ঢাকা, শুক্রবার   ২২ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৬ ১৪২৮

সুমাইয়া সিরাজী

প্রকাশিত: ২৩:০৪, ২৭ জুলাই ২০২১
আপডেট: ২৩:৪১, ২৭ জুলাই ২০২১

বিশেষ শিশু কি? 

যখন কোনো শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় তখন তার দৈনন্দিন কাজ যেমন: হাটা চলা, বসা, খাওয়া, কথা বলা, যোগাযোগ করা, যে বয়সে যে বিকাশ হওয়ার কথা ছিলো সেটা হয় না, অন্য দশটা বাচ্চার মতো খেলে না, মিশতে চায় না, নিজের জগতে থাকে তখন সেই শিশুর স্পেশাল নিড আছে বলা হয়। 

স্পেশাল নিড কিন্তু আপনার আমারো আছে। কিভাবে? চোখ কম দেখতে পারার জন্য এই যে আমরা চশমা পড়ি এটাও কিন্তু আমাদের স্পেশাল একটা নিড। তাহলে কি আমরাও বিশেষ শিশু?  না, কারণ এই সমস্যার জন্য কিন্তু আমার স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে না আমি চশমা ব্যবহার করে দৈনন্দিন সব কাজ করতে পারছি। অর্থাৎ শিশুর এই বিকাশজনিত সমস্যাগুলো যখন তার স্বাভাবিক জীবনকে বাধা দেয় তখনি কিন্তু সেটা নিয়ে ভাবনার বিষয়। 

এখন কথা হলো এই বৈশিষ্ট্য গুলোর একটা প্রকাশ পেলেই কি আমি আমরা শিশুকে বিশেষ শিশু বলব?

⇒ না, বলা যাবে না। হতে পারে কোনো একটা পরিস্থিতির জন্য শিশুর ভেতর হঠাৎ করে এক বা দুইটা বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে সেটা ঠিক হয়ে যাবে।

আবার অটিজমের সকল বৈশিষ্ট্য কিন্তু দেড় বছরের পর থেকে আসে তার আগ পর্যন্ত শিশু একদম স্বাভাবিক থাকে। আবার কোনো  কোনো 
 শিশুর হঠাৎ কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় ৩ বছর থেকে যেটা অটিজম এর আরেকটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য। 

বিশেষ শিশু কত ধরণের আছে? 

১. অটিজম
২. সিপি( সেরিব্রাল পালসি)
৩.এডিএইসডি
৪. বুদ্ধি প্রতিবন্ধী
৫. দৃষ্টি প্রতিবন্ধী
৬. শ্রবণ প্রতিবন্ধী
৭. লার্নিং ডিজএবিলিটি 
৮. ডাউন'স
৯. মাল্টিপল ( একি সাথে অটিজম, এডিএইসডি বা আরো কিছু থাকে এদের) 

মূলত এই ৮ ধরনের শিশু বেশি দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে সমস্যা প্রকট থাকে। কারো ক্ষেত্রে অল্প থাকে। যাদের অল্প মাত্রায় থাকে  সঠিক সময়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে দ্রুত সুস্থতার দিকে শিশু ধাবিত হয় এবং ৯০ ভাগ সুস্থ জীবনের দিকে ফিরে আসে। আর সমস্যা প্রকট হলে এবং দেরিতে পদক্ষেপ নিলে সেই সম্ভাবনা কমে ৪০-৫০ এ চলে আসে। 

কার্যকরী পদক্ষেপ (Early Intervention) 

যত দ্রুত সম্ভব শিশুর সমস্যা দেখা মাত্রই তাকে Early Intervention আওতায় আনতে হবে। ৫ বছর পার হয়ে গেলে এই Early Intervention প্রক্রিয়া কম কাজ করে বা একদমই করে না অনেকের ক্ষেত্রেই। কারণ বেশিরভাগ শিশুর ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট ৫ বছরের ভেতর শেষ হয়ে যায়।  

কি কি সাপোর্ট লাগে একটা বিশেষ শিশুর?

১. নিউরোলজিস্ট / শিশু ডাক্তার
২. স্পিচ থেরাপিস্ট
৩. ফিজিওথেরাপিস্ট
৪. অকুপেশনাল থেরাপিস্ট
৫. সাইকোলজিস্ট
৬. নিউট্রিশনিস্ট
৭. বিশেষ শিক্ষক ( স্পেশাল এডুকেটর)  

সবাই মিলে একটা টিম হয়ে শিশুকে সাপোর্ট সার্ভিস দিবে। কোনো কোনো শিশুর সমস্যার মাত্রা অনুযায়ী হয়তো বা সবগুলো সাপোর্ট লাগতে পারে আবার কারো কারো ২/৩ বা ১ টাও লাগতে পারে। এটা নির্ভর করে সেই শিশুর সক্ষমতার উপর। 

৪-৫ বছরের আগে কোনো শিশুকে অটিস্টিক বলা যাবে না 

কোনো কোনো শিশুর কথা দেরিতে বলাকে Developmental  Delay বলে। ২ বছরের শিশু কথা বলছে দেখেই তাকে অটিস্টিক বলে মার্ক করা যাবে না। নিয়মিত স্পিচ থেরাপি দিলে এই সমস্যা ৮০-৯০ ভাগ কাটিয়ে উঠা যায়।  

কোনো কোনো বিকাশমূলক দক্ষতাগুলোতে শিশু পিছিয়ে থাকে? 

১. অংগসঞ্চালন মূলক দক্ষতা (motor skill)
২. যোগাযোগের দক্ষতা ( communication skill)
৩. সামাজিক দক্ষতা( social skill)
৪. দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা( activity of daily living skill
৫. জ্ঞানীয় দক্ষতা ( cognitive skill) 

অটিজম শিশুদের ৩ টি দক্ষতায় সমস্যা বেশি দেখা যায়

১. সামাজিক দক্ষতা
২. যোগাযোগ দক্ষতা
৩. রিপিটেটিভ বিহেভিয়ার ( একি কাজ বার বার করা)

একটা স্বাভাবিক শিশু দেখে শেখে,আরো শেখে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে। মা-বাবাকে দেখে অনুকরণ করে। বিশেষ শিশুর সাথে মূলত ভিন্নতা এখান থেকেই শুরু হয়। বিশেষ শিশুকে সব কিছু শেখার জন্য আমাদেরকে একটা কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে দিতে হয়। সেই পরিবেশ থেকে শেখানোর জন্য প্রতিদিন অনুশীলন করাতে হয়। এরপর সে শেখে কখনো ১ বছর লেগে যায় কখনো ৩-৪ বছর। এটা নির্ভর করে শিশুর নেয়ার সক্ষমতার উপর। কেউ দ্রুত শেখে কেউ ধীরে শেখে। 

অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ রইল আপনার শিশুকে একজন মানুষ হিসেবে প্রথম বিবেচনা করবেন কারণ একটা বিশেষ শিশু কিন্তু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। একই সাথে সব সমস্যার সমাধান করা যাবে না এতে শিশুর উপর এবং আপনার নিজের উপর একটা মানসিক চাপ আসবে। আমাদের এই শিশুগুলো সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে প্রেরিত আমানত আমাদের কাছে। ওদেরকে ভালো রাখার দায়িত্ব একা পরিবারগুলোর নয়- এই সমাজের, আমাদের, আমার, সকলের। 

Our child is not disable, they are differently able. 

সুমাইয়া সিরাজীনিউট্রিশনিস্ট এন্ড স্পেশাল এডুকেটর প্রয়াস, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়