ঢাকা, শনিবার   ১৬ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ১ ১৪২৮

মোহাম্মদ আবদুল খালিক

প্রকাশিত: ২০:৩৫, ৮ অক্টোবর ২০২১
আপডেট: ২০:৫৪, ৮ অক্টোবর ২০২১

জীবনানন্দ দাশের কবিতা: বৃক্ষ-পুষ্প-গুল্ম-লতা (শেষ পর্ব)

মাঠ থেকে গাজন গানের ম্লান ধোঁয়াটে উচ্ছ্বাস

ভেসে আসে;-ডানা তুলে সাপমাসী উড়ে যায় আপনার মনে

আকন্দ বনের দিকে;

আমরা জানি, স্কুলে উপরের শ্রেণিতে পড়বার সময় থেকেই জীবনানন্দ নিজের মধ্যে গাছ-ফুল-পাতার আকর্ষণ বোধ করতেন। টাকা জমিয়ে কলকাতার নার্সারি থেকে নানা রকম ফুলের চারা আনিয়েছিলেন। জুঁই, চামেলি, গন্ধরাজ, কাঁঠালি চাঁপা, রঙ্গন, নীলজবা, হাস্নাহেনা, কৃষ্ণচূড়ার সঙ্গে কয়েকটি উৎকৃষ্ট গোলাপের চারাও ছিল সেখানে। গোলাপফুল ও কৃষ্ণচুড়ার জন্য তাঁর বাগানটি বরিশালে সে সময় প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।

জীবনানন্দ দাশের বরিশালের বাড়ির বিবরণ পাওয়া যায় এরকম- ‘বগুড়া রোড আর গোরস্থান রোডের কোণে পাঁচ-ছ বিঘা জমি জুড়ে তাঁদের বসত বাড়ি, ফুল ফোটা কৃষ্ণচূড়া, বাতাবিলেবু, বাড়ির দক্ষিণ প্রান্তে পোড়োজমিতে সতেজ বেতবন আর কেয়াঝোঁপ, নারকেল সুপারির কুঞ্জঘেরা মাছের চোখের মতো ঝকঝকে একটি পুকুর, আম-কাঁঠাল-জামরুল, লিচু সব বড় বড় গাছ, পরিচ্ছন্ন আঙিনার তিন দিকে আধা শহুরে আধা গ্রামীণ ধরণের কয়েকটি ছোট বড় কামরাযুক্ত তিনটি পৃথক ভিটে বাড়ি।’ (৮)

শৈশব কৈশোরের লালিত স্বপ্ন, ফুল পাখি বৃক্ষ-লতা ইত্যাদির ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে থেকে  এদের প্রতি অন্য রকমের এক অনুরক্তি, আবেগ ও ভালবাসা তাঁর মধ্যে সঙক্রমিত হয়-যা তাঁর শিল্পীত সৃজনের পরতে পরতে অক্ষয় রূপ লাভ করে। ‘তিরিশের প্রধান পাঁচ কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), বুদ্ধ দেব বসু (১৯০৮-১৯৭৮) ও বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২) সকলেই নাগরিক তথা নগর কেন্দ্রিক আধুনিক কবি। প্রথম বিশ^যুদ্ধোত্তর পশ্চিমা সাহিত্যের আধুনিকতাকে পূর্বে এই বাংলায় আত্মীকরণের ফলে যে আধুনিক কবিতা এদের হাতে গড়ে উঠলো সেখানে নিসর্গের সকল উপাদান সব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ অনুষঙ্গ হয়ে আসেনি। যদিও ব্যতিক্রম একমাত্র জীবনানন্দ দাশ। বলা যায় জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নিসর্গ বড় বেশি মূর্ত হয়ে উঠেছে।’ (৯)

‘আমি চলে যাব বলে চালতা ফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে/নরম গন্ধের ঢেউয়ে?’ প্রায়শই এ উপলব্ধি তাড়িত জীবনানন্দ দাশ জগত-সংসার থেকে হারিয়ে যাওয়া কিংবা বলা যায় মৃত্যু ভাবনা জনিত কারনে পৃথিবীর অপার এ নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে প্রত্যক্ষ বা উপভোগ করতে না পারার বেদনা এবং স্বপ্ন ও প্রত্যাশার যে গভীর অনুভব তাঁর চেতনায় ব্যাপকভাবে কাজ করেছে আমরা তা প্রত্যক্ষ করি তাঁর প্রকৃতিময় সৃষ্টির ঐশ্বর্য্যে।

মনে হয় একদিন আকাশের শুকতারা দেখিব না আর;

দেখিব না হেলেঞ্চার ঝোপ থেকে একঝাড় জোনাকী কখন

নিভে যায়- দেখিব না আর আমি পরিচিত এই বাঁশবন,

শুকনো বাঁশের পাতা-ছাওয়া মাটি হয়ে যাবে গভীর আঁধার

আমার চোখের কাছে-লক্ষ্মী পূর্ণিমার রাতে সে কবে আবার

পেঁচা ডাকে জোৎস্নায়-হিজলের বাঁকা ডাল করে গুঞ্জরণ;

সারারাত কিশোরীর লাল পাড় চাঁদে ভাসে-হাতের কাঁকন

বেজে ওঠে: বুঝিব না-গঙ্গাজল নারকোল নাড়–গুলো তার

জানি না সে কারে দেবে-জানি না সে চিনি আর শাদা তালশাঁস

হাতে লয়ে পলাশের দিকে চেয়ে দুয়ারে দাঁড়ায়ে রবে কিনা...

