ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৮

নুসরাত জাহান

প্রকাশিত: ১৯:৫১, ১২ আগস্ট ২০২১
আপডেট: ১৯:৫৬, ১২ আগস্ট ২০২১

যতবার একটা আদি ধান হারিয়ে যায়, ততবার হারিয়ে যায় বাংলার কৃষ্টি

আদি ধান বৈচিত্র্যের ব্যাপক খরা গ্রাম বাংলার দৃশ্যমান নান্দনিকতাকেও বিবর্ণ করেছে। ধানের খড় ছাওয়া সুন্দর ছাদের কুঁড়েঘরগুলো এখন আর দেখাই যায় না। এর একটা বড় কারণ হলো নতুন সব আধুনিক জাতের ধানে যে খড় হয় তা এত ছোট আর ভঙ্গুর যে তাতে ঘর ছাওয়া যায় না।

এশিয়ার অন্য অনেক কৃষ্টির মতো বঙ্গ কৃষ্টিতেও 'ভাত খাওয়া' কথাটা 'খাবার খাওয়ার' সমার্থক।

সংস্কৃত শব্দ 'অন্ন' এবং প্রাচীন বাংলা শব্দ 'ওদন' দুটোর মানেই ভাত এবং খাবার। একটা সাধারণ বাংলা কথা 'ভাত খেয়েছো?' মানে আসলে জেনে নেওয়া দুপুর বা রাতের খাবার খেয়েছেন কি না। এইসব রোজকার ভাষা বঙ্গ কৃষ্টিতে চালের মহান তাৎপর্যকে নির্দেশ করে। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি বাঙালী কৃষ্টিতে প্রবহমান আচারসমূহ চাল, চালের গুঁড়ো অথবা ভাতের সাথে জড়িয়ে থাকে। প্রত্যেক ঐতিহ্যবাহী উৎসব অনুষ্ঠানের আপ্যায়নে পরিবেশিত হয় পোলাও কিংবা পায়েসের মতো সুগন্ধি চালের খাবার।

বাংলার শিশুশ্রেণীর ছড়াগুলো আজও বাঁচিয়ে রেখেছে আদি ঐতিহ্যবাহী ধানের বৈচিত্র্যময় সব স্মৃতিকে, যারা তাদের বিশেষ গুণের জন্য সমাদৃত হতো। আমার শৈশব স্মৃতির এক পুরোনো ছড়া এমন:

কলম কাঠির পাতলা চিঁড়ে, হামাই ধানের খই,

চিনি আতপ চালের পায়েস, খাবে এসো সই।

আরও এক ছড়ায় বলা হচ্ছে-

আমার বাড়ি যাইও ভোমর, বসতে দেব পিঁড়ে,

জলপান যে করতে দেব, শালি ধানের চিঁড়ে।

শালি ধানের চিঁড়ে দেব, বিন্নি ধানের খই,

বাড়ির গাছের কবরী কলা, গামছা-বাঁধা দই।

এই মিষ্টি ছড়াগুলো আজ বিস্মৃত, ঠিক যেভাবে আধুনিক বাঙালির পাত থেকে বিস্মৃত হয়েছে কলার কবরী জাত আর চালের বিপুল বৈচিত্র্যময়তা। প্রাচীন প্রথা এবং খাদ্যাভ্যাসগুলো এখন আর আগের মতো অর্থ বহন করে না, কারণ তাদের সাথে জড়িয়ে থাকা ধানগুলো হারিয়ে গেছে।

বৈচিত্র্যের খরা

বাংলা অঞ্চলে গৃহপালিত ধানের চাষাবাদ শুরু হয় প্রায় চার হাজার বছর আগে। সুদীর্ঘকাল ধরে, প্রাচীন কৃষকগণ সৃষ্টি করেছেন হাজার হাজার স্থানীয় জাতের ধান, যারা প্রত্যেকেই জন্মভূমির মাটি এবং জলবায়ুর সাথে অভিযোজিত। আদিম চাষাবাদকারীদের হাতে ঘটা এ প্রক্রিয়াকে চার্লস ডারউইন অভিহিত করেছেন ' কৃত্রিম নির্বাচন ' নামে। গৃহপালিত ধান ওরাইজা স্যাটিভা এর ইনডিকা গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত এই ধান বৈচিত্র্যগুলোর অধিকাংশই জন্মায় পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশে। কিছুটা জাপানিকা ধানও চাষ হয় এসব অঞ্চলে, বিশেষত গভীর পানির এলাকায়।

