ঢাকা, সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১০ ১৪২৭

নূর মোহাম্মদ

প্রকাশিত: ১৮:১০, ৭ অক্টোবর ২০২০
আপডেট: ১৮:১৫, ৭ অক্টোবর ২০২০

দুঃখের নাগর কবি হেলাল হাফিজ

রাজা হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে জন্ম নেওয়া কবি হেলাল হাফিজ বাংলা কবিতার রাজ্যে ‘রাণীবিহীন রাজা’ হয়ে স্থায়ী সিংহাসন গেড়েছেন। কার সাধ্য এ রাজাকে পরাজিত করার?

সংসার, দুঃখ, বেদনা, কষ্ট, নারী, নিউট্রন বোমা, মারণাস্ত্র—কার সাধ্য এ সম্রাটকে সরিয়ে দেওয়ার? কষ্টের ফেরিওয়ালা, দুঃখের নাগর কবি হেলাল হাফিজ স্বদেশ জুড়ে গোলাপ বাগান তৈরি করার সংকল্প নিয়ে বাংলা কবিতার জমিনে আবির্ভূত হয়েছেন। খুব সামান্য হৃদয়ের ঋণ নিয়ে বেদনার সঙ্গে সচ্ছলতার ঘর বাঁধার স্বপ্নে কবি বিভোর এখনও —

"তাকে ভালোবেসে যদি

অমার্জনীয় অপরাধ হয় হোক,

আয় মেয়ে গড়ি চারু আনন্দলোক।

দেখবো দেখাবো পরস্পরকে খুলে

যত সুখ আর দুঃখের সব দাগ,

আয়না পাষাণী একবার পথ ভুলে

পরীক্ষা হোক কার কত অনুরাগ।"

বাংলা কবিতায় হেলাল হাফিজের আগমন বজ্রধ্বনির মতো। যে হুঙ্কার দিয়ে তিনি আবির্ভূত হলেন তার ঝংকার এখনও ধ্বনিত হচ্ছে। 'যে জলে আগুল জ্বলে' কাব্যের মাধ্যমেই তিনি ১৯৮৬ সালে সুরের অর্কেস্ট্রা বাজিয়ে ছিলেন। রবীন্দ্র-রোম্যান্টিকতার চিরকালীন অরূপের খোলস থেকে তিনি বাংলা কবিতাকে রূপের ভূমিতে নিয়ে আসেন। নব্বইয়ের দশকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কপোত কপোতি নিরেট প্রেমের সুধা পেয়েছিলেন হাফিজের কবিতায়। শুধু প্রেমের অনুরাগ নয়, ঊনসত্তরের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও ফুয়েল ঢেলেছেন তিনি দুহাত ভরে তাঁর কাব্য সুধায়। যা নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর কবিতার ছোঁয়ায় সেদিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষকও উদ্ধত দুহাত তুলেছেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। তার কবিতা সেদিন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধার প্রাণে সঞ্চার করেছিল উনিশ বছরের বালকের খুন। প্রাণে প্রাণে ঝংকার তুলেছিল তার নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়র প্রতিটি শব্দ-ধ্বনি।

"এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় ।"

ঊনসত্তর থেকে নব্বইয়ের স্বৈরাচারী আন্দোলনে তরুণদের উজ্জীবিত করেছে এ কবিতা। এ যেন কবিতা নয় একটা বুলেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে তখন এ জাগরণী বীণা ঝংকার তুলেছিল,কাঁপিয়ে দিয়েছিল স্বৈরাচারের মসনদ। স্বদেশে গোলাপের বাগান তৈরি করার সংকল্পে যে কবি মারণাস্ত্রের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন, কাঙ্ক্ষিত পতাকা পাওয়ার পর যেন তাঁর সে  স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। সে স্বপ্নভঙ্গের খেদোক্তি কবির ভাষায়—

"কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

ভজন গায়িকা সেই সন্ন্যাসিনী সবিতা মিস্ট্রেস

ব্যর্থ চল্লিশে বসে বলবেন,—'পেয়েছি, পেয়েছি' ।

কথা ছিল একটি পতাকা পেলে

ভূমিহীন মনুমিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে,

বাঁচবে যুদ্ধের শিশু সসন্মানে সাদা দুধে-ভাতে।

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে,

সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ

সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।"

বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রণহুঙ্কার, বিত্ত বৈভব বেসাতি, সোভিয়েত-আমেরিকার নর্দনকুর্দনে পৃথিবী যখন নরককুণ্ড তখন কবি হেলাল হাফিজ নিয়ে আসেন ঘৃণার বাণ। যা তিনি নিক্ষেপ করেন সাম্রাজ্যবাদীদের মস্তিষ্কে। মুখের উপর দস্যুদের তিনি বলে দেন :

"নিউট্রন বোমা বোঝ/ মানুষ বোঝ না!

