ঢাকা, রোববার   ২০ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৬ ১৪২৮

রিনি রাজিউন তিশা

প্রকাশিত: ২০:০২, ৪ জুন ২০২০
আপডেট: ২২:১৩, ৪ জুন ২০২১

চায়ের আদিবাড়ি চীনে যত জাত-স্বাদের চা

চীনে নানা কায়দায় চা পরিবেশিত হয়। ছবি : রিনি রাজিউন তিশা

চীনে নানা কায়দায় চা পরিবেশিত হয়। ছবি : রিনি রাজিউন তিশা

তাঁদের ভাষায়, এই চায়ের স্বাদ ‘পরিণত’ ও খানিকটা ‘বাদামের মতো। এই চা ‘সুবাসিত’ ও ‘সুষম’। কিন্তু অনেকে আবার এই চা একেবারেই পছন্দ করেননি। তাঁদের মতে, চায়ের দামটা অনেকই বেশি হয়ে গেছে।

আমি একজন ট্রাভেলার। ভ্রমণ করাটা নেশায় পরিণত হয়েছে। এই ভ্রমণ করতে করতে পৃথিবীর নানা সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন সম্পর্কে জানছি। আজ আইনিউজডটনিউজের (eyenews.news) পাঠকদের চায়ের তীর্থস্থান চীনাদের চা পান, চায়ের ইতিহাস ও রীতিনীতি সম্পর্কে বলার চেষ্টা করবো।

এর আগে বলে নেওয়রা দরকার চীনের প্রাচীর দেখার পর আমরা টি সেরেমনিতে (Tea ceremony ) গেলাম। এখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য হল আমরা যাতে কিছু চা কিনি আর গাইড কিছু কমিশন পায়। এবার আসি মূল পর্বে।

চীনাদের চার হাজার বছরের চায়ের ইতিহাস

চীনাদের চা খাওয়ার ইতিহাস চার হাজার বছরের বেশী দীর্ঘ। চা হচ্ছে চীনাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম অপরিহার্য পানীয় মেহমান আসলে তাকে এক কাপ সুগন্ধী চা দেয়া চীনাদের অতিথিকে সম্বর্ধনা করার রীতির মধ্যে পড়ে।

খ্রিস্টাব্দ ২৮০ সালের আগে দক্ষিণ চীনে ‘উ’ নামে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল। এই ‘উ’ রাজ্যের রাজা মন্ত্রীদের সঙ্গে ভোজে অংশ নেয়ার সময় মন্ত্রীরা বেশি বেশি মদ খেয়ে নেশা করতেন। তাদের মধ্যে উয়ে চাও নামে এক মন্ত্রী মদ খেতে পারতেন না, তাই রাজা তাকে মদের বদলে চা খেতে অনুমতি দেন। এই সময় থেকে চীনের অনেক লোক চা দিয়ে মেহমানকে সম্বর্ধনা করতে শুরু করেন ।

আবার এও শোনা যায় যে খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ সালে চীনের রাজা শেন নং চা খাওয়া আবিষ্কার করেন। তখন তিনি একটি চা গাছের পাশে বসেছিলেন। হঠাৎ এক ঝটকা বাতাসে কয়েকটি চায়ের পাতা তার গরম পানির মধ্যে পড়ে যায়। এভাবে তিনি আবিষ্কার করেন যে চায়ের পাতা গরম পানির মধ্যে দিয়ে খেতে বেশ মজা। তখন থেকে চীনা মানুষের চা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে।

কোনটা সত্য তা আসলে কারো জানা নাই। চীনের সংস্কৃতির মধ্যে চা-সংস্কৃতি সুদীর্ঘ কালের। প্রায় সব চীনা মানুষ চা খায়। ওরা চাকে ছা বলে! যেমন আমাদের সিলেটের লোকজনও চাকে ছা বলে।

চা খাওয়ার সময় এরা গান গায়- বাজনা বাজায়। এভাবেই চা খেতে খেতে তারা জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে।

চীনাদের এই অভ্যাস বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। মন্দিরে সন্ন্যাসীরা ধ্যান করার সময় তাদের ঘুম- ঘুম ভাব দূর করার জন্য কড়া চা খেতেন।