সবুজ বিপ্লব নাযিল হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মোট ধান বৈচিত্র্যের সঠিক সংখ্যা কত ছিল তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় নি। যদিও, বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন ১৯৪০ সালে অবিভক্ত বাংলায় পনের হাজার স্থানীয় জাতের ধান চাষ করা হতো। ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট রিসার্চ স্টেশন এর অপ্রকাশিত নথি বলছে, ১৯৬০ সাল পর্যন্ত কৃষকগণ পাঁচ হাজার পাঁচশ রকম স্থানীয় জাতের ধান চাষ করতেন। ১৯৬৫ তে ভারতে সবুজ বিপ্লব নাযিল হওয়ার সাথে সাথে, অল্প কিছু উচ্চ ফলনশীল জাত দখল করলো এবং এখনো দখল করে চলেছে হাজার হাজার স্থানীয় জাত বৈচিত্র্যের স্থান।

বাংলাদেশও ধানের জিন বৈচিত্র্য বিলোপের একই রকম প্রক্রিয়ার সাক্ষী। ১৯৭০ এ সাত হাজার বৈচিত্র্যময় জাতের আদি ধানকে সরিয়ে স্থান দখল করে আধুনিক উচ্চ ফলনশীল কয়েকটি জাত, বাকী শত শত জাতের ধানগুলোও পরবর্তী দশকগুলোতে হারিয়ে যায়। বর্তমান তথ্য বলে, বাংলাদেশে মাত্র ৭০০র কিছু বেশি জাতের ধান এখন চাষ হয়।

সংক্ষেপে বললে, দুই বাংলারই অধিকাংশ স্থানীয় ধানের জাত এখন কেবল অল্প কিছু জিন ব্যাঙ্কে মেলে, কৃষকের হাতে তা আর নেই। ভ্রিহি ধান বীজ ব্যাঙ্কে থাকা আমার নিজের সংগৃহীত স্থানীয় জাতের ধান মোট ৫৭৬ টি, যা সম্ভবত ২০১২ পর্যন্ত বাংলায় চাষ হতে থাকা আদি ধানগুলোর সর্বশেষ কয়েকটি জাত। এদের মধ্যে অনেকেই কৃষিক্ষেত্র থেকে হারিয়ে গেছে, বেশিরভাগই বিলুপ্তপ্রায়, হয়তো কোনো একটি মাত্র ফার্মে টিকে আছে এমন।

হাজার হাজার জাতের ধানের এই হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো এদের প্রত্যেকটির সাথে জুড়ে থাকা এক বিপুল লোকজ জ্ঞানভাণ্ডারের ক্ষয়। একইসাথে দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা। স্থানীয় মাটি এবং পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত ধানগুলোর ওপর যাদের এখন আর কোন অধিকার নেই। আমি এখানে জোর দিয়ে বলতে চাই, "অপূরণীয় ক্ষতি এবং বিস্মৃত হওয়া এই অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ধানের জাতগুলোই আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাস এবং বাঙালির রুচি তৈরি করেছিল।"

বিভিন্ন এলাকায় এবং জেলায় নির্দিষ্ট ধানের জাত বিশেষ রকমের খাদ্য কৃষ্টি তৈরি করেছিল। মোয়া, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার জয়নগরের বিখ্যাত মিষ্টান্ন, আদিবাসী ভুমিজাত এক ধান কনকচূড় এর অনন্য সুগন্ধ বহন করতো। বিখ্যাত মুড়ি তৈরির জন্য বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, জলপাইগুড়ি এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কৃষকগণ কেলাস, দহার নাগরা, নলপাই, মউল জাতের ধান চাষ করতেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের আশেপাশের এলাকায় সীতাশাল এবং বাঁশকাঠি চাল জনপ্রিয় ছিল কারণ এরা সুস্বাদু, সরু দানার, এবং এদের রাঁধতে কম সময় লাগে। চিঁড়ার জন্য উপযুক্ত চাল হলো অজিরমন, চন্দ্রকান্তা এবং মানিক কালমা।