মানুষের প্রতি রয়েছে  কবির অগাধ বিশ্বাস ও গভীর শ্রদ্ধা।কবি বলেছেন,

"আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে/মানুষের কাছে এওতো আমার একধরনের ঋণ।"

মানুষ কবিকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে অঙ্গার করেছে, মানবানলে পুড়ে কবি বিরান হয়েছেন। 'মানবানল’ কবিতায় তো কবির সে অভিব্যক্তিই দেখি—

"আগুনে পোড়ালে তবু কিছু রাখে কিছু থাকে,

হোক না তা শ্যামল রঙ ছাই,

মানুষে পোড়ালে আর কিছুই রাখে না

কিচ্ছু থাকে না,

খাঁ খাঁ বিরান, আমার কিছু নাই।"

নারী নিয়ে কবির রয়েছে বিচিত্র অভিজ্ঞান। তিন বছর বয়সে মাকে হারানো কবি মায়ের পরশ পেয়েছেন স্কুল শিক্ষিকা সবিতা মিস্ট্রেসের হাতে। শিক্ষিকা সবিতার দীক্ষা ও রুচিতেই কবির মানস গঠিত হয়েছে। নেত্রকোণা কলেজের সহপাঠি শঙ্করীর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে কবি হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার। শঙ্করির স্বপ্নই কবির স্বপ্নে রূপান্তরিত হয়েছিল সেদিন; শঙ্করী ডাক্তার হয়েছিল ঠিকই কিন্তু কবি সে ডাক্তারের সেবা নিতে পারেননি। শঙ্করির প্রেমে আক্রান্ত হয়ে কবি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; সেখানে তার প্রেমজ্বর সারাতে এগিয়ে আসেন হেলেন। স্পার্টার  হেলেনের মতো সেও কবিকে বিরহের অনলে নিক্ষেপ করে পাড়ি দেন ট্রয়ের কোন এক প্যারিসের অন্দরে। নারী নিয়ে কবির ভ্রান্তি কুহকের যেন শেষ নেই। অনির্ণীত নারী নিয়ে কবির কল্পনা :

"নারী কি নদীর মতো

নারী কি পুতুল,

নারী কি নীড়ের নাম

টবে ভুল ফুল।"

নারীর বিরহ, নারীর প্রেমই কবিকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে নিখাঁদ শিল্পীতে রূপান্তরিত করেছেন। নারীর প্রেমই কবিকে কষ্টের ফেরিওয়ালা বানিয়েছে। তাই কবি কষ্ট ফেরি করে বেড়ান।

"একটি মানুষ খুব নীরবে নষ্ট হবার কষ্ট আছে

কষ্ট নেবে কষ্ট।

প্রেমের কষ্ট ঘৃণার কষ্ট নদী এবং নারীর কষ্ট

অনাদর ও অবহেলার তুমুল কষ্ট,

ভুল রমণী ভালোবাসার

ভুল নেতাদের জনসভার

তাসের খেলায় দুইটি জোকার নষ্ট হবার কষ্ট আছে

কষ্ট নেবে কষ্ট।

কার পুড়েছে জন্ম থেকে কপাল এমন

আমার মত ক’জনের আর

সব হয়েছে নষ্ট,

আর কে দেবে আমার মতো হৃষ্টপুষ্ট কষ্ট।"

হেলাল হাফিজের প্রেম, মান-অভিমান-আবহমান গ্রাম বাংলার নর-নারীর প্রেমেরই আখ্যান। তাঁর মতো কে আর এমন করে বলেছে—

"পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো।

আর না হলে যত্ন করে ভুলেই যেয়ো,

আপত্তি নেই।

এক জীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,

এক মানবী কতোটা আর কষ্ট দেবে।"

যে জলে আগুন জ্বলে'র তেজোদীপ্ত কবি 'বেদোনাকে বলেছি কেঁদো না' কাব্যে বিরহ ক্লান্ত ,যেন পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়া সূর্য। বিরহী কবি  দুঃখের নদী বয়ে দিয়েছেন এ কাব্যের জমিনে। বলা যায় 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না'বাংলা সাহিত্যের প্রথম মেদ-ভুঁড়িহীন কাব্য। কবির বিরহে পাঠক হৃদয়ও সিক্ত হয়ে ওঠে।

"এক জীবনের সব হাহাকার বুকে নিয়ে

অভিশাপ তোমাকে দিলাম, -

তুমি সুখী হবে, খুব সুখী হবে। "

কবি জীবনের শেষ বিকেলে অভিমানের দেয়াল ভাঙতে চাননা :