চীনারা চা খুব ঘন করে পান করে না। বড় এক চায়ের বোতলের নিচে একটু চায়ের পাতা পড়ে থাকে, আর তার উপরে গরম পানি ঢালা হয়। পানি শেষ হয়ে গেলে কিংবা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে আবার গরম পানি ঢালা হয়। এভাবেই সকাল থেকে সন্ধ্যা চলতে থাকে। দিন-রাত এই চায়ের পাতা ভেজানো পানি সঙ্গেই থাকে এদের। অধিকাংশ রেস্টুরেন্টেই খেতে গেলে তাদের বাইরে থেকে পানি কিনে নিয়ে যেতে হয়। কারণ রেস্টুরেন্টে অনেক সময়েই পানি থাকে না। হালকা চা শুরুতে দেওয়া হয়, আবার পরে যেকোনো সময়ে নেওয়া যায়। এছাড়া স্যুপ থাকে।

চায়ের অনেক গুণ আছে। তাছাড়া ওরা মনে করে  এতে জীবনের অনেক দর্শন আছে। যেমন চা খাওয়ার পর মুখে চায়ের সুগন্ধ বজায় থাকে।

চীনারা মনে করে, এখনকার জীবনে অনেক ধরনের সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি আবার অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষকে প্রায়ই চাপের মধ্যে থাকতে হয়। চা বানানোর সময় মন শান্ত রাখতে হয়। মন শান্ত হলে সুর্্যর মত উষ্ণতা মনের মধ্যে ওঠে আসে। শান্ত ও সুখী মন নিয়ে চা বানালে চায়ের মধ্যেও ইতিবাচক শক্তি থাকে। এ রকম চা খেলে মানুষ কেবল স্বাদই পায় না, এর ইতিবাচক শক্তিও শরীরের মধ্যে বজায় থাকে

চীনের চায়ের রং অনুযায়ী ছয়টা প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়। এগুলো হলো সাদা চা, হলুদ চা, সবুজ চা, লাল চা, নীল চা এবং কালো চা। এর বাইরে যদি আরেক প্রকার যোগ দিতে চান তাহলে সেটা হলো ফুলের চা, আর ফলের চাও রয়েছে। এ কয়েকটি প্রধান প্রকারের অধীনে প্রায় ১০০০ রকমের চা আছে।

চীনা মানুষ চা খায় সুস্থ থাকার জন্য

চীনে চা খাওয়া ইতিমধ্যে এক সাংস্কৃতিক কর্মসূচীতে পরিণত হয়েছে। অনেকে চা বানানো ও চা খাওয়াকে এক শিল্প মনে করেন। চীনের বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের ছোট-বড় চা দোকান আছে। বেইজিংয়ের কেন্দ্রস্থলের ছিয়েনমেন রাস্তায় এক বড় চা দোকান আছে, নাগরিকরা সেখানে চা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের জলখাবার খান এবং সংগীত ও অপেরা উপভোগ করেন। দক্ষিণ চীনের অনেক দর্শনীয় স্থানে পর্যটকদের সুবিধার জন্য চা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। পর্যটকরা সুগন্ধ চা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।

বেইজিংয়ের নাগরিকরা ফুল চা পছন্দ করেন। সাংহাইয়ের নাগরিকরা সবুজ চা পছন্দ করেন। দক্ষিণ চীনের ফু চিয়েন প্রদেশের অধিবাসীরা লাল চা পছন্দ করেন। কোনো কোনো জায়গায় চায়ের ভিতরে কিছু মশলাও দেয়া হয়, যেমন হুনান প্রদেশের কিছু জায়গায় লবণ ও আদার চা দিয়ে মেহমানকে আপ্যায়ন করা হয়। এই ধরনের চায়ের মধ্যে চা, লবণ , আদা ছাড়া ভাজা সোয়াবিন ও তিল দেয়া হয়। চা খাওয়ার সময় হাতের কাপ নড়তে হয়, চা খাওয়া শেষে স্থানীয় অধিবাসীরা কাপের সোয়াবিন, তিল , আদা ও চায়ের পাতা এক সঙ্গে  মুখে চিবিয়ে চায়ের সুগন্ধ উপভোগ করেন।