সাধারণ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তায় এবং খাদ্য গুণাগুণ সম্পর্কিত লোকজ জ্ঞানের অংশ হিসেবে ধানের এই বৈচিত্র্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চাল সাধারণত কার্বোহাইড্রেট এবং অল্প পরিমাণ দ্রবণীয় প্রোটিন ও লিপিড সমৃদ্ধ। এছাড়াও অনেক পরম্পরাগত ধানে থাকে অনুপুষ্টি যেমন- বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন বি যেমন থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন এবং নায়াসিন। এবং ধাতু যেমন- আয়রন ও জিংক যা থাকে ধানের তুষে। কমপক্ষে আশিটি এমন জাত আছে যাদের প্রতি কেজি দানায় বিশ মিলিগ্রামেরও বেশি লৌহ থাকে। সবচেয়ে বেশি পরিমাণ লৌহ পাওয়া গেছে হরিণ কাজলী, দুধে বোলতা এবং ঝুলি ধানে, প্রতি কেজিতে ১৩১ থেকে ১৪০ মিলিগ্রাম। অন্য ধানগুলোও ওমেগা-৩, ফ্যাটি এসিড এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট এ সমৃদ্ধ।

পুরুলিয়া জেলার এক ঔষধি ধান গরিবশাল এ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রৌপ্য কণিকা পাওয়া গেছে। রৌপ্য কণার উপস্থিতি বিষাক্ত অণুজীবদের ধ্বংস করে বলে জানা যায়। এ তথ্য থেকে গ্যাসট্রোএনটেরিক সংক্রমণের উপশমে এই চালের ঐতিহ্যবাহী ব্যবহার বোধগম্য হয়। দুধেশ্বর চাল প্রসূতি মায়েদের দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি করে বলে বিশ্বাস করা হয়। বলা হয় কেলাস ধান অথবা পশ্চিম মেদিনীপুরের বাঁকুড়া ও ভূতমুড়ি ধানের স্টার্চ স্তন্যদায়ী মায়েদের এনিমিয়া সারায়। পারমাই - শাল ধান শিশুদের বৃদ্ধি তরান্বিত করে, কবিরাজ - শাল ধান রোগীদের স্বাস্থ্য পুনর্গঠনের জন্য খাওয়ানো হয়।

ধান বোনা থেকে কাটা পর্যন্ত বিচিত্র সব আচার অনুষ্ঠান জড়িয়ে থাকে এর সাথে। শীতকালে যেসব ধান কাটা হয় তাদের উৎসব নতুন ধান বা নবান্ন নামে পরিচিত। পৌষ পার্বণের মাসব্যাপী এ উৎসবে চাল থেকে অনেক রকমের মিষ্টি খাবার তৈরী করা হয়। সদ্য ঘরে তোলা আমন ধানের চালকে পবিত্র মনে করা হয়। ব্রত বা মানতের জন্য দেবতার ভোগের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয় আমন। চালের দানা গুরুজনদের সম্মান জানাতে এবং নবীনদের আশীর্বাদ করতে ব্যবহৃত হয়। অধিকাংশ ব্রত আচার মূলত গোলাভরা ধান প্রাপ্তির আকাঙ্খা প্রকাশ করে। পৌষ মাসের তোশলা ব্রততে নারীরা ধানক্ষেতে গিয়ে দেবদেবীদেরকে সন্তুষ্ট করেন। নতুন বউকে গৃহে বরণ করা হয় আমন ধান আর দূর্বাঘাস দিয়ে।

বৈচিত্রময় এসব ধান চাল শুধু আচার আনুষ্ঠানের অণুষঙ্গীই নয়, বরং এসব প্রথার মাধ্যমে ধানের নিজের জীবনচক্রও প্রবহমান ও জীবিত থাকে। জামাই নাড়ু এবং জামাই শাল ধানের নাম হচ্ছে কন্যার স্বামীর নামে, যাকে বেশকিছু বিশেষ বিশেষ খাবার দিয়ে আদর-আপ্যায়ণ করা হয় জৈষ্ঠ্যমাসের জামাই ষষ্ঠীর অনুষ্ঠানে। দেউলাভোগ, গোবিন্দভোগ, মোহনভোগ, মোহনরস, অলি, রাধাতিলক ইত্যাদি চালগুলো পায়েস এবং উৎসবের অন্যান্য মিষ্টান্ন তৈরির জন্য অপরিহার্য।

