ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৭

হেলাল আহমেদ

প্রকাশিত: ১১:৩২, ১২ নভেম্বর ২০২০
আপডেট: ১১:৫৭, ১২ নভেম্বর ২০২০

সালিম আলী: পাখি রাজ্যের এক রাজা

‘‘অস্থিতপঞ্চক সভ্যতার দ্রুতবেগের এই যান্ত্রিকযুগের কোলাহলময় ডামাডোল থেকে আমার মুক্তির রাস্তা হল পাখি দেখা।’’ নিজের আত্মজীবনী ‘দ্য ফল অব আ স্প্যারো’-তে লিখেছিলেন ‘বার্ডম্যান’ খ্যাত ভারতীয় পাখি বিশারদ সালিম আলী। আজ এই ১২৪ তম জন্মবার্ষিকী।

বিস্তৃত আকাশে ডানার বৈঠা বেয়ে উড়ে চলা পাখিও যে গবেষণা বিষয় হতে পারে তা বোধ করি সালিম আলীর আগে তেমন করে কেউ ভাবেনি। মুক্ত আকাশে পাখির উড়ে চলা, সমুদ্র কিংবা নদীর জলে পাখা ভিজিয়ে গোসল করা, ক্ষিপ্ত শিকারির ন্যায় ঠোঁট দিয়ে শিকার করা এসব কিছুর রহস্যকে ভালোভাবে বুঝতে চাইতেন তিনি। যেকারণে শুধু দেশিয় পাখি নয়, তার দৃষ্টি ছিলো আরও বিস্তৃত। আফগানিস্তান, তিব্বত, ভুটানের পাখিদের প্রজনন, তাদের বাসস্থান, জীবনযাত্রা সব কিছু নিয়ে খুঁটিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তার লেখা ‘বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস’ পাখি প্রেমিদের কাছে এক মহাগ্রন্থ হয়ে জায়গা  করে নিয়েছে।

১৮৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সালিম আলী ব্রিটিশ ভারতের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। নয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। পিতা-মাতা মারা যাওয়ার পর সালিমের দায়িত্ব নেন তার নিঃসন্তান মামা-মামি।

মামার বাড়িতে থাকার সময় সেকানে মাঝেমধ্যেই বাঁশের ঝাঁকায় করে আসত তিতির ও বটের পাখি। ছোট্ট সালিম সকলের অলক্ষ্যে পাখির ঝাঁকা থেকে কয়েকটা পাখি সরিয়ে ফেলে প্যাকিং বাক্সের খাঁচা বানিয়ে তার মধ্যে পাখিগুলো রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মশগুল হয়ে দেখতেন। পরবর্তী কালে ‘বার্ডম্যান’ হয়ে ওঠার বীজ বোনা হয় এ ভাবেই।

সালিম স্বপ্ন দেখতেন প্রাণিবিজ্ঞানী হওয়ার, পক্ষী-তত্ত্ব তাঁর বিষয় হবে। দুঃসাহসী অভিযাত্রী হবেন, দুর্ধর্ষ শিকারি হবেন। সালিম তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘‘ছেলেবেলায় ক্লাসে বসে ক্ষেত্রমিতির অখাদ্য সব অঙ্ক কষার চেয়ে আমি ঢের বেশি ভালবাসতাম মনোরম পরিবেশে মনের সুখে পাখির পিছনে ছুটতে।’’ ছোটবেলায় সালিম তার খেলনা এয়ারগান দিয়ে একটি অদ্ভুত রকমের চড়ুই শিকার করেন। সেই চড়ুই পাখির সূত্র ধরেই বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির তৎকালীন সচিব ওয়াল্টার স্যামুয়েল মিলার্ডের সাথে তার পরিচয় হয়। মিলার্ড চড়ুইটিকে ‘হলদেগলা চড়ুই’ হিসেবে সনাক্ত করেন। তিনি সালিমকে সোসাইটিতে সংগৃহীত স্টাফ করা পাখির সংগ্রহ ঘুরিয়ে দেখান। সালিমকে পাখি সম্পর্কিত কিছু বই ধার দেন, তার মধ্যে’কমন বার্ডস অব বোম্বে ‘ অন্যতম। তিনি পাখির একটি সংগ্রহ সৃষ্টির জন্য সালিমকে উৎসাহ দেন আর কিভাবে পাখির চামড়া ছাড়াতে হয় ও সংরক্ষণ করতে হয় সে ব্যাপারেও প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

 ‘বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি’র দেওয়াল জুড়ে মাউন্ট করা জীবজন্তু, শো-কেসে সাজানো প্রজাপতি, পাখির ডিম— এমন সব হাজারও জিনিস প্রথম বার দেখে ছোট্ট সালিমের মনে যে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, তা তাঁর জীবনটাই বদলে দেয়। সেই দিনের কথা প্রসঙ্গে সালিম পরে লিখেছেন, ‘‘বিএনএইচএস-এর সঙ্গে সেই আমার প্রথম যোগাযোগ। পরে আমার জীবন গড়ে তুলতে এবং বিশেষ একটি খাতে বইয়ে দিতে এই যোগাযোগ বড় রকমের সাহায্য করেছিল।’’ সে দিনের ছোট্ট সালিম জানতেন না, ভবিষ্যতে তিনিই হবেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ভারতীয় সেক্রেটারি এবং পরবর্তী কালে প্রেসিডেন্ট।

