ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৮

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:১৪, ৮ অক্টোবর ২০২১
আপডেট: ১৮:৪৯, ৮ অক্টোবর ২০২১

ডিম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সকলের পছন্দের একটি খাবার ডিম। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত ডিম খাওয়া বেশ উপকারী। ডিম অনেক পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি খাবার। এটি ক্যালসিয়াম, আয়রন ও প্রোটিনের ভালো উৎস।করোনাকালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো খুবই জরুরি। তাই প্রতিদিন একটি ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ডিম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা দুটোই আছে। 

ডিম নিয়ে আমাদের মাঝে নানা ভুল ধারণাও আছে। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ডিম খাওয়া নিয়ে অনুমান নির্ভর দুশ্চিন্তায় ভোগেন। অনেকে মনে করেন ডিমের কোলেষ্টেরল হৃদরোগ, মস্তিকে রক্তকরণ (স্ট্রোক) রোগ সৃষ্টি করে। আবার কেউ মনে করে ডিম খেলে উচ্চ রক্তচাপ, বা হাইপ্রেসার হয়। পেটে গ্যাস জমা হয়। কিন্তু আসলে এসব ক্ষেত্রে ডিম কতটুকু দায়ী তা জানা দরকার। তাই আইনিউজের পাঠকদের জন্য ডিম নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো-

ডিমের উপকারিতা 

ডিম একটি পরিপূর্ণ পুষ্টিকর খাবার। যা শরীরের নানা উপকার ও স্বাস্থ্যের জন্য অতি উত্তম। যেমন- 

১. ডিমে থাকা ভিটামিন বি ১২ আপনার পেটে থাকা খাবারকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে।

২. ডিমের মধ্যে থাকা ভিটামিন এ দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। ডিমের ক্যারোটিনয়েড, ল্যুটেন ও জিয়েক্সেনথিন বয়সকালের চোখের অসুখ ম্যাকুলার ডিজেনারেশন হওয়ার সম্ভাবনা কমায়। একই উপাদান চোখের ছানি কমাতেও সাহায্য করে।

৩. ডিমে রয়েছে ভিটামিন-ডি যা আপনার পেশীর ব্যথা কমায়।

৪. ডিমের ভিটামিন-ই স্কিন ক্যানসার প্রতিরোধ করে।

৫. ডিমের সবচেয়ে বড় গুণ এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে। ব্রেকফাস্টে রোজ একটি ডিম মানে সারাদিন আপনার ক্ষুধা কম হবে, খাওয়া হবে কম।

৬. ডিমে আছে আয়রন, জিঙ্ক, ফসফরাস। মেয়েদের পিরিয়ডের জন্য অনেক সময় রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। শরীর তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ডিমের মধ্যে থাকা আয়রন এই ঘাটতি মেটাতে পারে সহজেই। জিঙ্ক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। আর ফসফরাস হাড় ও দাঁত মজবুত করে।

৭. ২০০৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছে শৈশব থেকে সপ্তাহে ৬টি করে ডিম নিয়মিত খেলে নারীদের স্তন ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা কমে ৪৪ শতাংশ।

৮. ডিম হৃৎপিণ্ডে রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। ফলে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকটাই কম থাকে।

৯. শরীর সুস্থ রাখার আরও একটি জরুরি উপাদান কোলাইন। কোলাইনের ঘাটতি ঘটলে অনেক সময় কার্ডিওভাসকুলার, লিভারের অসুখ বা স্নায়ুবৈকল্য দেখা দিতে পারে। একটি ডিমে প্রায় ৩০০ মাইক্রোগ্রাম কোলাইন থাকে; যা কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম, স্নায়ু, যকৃত ও মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

১০. ডিম কোলেস্টেরল বাড়ায় না। দিনে দুটি ডিম খেলে রক্তে লোহিতকণিকা তৈরি করে।

১১. ঝটপট নখ ভাঙার অভ্যাস থাকলে চোখ বন্ধ করে রোজ ডিম খেয়ে যান। ডিমের মধ্যে থাকা সালফার ম্যাজিকের মতো নখ আর চুলের মান উন্নত করবে।

হাঁসের ডিম বেশি উপকারী

প্রোটিনের ভালো উৎস হচ্ছে ডিম। কেউ হাঁসের ডিম খেতে পছন্দ করেন, কেউ আবার মুরগির। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, মুরগির ডিমের থেকে হাঁসের ডিম বেশি উপকারী। কারণ-

১. ১০০ গ্রাম মুরগির ডিমে থাকে ১৪৯ কিলো ক্যালোরি এনার্জি। আর ১০০ গ্রাম হাঁসের ডিম থেকে এনার্জি পাওয়া যায় ১৮৫ কিলো ক্যালোরি।

২. কার্বহাইড্রেট ও মিনারেলের পরিমাণ সমান হলেও হাঁসের ডিমে প্রোটিনের পরিমাণ থাকে বেশি। দুই ডিমেই থাকে ম্যাঙ্গানিজ, দস্তা, তামা, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ও আয়রন। 

৩. প্রতি ১০০ গ্রাম হাঁসের ডিমে রয়েছে ১৮১ কিলো ক্যালোরি খাদ্যশক্তি। আর  মুরগির ডিমে পাওয়া যায় ১৭৩ কিলো ক্যালোরি খাদ্যশক্তি। 

৪. হাঁসের ডিমের ফ্যাট থাকে ১৩.৭ গ্রাম, মুরগির ডিমে থাকে ১৩.৩ গ্রাম। 

৫. সাইজে বড় হয় হাঁসের ডিম। মুরগির ডিমের চেয়ে হাঁসের ডিম প্রায় ৫০ শতাংশ বড় হয়। 

