দূরে দেখা যাচ্ছে Ol Doinyo Lengai আগ্নেয়গিরি[/caption]
হ্রদের কাছে পৌঁছে, তীর ধরে হাঁটতে গিয়ে দেখলেন, হ্রদের তীর বরাবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য পাখি আর বাদুড়ের স্ট্যাচু। কারা যেন স্ট্যাচুগুলি নিঁখুতভাবে তৈরি করে, অবহেলায় ফেলে দিয়ে গেছে হ্রদের ধারে। স্ট্যাচুগুলি বেশ ভারি। একটি পাখির স্ট্যাচুকে হাতে তুলে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে তাঁর মেরুদন্ড বরাবর যেন একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। এগুলি স্ট্যাচু নয়। জীবন্ত অবস্থায় পাথর হয়ে যাওয়া প্রাণীগুলির মমি। হাতের জিপিএস ডিভাইস জানান দিচ্ছে খুনি হ্রদটার নাম লেক নেট্রন।
লেক ন্যাট্রন[/caption]
কয়েক মুহূর্তের জন্য জীবনে ফেরালেন নিক
স্ট্যাচু হয়ে গেছে ‘মেছো ঈগল’[/caption]
প্রত্যেকটি প্রাণীর দেহ নিখুঁতভাবে চুনাপাথরে জমে গেছে। মনে হবে, প্রকৃতির কর্মশালায়, কোনও ভাস্কর পাথর খোদাই করে স্ট্যাচুগুলি বানিয়েছেন। নিক ব্রান্ডট পাথর হয়ে যাওয়া বিভিন্ন পাখি ও বাদুড়দের শরীর, গাছের ডালে বসিয়ে ছবি তোলেন। যেন তারা জীবিত।
আরেকটি হতভাগ্য পাখির পাথর হয়ে যাওয়া দেহ[/caption]
নিক তাঁর বইয়ে এ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “আমি ওদের পেয়ে আবার কয়েক মিনিটের জন্য জীবন্ত করতে চেয়েছিলাম। ওরা হ্রদটির পাশের গাছের ডালে বা পাথরে যেভাবে বসে থাকত, সেভাবেই ওদের বসিয়ে দিয়েছিলাম। ছবি তুলেছিলাম। ক্যামেরার ভিউ-ফাইন্ডারে ওদের আশ্চর্য রকমের জীবন্ত লাগছিল। নিকের তোলা এই ছবিগুলি বিশ্ব জুড়ে সাড়া ফেলে alive again in death শিরোনামে।
তানজানিয়ার আরুশা এলাকার গ্রেগরি রিফ্টে আছে এই খুনি হ্রদ
অগভীর নেট্রন লেকটি দৈর্ঘে ৫৭ কিমি ও প্রস্থে ২২ কিমি। জলের গভীরতা মাত্র ১০ ফুট। মধ্য কেনিয়া থেকে তানজানিয়ায় ঢুকে পড়া দক্ষিণ Ewaso Ng’iro নদীর জল, নেট্রন হ্রদে এসে পড়ে। এছাড়াও লেকে জল আসে খনিজ পদার্থে ভরপুর আশেপাশের বিভিন্ন উষ্ণপ্রস্রবণ থেকে। বছরের বেশিরভাগ সময় লেকের জলের তাপমাত্রা থাকে ৬০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। প্রচুর সোডিয়াম ও কার্বোনেট যুক্ত ট্র্যাকাইট লাভা দিয়ে প্লিসটোসিন যুগে তৈরি হয়েছে নেট্রন হ্রদের তলদেশ। ফলে লেকের জল অস্বাভাবিক ক্ষারধর্মী। হ্রদটির জল দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায় বলে, হ্রদের তরলে পড়ে থাকে ঘন natron (sodium carbonate decahydrate) এবং trona (sodium sesquicarbonate dihydrate)।
সায়ানোব্যাকটেরিয়ার জন্য, হ্রদের জলের রঙ কখনও হয়ে যায় লাল[/caption]
লেকের জলে ক্ষারের মাত্রা যত বাড়ে, তত বংশবৃদ্ধি হয় লবণগ্রাহী সায়ানোব্যাকটেরিয়ার। এই ব্যাকটেরিয়ার শরীরে থাকা লাল রঞ্জক পদার্থের জন্য লেকের জল হয় রক্ত লাল। পাড়ের দিকে জলের রঙ হয় হালকা গোলাপি।
কেন পাখীগুলি জল ছুঁয়েছিল
কেউ জানে না বা দেখেনি কীভাবে এই প্রাণীগুলি জীবন্ত স্ট্যাচু হয়ে গেছে। কিন্তু অনুমান করা হচ্ছে, সূর্যের রশ্মি হ্রদের জল থেকে আয়নার মত প্রতিফলিত হয়েছে। লেকের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় পাখিদের চোখে লেক থেকে ঠিকরে আসা সূর্যরশ্মি পড়েছিল। চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে বা বিভ্রান্ত হয়ে লেকের জলে আছড়ে পড়েছিল পাখি ও বাদুড়গুলি। লেকের জলে থাকা সোডা আর নুন প্রাণীগুলির শরীরে লেগে যায়।
স্ট্যাচু হয়ে যাওয়া বাদুড়[/caption]
বেশিরভাগ পাখি জলে আছড়ে পড়বার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। কোনও কোনও পাখি ও বাদুড় অতিকষ্টে হ্রদের জল থেকে পাড়ের ফিরে আসে। কিন্তু ভিজে শরীর যত শুকায়, তাদের শরীর কামড়ে ধরতে থাকে সোডা আর নুন। এক সময় জীবন্ত অবস্থাতেই প্রাণীগুলি স্ট্যাচুতে পরিণত হয়, মর্মান্তিক মৃত্যু যন্ত্রণা অনুভব করতে করতে।
খুনি হ্রদই আবার জীবন দেয় ফ্লেমিঙ্গোদের
কিন্তু অবাক হওয়ার মত আরেকটি ঘটনা ঘটে এখানেই। পূর্ব আফ্রিকার লেসার ফ্লেমিঙ্গোদের সবচেয়ে বড় এক প্রজনন ক্ষেত্র এই লেক ন্যাট্রন। প্রায় ২৫ লক্ষ লেসার ফ্লেমিঙ্গো হ্রদটিকে ঘিরে বাস করে। কারণ এই লেকের অগভীর জলে মেলে প্রচুর স্পিরুলিনা ( নীলাভ-সবুজ শৈবাল)। এই শৈবাল খেয়ে বেঁচে থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করে, পৃথিবীর অনান্য জায়গায় বিপন্ন হয়ে পড়া লেসার ফ্লেমিঙ্গোরা।
লম্বা লম্বা পা ফেলে লেকের জলে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে লেসার ফ্লেমিঙ্গোরা[/caption]
লেসার ফ্লেমিঙ্গোরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লেক ন্যাট্রনকে বেছে নিয়েছে। কারণ, এই লেক ন্যাট্রনের খুনি চরিত্র ও চরম আবহাওয়া অনান্য শিকারী পশুপাখিদের লেকটি থেকে দূরে রাখে। ফলে লেসার ফ্লেমিঙ্গোরা নিশ্চিন্তে বংশবৃদ্ধি করে এবং শাবকেরা নিরাপদে থাকে।
























