রুপম আচার্য্য
প্রকৃতির রহস্যময় প্রাণী
বনজঙ্গলের নীরব রাজা বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঠবিড়ালি লাউয়াছড়া বনে
কাঠবিড়ালির ছবি তুলেছেন বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম।
বনের গভীর ছায়াঘেরা বৃক্ষশাখায় হঠাৎ যদি বিশাল আকৃতির কালো রঙের কোনো কাঠবিড়ালি চোখে পড়ে, অনেকেই প্রথমে বিস্মিত হয়ে যান। কারণ আমরা সাধারণত ছোট আকারের বাদামি বা ধূসর রঙের কাঠবিড়ালিই দেখতে অভ্যস্ত।
কিন্তু প্রকৃতির বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে এমন এক প্রজাতির কাঠবিড়ালিও রয়েছে, যার আকার তুলনামূলকভাবে বড়, গায়ের রং গাঢ় কালো এবং উপস্থিতি যেন বনজঙ্গলের এক রাজসিক প্রাণীর মতো। ঘন বনভূমির উঁচু গাছের ডালে ডালে তার অবাধ বিচরণ, লম্বা ঝাঁকড়া লেজ আর গম্ভীর চেহারা- সব মিলিয়ে তাকে দেখলে মনে হয় যেন বনের নীরব রাজ্যের এক রহস্যময় বাসিন্দা।
এটি হলো Black giant squirrel, যা আবার Malayan giant squirrel নামেও পরিচিত। প্রকৃতির রহস্যময় প্রাণী হিসেবেও পরিচিত।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অরণ্যে বসবাসকারী এই প্রাণীটি শুধু তার আকার বা রঙের জন্যই নয়, বরং তার আচরণ, বাসস্থান ও জীবনের বৈচিত্র্যের জন্যও গবেষক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়।
বিশাল আকৃতি, রাজসিক উপস্থিতি
সাধারণ কাঠবিড়ালির তুলনায় এই প্রজাতির আকার অনেক বড়। পূর্ণবয়স্ক একটি কালো দৈত্য কাঠবিড়ালির দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার এবং লেজের দৈর্ঘ্য প্রায় একই রকম বা তার থেকেও বেশি হতে পারে। ফলে পুরো প্রাণীটির দৈর্ঘ্য অনেক সময় এক মিটার পর্যন্ত হয়ে যায়।
এদের শরীর সাধারণত গাঢ় কালো বা কালচে বাদামি রঙের, আর বুকের নিচের অংশে অনেক সময় হালকা বাদামি বা ক্রিম রঙ দেখা যায়। মোটা ও লম্বা লেজটি তাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, বিশেষ করে যখন তারা এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে চলে।
বনের উঁচু ডালে বসে থাকা এই প্রাণীকে দেখলে অনেক সময় ছোট কোনো বানর বলে ভুল হয়। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় এটি প্রকৃতির এক অনন্য কাঠবিড়ালি।
বিস্তৃত বাসস্থান
এই প্রজাতির কাঠবিড়ালি প্রধানত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়। এদের বিস্তৃতি রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালোশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়।
বাংলাদেশে এটি মূলত পার্বত্য বনাঞ্চল এবং চিরসবুজ অরণ্যে দেখা যায়। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের বনাঞ্চল- যেমন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এদের সম্ভাব্য আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত।
এই কাঠবিড়ালিরা সাধারণত মাটিতে খুব কম নামে। তারা জীবনের অধিকাংশ সময়ই গাছের উঁচু ডালে কাটায়। ঘন বন, উঁচু গাছ এবং পর্যাপ্ত খাবার, এই তিনটি বিষয় তাদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাস: বনজ ফলের প্রতি বিশেষ ঝোঁক