৬. হাঁসের ডিমের কুসুম মুরগির ডিমের থেকে বড় হয়। এ ছাড়া ফ্যাটের পরিমাণও বেশি থাকে। 

৭. নিউট্রিশনে ভরপুর হাঁসের ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন এ ও ডি, আয়রন মুরগির ডিমের থেকে বেশি। 

ডিম কীভাবে খেলে উপকার

একটি ডিম থেকে পাওয়া যায় অনেক পুষ্টি উপাদান। তবে বিভিন্ন গবেষণা বিভিন্ন সময় এই প্রিয় খাবারটি খাবে কি খাবে না, এ নিয়ে শঙ্কায় ফেলে।
কোনো গবেষণা বলে,  প্রতিদিন ডিম খাওয়া যাবে, আবার কোনো গবেষণা বলে সপ্তাহে দুটি।  তবে ডিমকে কীভাবে রান্না করে খাচ্ছেন তার ওপর ক্ষতি অনেক নির্ভর করে। 

অনেক তেলে ডিম ভেজে রোজ খেলে তা থেকে ক্ষতি হলে হতেও পারে। আবার ডিম কী দিয়ে খাবেন সেটাও কিন্তু বিবেচনার বিষয়। পরোটা,  লুচি,  খিচুড়ি, বিরিয়ানি ইত্যাদির সঙ্গে ডিম খেলে তা থেকে শরীরে কোলেস্টেরল বাড়ারই কথা। লাল আটার রুটি,  সিরিয়াল মিল্ক আর ডিম সিদ্ধ,  ব্রেড আর ডিম- এভাবে খেলে তা তেমন ক্ষতিকর নয়।

অনেকে ডায়রিয়া হলে ডিম খাওয়া বন্ধ রাখে। অথচ ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে প্রচুর পুষ্টি ঘাটতি হয়। তাই ডায়রিয়া হলে একটা ডিম খাওয়া যেতে পারে। যেকোনো বয়সে ডিম একটা আদর্শ প্রোটিন। তবে কিডনি রোগে ডিম খাবে কি খাবে না তা নির্ভর করবে পুষ্টিবিদের ওপর।

ডিমের খোসার উপকারিতা 

সাধারণত ডিম খেয়ে খোসা আমরা ফেলে দেই। তবে আপনি জানেন কী ডিমের খোসার রয়েছে নানা উপকারিতা।  
ডিমের খোসায় রয়েছে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, গ্লুকোসামিন, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও কোলাজেন। এই সব যৌগ শরীরের নানা ব্যাধি, মূলত, ব্যথা-বেদনা সরাতে কাজে আসে। এছাড়াও- 

১. ত্বক পরিচর্যাতেও ডিমের খোসা খুব কার্যকর। ডিমের সাদা অংশে ডিমের খোসা গুঁড়ো করে মিশিয়ে দিন। আপনার দরকারি ফেসপ্যাক তৈরি হয়ে যাবে। এবার তা মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিটের মতো অপেক্ষা করুন। এরপর হালকা গরম জলে ধুয়ে ফেলুন। মুখে পুরনো দাগ বা ব্রণের সমস্যা থাকলে এই প্যাক সহজ সমাধান।

২. বাত বা গাঁটের ব্যথা কমিয়ে আরাম দেয় ডিমের খোসা। আপেল সাইডার ভিনেগারের সঙ্গে ডিমের খোসা গুঁড়ো করে মিশিয়ে দুই দিন রেখে দিন। গলে মিশে যাবে খোসা। এই মিশ্রণ লাগান ব্যথার জায়গায়। ব্যথা কমে যাবে এবং আরাম পাবেন।

৩. ডিম ভেঙে তার খোসা ধুয়ে বড় বড় টুকরো করে তা ছড়িয়ে দিন চা বা কফিতে। তারপর আরও একবার ছেঁকে নিন চা। ডিমের খোসার হায়ালুরোনিক অ্যাসিড টেনে নেবে তেতো ভাব।

৪. ডিমের খোসায় রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম কার্বনেট, ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালসিয়াম। বা়ড়ির বাগানে বা কোনও গাছের গোড়ায় ডিমের খোসা গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দিন। পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচবে গাছ।

ডিমের অপকারিতা 

শরীর দুর্বল হলে ডাক্তার সকালবেলার নাশতায় ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে। তবে অতিরিক্ত ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। 

জার্নাল অব অ্যাথেরসক্লেরোসিস রিসার্চ নামের একটি গবেষণা সংস্থা অতিরিক্ত ডিম খাওয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিদিন ডিম খাওয়া সিগারেটের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর! তাদের তথ্য অনুযায়ী, বেশি ডিম খেলে শরীরে কোলেস্টরেলের মাত্রা বেড়ে যায়। যা হৃদরোগের কারণ হতে পারে।

শুধু তাই নয়, ডিম খাওয়ার ফলে আর্থ্রাইটিসের সম্ভাবনাও দেখা যায় বেশি। তবে অনেকেই বলেন, ডিমের সাদা অংশ উপকারী, আর কুসুম খাওয়া ভালো নয়। তাদের এ তথ্যকে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, ডিমের যে কোনো অংশই অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়।
এমনকি বিজ্ঞানীরা বলছেন, কাঁচা ডিমের তুলনায় ওমলেট, সেদ্ধ কিংবা পোচ খেলে ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

প্রসঙ্গত, ডিম প্রোটিনের খুব ভালো উৎস। পরিমিত পরিমাণে খেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। একটি খাবার অনেক স্বাস্থ্যকর হলেও সেটি অতিরিক্ত গ্রহণ উপকারের পাশাপাশি অপকারও করে থাকে এটাই স্বাভাবিক। দৈনিক চাহিদার তুলনায় যেকোনো খাবার বেশি গ্রহণ না করাই ভালো।

আইনিউজ/এসডিপি 

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়