ঢাকা, শনিবার   ২৩ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৮ ১৪২৮

নুসরাত জাহান

প্রকাশিত: ২১:৩৬, ১১ জুলাই ২০২১
আপডেট: ২০:২৪, ১৪ জুলাই ২০২১

রোহিনি চাকির লেখা থেকে অনুদিত

চালের নকশায় বুনে রাখা গণিত, জ্যামিতি, পুরাণ

সূর্যের প্রথম কিরণ নীলগিরি পর্বতমালার ধানক্ষেত এবং কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে, চেন্নাই এবং মাদুরাই নগরের অট্রালিকার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পথ করে নেয়নি তখনও। তার আগেই তামিলনাড়ুর মহিলারা ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন। ভোরের আবছা অন্ধকারে, তারা তাদের বাড়ির সদরের চৌকাঠগুলো ধুয়ে ফেলেন। তারপর চালের গুঁড়া গুলে কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন প্রথামতো অত্যন্ত যত্নের সাথে চমৎকার ঐতিহ্যবাহী এক নকশা আঁকতে শুরু করেন, যার নাম 'কোলাম'।

একটা বাটিতে বা নারকেলের মালায় চালের ময়দা নিয়ে কোলাম শিল্পী পা রাখেন তার সদ্য ধোয়া ক্যানভাসের ওপর। তার বাড়ির সদর দুয়ারের মেঝে, বা যে কোনো প্রবেশপথের মেঝেতে। এক চিমটি চালের ময়দা হাতে নিয়ে অতি দ্রুত তিনি এঁকে ফেলেন নিখুঁত সব জ্যামিতিক রেখা : বাঁকানো ঢেউ, লাল বা সাদা সাদা ফোঁটার চারপাশে গোলকধাঁধাঁর মতো লুপ, ষড়ভূজীয় ফ্র্যাকটাল অথবা পদ্ম ফুলের প্রতিকৃতি। পদ্মফুল সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক, যার জন্য কোলামের নকশার বুননে প্রার্থনা আঁকা হয়। এটা নিজেই হয়ে ওঠে প্রার্থনার এক কৌশল যখন শিল্পী তার দেহটি অর্ধ ভাঁজ করে, কোমর থেকে বাঁকিয়ে মাটিতে নুয়ে পড়ে তার নকশাগুলোকে আঁকেন। অনেক কোলাম শিল্পী মনে করেন কোলাম হলো পৃথিবীর দেবী, ভূদেবীর প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন।

কিন্তু কোলাম কেবল একটি প্রার্থনা নয়; বরং তা প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করার রূপকও। সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মীয় স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক বিজয়া নাগারাজন ২০১৮ সালে তাঁর লেখা, "Feeding a Thousand Souls: Women, Ritual and Ecology in India, an Exploration of the Kolam", বইতে বলেন, হিন্দু পুরাণের বিশ্বাস অনুসারে সহস্র প্রাণকে খাওয়ানো বা যারা আমাদের আশেপাশে বাস করে তাদেরকে খাবার সরবরাহ করা হিন্দুদের এক ধরনের কর্মফলগত দায়বদ্ধতা। পোকা-মাকড়, পিঁপড়া, পাখিকে চালের গুঁড়োর খাবার দেয়ার এক উদার ঐতিহ্যের মাধ্যমে হিন্দু গৃহকর্ত্রী তাঁর দিনের শুরু করেন। একই সাথে ঈশ্বর এবং প্রকৃতির প্রতিও তার অর্ঘ্য নিবেদন করেন। 

