ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৩ মে ২০২১,   বৈশাখ ৩০ ১৪২৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩:৪১, ১৬ এপ্রিল ২০২১
আপডেট: ২২:৩১, ১৬ এপ্রিল ২০২১

বাড়িতে ফোন দিয়ে জানলেন তিনি বাঘের থাবায় মারা গেছেন, চলছে দাফনের প্রস্তুতি

সিরাজুল ইসলাম সরদার ও বাঘ (প্রতীকী ছবি)

সিরাজুল ইসলাম সরদার ও বাঘ (প্রতীকী ছবি)

খুলনার কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম সরদার গত ১ এপ্রিল গিয়েছিলেন সুন্দরবনের গহীনে। উদ্দেশ্য মধু সংগ্রহ, নিয়েছিলেন বন বিভাগের অনুমতি। সাথে আরও ৭ জন সঙ্গীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। 

কিন্তু সিরাজুল সুন্দরবনে যাওয়ার ১০ দিন পর ১১ এপ্রিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের খপ্পরে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। ভাইরাল হতে সময় লাগেনি, সুন্দরবনের বনকর্মকর্তা আশিকুজ্জামান আশিকের বরাতে ঘটনাটি উঠে আসে দেশের কয়েকটি পত্র-পত্রিকায়ও। খবরটি নজরে আসে সিরাজুল ইসলামের পরিবারেরও। 

তো শোকে ভাসছিলেন সিরাজুলের পরিবার, এমন সময়ে ফেরত আসেন সিরাজের সঙ্গীরা। তার মধ্যে গ্রামের আব্দুল খালেক নামে এক ব্যক্তিও ছিলেন। তিনি বললেন, সিরাজুলের নৌকায় বাঘের হামলা হয়েছে। আর তাতেই গ্রামবাসীরা 'নিশ্চিত' হয়ে যায় তাদের সিরাজুল মারা গেছেন। 

সিরাজের বড় মেয়ে সেলিনা খাতুন জানান, খালেকের বাবাও মধু সংগ্রহে সুন্দরবনে গেছেন, যে কারণে স্থানীয় মানুষ খবরটির গুরুত্ব দেয়।তখন ওই খবর বনবিভাগকে জানালে তারা সেখানে উদ্ধারকারী দল পাঠায়। 

গ্রাম থেকেও একটি দল খবর নিতে সুন্দরবনে যায় বলে সেলিনা জানান।

তবে বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক যোগাযোগ 'বাস্তবের থেকেও কিছু ফাস্ট'। যখন সিরাজের পরিবার বুক ভাসাচ্ছিলো সিরাজের কোনও খবর নেই দেখে, এই অবস্থায় ফেইসবুকে ভাইরাল সিরাজের ফলোআপ আরেকটি খবর ছড়ায়। তার মৃতদেহ বাড়িতে নাকি নিয়ে আসাও হয়েছে!

সেলিনা বলেন, আমরা কিছুই জানি না, এর মধ্যে সোমবার (১২ এপ্রিল) দুপুরের পর ফেইসবুকে বাবার মৃতদেহ উদ্ধার করে বাড়ি আনার খবর ছড়িয়ে পড়ে।

সিরাজুল ইসলাম সুন্দরবন থেকে বের হয়ে বাড়িতে ফোন দিয়ে জানতে পারেন তিনি মারা গেছেন। নিজের 'মৃত্যুশোক' কাটাতে দ্রুত চলে আসেন বাড়িতে।

সিরাজুল ইসলাম সরদারের বড় মেয়ে সেলিনা খাতুন বলেন, রোববার তারা খবর পান তাদের বাবার নৌকায় বাঘের হামলা হয়েছে। খালেক নামে গ্রামের এক ব্যক্তি এ খবর ছড়ান। তিনি বলেছেন আব্বার একটা পা ও হাত পাওয়া গেছে। তাকে আনা হচ্ছে।

এই খবরে মানুষ জড়ো হয়। বরফ, কাফন সব কিছু কিনে আনা হয় রাতারাতি দাফন দেওয়া হবে বলে।

'বুধবার (১৪ এপ্রিল) বাবার সঙ্গে থাকা একজনকে ফোন দেওয়া হয়। পরে বাবার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান- তার কোনো সমস্যা হয়নি, কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আমার মামা ফরেস্ট অফিসে তাকে আনতে যান।'

সিরাজুল ইসলাম সরদার বলেন, এলাকার অনেকেই আমি মারা যাওয়ার ঘটনাটিকে ছড়িয়ে দেয়। বাড়ির লোকজন শুনেছে আমাকে বাঘে নিয়ে গেছে। একখান পা ও একখান হাতও পাওয়া গেছে। তাই শুনে বাড়িতে সবাই কান্নাকাটি শুরু করে। কাফনের কাপড় আর বরফও কিনে আনে।

তিনি বলেন, শুধু কবরটা খুঁড়তেই বাকি ছিল।

সিরাজুল সরদার বলেন, মেয়াদ শেষে ফরেস্ট স্টেশনে পাশ সমর্পণ করতে এলে তারা আমাকে দেখে কানাঘুষা শুরু করে। পরে তাদের মাধ্যমে আসল ঘটনা জানতে পারি। তাই সেখানে আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি বাড়ি এসেছি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল গফফার ঢালী বলেন, বাঘের হামলায় মৌয়াল সিরাজুলের মৃত্যুর খবর সঠিক নয়। রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাঘের আক্রমণে তার নিহতের খবরটি ছিল ‘গুজব’। বুধবার সশরীরে সিরাজুল বাড়ি এসেছেন।

তবে মজার ব্যাপার হলো, গ্রামের মধ্যে যারা এই গুজবের সূচনা যারা ফেইসবুকে পোস্টের মাধ্যমে করেছিলেন, তাদের প্রোফাইলে সেই পোস্টগুলো আর দেখা যাচ্ছেনা। সিরাজুল ইসলামের মতো পোস্টগুলোও 'বাঘের হামলায়' প্রাণ হারালো নাকি তারা নিজেই ডিলেট দিয়েছেন সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি!

বাঘের আক্রমণে প্রাণ গেলো রাজপুত্তুরের, রাজ্যে শুরু হলো শোক। পরে টগবগিয়ে পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় বীরদর্পে রাজ্যে আসলো রাজকুমার...

ছোটবেলায় 'ঠাকুরমার ঝুলি'তে এমন গল্প পড়েছেন? হ্যাঁ, আমিও পড়েছি। আর এরকম ঘটনাই ঘটেছে বাংলাদেশে, তাও ২০২১ সালে। 

আইনিউজ/এসডি

Green Tea
সারাবাংলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়