ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৪ ১৪২৭

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২:৩৭, ৩০ জুন ২০২০
আপডেট: ০২:৪৬, ৩০ জুন ২০২০

মা আর বোনকে নিয়ে বাসায় ফেরা হল না রিফাতের

মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা রিফাত ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাবা থাকেন মালয়েশিয়ায়। কিছুদিন আগে মা আর বোনকে নিয়ে ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ সদরে নিজেদের বাসায় বেড়াতে যান। মা ময়না বেগম আর প্রিয় বোন মুক্তার সাথে এটাই ছিল তার শেষ যাত্রা।

সোমবার সকাল ৮টার দিকে মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন রিফাত। লঞ্চে ছিলেন তাঁর মা ময়না বেগম, বোন মুক্তা আক্তার আর বন্ধু রিপন। সোয়া ৯টার সময় লঞ্চটি যখন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের কাছে আসে, তখন হুইসেল বাজায়। রিফাত, তাঁর মা ও বোন ঘাটে নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে পেছন থেকে ময়ূর-২ নামের লঞ্চটি ধাক্কা মারে। মুহূর্তের মধ্যে লঞ্চটি উল্টে বুড়িগঙ্গার পানিতে তলিয়ে যায়। অলৌকিকভাবে যান রিফাত গেলেও তাঁর মা ময়না বেগম ও বোন মুক্তা আক্তার মারা যান। মা-বোন হারিয়ে পাগলপ্রায় তিনি।

রিফাত আহমেদকে বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার করে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁর জ্ঞান ফেরে। তখন রিফাত জানতে পারে তার পরম প্রিয় মা আর বোন বেঁচে নেই। তবে বন্ধু বেঁচে গেছেন। খবর পান লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া লাশগুলো সব নিয়ে রাখা হয়েছে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তখন মা আর বোনের খোঁজে রিফাত স্বজনদের সহযোগিতায় আসেন মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে। সাদা কাফনে মোড়ানো লাশের সারি থেকে মা আর বোনকে খুঁজে বের করেন রিফাত। তখন রিফাতের কান্না আর আর্তচিৎকার সেখানে থাকা মানুষের হৃদয়কেও ছুঁয়ে যায়।

দূর্ঘটনা সম্পর্কে রিফাত জানান, ‘আমরা তো কল্পনাও করিনি যে সদরঘাটে আমাদের লঞ্চকে অন্য আরেকটা লঞ্চ ধাক্কা দেবে। আমি, আমার মা আর বোন লঞ্চের ভেতরে ছিলাম। আর আমার বন্ধু ছিল ছাদে। মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে আমাদের লঞ্চ ছাড়ে ৮টার কিছু আগে। লঞ্চের ভেতর আমার হালকা ঘুম চলে এসেছিল। তবে সদরঘাটের কাছাকাছি আসায় আম্মু আমাকে জাগিয়ে তোলেন। আমরা সদরঘাটের একেবারই কাছাকাছি চলে আসি। তখন বড় একটা লঞ্চ আমাদের লঞ্চকে ধাক্কা মারে। সঙ্গে সঙ্গে উল্টে যায়। আমি, আমার মা আর বোন পানির নিচে তলিয়ে যাই। মা আর বোন পানির নিচে কোথায় হারিয়ে গেল জানি না। পানির নিচে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কয়েক ঢোক পানিও খেয়েছি। কিন্তু কীভাবে যেন উপরে ভেসে উঠি। তখন আমার জ্ঞান ছিল না। লোকজন ধরাধরি করে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। আমি বেঁচে যাই।’

তিনি বলেন, ‘আমার আম্মু চাইতেন, আমি যেন ভালো একটা চাকরি করি। চাকরি করার পাশাপাশি আমি লেখাপড়াও করি। আমার বোনও লেখাপড়া করে। করোনার কারণে আমরা ঢাকা থেকে গ্রামে যাই। আমার আম্মু সব সময় বলতেন, “ভালো মানুষ হও।” আম্মুর কথার অবাধ্য কখনো আমি হইনি। এখন আমার আম্মু কোথায় হারিয়ে গেল। আমার বোন মুক্তা কোথায় হারিয়ে গেল। লঞ্চের খামখেয়ালির কারণে আজ আমি আমার মাকে হারালাম, বোনকে হারালাম। আমার মা আর বোন এখন কেবলই ছবি। আমার পরিবার যারা তছনছ করল, তাদের আমি কঠিন শাস্তি চাই।’

রিফাত এই দূর্ঘটনার জন্য দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবী করে বলেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমি সাক্ষী হতে চাই, যে চালক আজ মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি চালিয়েছেন, আদৌ তাঁর লঞ্চ চালানোর সনদ আছে কি না? কারণ মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসার পর মাঝপথে লঞ্চটি আরেকটি বালুবাহী জাহাজকে (বাল্কহেড) ধাক্কা দিয়েছিল। ভাগ্যক্রমে তখন কোনো দুর্ঘটনা হয়নি। তখন কিন্তু একবার আমরা ভয় পেয়ে যাই। আবার সদরঘাটের কাছাকাছি আসার পর আমাদের লঞ্চের চালক যদি সতর্ক থাকতেন, তাহলে কিন্তু এই দুর্ঘট না-ও ঘটতে পারত। তবে আমাদের লঞ্চটি ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেওয়ার দায় ময়ূর-২ কোনোভাবে এড়াতে পারে না। ময়ূর-২ আমার মা-বোনকে মেরে ফেলল। আমি বিচার চাই। কঠিন শাস্তি চাই। এই ঘটনায় যাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে, তাঁরা যেন জামিন না পান। দ্রুত বিচার করা হোক।’

মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা সব ছোট লঞ্চ চলাচল বন্ধ করার দাবি জানান রিফাত আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিতভাবে লঞ্চে করে ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জে যাই। আমরা জানি, ছোট লঞ্চগুলো যখন নদীতে চলে, তখন গ্রীন লাইনের মতো বড় বড় লঞ্চ যখন পাশ দিয়ে যায়, তখন ছোট লঞ্চগুলো দোলে। বহু ছোট লঞ্চ ডুবে বহু মানুষ মারা গেছেন। কিন্তু বছরের পর বছর এই ছোট লঞ্চ চলছে। প্রশাসন এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। আমি চাই না, আমার মতো আর কেউ তার মা হারাক, কেউ বোন হারাক।’

সূত্র: প্রথম আলো

জেএ/আই নিউজ

Green Tea
জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়