"থিতু হও, যেভাবে আড়ালে আছো

দেয়ালের ওই পাশে

কবি জীবনের শেষ বিকেলেও অভিমানের দেয়াল ভাঙতে চাননা :

"থিতু হও, যেভাবে আড়ালে আছো

দেয়ালের ওই পাশে ওইভাবে নিরুদ্দেশ রও। "

কবির নিঃসঙ্গতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ঘুড়ি কবিতায় -

"সুতো ছিঁড়ে তুমি গোটালে নাটাই

আমি তো কাঙাল ঘুড়ি,

বৈরী বাতাসে কী আশ্চর্য

একা একা আজও উড়ি! "

প্রণয়যাচিকা নতুন স্বরে নতুন সুরে মাতোয়ারা হলেও কবির নিঃসঙ্গতায়, প্রাত্যহিকতায় গোপনে ধরা দেয় এভাবে:

"আপনি আমার এক জীবনের যাবতীয় সব/ আপনি আমার নীরবতার গোপন কলরব। " অথবা  "তোমার বুকের ওড়না আমার প্রেমের জায়নামাজ। "

মানসী যে প্রেমের ছোঁয়া দিয়ে কবিকে মাতোয়ারা করেছে তার অভিব্যক্তি দেখা যায় 'তাবিজ 'কবিতায়। "এ কেমন তাবিজ করেছো সোনা/ব্যথাতো কমে না/বিষ নামে না, নামে না। "

কবি স্রোতস্বিনী ভালোবাসার ফিরিস্তি রচনা করেছেন এভাবে :

"ভালোবাসা ছিল বলেই তুমিও আছো, আমিও আছি।

ভালোবাসা ছিল বলেই আম্মা ছিলেন, আব্বা ছিলেন

আম্মার আবার আব্বা ছিলেন আম্মা ছিলেন

আব্বার আবার আম্মা ছিলেন আব্বা ছিলেন।"

কবি নীল খামে গোপন গহীন অভিসারে প্রিয়াকে চিঠি লিখেছেন এভাবে :

"আমারে কান্দাইয়া তুমি

কতোখানি সুখী অইছো

একদিন আইয়া কইয়া যাইও।"

কবি প্রণয়ে ব্যর্থ হলেও প্রজন্মের কপোতকপোতির কল্যাণ কামনা করেছেন।

"হলো না। না হোক,

আমি কী এমন লোক!

আমার হলো না তাতে কি হয়েছে?

তোমাদের হোক।"

অবচেতনে কবি প্রিয়ার কাছে প্রশ্ন রাখেন -

"কোনোদিন আচমকা একদিন

 ভালোবাসা এসে যদি হুট করে বলে বসে, -

চলো, যেদিকে দু'চোখ যায় চলে যাই,

যাবে? "

কবি প্রেমের প্রতিদান চেয়েছেন এভাবে —

"ভালোবেসেই নাম দিয়েছি 'তনা '/ মন না দিলে/ ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা। "

পথ হয়ে কবি প্রিয়ার শেষ পরশ পেতে চান।

"যদি যেতে চাও, যাও,

আমি পথ হবো চরণের তলে,

না ছুঁয়ে তোমাকে ছোঁব

ফেরাবো না, পোড়াবোই হিমেল অনলে। "

বিরহের অনলে দগ্ধ কবির বাসনা -

"আগামী, তোমার হাতে

আমার কবিতা যেন

থাকে দুধে ভাতে।"

ভাটির ঊর্বর জনপদ নেত্রকোনায় খোরশেদ আলী তালুকদারের ঔরসে এবং কোকিলা বেগমের উদরে  বিরলপ্রজ এ কবির জন্ম ১৯৪৮ সালে ৭ অক্টোবর। ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া এ কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র থাকা অবস্থায় 'নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়' কবিতা লিখে তুমুল খ্যাতি পান। কবি তখন থাকতেন ইকবাল হলে, যা বর্তমানে জহুরুল হক হল। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ কালরাতে কবি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। রাতে তিনি ফজলুল হক হলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেয়েছিলেন, রাত বেশি হওয়ায় ঐ হলেই থেকে গিয়েছিলেন। নতুবা আমরা আজকের এ শক্তিমান কবিকে পেতাম না। বাহাত্তরতম জন্মদিনে কবির সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। শুভ জন্মদিন— চিরকাল প্রেম আর দুঃখকে আপন করে নেওয়া বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র স্বরের কবি। ষাটের দশকে শুরু করে এত অল্প লিখে আজও হেলাল হাফিজ অপ্রতিরোধ্য, প্রযুক্তি প্রভাবিত সময়েও তরুণ তরুণীদের কাছে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত।

 নূর মোহাম্মদবিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, সরকারি মুজিব কলেজ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়