ঢাকা, রোববার   ১৭ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ২ ১৪২৮

ডা: মো: আব্দুল হাফিজ (শাফী)

প্রকাশিত: ২৩:১৬, ৭ আগস্ট ২০২১
আপডেট: ২৩:৩১, ৭ আগস্ট ২০২১

করোনা পরবর্তী জটিলতা এড়াতে চাই বাড়তি সতর্কতা

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে করোনাভাইরাস প্রতিনিয়তই যেমন তার জিনগত ধরণের পরিবর্তন করে সবাইকে হিমশিম খাওয়াচ্ছে, ঠিক তেমনি দেড় বছর ধরে কতোনা নতুন কিছু শিখাচ্ছে। এর মধ্যে বহুল উচ্চারিত একটি নাম হল ‘পোস্ট কোভিড সিনড্রোম’।

কোভিডে আক্রান্তদের মধ্যে কিছু উপসর্গ যেমন: দুর্বলতা, শ্বাসের সমস্যা, কাশি, অস্থি বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বুকে ব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়, স্মৃতিভ্রম, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি কোভিড নেগেটিভ হওয়ার পরও বেশ কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে। যেকোনো ভাইরাসজনিত রোগের পরই শরীর এবং মনে এক ধরনের জড়তা, ক্লান্তি ভর করে। 

সার্বিকভাবে একে বলে পোস্ট ভাইরাল ফ্যাটিগ। করোনার সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পর এই ‘ফ্যাটিগ’ প্রকট আকারে দেখা যাচ্ছে। আর করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই অবস্থাকে বলা হচ্ছে পোস্ট কোভিড সিনড্রোম। বিভিন্ন গবেষণায়, করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের মধ্যে এই পোস্ট কোভিড সিনড্রোম দেখা যাচ্ছে। এই লক্ষণগুলো নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পর থেকে তিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে দেখা যাচ্ছে।

করোনাভাইরাস আক্রমণ করে শরীরের ফুসফুস ছাড়াও অন্য কোথাও (কিডনি, যকৃত, স্নায়ু, হৃদপিন্ড) ক্ষতি করেছে কি-না তা জানার জন্য এবং এছাড়াও পরবর্তী জীবনে ভালো থাকার জন্য কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠার পর চিকিৎসকের অধীনে রেগুলার ফলো-আপে থাকা অত্যন্ত জরুরি। 

করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে নেগেটিভ হয়ে সেরে উঠার পর যে সমস্যা গুলো দেখা যাচ্ছে এবং এগুলো প্রতিরোধে কি করা যায় তা নিম্নে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

ফুসফুস

ইতোমধ্যেই আমরা সবাই জেনে গেছি করোনাভাইরাস নাক-মুখ দিয়ে প্রবেশ করে ফুসফুসকে (Lungs) আক্রান্ত করে। করোনাভাইরাস সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে ফুসফুসে। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন বা ফুসফুসের অতিরিক্ত যত্ন নেওয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন। শুধু ওষুধ না ফুসফুস সুস্থ রাখতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। যাদের ফুসফুসে ফাইব্রোসিস দেখা দেয় (যদিও ফাইব্রোসিস এর হার খুব কম),  তাদের মধ্যে  অনেকের করোনাভাইরাস নেগেটিভ হওয়ার পরও  শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট দীর্ঘদিন ধরে থেকে যেতে পারে। 

‘ফাইব্রোসিস’ হলো ফুসফুসের নরম কোমল তন্তু বা কোষ বা টিস্যু শক্ত হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ ফুসফুসের বাইরে কঠিন আস্তরণ পড়ে যাওয়া। এতে ফুসফুসের স্বাভাবিক সঙ্কোচন-প্রসারণ বাধা পায়। এই কারণে ধূমপায়ীরা করোনা থেকে সেরে উঠলে ধূমপান একেবারে ছেড়ে দেওয়া আবশ্যক। যতক্ষণ শ্বাস নিতে পারছেন ততক্ষণই জীবন। আমাদের শ্বাস নিতে সাহায্য করে ফুসফুস। তাই শ্বাস -প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে হবে করোনা থেকে সেরে ঊঠার পর। এক্ষেত্রে হাতের কাছে একটা সহজলভ্য স্পাইরোমিটার রাখতে পারেন, যা খুব উপকার দিয়ে থাকে। 

খুব সহজেই সারাদিনে বেশ কয়েকবার এই স্পাইরোমিটার দিয়ে শ্বাসের ব্যায়াম করে আক্রান্ত ফুসফুসকে আবার সাবলীল করতে পারেন। এখানে ছোট্ট একটা ডিভাইসের মধ্যে তিনটা বল থাকে। শ্বাস দিয়ে রোগীদের সেই বলগুলো ডিভাইসের ভেতরে তুলতে হয়। প্রথমদিন হয়তো একটা, পরের দিন আরেকটা, এভাবে আস্তে আস্তে ৩ টা বলই তোলার ক্ষমতা বাড়ে। তিনটা বল তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে আবার ছেড়ে দিতে হয়। এভাবে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ে। 