চীনের বিভিন্ন জায়গায় চা বানানোর পদ্ধতিরও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে
পূর্ব চীনের নাগরিকরা অতিথি আসার পর চা পাতা একটি পটে রেখে গরম পানি ঢেলে দেন , কয়েক মিনিট পর টি পট থেকে কাপে চা ঢেলে অতিথির হাতে দেন। দক্ষিণ চীনের ফুচিয়েন প্রদেশের চাং চৌ শহরে চা খাওয়ার বাসনগুলো আর চা বানানোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে।

চীন থেকে সবচেয়ে বেশি যেটা উপহার হিসেবে অন্যদেশে যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যায় ‘সবুজ চা’ আর ‘জিনসেং’ (প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত চীনা ঔষধ)। আমি চীন থেকে  যখন দেশে যাই, অতি সুদৃশ্য প্যাকেটে অনেকের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলাম এই চা। সেগুলোর মূল্যমান নেহায়েত কম ছিলো না। তবে মাত্র দুই-তিনজন পছন্দ করেছেন।

কিছু চা যেগুলো নিয়ে সুন্দরী গাইড আমাদেরকে বলেছিল ‘ওলোং চা’

ওলোং চা এক ধরনের পানীয়। 'ওলোং' কথাটির অর্থ হচ্ছে কালো ড্রাগন। এ কারণে ওলোংয়ের আরেকটা নাম কালোনাগ চা। এতে চা এর পাতার অক্সিডেশন বা ফার্মেন্টেশনের ওপর চা এর রঙ বা গন্ধ পরিবর্তন হয়। পুরোপুরি ফারমেন্ট ও অক্সিডাইজড করা হয় ব্লাক টি। গ্রীন টি একেবারেই ফারমেন্ট করা হয় না। কিন্ত এই কালো ড্রাগনকে মাঝামাঝি অক্সোডাইজ বা ফার্মেন্ট করা হয়। এতে চা পাতার ফার্মেন্টেশন এর রঙ পরিবর্তনের আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়। আর তাই গ্রিন টি এর চাইতে কড়া স্বাদ থাকে। কিন্তু ব্লাক টি এর চাইতে কম ক্যাফেইন থাকে। মূলত চাটি মেদ কমাতে সাহায্য করে

জেসমিন চা বা জুঁই চা

প্রস্ফুটিত জুঁই ফুল থেকে চায়ের সাথে সৌরভ মিশ্রিত করে একধরনের সুগন্ধি চা। জেসমিন চা মূলত চায়ের প্রকৃত রং হিসেবে সবুজ চায়ের মতো হয়ে থাকে; যদিও, সাদা চা এবং কালো চাও ব্যবহৃত হয়। জেসমিন চায়ের পরিণত স্বাদ নিগূঢ় মিষ্টি এবং তীব্র সুগন্ধি হয়ে থাকে। এটি চীনের সবথেকে জনপ্রিয় সুগন্ধি চা।

মাচা

এটা  হল এক বিশেষ প্রক্রিয়াতে গজানো ও প্রক্রিয়াজাত সবুজ চায়ের পাতার খুব মিহি গুঁড়া। উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ দুই দিক থেকেই এই চায়ের গুঁড়াটি আলাদা। মাচা'র চা গাছগুলি ফসল ওঠানোর তিন সপ্তাহ আগ থেকে ছায়ায় রাখা হয় এবং প্রক্রিয়াকরণের সময় চা পাতার কাণ্ড ও শিরা সরিয়ে ফেলা হয়। ছায়াতে বৃদ্ধির সময় চা গাছ বেশি বেশি থিয়ানিন ও ক্যাফেইন উৎপাদন করে।
মাচা গুঁড়া চা-পাতা বা চায়ের ব্যাগের মতো করে খাওয়া হয় না। সাধারণত এটিকে পানি বা দুধে গুলিয়ে খাওয়া হয়।
মাচার খামার, দোকান অনেক সময় তাদের নিজস্ব মার্কার চায়ের জন্য কাব্যিক নাম রাখেন। এই নামগুলিকে জাপানি ভাষাতে "চামেই" (অর্থাৎ "চায়ের নাম") বলা হয়

