরস্থান,পঞ্চমভাগে চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি টিক্করবাড়ি গোরস্থান হতে দক্ষিণ কলিমাবাদ কালভার্ট। ষষ্ঠভাগে জেলা পুলিশ ও সপ্তমভাগে জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে অবশিষ্ট অংশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও খনন কাজ পরিচালিত হবে।

এলো সেই আলোকোজ্জ্বল দিন

২০১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের জেলার ইতিহাসে ছিল অন্যরকম এক উজ্জ্বল দিন। মৌলভীবাজার শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে কোদালিছড়া পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও খনন করতে দিনব্যাপী স্বেচ্ছাশ্রমে আপামর জনসাধারণের ঝাঁপিয়ে পড়ার দিন। মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা কর্তৃক আয়োজিত এ কর্মসূচির প্রথমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করার পর প্রেসক্লাব সংলগ্ন কোদালিছড়া খননস্থলে এক বিশাল সমাবেশে স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচ্ছন্নতা ও খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন মৌলভীবাজার- ৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসীন। এসময় উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার- ৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য নেছার আহমদ, জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান, পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমান, চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন, সকল সরকারি-বেসরকারি বিভাগ, প্রেসক্লাব, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক, ক্রীড়া, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের পৌর নাগরিক।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, জেলা পুলিশ, পৌরসভা, চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ড্রাস্ট্রি, বিজনেস ফোরাম ও জেলা ক্রীড়া সংস্থা ৭টি দলের সহস্রাধিক স্বেচ্ছাশ্রমী একযোগে নির্দিষ্ট এলাকায় পরিষ্কার ও খনন কাজ করে। এছাড়া খালটিতে ময়লা আবর্জনা ফেলে ভরাট না করতে খালের দু’পাশে বসবাসরত মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচারণা চালানো হয়। একটা আন্তরিক উদ্যোগ পাল্টে দিতে পারে অনেক কিছু তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ২০১৮ সালের এই ১০ ফেব্রুয়ারি ।

কাজের স্বীকৃতি পেলেন পৌর মেয়র ফজলুর রহমান

মৌলভীবাজারের সর্বস্তরের সকল মানুষের সফল অংশগ্রহণে কোদালিছড়ার দৃশ্যপট বদলে দেয়া এই বিরল ঘটনার নেপথ্য কারিগর ছিলেন মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমান। কোদালিছড়া অভিযানের পর এই স্বপ্নযাত্রা আরও দীর্ঘতর করার লক্ষ্যে পৌরসভা তাৎক্ষণিকভাবে দুইটি এক্সকেভেটর ক্রয় করে অবশিষ্ট খনন কাজ চালাতে থাকে। কোদালিছড়া অবৈধ দখলমুক্তকরণ, খনন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সংস্কারসাধন নিয়ে পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবীর পক্ষে তার কণ্ঠ সর্বদা ছিল সোচ্চার। দিনরাত পরিশ্রম করতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থও হয়ে পড়েছিলেন। অবশ্য তাঁর এই পরিশ্রম ও আন্তরিকতার যথাযথ মূল্যায়ন করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম কাজের সফলতার স্বীকৃতি স্বরূপ মেয়র ফজলুর রহমানের হাতে তুলে দেন সম্মাননা স্মারক।

কোদালিছড়ায় এলো নতুন প্রাণ

মৌলভীবাজার পৌরবাসীর দুঃখ বলে কথিত কোদালিছড়া পেলো নতুন প্রাণ। সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটু থেকে কোমর পানিতে ডুবে যেত টিবি হাসপাতাল রোড, গির্জাপাড়া, আরামবাগসহ শহরের বেশ কিছু অংশ। কোদালিছড়া খননের পর গত তিনটি বর্ষা মৌসুমে শহরের কোথাও জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি। কোদালিছড়া ভরাট হবার কারণে কৃষকদের ফসল তলিয়ে যেত। সে সময়টা পাল্টে গেছে এখন। নতুন ধানের ঘ্রাণে হাজার হাজার কৃষকের পরিবারে হাসি ফুটেছে। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে এ বছর পুরো হাওর জুড়ে আমনের বাম্পার ফলন হওয়ায় বাঁধভাঙ্গা আনন্দে ভাসছে হাওর এলাকা। কৃষকের ঘরে ঘরে জমে উঠেছে নবান্নের পিঠাপুলির উৎসব। খননের প্রয়োজনে পৌরসভার অন্তত অর্ধশত নাগরিক নিজেরা কোদালিছড়ার উপর গড়ে উঠা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও প্রাচীর দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন। বাকী যা আছে সেগুলোও নিশ্চয়ই মানুষের বাঁধভাঙ্গা ঐক্যবদ্ধ দাবীর কাছে নতি স্বীকার করে তারা ভেঙ্গে ফেলবেন কোদালিছড়ার সব বাঁধা।

নবজীবনের আলোকধারা হয়ে উঠুক কোদালিছড়া

খাল খনন ও দখলী জমি পুনরুদ্ধারে এখন অনেকটা বদলে গেছে কোদালিছড়ার হতাশাজনক চিত্র। কোদালিছড়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। কোদালিছড়াকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সকলে। সবাই মিলে যদি একটু সচেতন থাকি তবেই তার সুফল ভোগ করা যাবে। শহরবাসীর দাবীর প্রেক্ষিতে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ একটি প্রকল্প তৈরি করে ঠিকাদার নিয়োগ করে। শহরের ভেতরে যে ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার পড়েছে তার ২.৬ কিলোমিটার খালের দুপাড়ে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হবে গাইডওয়াল ও দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে। নিরাপত্তার জন্যে থাকবে পর্যাপ্ত লাইটিং ও সিসি ক্যামেরা। টয়লেট ফ্যাসিলিটিজও থাকবে ঘুরে বেড়ানো মানুষের জন্য। আগামী ১৪ নভেম্বর সেই আকাঙ্খিত কাজের কার্যাদেশ প্রদান করা হবে। খালের দুইপাড়ে গাইডওয়াল নির্মিত হলে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মানুষ প্রাতঃভ্রমণসহ শরীরচর্চার জন্যে ২.৬ কিলোমিটার এলাকা ব্যবহার করতে পারবে অবাধে। তাছাড়া পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে লাইটিংসহ সুদৃশ্য ওয়াকওয়ে।

ভাবতে ভালো লাগে, যে খালটির পানিপ্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হতে হতে একটা সময় বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, যে কোদালিছড়া মৌলভীবাজারের দুঃখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, কিছু স্বপ্নবাজ মানুষের দুরন্ত শ্রমে সেই কোদালিছড়া ফিরে পেতে যাচ্ছে তার শত বছরের ঐতিহ্য। একটি খালকে ঘিরে মানুষ যে কতটা একতাবদ্ধ হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কোদালিছড়া। এই এলাকার মানুষ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে কোদালিছড়ায় সবসময় থাকবে বাধাহীন পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, কোদালিছড়ার দুপাশে থাকবে সুদৃশ্য ওয়াকওয়ে, নিয়ন আলোয় হেঁটে যাবে মানুষ দূর থেকে বহুদুর। এবার কোদালিছড়া সত্যিই স্বপ্নের সেই সোপান হতে চলেছে। নবজীবনের আলোকধারা হয়ে উঠুক কোদালিছড়া।

জসীম উদ্দীন মাসুদ, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা, মৌলভীবাজার

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়