হৃদপিন্ড 

পোস্ট-কোভিড হৃদরোগ জনিত (Cardiac) সমস্যা মানেই মৃত্যু আতংক নয় এমনটাই জানাচ্ছে  বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বিভিন্ন বার্তা/গবেষণা। কোভিড থেকে সুস্থ হওয়ার সপ্তাহ দুয়েক পরেই যেন চিকিৎসকের পরামর্শে ইসিজি করিয়ে নেওয়া হয়, ক্ষেত্রবিশেষে ইকো(ECHO) অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে পোস্ট কোভিডে। বুক ধড়ফড় বা দ্রুত হৃদস্পন্দন অত্যন্ত পরিচিত একটি পোস্ট কোভিড সমস্যা, যা আমাকেও অনেকদিন ভুগিয়েছে। বিশ্রাম এর সময়ও অনেক বেশী বুক ধড়ফড় করে এই সময়ে, যা মাঝে মাঝে আতংকিত করে ফেলতে পারে। তাই বুক ধড়ফড়ের সমস্যা বেশী হলে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন, প্রয়োজনে ওষধ সেবন করবেন। করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ফলোআপের সময় নতুন রোগ হিসেবে উচ্চ রক্তচাপ বা হাই প্রেসারের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই এই সময়ে ভয়ভীতিহীন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমেই একমাত্র এড়িয়ে যাওয়া যেতে পারে দীর্ঘমেয়াদী হৃদরোগের সম্ভাবনাকে।

রক্তনালীতে রক্তজমাট বাধা 

অনেক সময় করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে রক্ত জমাট বেধে শরীরের  রক্ত প্রবাহের নালীগুলো বন্ধ হয়ে যায়। কোভিড পরবর্তী এই মারাত্মক সমস্যাটি  থ্রম্বোএমবলিজম নামে পরিচিত। ধমনীতে রক্ত জমাট বেঁধে এর ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হতে পারে। তবে কোভিড থেকে আরোগ্য লাভ করা ৫ শতাংশেরও কম রোগীর মধ্যে এই সমস্যা হতে পারে। তবে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই জটিলতা থেকে মুক্তি বা রক্ষা পাওয়া সম্ভব। 

যেসব কোভিড রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন চিকিৎসকরা তাদের ব্লাড থিনার দিয়ে থাকেন যেন রক্ত পাতলা থাকে। এছাড়াও চিকিৎসকরা রক্ত পাতলা করার বিশেষ ওষধ Mild - Severe কোভিড আক্রান্তদের প্রেসক্রিপশনে ৪-৬ সপ্তাহ দিয়ে থাকেন, যা করোনা নেগেটিভ আসার পরেও নির্দেশমতো কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। অনেকের ক্ষেত্রে করোনা পরবর্তী ফলোআপে রক্ত পরীক্ষায় ( Fasting Lipid Profile) কোলেস্টেরল এর পরিমাণ স্বাভাবিক এর চেয়ে অনেক বেশী দেখা যাচ্ছে, যা আগে কখনই ছিলনা। এই বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে কারণ কোলেস্টেরল বেড়ে গিয়ে রক্তনালীতে চর্বি জমে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল বিঘ্ন করে দিতে পারে।

ক্লান্তি এবং মানসিক অবসাদ

করোনার সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পর প্রায় সবাই অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দূর্বলতার সমস্যায়  ভোগে থাকেন। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র অবসাদ, সারা দিন ঘুম ঘুম ভাব থাকলেও ঘুম না আসা। আবার কখনো ইচ্ছা না থাকলেও অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পড়া অন্যতম। দিনের বেলা বেশি বেশি হাই ওঠা। কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা, কথা বলতে অনাগ্রহ ইত্যাদি। এমনকি রোগী আগে যেসব বিষয়ে খুব আনন্দ পেতেন, সেগুলোও করোনা–পরবর্তী সময়ে ভালো না লাগা কিংবা বিরক্ত লাগার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

মনে রাখবেন এই ধরণের সমস্যা সাময়িক, এতে ভীত হয়ে নিজেকে মানসিক ভাবে দূর্বল করে ফেলবেন না। করোনা থেকে সেরে উঠার পর এই অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে যা করার ব্যাপারে চিকিৎসকরা বারবার তাগিদ দিচ্ছেন তা হলো- ঘুমের রুটিন ঠিক রাখার চেষ্টা করা এবং অযথা রাত না জাগা। দিনের বেলা কর্মময় থাকতে হবে, রাতে সঠিক সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে দিনেও অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নেওয়া যেতে পারে, তবে খেয়াল রাখতে হবে সারা দিন বিছানায় গড়াগড়ি করা যাবে না। নিজেকে চাঙা রাখতে হবে। কোভিড পরবর্তী মানসিক স্থিতি ঠিক রাখতে মেডিটেশন, ধ্যান বা প্রার্থনা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। কোনো কাজে তাড়াহুড়ো করা যাবে না।

এসময় পর্যাপ্ত পানি আর ফলের রস পান করতে হবে, কারণ কোভিড-১৯ শরীরকে শুষ্ক করে দেয়। ক্লান্তি দূর করতে প্রোটিন জাতীয় খাবার (মাছ/মাংস/ডিম) খাওয়ার ব্যাপারে বারবার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভিজ ও প্রাণীজ,  দু' ধরনের প্রোটিনই রাখুন আপনার খাদ্য তালিকায়। 

ডা. মো: আব্দুল হাফিজ(শাফী), বিসিএস(স্বাস্থ্য), বিএসএমএমইউ (প্রেষনে), ঢাকা

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়