ঢাকা, বুধবার   ১০ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ২৬ ১৪৩৩

প্রকাশিত: ১৩:৪২, ২৫ এপ্রিল ২০১৯
আপডেট: ১৫:২০, ২৯ এপ্রিল ২০১৯

ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রাজনীতি

রিপন দে রাজনীতিকে বলা হয় নীতির রাজা। সমাজ ও জনগণের কল্যাণে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর জন্য নির্দিষ্ট একটি আদর্শকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। বছরের পর বছর নিজেদের লক্ষ্য ঠিক রেখে আদর্শের জন্য কাজ করতে গিয়ে একসময় যোগ্যতা অর্জন করবেন নির্বাচন করার, নির্বাচিত হওয়ার। সংসদ নির্বাচনে একজন রাজনীতিবিদ আসবেন তার রাজনীতির পূর্ণতা আসার পর। কাগজে-কলমে এমন কোনো নিয়ম না থাকলেও নৈতিকতা এবং ইতিহাসের হিসেবে সেটাই অলিখিত নিয়ম। কিন্তু দিনে দিনে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ চলে গেছে রাজনীতিবিদদের নাগালের বাইরে ব্যবসায়ী এবং ভিন্ন পেশার কাছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে রাজনীতির নীতির রাজ্য। রাজনীতিবিদরা রাজনীতিতে হয়ে যাচ্ছেন সংখ্যালঘু। এখন যে কেউ যে কোনো যোগ্যতায় দলের আনুগত্য পেলেই রাজনীতিতে এসে রাজনীতির মাঠে না গিয়েই এমপি, মন্ত্রী হতে পারছেন। অনেক দল থেকে মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের চেয়ে টাকাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী রাজনীতিতে এসে রাজনীতিকে ব্যবসা হিসেবেই দেখছেন। যার ফলে তারা ব্যবসা রেখে এলাকায় সময় দিতে পারেন না এবং রাজনীতিতে জনসেবার যে মূল লক্ষ্য তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ জনগণ। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের মধ্যে রাজনীতি ফিরিয়ে দিতে যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা হারিয়ে গেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। রাজনীতিকে এখন জনসেবা না ভেবে ব্যবসা হিসেবে নিচ্ছেন ভিন্ন পেশা থেকে আসা লোকজন। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের রাজনীতি ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢুকে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যানে। ২৫ ডিসেম্বর ২০১৬ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৩ সালে এমপিদের মধ্যে ব্যবসায়ীর যে হার ১৫% ছিল, তা এখন অতীতের সব রেকর্ড পেছনে ফেলে ৬৯%-এ এসে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য সংসদগুলোর ধারাবাহিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেই বাংলাদেশের রাজনীতি ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢুকে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৫৪ সালে এমপিদের মধ্যে ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। পরে ধারাবাহিকভাবে এটি বেড়েছে। স্বাধীনতার দুই বছর পর প্রথম নির্বাচনে ১৯৭৩ সালে ১৫% ব্যবসায়ী ছিলেন সংসদে। এরপর সামরিক নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ব্যবসায়ী, সম্পদশালী ও প্রভাবশালীদের ডেকে ডেকে করা হয়েছে এমপি। মাত্র ছয় বছরে ১৯৭৯ সালে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৫%। এরপর শুধুই বেড়েছে দুর্বৃত্তায়ন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের পরও সেই একই ধারা অব্যাহত ছিল। ১৯৯৬ সালে এসে ব্যবসায়ী এমপির হার হয়েছে ৪৮%, পরে ২০০১ সালের সংসদে এ হার হয় ৫১% এবং ২০০৮ সালে মোট এমপির ৬৩ শতাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী। সেসব রেকর্ডও ভঙ্গ হয় ২০১৪ সালের নির্বাচনে। সে নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ ও অতীতের ধারাবাহিকতায় সরকারের চার ভাগের প্রায় তিন ভাগই দখল করেছেন পেশায় ব্যবসায়ীরা। সংরক্ষিত আসন বাদ দিলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৯ শতাংশে। এই সংখ্যা বেড়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী এবং আইনজীবীদের সংখ্যা চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি বেসরকারি টিভি চ্যানেল ২৪-এর সংবাদে সুজনের দেয়া তথ্যের সূত্রে একটি প্রতিবেদনে জানায়, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে শপথ নেয়া সংসদ সদস্যদের ৭৩ শতাংশ পেশায় ব্যবসায়ী এবং আইনজীবী। দিন দিন যে হারে রাজনীতিতে রাজনীতিবিদরা সংখ্যালঘু হচ্ছেন এবং ব্যবসায়ীসহ অন্য পেশার মানুষ রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন, তাতে হয়তো আর হাতেগোনা কয়েকটা নির্বাচনের পরে কোনো প্রকৃত রাজনীতিবিদ আর এমপি হিসেবে থাকার সুযোগ পাবেন না। এর ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমপি, মন্ত্রীদের যে দূরত্ব বাড়বে এবং এতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে, তা অবশ্যই দেশ ও সমাজ কারো জন্যই মঙ্গলকর নয়। চলমান রাজনীতির ধারায় তৃণমূল থেকে উঠে এসে একজন আহসানউল্লাহ মাস্টার বা একজন আবদুল জলিল সৃষ্টি হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। রাজনীতিবিদের জায়গা যখন কোনো আমলা বা ব্যবসায়ী দখল করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ জনগণের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়ে। একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদ সারাজীবন জনগণের পাশে থেকে জনগণের সুখ-দুঃখের ভাষা বোঝার যে জ্ঞান লাভ করেন, হঠাৎ করে কেউ রাজনীতিতে এলে তা পারেন না। ফলে তাদের সঙ্গে সাধারণ জনগণের মালিক-কর্মচারীর মতো বৈষম্য সৃষ্টি হয়। একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদ তার নিজের এলাকার প্রতিটি মানুষকে চেনেন। ফলে এই এলাকার মানুষ এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার বন্ধন থাকে। কিন্তু রাজনীতির বাইরের ভিন্ন পেশা থেকে যারা আসেন, তাদের সঙ্গে সেই সম্পর্ক থাকে না এবং তাদের মধ্যে অনেক সময় ডন স্টাইলে ক্ষমতা এবং টাকার দৌরাত্ম্যের প্রতিযোগিতায় জনসেবা থেকে নিজেদের ব্যবসায় মনোযোগী হতে দেখা যায়। অনেক এমপিকে তাদের এলাকায় বাধ্য হয়ে ‘স্যার’ ডাকতে হয়। মহাত্মা গান্ধী, শেরেবাংলা, ভাসানী থেকে শুরু করে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু তাদের নিজ নিজ আদর্শকে লালন করে মানুষের ও সমাজের মুক্তি জন্য কাজ করে গেছেন নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বর্তমানে একদিনের মধ্যেই ভিন্ন পেশার একজন মানুষ এমপি, মন্ত্রী হয়ে যাচ্ছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে একসময় ব্যাকরণ মেনে রাজনীতি হলেও বর্তমানে তা নেই। বিগত কয়েক বছরের মতো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের জোট থেকে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ীর পাশাপাশি কয়েকজন নায়ক, গায়ক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, উকিল মনোনয়ন কিনেছিলেন। অন্যদিকে, বিএনপি জোটে মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় ছিল আরো চমক। ব্যবসায়ী প্রবাসীদের পাশাপাশি নেতাদের ছেলে-মেয়ে-ভাই-বোন সবাইকে গণহারে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। যদিও বিএনপি জানিয়েছিল তারা কৌশলী হয়েছে, কিন্তু কৌশলের কারণে একের অধিক মনোনয়ন দিলে সেটা কি নেতাদের ছেলে-মেয়েদের না দিয়ে পরীক্ষিত নেতাদের দেয়া যেত না? ব্যবসায়ীর পাশাপাশি দীর্ঘদিনে পরীক্ষিত নেতাদের রেখে সাবেক নেতা বা বর্তমান নেতাদের ছেলে-মেয়েকে শুধু পরিবারের পরিচয়ে মনোনয়ন দিয়ে এমপি বানানোর চিন্তা আমাদের দেশের মোটামুটি সব দলেই আছে। দিন দিন ব্যবসায়ীদের এমপি হওয়ার এই প্রবণতা বিভিন্ন সময় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন প্রকৃত রাজনীতিবিদরা। সারাজীবন রাজনীতি করে যে মানুষটি দেখবেন তার আসনে অন্য পেশাতে একদিনের ব্যবধানে কেউ এসে এমপি হয়েছেন স্বাভাবিকভাবে তার রাজনীতি থেকে আগ্রহ কমে যাবে, যা ভবিষ্যৎ নেতা সৃষ্টিতে বাধা হয়ে আসবে। সারাজীবন রাজনীতি করে বর্তমানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন আবদুল হামিদ। গত বছর একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অন্য পেশা থেকে রাতারাতি রাজনীতিতে আসা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি বলেন, ‘কেউ ৫৯ বছর, কেউ ৬৫ বছর, কেউ ৬৭ বছর চাকরি করে। উনার যা কিছু করার করে এরপর এসে বলেন আমি রাজনীতি করব।