রুপম আচার্য্য
ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানা: জলাভূমির নীরব নৃত্যশিল্পী
ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানা পাখির ছবি তুলেছেন বার্ডফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম।
বাংলাদেশের জলাভূমি, বিল-হাওর কিংবা ধানক্ষেতের শান্ত জলে কখনো যদি চোখে পড়ে লম্বা পা-ওয়ালা, ঝকঝকে ডানার এক অদ্ভুত সুন্দর পাখি- তবে সেটি হতে পারে Bronze-winged Jacana। বাংলায় যাকে বলা হয় ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানা। জলজ উদ্ভিদের উপর প্রায় ভেসে ভেসে হাঁটার মতো ভঙ্গিতে চলাফেরা করা এই পাখিটি প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। শান্ত স্বভাব, ব্যতিক্রমী আচরণ এবং অনন্য গঠনের জন্য পাখিপ্রেমীদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
জলাভূমির বিশেষ বাসিন্দা
ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানা মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলাভূমি অঞ্চলে দেখা যায়। ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশের বিল, হাওর, পুকুর, জলাশয় এবং ধানক্ষেত এদের প্রিয় আবাসস্থল। বাংলাদেশের অনেক এলাকায় বর্ষাকালে জলজ উদ্ভিদে ভরা জলাভূমিতে এদের দেখা মেলে।
এই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এরা পানির ওপর ভাসমান শাপলা-শালুক বা কচুরিপানার পাতার উপর হাঁটতে পারে। কারণ তাদের পা অত্যন্ত লম্বা এবং আঙুলগুলো বিস্তৃত ও সরু, যা পানির ওপর ভাসমান পাতায় ওজন সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। ফলে মনে হয় যেন পাখিটি পানির ওপরেই হাঁটছে।
ঝকঝকে রঙে অনন্য সৌন্দর্য
ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানার শরীরের রঙ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর শরীর সাধারণত কালচে-বাদামি বা গাঢ় রঙের হলেও ডানার ওপরের অংশে থাকে ব্রোঞ্জের মতো চকচকে সবুজাভ আভা। সূর্যের আলো পড়লে এই ডানাগুলো ধাতব উজ্জ্বলতায় ঝলমল করে ওঠে, যেখান থেকেই এসেছে এর নাম “ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা”।
পাখিটির কপালে সাদা রঙের একটি ঢাল বা ফ্রন্টাল শিল্ড থাকে, যা দেখতে বেশ আলাদা। এছাড়া চোখের পাশে সাদা দাগ ও দীর্ঘ পা-আঙুল তাকে অন্য জলচর পাখিদের থেকে সহজেই আলাদা করে।
আকার ও গঠন
ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানার দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৯ থেকে ৩১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। শরীর তুলনামূলক ছোট হলেও এর পা ও আঙুল অস্বাভাবিক দীর্ঘ। বিশেষ করে মাঝের আঙুলটি অনেক সময় ১০ সেন্টিমিটারের কাছাকাছি লম্বা হতে পারে।
এই লম্বা আঙুলই তাকে জলজ উদ্ভিদের পাতার উপর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
খাবারের অভ্যাস
এই পাখি মূলত সর্বভুক হলেও খাদ্য তালিকায় থাকে— ছোট পোকামাকড়, জলজ কীট, শামুক ও লার্ভা, ছোট জলজ প্রাণী অথবা কখনো জলজ উদ্ভিদের বীজ।
জলাভূমির পাতার উপর হাঁটতে হাঁটতে তারা খাবার খুঁজে বেড়ায়। অনেক সময় পানির ওপর থেকে হালকা ঠোকর দিয়ে শিকার ধরে।
অদ্ভুত প্রজনন আচরণ
ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর উল্টো পারিবারিক ব্যবস্থা। অধিকাংশ পাখির ক্ষেত্রে পুরুষ সঙ্গী স্ত্রীকে আকৃষ্ট করে, কিন্তু জাকানার ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো।
এদের সমাজে সাধারণত স্ত্রী পাখি বড় ও শক্তিশালী হয় এবং একটি স্ত্রী পাখি একাধিক পুরুষের সঙ্গে মিলিত হতে পারে। এরপর ডিম পাড়ার পর সেই ডিমে তা দেওয়া ও ছানাদের লালন-পালনের দায়িত্ব প্রধানত পুরুষ পাখির ওপর পড়ে।
পুরুষ জাকানা জলজ উদ্ভিদের পাতার উপর ছোট্ট বাসা তৈরি করে এবং সেখানে ডিম পাড়ার পর ধৈর্যের সঙ্গে তা দেয়।
প্রকৃতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যের অংশ
জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রে এই পাখির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু জলাভূমি ধ্বংস, দূষণ ও মানবিক কার্যকলাপের কারণে অনেক জায়গায় এদের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে।
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জলাভূমি সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ এইসব পরিবেশেই টিকে আছে ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানার মতো অসংখ্য বিরল প্রাণী।
প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য
জলাভূমির শান্ত পানির উপর শাপলার পাতায় হেঁটে বেড়ানো ব্রোঞ্জ-ডানাওয়ালা জাকানাকে দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই এক শিল্পীর মতো সূক্ষ্ম সৌন্দর্যের ছবি এঁকেছে। এরা কোলাহল পছন্দ করে না, মানুষের চোখের আড়ালে নিরিবিলি পরিবেশেই থাকতে ভালোবাসে।
তাই যখন কোনো বিল বা হাওরের ধারে দাঁড়িয়ে হঠাৎ দেখা মেলে এই পাখির—তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন এক ঝলক তার গোপন সৌন্দর্য দেখিয়ে দিল।
ইএন/এসএইচএ
- কেএফসির মালিকের জীবন কাহিনী
- প্রজাপতি: আশ্চর্য এই প্রাণীর সবার ভাগ্যে মিলন জোটে না!
- বিশ্বের অদ্ভুত কিছু গাছের ছবি
- মা-শাশুড়িকে হারিয়েও করোনার যুদ্ধে পিছিয়ে যাননি এই চিকিৎসক
- যেখানে এক কাপ চা পুরো একটি পত্রিকার সমান!
- তিন রঙের পদ্মফুলের দেখা মিলবে এই বিলে
- সোনার দাম এত কেন : কোন দেশের সোনা ভালো?
- ২০২৩ সালে পৃথিবীর শক্তিশালী ১০টি দেশ!
- ঢাকার মাঠ মাতানো বিদেশি ফুটবলাররা
- রহস্যময় গ্রামটি লাখো পাখির সুইসাইড স্পট

