উচ্চশিক্ষা স্থগিত রেখে ১৯১৪ সালে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিতে সালিম চলে যান বর্মায় (বর্তমানে, মায়ানমার)। বর্মায় এসে শাপে বর হল। কাজের অবসরে তাঁর সময় কাটত চা বাগান, ফলের বাগানে বিস্তর পাখি দেখে। যদিও তাঁর পক্ষী-সমীক্ষা সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। শুধু দু’চোখ ভরে দেখতেন আর নোটবুকে পাখির খুঁটিনাটি বর্ণনা লিখে রাখতেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনে দারুণ কাজে লেগেছিল।

১৯১৭ সালে বর্মা থেকে বম্বে চলে আসেন অসমাপ্ত পড়াশোনা শেষ করতে। সেই সময় সেন্ট জ়েভিয়ার্স কলেজের জীববিদ্যার অধিকর্তা রেভারেন্ড ফাদার ব্ল্যাটারের প্রেরণা ও তাড়নায় প্রাণিতত্ত্ব নিয়ে স্নাতক হন সালিম আলী। ১৯২৪-এ প্রিন্স অব ওয়েলস মিউজ়িয়ামের (বর্তমান নাম ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ বাস্তু সংগ্রহালয়) প্রকৃতিবিজ্ঞান বিভাগে গাইড লেকচারারের চাকরি পেয়েছিলেন। এই কাজটা আবার তাঁর পড়াশোনা করার ইচ্ছেটাকে বাড়িয়ে দিল। সুযোগ এল জার্মানি থেকে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ়ুলজিক্যাল মিউজ়িয়ামে কাজ করার সময় আলাপ হয় দিকপাল জীববিজ্ঞানীদের সঙ্গে।

পাখিদের প্রজনন নিয়ে কাজ করতে গেলেন হেলিগোল্যান্ড দ্বীপে। শিখলেন পাখিদের পায়ে রিং পরানোর কারিকুরি, যা পরে তিনি এখানে এসে শুরু করেছিলেন। দেশে এসে কোনও চাকরি না পাওয়ায় তাঁর মাথায় আসে অঞ্চলভিত্তিক পাখি জরিপের চিন্তা। সাহায্যের আশ্বাস পান নিজ়ামের প্রশাসন থেকে। প্রথম কাজ শুরু করেন হায়দরাবাদে। ১৯৩০ থেকে ১৯৫০— এই দু’দশকে হায়দরাবাদ দিয়ে শুরু করে গোটা ভারতের পাখির প্রজনন, তাদের বাসস্থান, জীবনযাত্রা সব কিছু নিয়ে প্রথম পুঙ্খানুপুঙ্খ সমীক্ষা করেন তিনি।

সালিম আলী বেশ কয়েকটি দেশে পাখি দেখার জন্য অভিযান করেছেন। সংগ্রহ করেছেন পাখি সম্বন্ধীয় বহু তথ্য উপাত্ত। ভুটানে ছ’টি সংগ্রহ অভিযান করেছিলেন সেলিম। উত্তর-পূর্ব ভারত ও ভুটানের পাখিদের নিয়ে তাঁর বই ফিল্ড গাইড টু দ্য বার্ডস অব দি ইস্টার্ন হিমালয়াজ়।

সালিম প্রথম সাইবেরিয়ান সারস দেখেছিলেন ১৯৩৭ সালে রাজস্থানের ভরতপুরের কেওলাদেও ঘানার অরণ্যে। জায়গাটি ছিল পরিযায়ী হাঁসদের স্বর্গরাজ্য। এখন অভয়ারণ্য হলেও তখন সেটি ছিল রাজা সুরজমলের শিকারভূমি।

১৯৩৮ সালে নভেম্বর মাসে পক্ষী-মেধ যজ্ঞের প্রধান হোতা ছিলেন তখনকার বড়লাট লিনলিথগো। মারা পড়েছিল ৪,২৭৩ হাঁস আর রাজহাঁস! এই শিকার বন্ধ করার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছিলেন সালিম, পাশে পেয়েছিলেন জওহরলাল নেহরুকে। সমীক্ষার মতো পক্ষী-সংরক্ষণ নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। সালিম অকারণে জীবহত্যাকে বর্বরতা মনে করতেন। যদিও পাখির নমুনা সংগ্রহের জন্য তাঁকেও পাখি শিকার করতে হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সালিমের বক্তব্য, ‘‘তা যদি না করতাম, ভারতীয় পাখিদের সম্পর্কে চর্মসংরক্ষণমূলক জ্ঞানের ক্ষেত্র কিছুতেই প্রশস্ত হতে পারত না।’’

সালিম আলীর নামে নামকরণ করা হয়েছে গোয়ার বার্ড স্যাংচুয়ারি, কেরলের থাট্টেকাড বার্ড স্যাংচুয়ারি, পুদুচেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোলজি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগ ইত্যাদি। বাদ যায়নি পাখির নামও। ২০১৬ ভারতে আবিষ্কৃত হয় হিমালয়ান ফরেস্ট থ্রাস, যার বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে ‘জ়ুথেরা সালিমআলি’।

সারা জীবনে পেয়েছেন বহু সম্মান ও পুরস্কার। সে সবের ফিরিস্তি দিয়ে তিনি আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘‘পাখি নিরীক্ষণ করার মতন আপাত নিরর্থক বৃত্তিতেও কেউ যদি কায়মনোবাক্যে লেগে থেকে নিজেকে উজাড় করে দেন, তা হলে তাঁর প্রাপ্তির ঘর কিছুতেই ফাঁকা যাবে না।’’

আইনিউজ/এইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়