লোকজ ধানগুলোর নামকরণও বেশ মজাদার। সুবলশাল, অসিত কালমা এবং দেবদুলালী এরকম জাতগুলো স্পষ্টভাবেই তাদের উৎপাদনকারী কৃষকের নাম বহন করে। খেজুড়ছড়ি এবং নারকেলছড়ি ধানের মঞ্জুরীর গুচ্ছাকার শাখা দেখতে অনেকটা খেজুর এবং নারকেল এর পুষ্পবিন্যাস এর মতো। অনেক জাত আবার পশুপাখির নামও বহন করে। যদিও সেসব প্রাণীর সাথে এগুলোর কোন সম্পৃক্ততা নেই। ঘোড়া শাল, হাতিধান, হাতি পাঁজর, হাঁস গুজি, হনুমান জটা, মুরগী শাল, শিয়াল শাল, শিয়াল ভোমরা এবং আরও অনেক। অনেকগুলো আবার পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক চরিত্রের নামে প্রচলিত : ভীম শাল, গৌর নিতাই, লক্ষ্মণ শাল, মেঘনাদ শাল, রাবণ শাল, রাধা তিলক, রাম শাল, সিতা শাল ইত্যাদি। দেবদেবীর নামে ধান হলো: বিষ্ণুভোগ, দূর্গা শাল, গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, ইন্দ্রশাল, কালীয়াশু, কালী কোমাদ, কার্তিক শাল, লক্ষীচূড়া, লক্ষীদীঘল, লক্ষী জটা, নরসিংহ জটা এবং ঠাকুর শাল।

সাংস্কৃতিক ক্ষতি

এইসব ধান চালের নামগুলোই শুধু লোককৃষ্টির সাথে জড়িয়ে আছে তা নয়, এদের ব্যবহারের পদ্ধতিও এসব ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আচারের মাধ্যমে রচিত হয়েছে। এবং একই ভাবে এসব ধান চালকে জড়িয়ে রচিত হয়েছে সংস্কৃতি নিজেও। গোবিন্দভোগ আর গোপালভোগ চাল ছাড়া পায়েস বানালে লক্ষী নারায়ণ পূজা অশুদ্ধ থেকে যায়। বিয়েতে সুগন্ধি চাল অতিথিদের জন্য অপরিহার্য। এরকম বিচিত্র পরম্পরার সব ধান বৈচিত্র্যের স্থান গুটিকয়েক আধুনিক, সুগন্ধহীন চাল দখল করে নিচ্ছে, ফলে এদের সাথে জড়িয়ে থাকা আচার প্রথাগুলো তাদের অর্থ হারাচ্ছে।

শিল্পায়িত কৃষির দ্রুত গতির সাথে সাথে ধানচাষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থাকা আচারাদি যেমন তোশলা আর পুণ্যিপুকুর ব্রত, ইতু পূজা, ইন্দ পূজা আর নীল ষষ্ঠী আজ লুপ্তপ্রায়। একইভাবে, জামাই নাড়ু এবং জামাই শাল চাল না থাকায় জামাই ষষ্ঠী উৎসব তার কৃষিজ তাৎপর্য হারিয়েছে। গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, মোহনভোগ এবং ঠাকুরশালের মতো অপরিহার্য জাতের চালগুলো হারিয়ে লক্ষী এবং সত্যনারায়ণ পূজার আয়োজন তার আনন্দ ও অর্থপূর্ণতা হারিয়েছে।

এইসব ধানের জাত বৈচিত্র্য বিস্মৃতির ফলে এই আচার অনুষ্ঠান বা প্রথাগুলোই কেবল তাদের অর্থগত গুরুত্ব হারায়নি, বরং অনেক উৎকৃষ্ট খাবারদাবারও হারিয়েছে তাদের আসল স্বাদ, ঐতিহাসিক যোগসূত্র এবং সামাজিক পটভূমিও। বর্ধমান জেলার এক বিখ্যাত মিষ্টান্ন সীতাভোগ তৈরি হতো একই নামের একটি চাল থেকে যা বর্তমানে বিলুপ্ত। আজকের সীতাভোগ মিষ্টি তৈরি হয় আধুনিক চাল যেমন: স্বর্ণা অথবা আইইটি-৭০২৯ থেকে। যদিও খাবারটা এখনো সেই আদি চালের নাম ধারণ করে যার স্বাদ বহু আগেই হারিয়ে গেছে।