কোলাম শব্দের অর্থ সুন্দর। থরে থরে সাজানো ফোঁটাগুলোর চারপাশে সোজা বা বাঁকানো রেখার নিখুঁত প্রতিসাম্য ফুটে ওঠে এতে। প্রায় সবক্ষেত্রেই, বিন্যস্ত ফোঁটাগুলো আসে সবার আগে। প্রতিসাম্য নির্মাণের জন্য দরকার নিখুঁত মাপজোখ। হিন্দু দর্শনের এই ফোঁটা নির্দেশ করে সৃষ্টির শুরুর বিন্দুকে, যা মহাবিশ্বের প্রতীক। শিল্পীর নিপুণ আঙুল এবং চালের গুঁড়ো ছাড়া আর কোনো উপকরণ এতে ব্যবহার হয় না। কখনো কখনো নকশাটি কেবল একটি চলমান রেখা যা বারবার নিজের ওপরই সাপের মতো অসীমসংখ্যাক প্যাঁচ খেতে থাকে। প্যাঁচটি অসীম সংখ্যার প্রতীক বা আট (ইংরেজি এইট) এর মতো আকার ধারণ করে। পুলি কোলাম নামে পরিচিত এটা আর একটা ধরণ, যাকে মনে করা হয় অনন্তের উপস্থাপনা। হিন্দু পুরাণের মৌলিক ধারণা জন্ম এবং পুনর্জন্মের অনন্ত চক্র ফুটে ওঠে এতে।

গণিতবিদ এবং বিজ্ঞানীরা কোলাম নিয়ে গবেষণা করেন। ইথাকা কলেজ এর অধ্যাপক মারসিয়া আচার লিখেছেন, 'সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গাণিতিক রাশিমালার এক অনন্য উদাহরণ কোলাম।' তার নৃতাত্ত্বিক গণিতবিদ্যা গবেষণা থেকে নাগরাজন উল্লেখ করেন, 'কোলাম হচ্ছে সেই সমস্ত আদিবাসী প্রথার একটি যারা পশ্চিমের গাণিতিক ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।'

যদিও কোলাম শিল্পীরা হয়তো গাণিতিক তত্ত্বের চিন্তা করেন না, তবুও বেশিরভাগ কোলাম নকশাতেই একটা বৈশিষ্ট্য বারবার ফিরে আসে। ক্ষুদ্র থেকে শুরু হয়ে একটাই আঁচড় নিজের পুনরাবৃত্তি করতে করতে বৃহৎ হয়ে ওঠে। তৈরি করে এক জটিল নকশা। এটাই গণিতজ্ঞদেরকে আকর্ষণ করেছিলো। কারণ ওই নকশাগুলো গণিতের মূল যুক্তিগুলোকেই বিস্তৃতভাবে তুলে ধরে। নাগরাজন লিখেছেন, কীভাবে কোলাম শিল্পের পুনরাবৃত্ত অসীম প্রতিসম আকৃতিগুলো Sierpinski Triangle `র মতো গাণিতিক মডেলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


 
কম্পিউটার বিজ্ঞানীরাও কম্পিউটার ভাষার মূলনীতিগুলো শেখাতে কোলাম এর ব্যবহার করেছেন। কোলামের নকশাগুলোকে চিত্রভাষা হিসেবে পড়া যায় । আসচার এর কথা থেকে নাগরাজন উদ্ধৃত করেন, 'স্বাভাবিক ভাষা এবং কম্পিউটার ভাষা সমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সচিত্র ভাষাগুলো তৈরি হয়েছে সীমাবদ্ধ সংখ্যক মৌলিক একক এবং নির্দিষ্ট, প্রথাগত নিয়মে সেইসব একককে একসাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে।' কম্পিউটারকে কোলাম আঁকতে শেখানোর মাধ্যমে কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা, চিত্র ভাষা কীভাবে কাজ করে তা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করেন। যা তারা পরবর্তীতে নতুন যান্ত্রিক ভাষা তৈরিতে ব্যবহার করেন।

'এটা আসলে কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের সাহায্য করেছে তাদের নিজেদের কাজের ভৌত কিছু বিষয় বুঝে উঠতে', কোলাম এর জ্যামিতি বিষয়ক এক বক্তব্যে নাগরাজন বলেন।