চিন চিয়ুন মেন

এটি হলো চীনের উ ই পাহাড়ি অঞ্চলের এক ধরনের পাথরের ওপরে বড় হওয়া চা গাছের পাতা দিয়ে তৈরি চা। এটা হলো লাল চায়ের মধ্যে একটা। এ চা দেখতে সোনালি এবং কালো রংয়ের, খাওয়ার সময় মুখে এক ধরনের ফুলের সুগন্ধ পাওয়া যায়।

ফুআর

এটি হলো চীনের ইউনান অঞ্চলের বৈশিষ্টপূর্ণ চা। ফুআর চা পুরোপুরি গাঁজানো চায়ের মধ্যে একটা। এটা আবার এক ধরনের কালো চা। এ চা বানানোর সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি হলো একটা টি-পট বা চা-পাত্রে ফুটিয়ে খাওয়া। যারা সত্যি চা খেতে খুব পছন্দ করে তাদের চা-পাত্র সংরক্ষণের শখও আছে। চীনের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি দিয়ে বানানো মাটির বা চীনামাটির চা-পাত্র খুব সুন্দর। বিভিন্ন চা-পাত্র দিয়ে বিভিন্ন ধরনের চা বানানো হয়। ফুআর চা বানানোর সময় একটা ফুআর চায়ের পাতা বের করে তার এক টুকরা চায়ের পাত্রে দেন। তারপর চা-পাত্রটি চুলার ওপরে রেখে দিয়ে চা ফুটাতে থাকেন। আস্তে আস্তে চায়ের সুগন্ধ বের হয়ে আসে। তখন কাপে ঢেলে দিলে দেখা যায়, চায়ের রঙ একটু কালচে-লাল হয়ে গেছে। এবং নতুন চাল দিয়ে ভাত রান্নার সময় যে সুগন্ধ পাওয়া যায়, এ চা খাওয়ার সময়।ঠিক সে রকম গন্ধ পাওয়া যায়।

পাণ্ডা ডাং টি

এক কেজি চাপাতির দাম প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা! স্বাভাবিক হিসাবে প্রতি কাপে চাপাতি লাগে তিন গ্রাম করে। সে হিসাবে এক কাপ চায়ের দাম পড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা! সম্ভবত এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি চা।

তাঁর এই চায়ের সঙ্গে পাণ্ডার পুরীষ/লাদী/গু এর যোগ আছে। বিশেষত্ব হলো, এই চা গাছগুলোতে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয় পাণ্ডার পুরীষ। পাণ্ডার খাদ্য পরিপাকের ক্ষমতা খুবই কম, বিশেষ করে প্রধান খাবার বাঁশ বলে, ওদের পেটে খাবার খুবই কম হজম হয়। যা খায় তার বড়জোর ৩০ শতাংশ হজম হয়। বাকি সব পুষ্টিগুণই ওদের পুরীষে থেকে যায়। তাই তাদের পুরীষ সার হিসেবে অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। এই পাণ্ডার পুরীষ দেওয়া চাগাছগুলোতে। চা পাতাকে ‘পাণ্ডা চা পাতা’ বলে। এমনকি পাণ্ডা চা পাতায় নাকি ক্যান্সার প্রতিরোধের শক্তিও থাকে।

আলাদা চা বাগান বানিয়ে তার যত্ন-আত্তি নিতে হয়। চার বছরে ১০ টন পাণ্ডার পুরীষ ঢালা লাগে  সেই বাগানে। আর এই ‘পাণ্ডা চাগাছ’ থেকে ‘পাণ্ডা চা পাতা’ তোলার কাজটাও হয় ব্যতিক্রমীভাবে, উৎসবমুখর পরিবেশে। বসন্তের শুরুর দিনে সবাই রীতিমতো ‘পাণ্ডা’ সেজে বাগানটি থেকে চা পাতা তোলার কাজ করে।

যাঁরা খেয়েছেন এই চা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে তাঁদের মধ্যে। কেউ কেউ এই চা পছন্দ করেছেন। তাঁদের ভাষায়, এই চায়ের স্বাদ ‘পরিণত’ ও খানিকটা ‘বাদামের মতো। এই চা ‘সুবাসিত’ ও ‘সুষম’। কিন্তু অনেকে আবার এই চা একেবারেই পছন্দ করেননি। তাঁদের মতে, চায়ের দামটা অনেকই বেশি হয়ে গেছে।

রিনি রাজিউন তিশা, ট্রাভেলার

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়