ঢাকা, রোববার   ০৩ মে ২০২৬,   বৈশাখ ২০ ১৪৩৩

মহিদুর রহমান

প্রকাশিত: ২২:০২, ৯ অক্টোবর ২০২১
আপডেট: ১০:১৮, ১০ অক্টোবর ২০২১

বেরি লেক হতে পারে মৌলভীবাজার শহরের ফুসফুস

নির্ভেজাল সৌন্দর্যের অন্বেষণ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু কৃত্রিম নগরসভ্যতার অন্তরালে  হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চিরায়ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দূষিত হচ্ছে জল-মাটি-বাতাস। নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। আমরা খুব গর্ব করেই বলি, নিসর্গ সৌন্দর্যের লীলাভূমি মৌলভীবাজার জেলা। কিন্তু এই মৌলভীবাজার শহরের রাস্তায় রাস্তায় যে বড়ো বড়ো ছায়াগাছ ছিল তা উন্নয়নের দোহাই তুলে কাটা হয়ে গেছে অনেক আগেই। শহরে এখন যতদূর চোখ যায় কেবল ‘ইটের পর ইট।’

মানুষ এখন নগরসভ্যতার জঠরে আটকে পড়া কীট মাত্র। প্রকৃতপক্ষে আমরা যে প্রকৃতির অংশ সে কথা ভুলে যাই বেমলুম। তা না হলে মৌলভীবাজার শহরের বেরি লেকের এমন দশা হতো না বরং এটি হতে পারতো এই শহরের ফুসফুস। ভাবতে ভালো লাগে, শহরের ভেতরে ১৪ একর ৬৫ শতক আয়তনের প্রাকৃতিক লেকটি এই জনপদের জন্য যেন সত্যিই এক আশীর্বাদ। কিন্তু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও যথাযথ উদ্যোগ না থাকায় ক্রমশ অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছেন শহরবাসী। বলতে গেলে নগরসভ্যতা মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করছে যে, দিনে দিনে আত্মকেন্দ্রিকতা ও সামাজিক নিষ্ঠুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে গোটা সমাজ। অথচ সুস্থ্ জীবনের জন্য প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য খুবই প্রয়োজন। 

বেরি লেক এক সময় মনু নদের সাথে যুক্ত ছিল। পরে নদী গতিপথ পাল্টালে এই অংশটি বিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এবং লেকে রূপ নেয়। দিনের শুরুতে অথবা দিনান্তের ক্লান্তি শেষে বেরি লেক হতে পারে শহরবাসীর স্বস্থির নিশ্বাসের আপন ঠিকানা। বেরি লেক মূলত একটি প্রাকৃতিক লেক। এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পরিচর্যা এখন সময়ের দাবি। শহরবাসী ছাড়াও পরবর্তী প্রজন্মের শান্তিপূর্ণ ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের জন্য অবহেলিত এ লেকটির সংস্কার ও উন্নয়ন অপরিহার্য। এই শহরে যারা বসবাস করেন তাদেরও সচেতন হওয়ার দরকার আছে। লেকের পার ঘেঁষে ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখা হয়েছে- হচ্ছে। জলজ উদ্ভিদ-ঘাস-লতাপাতায় ছেয়ে গেছে লেকের জল। এর উত্তর ও পূর্ব পারে গজিয়েছে সুউচ্চ দালানবাড়ি। দক্ষিণে শাহ মোস্তফা সড়ক ও পশ্চিমে ঢাকা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক। ফলে বহিরাগত ও স্থানীয় লোকজনসহ সবারই চোখ পড়ে লেকের উপর। কিন্তু অযত্ন অবহেলায় লেকটির না আছে সৌন্দর্য না আছে জৌলুস। 

জানা যায় বদ্ধ জলাশয় আইন অনুযায়ী ১৯৮৭ সাল থেকে বেরি লেক মৌলভীবাজার পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে আসে। পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকেই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মৎস্য চাষের জন্য বেরি লেকটিকে ইজারা প্রদান করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, লেক থেকে প্রতিবছর যে আয় আসে তা কি লেকের শুশ্রূষায় ব্যবহার হচ্ছে? নাকি অক্সিজেন যেমন নিজে জ্বলে না কিন্তু অন্যকে জ্বলতে সাহায্য করে তেমনি বেরি লেকও নিজের আয় অন্যের তরে ব্যয় করার কারণেই নিজের এমন জরাজীর্ণ ও ভগ্নদশা?

এখানে একটা উদাহরণ টানতে পারি। মৌলভীবাজার শহর থেকে ৪০ কিমি দূরে মাধবপুর লেক অবস্থিত। এটির মালিক চা-বাগান কর্তৃপক্ষ। এর রয়েছে একটি চমৎকার ব্যবস্থাপনা। করে দেওয়া হয়েছে লেকের পার ঘেঁষে হেঁটে বেড়ানোর জন্য সরু পায়ে চলার পথ। টিলার ওপর খড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ধরণের তাঁবু। নিরাপত্তার ব্যবস্থা তো আছেই। হ্রদের পানিতে রয়েছে নীল পদ্ম। রয়েছে নজরকাড়া শাপলা-শালুক। পারে পারে আছে ছায়াগাছ। এছাড়া হ্রদের জলে দেখা মেলে বিভিন্ন জাতের হাঁস, সরালি, পানকৌড়ি, জলপিপি প্রভৃতি জলচর ও পরিযায়ী পাখীর। সুনীল আকাশ, গাঢ় সবুজ পাহাড়, শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো মনোরম প্রকৃতির মাঝখানে অবস্থিত লেকটি সত্যি অপূর্ব। তাছাড়া ঢাকা শহরে হাতিরঝিল একসময় ছিল ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। পুরো এলাকা জুড়ে ছিল বস্তি। সেই ময়লার ভাগাড় এখন সৌন্দর্যের আধার। ফলে প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। অনেক মানুষ সপরিবারে বেড়াতে আসছেন। নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ঘুরে ঘুরে দেখছেন দর্শনার্থীরা। ছবি তুলছেন যে যার মতো। বাহারি রঙের ফুলের বাগান, নয়নাভিরাম লেক, সেতু ঘুরে ঘুরে দেখে নগরবাসী রীতিমতো মুগ্ধ। নিষ্প্রাণ কংক্রিটের রাজধানীতে প্রাণের ছোঁয়া দিয়েছে হাতিরঝিল। একইভাবে মৌলভীবাজারের বেরি লেকও হতে পারে সৌন্দর্যের আধার। দিতে পারে শিশুকিশোরসহ সববয়সী মানুষজনের প্রাণে একগুচ্ছ স্নিগ্ধ পরশ। মৌলভীবাজার শহরবাসী সেই প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন। তাও অনেক দিন থেকে। 

 মহিদুর রহমান, লেখক ও প্রকাশক, সাধারণ সম্পাদক- বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