(রূপসী বাংলা, ১৮)

অথবা,

কোথাও চলিয়া যাব একদিন - তারপর রাত্রির আকাশ

অসংখ্য নক্ষত্র নিয়ে ঘুরে যাবে কতকাল জানিব না আমি;

জানিব না কতকাল উঠানে ঝরিবে এই হলুদ বাদামি

পাতাগুলো-মাদারের ডুমুরের-সোঁদা গন্ধ-বাংলার শ্বাস

বুকে নিয়ে তাহাদের- জানিব না পরথুপী-মধুকুপী ঘাস

কতকাল প্রান্তরে ছড়ায়ে রবে- কাঁঠালশাখার থেকে নামি

পাখনা ডলিবে পেঁচা এই ঘাসে- বাংলার সবুজ বালামী

ধানী শাল পশমিনা বুকে তার- শরতের রোদের বিলাস

কতকাল নিঙড়াবে -

(রূপসী বাংলা, ২০)

মূলত স্বপ্ন ও ভাবনা জীবনকে কেন্দ্র করে প্রলম্বিত হয়, প্রসারিত হয় দূর দিগন্তে, শূণ্য থেকে মহাশূন্যে নৈসর্গিক বর্ণিল রঙে রঞ্জিত হয়ে। এবং শেষমেষ লক্ষ তো সীমাহীন অনন্তের পথে, মহাকালের দিকে-

যতদিন বেঁচে আছি আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে

অপরাজিতার মতো নীল হয়ে-- আরো নীল--আরো নীল হয়ে

আমি যে দেখিতে চাই--সে আকাশ পাখনায় নিঙড়ায়ে লয়ে

কোথায় ভোরের বক মাছরাঙা উড়ে যায় আশ্বিনের মাসে,

আমি যে দেখিতে চাই আমি যে বসিতে চাই বাংলার ঘাসে

পৃথিবীর পথে ঘুরে বহুদিন অনেক বেদনা প্রাণে সয়ে

ধানসিড়িটির সাথে বাংলার শ্মশানের দিকে যাব বয়ে।

(রূপসী বাংলা,৫)

তাঁর গদ্যেও প্রকৃতি তথা বৃক্ষ-পুষ্পের উল্লেখ অনেকটা কবিতার মতোই উঠে এসেছে--

‘গন্ধ পাই মৃত ঘাসের, মৃত মাছির, অনেক দিনের মৃত তরমুজের আঘ্রাণ বাতাসের ভিতর দিয়ে ভেসে আসে--অন্ধকারের ভিতর রাত কাটাতে কাটাতে মনে হয় যেন এক আশ্চর্য সর্পিণীর পাশাপাশি রাত কাটাচ্ছি, মৃত ঘাসের গন্ধ পাই শুধু, মৃত পাথরের, মৃত কদম ফুলের, মৃত শেফালিকা পাতার।’ (১০)

জীবনানন্দের ‘স্মৃতির আলোড়নের সঙ্গে কখনো যুক্ত হয়েছে ইতিহাস চেতনা, কখনো মৃত্যু চেতনা, কখনো প্রকৃতি চেতনা’। (১১) বুদ্ধদেব বসুর অভিমত, ‘ছবি আঁকতে তাঁর নিপূনতা অসাধারণ। তার উপর ছবিগুলো শুধু দৃশ্যের নয়, গন্ধের ও স্পর্শেরও বটে, বিশেষভাবে গন্ধের ও স্পর্শের’।(১২) 

অচিন্ত কুমার সেনগুপ্ত তো মনে করেন -‘অন্তরের গহন গোপন মহারহস্য আবিস্কার করতে হলে মাঝে মাঝে এসে বসতে হয় সমুদ্রের তীরে কিংবা খোলা আকাশের নিচে। আমাদের জীবনে জীবনানন্দ সেই সমুদ্র তীর, সেই অনবরুদ্ধ দীপ্ত আকাশ’।’ (১৩)

তাই আমরা প্রতিনিয়ত সেই মহা সমুদ্রের তীরবর্তী হয়ে এবং বিশাল আকাশের উন্মুক্ততায় জীবনানন্দীয় বৃক্ষ,পুষ্প,লতা-গুল্ম সুশোভিত প্রকৃতির নিবিড়তায় নিঃশ্বাস নিতে নিতে রহস্যময়তার উন্মোচন ঘটানোর চেষ্টা করতে পারি।

[১ম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন]

[২য় পর্বে পড়তে ক্লিক করুন]

মোহাম্মদ আবদুল খালিক, সাবেক অধ্যক্ষ, মৌলভীবাজার সরকারি মহিলা কলেজ।

তথ্যসূত্র ও ঋণ স্বীকার:

৮.       প্রভাত কুমার দাশ: জীবনানন্দ দাশ, হরিশংকর জলদাস, পূর্বোক্ত থেকে উদ্ধৃত

৯.       মামুন মুস্তফা: জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নিসর্গ, শালুক, বর্ষ-২১, সংখ্যা-২৪, জুন-২০২০।

১০.     জীবনানন্দ দাশ: অস্পষ্ট রহস্যময় সিঁড়ি (ছোট গল্প), রচনাবলী ষষ্ঠ খন্ড, ঐতিহ্য-২০০৬।

১১.      দীপ্তি ত্রিপাঠী: আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয়- ২০০৩।

১২.     বুদ্ধদেব বসু: কালের পুতুল-দীপ্তি ত্রিপাঠী থেকে উদ্ধৃত,

১৩      অচিন্ত কুমার সেনগুপ্ত: ময়ুখ, জীবনানন্দ সংখ্যা, পৌষ-জ্যৈষ্ঠ-১৩৬১, পূর্বোক্ত থেকে উদ্ধৃত।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়