কোলাম নকশায় প্রদর্শিত গভীর গাণিতিক তত্ত্ব সত্ত্বেও, এর চর্চাকারীগণ এই কাজটিকে স্বজ্ঞাজাত এবং উপভোগ্য বলে উল্লেখ করেন। "এটা সহজ, বিশেষত যখন আপনি ঠিকঠাক বিন্দুগুলো এঁকে শুরুটা করবেন ", বলেন গোদাবরী কৃষ্ণমূর্তি। চেন্নাইতে বসবাসরত কৃষ্ণমূর্তি অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে কোলাম আঁকছেন। তাঁর সাথে আমার ফোনে কথা হয় আর আহমেদাবাদে বসবাসরত তার পুত্রবধূ কাবেরী পুরন্ধর সেটা  অনুবাদ করে দেন।

আজকালকার ক্ষণস্থায়ী মনযোগ আর উঠোন বিহীন এপার্টমেন্টের জীবনে, কোলাম তৈরির ঐতিহ্য অনেকটা সময়ের সাথে যুদ্ধ করা। কোলামকে এখন যুদ্ধ করতে হচ্ছে ঐশ্বরিকতার সাথে মানুষের বদলাতে থাকা সম্পর্ক আর সম্প্রদায়ে নারীদের বদলাতে থাকা অবস্থানের সঙ্গে। উৎসবগুলোতে আয়োজিত কোলাম প্রতিযোগিতা এখন সেই অল্প কিছু সুযোগের মধ্যে একটা যেখানে এই শৈল্পিক প্রথার প্রদর্শন হয়। যদিও অল্পসংখ্যক তামিলই আজকাল কোলাম বানান। এইসব প্রতিযোগিতা সবার অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে। যারা এই সনাতনী প্রথায় অংশ নিতে আগ্রহী তাদের সবাইকেই এখানে স্বাগত জানানো হয়।

জানুয়ারি-ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তামিল পঞ্জিকার মারগাজি উৎসবের মাসে কৃষ্ণমূর্তি তার চেন্নাইয়ের বাড়ির সামনের লোকচলাচলের প্রধান পথটা দখল করেন। ঘন্টার পর ঘন্টা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বিস্তৃত পরিসরে কোলাম আঁকেন তিনি। তার কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই হারাতে থাকা ঐতিহ্যকে বাঁচানো। যদিও চলমান গাড়িগুলো তাকে আধুনিকতায় মোড়া নগরের ধুলোয় ঢেকে দিচ্ছে। যে নগরে এই কষ্টকর, পিঠভাঙা সাধনার জন্য কোনো স্থান নেই। তিনি বলেন 'এটা মনোনিবেশ এর মাধ্যমে এক দারুণ শরীরচর্চা। স্বাস্থ্যের জন্য এবং সৃষ্টিশীলতা চর্চার জন্য উপযুক্ত।'

কৃষ্ণমূর্তি শিখেছিলেন তার মায়ের কাছ থেকে। এবং মায়েরাই শতশত বছর ধরে মেয়েদেরকে শিখিয়ে এসেছে। কোলাম তামিল নারীদের ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি প্রকাশের এক শক্তিশালী বাহন, তাদের সৃষ্টিশীলতার সংকেত এবং কেন্দ্রীয় রূপক। এটা পৃথিবীর বুকে জীবন যাপনের এক সামগ্রিক পন্থাকে আহ্বান জানায়। কোলাম আকাঙ্খা, উদ্বেগ, সংবেদনশীলতা, এবং যন্ত্রণার কথা বলে। সর্বোপরি দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করে, আকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা : এক স্বাস্থ্যবান, সুখী গৃহস্থালি রচনায় নারীর পারদর্শীতাকে। 