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোকে এসব ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এগুলোকে থামানো দরকার।’ ভিন্ন পেশা থেকে আগমন নিয়ে তিনি বলেন, ‘এক্সপার্টাইজও দরকার আছে। এমবিবিএস পাস করে সরাসরি রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন, কোনো অসুবিধা নাই। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন, সরাসরি ঢোকেন। বিসিএস পাস করেই রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন। এভাবে আসেন।’ সেদিন তিনি আরো বলেন, ‘রাজনীতি যারা করবেন স্কুলে বাদ দিলাম, অন্তত কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজনীতিতে জড়িত হোক। রাজনীতির মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা, চলাফেরা করল। এমনও রাজনীতিবিদ আছেন, বড় বড় কর্মকর্তা ছিল, জুনিয়র অফিসাররা তাকে স্যার ডাকছে। এখন পাবলিকে যদি স্যার না ডাকে, তাহলে তারা গোস্যা হয়।’ ভিন্ন পেশা থেকে রাজনীতিতে গিয়ে এমপি হওয়া যায় এবং রাজনীতিকে ব্যবহার করে নিজের ব্যবসাসহ প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতাকে জাহির করা যায়- এই কথাটি যখনই ব্যবসায়ীরা বুঝতে পেরেছেন, তখনই তারা রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছেন। একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদ যেমন আজন্ম মানুষের সঙ্গে থেকে মানুষের সেবায় থাকতে পছন্দ করেন, তেমনি একজন ব্যবসায়ী রাজনীতিতে এসে রাজনীতিকে ব্যবহার করে নতুন নতুন ব্যবসায় যুক্ত হতে পছন্দ করছেন। তারা যখন মাঝে-মধ্যে এলাকায় যান, তাদের মধ্যে সাধারণত তিনটি ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়- ১. নিজেকে ডন ভাবেন, ২. নিজেকে সাধারণ জনগণের থেকে অন্যদের থেকে অন্য উচ্চতায় ভাবেন ও ৩. সাধারণের সেবা বাদ দিয়ে টাকা ক্ষমতার নেশায় ছুটতে থাকেন। যার কারণে জনগণের প্রকৃত সেবা পাওয়া হয় না। তাই সমাজের এবং দেশের কথা ভাবলে রাজনীতি রাজনীতিবিদদের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে। তবে এই অবস্থা সৃষ্টি করেছেন রাজনীতিবিদরা নিজেই। বর্তমানে রাজনীতি আর ব্যবসা এক হয়ে স্বকীয়তা হারাচ্ছে, যার জন্য কোনোটাই ভালো চলছে না। তার ওপর রয়েছে মনোনয়ন বাণিজ্য, যার কারণে ব্যবসায়ীরা অগ্রাধিকার পেয়ে যাচ্ছেন। তবে ভিন্ন পেশা থেকে কেউ রাজনীতিতে আসতে চাইলে তার পথ একেবারেই রুদ্ধ করে দেয়া ঠিক হবে না। নির্দিষ্ট একটা প্রক্রিয়া মেনে আসতে হবে। কয়েক বছর নিজের এলাকা এবং দলের সঙ্গে থেকে জনগণের ভাষা বুঝতে হবে, দলের আদর্শ লালন করতে হবে। তবে সেটাও গণহারে হতে পারে না। যেহেতু রাজনীতিবিদরা নিজেরাই এই অবস্থার সৃষ্টি করেছেন, তাই এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য রাজনীতিবিদদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তাতে রাজনীতিবিদরা যেমন রাজনীতিতে তাদের অবস্থান ফিরে পাবেন, তেমনি উপকৃত হবে দেশ ও সমাজ। তবে তার আগে সারাদেশে যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির পথ খুলতে হবে। যদি টাকার বিনিময়ে কমিটি বা পকেট কমিটি বানানো হয়, তাহলে কর্মীবান্ধব প্রকৃত নেতা সৃষ্টি হবে না। আর নিজ নিজ দলে স্বচ্ছতার সঙ্গে নেতা সৃষ্টি না হলে দেশের নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য নেতাও তৈরি হবে না। তাই সবার আগে সব রাজনৈতিক দলকে নিজের দলের গণতন্ত্র বজায় রেখে প্রকৃত নেতা সৃষ্টি করা উচিত। লেখক : রিপন দে , সাংবাদিক (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আমাদের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়