এমন অনেক জাতের ধান যাদেরকে ওই নির্দিষ্ট খাবার তৈরীর জন্য উৎকৃষ্ট মনে করা হতো, আজ তারা হয় বিস্মৃত অথবা বিলুপ্ত। যেমন, খই এর জন্য দক্ষিণ বাংলার জয়নগর এলাকার কনকচূড় ধানের এর ব্যাপক চাহিদা ছিল কারণ খই বানানোর পরও এর হালকা সুবাসটা পাওয়া যেত। এই ধান বোনার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ায় "জয়নগরের মোয়া" বলে এক নকল জিনিসের ব্যাপক প্রচার দেখা যায় যা মূলত সুগন্ধহীন আধুনিক জাতের চাল থেকে তৈরি।

আদি ধান বৈচিত্র্যের এই ব্যাপক খরা গ্রাম বাংলার দৃশ্যমান নান্দনিকতাকেও বিবর্ণ করেছে। ধানের খড় ছাওয়া সুন্দর ছাদের কুঁড়েঘরগুলো এখন আর দেখাই যায় না। এর একটা বড় কারণ হলো নতুন সব আধুনিক জাতের ধানে যে খড় হয় তা এত ছোট আর ভঙ্গুর যে তাতে ঘর ছাওয়া যায় না। সেগুলো আদি ধানের মতো নয়। আধুনিক বাংলায় ধানের বৈচিত্র্য বিলুপ্তির আরেক ক্ষতিকর দিক হলো বাংলার বস্তুগত কৃষ্টির এই পরিণতি।

অর্থনীতিবিদ এবং ভূগোলবিদগণ যখন ভূমি ব্যবহারের রূপান্তর নিয়ে কথা বলেন, তারা একটা প্রক্রিয়ার কথা বলেন যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক ভূচিত্রের পরিবর্তন ঘটায়। সেখানে জোর দেয়া হয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ভূমির উপযোগীতার ওপর। এই উদাহরণগুলো থেকে আমরা দেখতে পাই, আদি শস্যের জিনগত বৈচিত্র্য হারানোর সাথে সাথে এর আরও বেশ কিছু ক্ষতিকর দিক আছে যা আলোচনায় উঠেই আসে না প্রায়। যেমন, লোকজ কৃষ্টির পরিবর্তন এই জাত বৈচিত্র্যের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।

উল্লেখযোগ্য ভাবেই শব্দ, প্রবাদ এবং মৌখিক ঐতিহ্যেরও এক মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে লোকজ ধানের এসকল আদি জাত হারানোর সাথে সাথে যারা এসব কথ্য ইতিহাসেকে জড়িয়ে বেঁচে ছিল। এমনই আরও অনেক বাঙালী আচার-প্রথা-কৃত্য ইতিমধ্যেই সমাধিস্থ হয়ে গেছে : হারিয়ে ফেলেছে তাদের কৃষ্টিগত এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক সার্থকতা যারা একসময় বাঙালিয়ানাকে সংজ্ঞায়িত করতো।

(ড. দেবল দেব বিখ্যাত কৃষি বিজ্ঞানী ও পরিবেশ গবেষক। দীর্ঘকাল দেশীয় বীজ বৈচিত্র্য সংরক্ষণে যুক্ত। বসুধা কৃষি গবেষণাগার এবং ব্রীহি বীজ ভাণ্ডারের প্রতিষ্ঠাতা। নিবন্ধটি ' ফরগোটেন ফুড' শিরোনামে Scroll পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালের ৬ মার্চ। সেখান থেকে অনূদিত ও আংশিক পরিবর্তিত।)

*'সংস্কৃতি' শব্দের পরিবর্তে সচেতনভাবে অপ্রচলিত 'কৃষ্টি' শব্দটি ব্যবহার করেছেন অনুবাদক।

অনুবাদ: নুসরাত জাহান।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়