কিছু পুরুষও কোলাম তৈরি করেন, তবে ঐতিহাসিক ভাবে এটা নারীদেরই সম্পত্তি। 

কৃষ্ণমূর্তির পরিবার তার এ কাজ পুরোপুরি সমর্থন করলেও অংশগ্রহনে ততটা আগ্রহী নয়। যারা আগ্রহ দেখায় তাদের সবাইকেই তিনি তার নকশার কপিটি দিয়ে দেন। সেটা হলো ১৮৮৪ থেকে চলে আসা কোলাম নকশার এক ছোট্ট বই। দক্ষ কোলাম শিল্পীগণ সর্বদা তাদের নিজেদের নকশার একটা খাতা সংরক্ষণ করেন যা পরবর্তীতে পারিবারিক উত্তরাধিকারে পরিণত হয়।

কোলাম ক্ষণস্থায়ী হিসেবেই তৈরি। দিন গড়াতে গড়াতে চালের গুঁড়োর নকশাগুলো ঝাপসা হয়ে যেতে থাকে। মুছে যেতে থাকে দর্শনার্থী, পরিবারের লোকজন, সাইকেলের চাকা, ডাকপিয়ন অথবা রাস্তার পশুপাখির পায়ে পায়ে। ছোট্ট পিঁপড়া বা ছারপোকা গুলো নকশার মধ্যে ছিদ্র তৈরি করে। কিন্তু যেহেতু কোলাম তৈরির প্রথা নিজেই মুছে যাচ্ছে, হয়ত তারই একটা ক্ষতিপূরণ হিসেবে, আজকাল অধিকাংশ কোলাম শিল্পীরা পাউডার এবং এক্রিলিক রঙের দিকে ঝুঁকছেন যা নকশাগুলোকে দীর্ঘস্থায়ীত্ব দিবে। ঐতিহ্যবাহী কোলাম এখনো চালের গুঁড়ো আর কাভি দিয়েই হয়। কাভি বা লাল মাটিকে পবিত্র মনে করা হয়। " এই সেই কোলাম যা ' সাংতাম সাংতোরাম ' মন্দিরের ভেতরে আঁকা আছে" , বলেন পুরন্ধর। কিন্তু পোঙ্গাল উৎসবের প্রতিযোগিতা গুলোতে তামিলনাড়ুর পথে পথে দেখা যাওয়া বিস্তৃত কোলামগুলো আঁকা হয় বিভিন্ন ধরনের রঙের গুঁড়ো দিয়ে। প্রাচীন পন্থিরা আশঙ্কা এবং অনুতাপ করেন, কোলাম দিনদিন উত্তর ভারতের রাঙ্গোলির মতো হয়ে যাচ্ছে। মেঝেরই আরেক নকশা যা রঙ মেশানো চালের গুঁড়ো, পাথরের গুঁড়ো অথবা ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি হয়। কিন্তু সেটা একেবারেই ভিন্ন ধরনের নকশার বুনন নিয়ে গঠিত। 

রঙিন চালের গুঁড়ো, ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি প্রথাগত এরকম বিভিন্ন নকশা সারা ভারতেই ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে আলপনা, উড়িষ্যায় ঝোতি বা চিতা, অন্ধ্রপ্রদেশে মুগ্গুলু এবং বিহারে আরিপানা দেশজুড়ে চর্চিত সেরকমই অল্প কিছু ঐতিহ্যবাহী নকশা।

আগামীকাল, যখন চেন্নাই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত দ্রুতগতির এক জীবনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে থাকবে, কৃষ্ণমূর্তি জেগে উঠবেন সূর্যের আগে। তার বাড়ির বারান্দার একটা অংশ ধুয়ে নিয়ে, শুরু করবেন প্রকৃতির প্রতি তার শ্রদ্ধার্ঘ্য। এবং সেই স্বর্গীয় মায়ের প্রতিও যিনি এই শৈল্পিক প্রথার সাধনায় জীবনভর প্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন। 'এটা সহজ' তিনি আবার বললেন।

(রোহিনি চাকির লেখা থেকে অনুদিত এবং আংশিক পরিবর্তিত)

নুসরাত জাহান, শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়