কালো দৈত্য কাঠবিড়ালি মূলত শাকাহারী, তবে কখনও কখনও ছোট পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে। এদের প্রধান খাদ্যের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বনের ফল। যেমন বাদাম, বীজ, ফুল ও কচি পাতা।
বনের গাছে গাছে ঘুরে বেড়িয়ে তারা খাবার সংগ্রহ করে। অনেক সময় একটি ডালে বসে ধীরে ধীরে বাদাম বা ফল খেতে দেখা যায়। খাবার খাওয়ার সময় তাদের দাঁতের ব্যবহার এবং সামনের পায়ের দক্ষতা সত্যিই বিস্ময়কর।
গাছে গাছে উড়ন্ত জীবনের মতো চলাচল
যদিও এরা উড়তে পারে না, কিন্তু এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফানোর দক্ষতা দেখে অনেক সময় মনে হয় যেন তারা আকাশে ভেসে যাচ্ছে।
একটি গাছের ডাল থেকে অন্য গাছের ডালে ৬ থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত লাফ দিতে পারে। এই অসাধারণ ক্ষমতার কারণে তারা সহজেই শিকারিদের হাত থেকে বাঁচতে পারে।
বাসা ও প্রজনন
এই কাঠবিড়ালিরা গাছের উঁচু ডালে বড় আকারের গোলাকার বাসা তৈরি করে। শুকনো ডাল, পাতা ও ঘাস দিয়ে বানানো এই বাসাগুলো অনেক সময় গাছের মগডালে থাকে।
মাদী কাঠবিড়ালি সাধারণত এক বা দুইটি বাচ্চার জন্ম দেয়। মা কাঠবিড়ালি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বাচ্চাদের বড় করে তোলে এবং কয়েক মাস পর্যন্ত তাদের বাসার আশপাশেই রাখে।
বন ধ্বংসের হুমকি
বর্তমানে এই প্রজাতির প্রধান হুমকি হলো বন উজাড় এবং আবাসস্থল ধ্বংস। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে বনভূমি কমে যাওয়ায় তাদের বাসস্থান সংকুচিত হচ্ছে। ফলে অনেক জায়গায় এই প্রজাতি আগের তুলনায় কম দেখা যাচ্ছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণবাদীরা মনে করেন- যদি বন সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই বিস্ময়কর প্রাণীটি অনেক অঞ্চলে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
প্রকৃতির নীরব দূত
কালো দৈত্য কাঠবিড়ালি শুধু একটি প্রাণীই নয়, বরং বনজ পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা বনের ফল ও বীজ ছড়িয়ে দিয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সহায়তা করে। প্রকৃতির এই নীরব দূত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সুস্থ বন মানেই জীববৈচিত্র্যে ভরা একটি পৃথিবী।
বনের উঁচু ডালে বসে থাকা সেই কালো দৈত্য কাঠবিড়ালিকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি তার নিজস্ব সৌন্দর্য আর রহস্য নিয়ে এখনও বেঁচে আছে। আর সেই সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
২০২১ সালে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঠবিড়ালিটির ছবি তুলেছেন বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম।
ইএন/এসএইচএ
- কেএফসির মালিকের জীবন কাহিনী
- প্রজাপতি: আশ্চর্য এই প্রাণীর সবার ভাগ্যে মিলন জোটে না!
- বিশ্বের অদ্ভুত কিছু গাছের ছবি
- মা-শাশুড়িকে হারিয়েও করোনার যুদ্ধে পিছিয়ে যাননি এই চিকিৎসক
- যেখানে এক কাপ চা পুরো একটি পত্রিকার সমান!
- তিন রঙের পদ্মফুলের দেখা মিলবে এই বিলে
- সোনার দাম এত কেন : কোন দেশের সোনা ভালো?
- ২০২৩ সালে পৃথিবীর শক্তিশালী ১০টি দেশ!
- রহস্যময় গ্রামটি লাখো পাখির সুইসাইড স্পট
- ঢাকার মাঠ মাতানো বিদেশি ফুটবলাররা

























