ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:৫৭, ১৫ আগস্ট ২০২১
আপডেট: ২৩:০৭, ১৫ আগস্ট ২০২১

ইউটিউবে ওয়াজে মগ্ন থাকতেন, আফগানিস্তানে পাড়ি দিলেন সিলেটের যুবক

হাইস্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি, সেখান থেকেই একাধিকবার তাবলিগে যাওয়া। ঘরে রাখতে দিতেন না টিভি, কম্পিউটার। গান শোনাও বন্ধ ছিলো।ইউটিউবে ধর্মীয় বিভিন্ন বক্তার ওয়াজে মগ্ন থাকতেন। এভাবেই দিন কাটছিলো সিলেটের ২০ বছর বয়সী যুবক আব্দুর রাজ্জাকের।

এই রাজ্জাক হঠাৎ একদিন নিখোঁজ হয়ে যান, সাথে ছিলেন তার কিছু বন্ধুরাও। দুশ্চিন্তায় পড়েন তার পরিবারের সদস্যরা। খোঁজ নিয়ে পুলিশ জানায়, রাজ্জাক আফগানিস্তানে চলে গেছেন। এ কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়েন তার পরিবারের সদস্যরা। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তারা।

পুলিশ রাজ্জাকের পরিবারকে জানায়, ‘হিজরত’ আর ‘মুসলমানদের রক্ষার’ নামে আব্দুর রাজ্জাক বাড়ি ছেড়ে আফগানিস্তানে। তালেবানদের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি সেখানে গেছেন। 

তবে তার বড় ভাই সালমান খান বিষয়টি যেন মেনে নিতেই পারছিলেন না। তিনি জানান, গত ২৪ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় বাসা থেকে বের হন আব্দুর রাজ্জাক। ‘দুদিন বন্ধুর বাসায় থাকব’— এমনটি বলে তিনি সিলেটের লামাবাজার ছাড়েন। সেখান থেকে যান বন্ধু ফরিদের বাসায়। ২৫ মার্চ ফরিদের বাসা থেকে নিজ বাসায় ফেরার কথা থাকলেও আর ফেরেননি রাজ্জাক।

রাজ্জাক লামাবাজারের একটি কলেজের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই খুব শান্তপ্রকৃতির সে। দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নিয়মিত নামাজ আদায় করে। খুব বেশি নয়, হাতেগোনা কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে ছিল তার চলাফেরা। প্রয়োজন ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলত না রাজ্জাক। এলাকায় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। সে যে আফগানিস্তান যেতে পারে— এটা বিশ্বাস হয় না।

সালমান খান আরও বলেন, ‘২৫ মার্চ থেকে সে নিখোঁজ। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। শেষমেশ ১ এপ্রিল সিলেটের কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি’। ওই জিডির সূত্র ধরে সালমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে সিটিটিসি। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তারা জানায়, ‘রাজ্জাক চলে গেছে আফগানিস্তানে।’

তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই তিনি খুবই শান্ত স্বভাবের ছিলেন। একা একা থাকতে পছন্দ করতেন। নিয়মিত নামাজও পড়তেন। কলেজ বন্ধ থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে তাবলিগ জামাতে যেতেন। সব সময় কম কথা বলতেন। কাজ ছাড়া অতিরিক্ত কথা বলতেন না। রাজ্জাক বলতেন, ‘অতিরিক্ত কথা বলে যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে তো আমি পাপ করে ফেললাম। এ কারণে কম কথা বলাই ভালো।’

সম্প্রতি রাজ্জাক একটি স্মার্টফোনও কিনেছিলো, যদিও সেখানে সবসময় চলতো ধর্মীয় বিভিন্ন বক্তাদের ওয়াজ ও আলোচনা।

রাজ্জাকের সন্ধান দিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। সংস্থাটি বলছে, ভারত হয়ে রাজ্জাক এখন আফগানিস্তানে অবস্থান করছেন। তিনি একা নন, তার সঙ্গে আরও অনেক বাংলাদেশি যুবক আছেন। সেখানে তালেবানদের সহযোগী হিসেবে তারা কাজ করছেন।

সিটিটিসি'র এক পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, সম্প্রতি তারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা জানান, তাদের অনেক বন্ধু কথিত হিজরতের নামে আফগানিস্তান গেছেন। তাদের মধ্যে রাজ্জাকও রয়েছেন। রাজ্জাকের ছবি দেখে তারা বিষয়টি সিটিটিসিকে নিশ্চিত করেন।

সিটিটিসি জানায়, প্রথমে ভারত, এরপর পাকিস্তান হয়ে তিনি আফগানিস্তান পৌঁছেছেন। হিজরতের নামে তালেবানদের সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করাই তার মূল উদ্দেশ্য। রাজ্জাক শুধু একাই যাননি। তার মতো আরও অনেক যুবক হিজরতের নামে গ্রুপ করে তালেবানদের ডাকে আফগানিস্তানে যাচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটিটিসি'র আরও এক কর্মকর্তা জানান, অনেক আগে থেকেই আমরা রাজ্জাকের বিষয়ে জানতাম। তিনি আফগানিস্তান যেতে পারেন— এমনও সন্দেহ ছিল। সম্প্রতি কয়েকজন জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি যে, তিনি আফগানিস্তান গেছেন।

‘শুধু রাজ্জাক নন তার মতো আরও অনেকে বর্তমান আফগান-পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বেলিত। তাদের মধ্যে তালেবান ফ্যান্টাসি কাজ করছে। তালেবানদের সঙ্গে তারাও বিজয়ের সঙ্গী হতে চান। এ কারণে দলে দলে সেখানে (আফগানিস্তান) যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকে সফলও হয়েছেন।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি তালেবানরা আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নিতে মুসলিম যুবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে কিছু যুবক কথিত হিজরতের নামে ঘর ছেড়েছেন। বাংলাদেশ থেকেও গেছেন। তবে ঠিক কতজন গেছেন এ মুহূর্তে সংখ্যাটি বলা যাচ্ছে না।

আইনিউজ/এসডি

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়