ঢাকা, মঙ্গলবার   ৩০ নভেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৮

মোহাম্মদ আবদুল খালিক

প্রকাশিত: ১০:২১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ১০:৩৮, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

জীবনানন্দ দাশের কবিতা: বৃক্ষ-পুষ্প-গুল্ম-লতা (পর্ব ১)

জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) তিরিশ উত্তর কবিতার নান্দনিক শরীর নির্মাণের এক অনন্য কারিগর। ‘কাব্য, প্রজ্ঞা, রূপকথা, ঘাস, ফুল, পাখি মিলিয়ে মূর্ত-বিমূর্ত পৃথিবীর এক মায়াবী শৈশব, কৈশোর জীবনানন্দের’ ছিল এবং অধিত বিষয়ের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার আলোকেই নির্মিত হয়েছে তাঁর কথা ও কবিতার বিপুল সম্রাজ্য।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে হরিশংকর জলদাস বলেন,- ‘বালকবেলার হাতেগোনা মধুময় কয়েকটি বছর বাদ দিলে জীবনানন্দ দাশের প্রায় গোটা জীবন দারিদ্র্যে ও বিপন্নতায় কেটেছে। দরিদ্রতা ও বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাঁর অবিরাম প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু তাঁর সে সকল চেষ্টা বিফল হয়েছে বার বার। আজীবন একটা বিমর্ষ জীবনকে সঙ্গী করে তিনি পথ চলেছেন।’ তবে লক্ষণীয় বিষয়, ‘লেখা তাঁর কাছে ছিল মানুষ হবার সমান্তরাল। নিজের যাবতীয় শ্রম, মেধা ঢেলে প্রকাশ্যে, গোপনে ধারাবাহিকভাবে ওই একটা কাজই করে গেছেন জীবনানন্দ।‘

১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল শহরে তাঁর জন্ম। অবশ্য জীবনানন্দ দাশের পূর্বপুরুষেরা বরিশাল এসেছিলেন পদ্মার শাখা নদী কীর্তিনাশার তীরের গ্রাম বিক্রমপুর থেকে। পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৬৩-১৯৪১) বি.এ প্রথমে বরিশাল জেনারেল পোস্ট অফিসে একাউন্টেন্ট জেনারেলের দপ্তরে কাজ করতেন। পরবর্তীতে অশ্বিনীকুমার দত্ত প্রতিষ্ঠিত বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক হন এবং এখানকার ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদকও ছিলেন। তিনি প্রবন্ধ লিখতেন এবং ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্রজমোহন স্কুলটি জাতীয় বিদ্যালয়ে পরিণত হলে মডেল স্কুল নামে একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সত্যানন্দ এই নব প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি ছিলেন কর্মশীল মানুষ ও একজন আদর্শবাদী শিক্ষক। মা কুসুম কুমারি দাশ (১৮৭৫-১৯৪৮) ছিলেন গৃহিণী, পাশাপাশি কবি। তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘আদর্শ ছেলে’-কবিতাটি আজো সগৌরবে আমাদের শিশু-কিশোরদের পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভূক্ত হয়ে প্রেরণার উৎস হিসেবে বহুল পঠিত হচ্ছে।

১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে জীবনানন্দ দাশ ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একই বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান মাধ্যমিক বা এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দু’বছর পর ১৯১৭ তে বিএম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি) পরীক্ষায়ও প্রথম বিভাগ অর্জন করেন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে (ইংরেজিতে অনার্সসহ) স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে একই প্রতিষ্ঠান থেকেই ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে জীবনানন্দ দ্বিতীয় বিভাগে এম.এ পাস করেন।

১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার ব্রাহ্ম সমাজ পরিচালিত সিটি কলেজের টিউটর হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু। তবে ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে সরস্বতী পূজা নিয়ে প্রতিষ্ঠানে গোলযোগ সৃষ্টি হলে অন্যান্য কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁকেও ছাটাই করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ১৯২৯ সালে তিনি মাত্র মাস তিনেক সময়ের জন্য বাগের হাট পিসি কলেজ, খুলনায় শিক্ষকতা করেন। একই সালের ২৯ ডিসেম্বর দিল্লীর রামযশ কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন জীবনানন্দ। কিন্তু এখানেও তাঁর চাকরি খুব বেশি দিন টিকেনি। ১৯৩০ এর এপ্রিল মাস পর্যন্ত তিনি এখানে ছিলেন বলে জানা যায়। এ সময়টাতেই পারিবারিক উদ্যোগে তাঁর বিয়ের আয়োজন করা হয়। এর পর থেকে প্রায় পাঁচ বৎসর বেকারত্বের দূর্বিসহ জীবন অতিক্রান্তের পর ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি বরিশালে  ব্রজমোহন (বি এম) কলেজের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। দেশ বিভাগের পর তিনি ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে কলকাতা গমন করেন।

জীবনানন্দ দাশ সারাজীবনে যে সব প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন তার সময়ভিত্তিক তালিকাটি এরকম:-

  • সিটি কলেজ  (১৯২২-১৯২৮)
  • বাগেরহাট পিসি কলেজ, খুলনা (১৯২৯-মাত্র তিন মাসের জন্য)
  • রামযশ কলেজ, দিল্লী (১৯২৯-১৯৩০)
  • ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল (১৯৩৫-১৯৪৬)
  • খড়গপুর কলেজ, মেদিনিপুর (১৯৫০-১৯৫১)
  • বরিষা কলেজ (১৯৫২-১৯৫৩)
  • হাওড়া গার্লস কলেজ (১৯৫৩-১৯৫৪)

তাঁর কর্মজীবন কখনোই নিরবচ্ছিন্ন ছিলনা। একাধারে দীর্ঘ কর্মময় সময় তিনি কোথাও কাটাতে পারেননি। ১৯২২-১৯৫৪ পর্যন্ত এই ৩৩ বৎসরে জীবনানন্দকে বেকার থাকতে হয়েছে প্রায় ১০ বৎসর। বেকারত্বের কালকে  এভাবে ভাগ করা যায়:-

১৯৩০-১৯৩৫ এবং

১৯৪৬-১৯৫০।

‘নানা রকমভাবে এই অকর্মক জীবন যাপন ঘোচাবার চেষ্টা তিনি (জীবনানন্দ) করেছেন। প্রাইভেট ট্যুইশনি করেছেন; ছাতার ভাঁট তৈরি হয় যে মোটা বেতে, তা আমদানির ব্যবসায় যুক্ত হবেন কিনা ভেবেছেন, ইন্সিয়োরেন্সের দালালিও একটা উপযুক্ত উপায় মনে হয়েছে তার; একটা স্টেনো টাইপিস্টের বা খবরের কাগজের রিপোর্টারের চাকরি পেলেও তো সৌভাগ্যের ব্যাপার হত চিন্তা করেছেন, এমন কী খবরের কাগজ ফেরি করলে কেমন হয়, তাও হয়তো ভেবেছেন।‘

(ধারাবাহিকভাবে আইনিউজে এই আলোচনাটি চলবে...)

মোহাম্মদ আবদুল খালিক, সাবেক অধ্যক্ষ, মৌলভীবাজার সরকারি মহিলা কলেজ।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়