রুপম আচার্য্য
ধুনুচির ধোঁয়া আর ঢাকের তালে ভক্তি-ঐতিহ্যের অনন্য প্রকাশ
আরতি ও ধুনুচি নৃত্য পরিবেশন করছেন নটরাজ নৃত্যাশ্রমের নৃত্যশিল্পীরা
শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালির সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের মাঝেও তৈরি হয় আনন্দ আর উৎসবের আমেজ। পূজামণ্ডপে দেবী আরাধনার পাশাপাশি যে বিষয়গুলো দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ধুনুচি নাচ। ঢাকের তালে ধোঁয়ায় মোড়া পরিবেশে ধুনুচি হাতে নৃত্য যেন পূজার সৌন্দর্যকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলে।
বিশেষ করে অষ্টমী, নবমী ও সন্ধিপূজার সময় ধুনুচি নাচের আয়োজন পূজামণ্ডপগুলোতে আলাদা মাত্রা যোগ করে। সন্ধ্যা নামতেই ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। মণ্ডপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ধূপ ও ধুনোর ঘ্রাণ। মাটির তৈরি ধুনুচিতে জ্বলন্ত নারিকেলের ছোবড়া, ধুনো ও ধূপ দিয়ে তৈরি হয় ধোঁয়ার আবহ। সেই ধোঁয়ার মধ্যে ভক্তিভরে নৃত্যে মেতে ওঠেন নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী এমনকি শিশুরাও।
ধুনুচি নাচ শুধু একটি নৃত্য নয়, এটি মূলত দেবী দুর্গার প্রতি ভক্তি নিবেদনের একটি ঐতিহ্যবাহী উপায়। বহু বছর ধরেই বাংলার হিন্দু সমাজে এই রীতি চলে আসছে। একসময় গ্রামবাংলার পূজামণ্ডপগুলোতে সাধারণ ভক্তরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধুনুচি হাতে নাচতেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্যে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। এখন শহর ও গ্রামের অনেক পূজামণ্ডপে ধুনুচি নাচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন বয়সী প্রতিযোগীরা।
অনেক দক্ষ নৃত্যশিল্পী দুই হাতে, কখনো মাথায়, আবার কখনো মুখে ধুনুচি নিয়ে নাচ পরিবেশন করেন। আগুন আর ধোঁয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে ঢাকের তালে তালে নাচ পরিবেশন করা সহজ কাজ নয়। দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও দক্ষতার মাধ্যমে তারা এই পরিবেশনা আয়ত্ত করেন। দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হয়ে সেই নাচ উপভোগ করেন এবং করতালির মাধ্যমে উৎসাহ দেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ধুনুচির ধোঁয়া পরিবেশকে পবিত্র করে এবং অশুভ শক্তিকে দূর করে। তাই পূজার আরতির সময় ধুনুচি নাচকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক ভক্ত বিশ্বাস করেন, ধুনুচি নাচের মাধ্যমে দেবীর আশীর্বাদ লাভ করা যায় এবং পরিবারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে।
বর্তমান সময়ে ধুনুচি নাচ শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বাঙালির সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতায় ধুনুচি নাচ বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে স্থান পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন বিভিন্ন পূজামণ্ডপের ধুনুচি নাচের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। ফলে নতুন প্রজন্মও এই ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
পূজামণ্ডপে ধুনুচি নাচ দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। ঢাকের তালে ধোঁয়ার আবেশে যখন নৃত্যশিল্পীরা ঘুরতে থাকেন, তখন পুরো মণ্ডপজুড়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম মোহময় পরিবেশ। অনেকে সেই মুহূর্ত মোবাইল ফোনে ধারণ করে স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করেন।
সংস্কৃতিবিদদের মতে, ধুনুচি নাচ শুধু ধর্মীয় উৎসবের অংশ নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। এই নাচের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় ভক্তি, আনন্দ, ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা। তাই সময়ের পরিবর্তন হলেও ধুনুচি নাচের আবেদন এতটুকু কমেনি। বরং প্রতি বছর দুর্গাপূজায় এর জনপ্রিয়তা আরও বাড়ছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ধুনুচির ধোঁয়া আর ঢাকের বাদ্যে মুখর হয়ে উঠবে চারপাশ। ভক্তি আর আনন্দের সেই মিলনমেলায় ধুনুচি নাচ আবারও হয়ে উঠবে দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
ছবিতে বাসন্তী পূজা উপলক্ষে আয়োজিত ভক্তিমূলক নৃত্যানুষ্ঠানে আরতি ও ধুনুচি নৃত্য পরিবেশন করছেন নটরাজ নৃত্যাশ্রমের নৃত্যশিল্পীরা। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন বন্দনা দাস স্বর্ণা।
- কেএফসির মালিকের জীবন কাহিনী
- প্রজাপতি: আশ্চর্য এই প্রাণীর সবার ভাগ্যে মিলন জোটে না!
- বিশ্বের অদ্ভুত কিছু গাছের ছবি
- মা-শাশুড়িকে হারিয়েও করোনার যুদ্ধে পিছিয়ে যাননি এই চিকিৎসক
- যেখানে এক কাপ চা পুরো একটি পত্রিকার সমান!
- তিন রঙের পদ্মফুলের দেখা মিলবে এই বিলে
- সোনার দাম এত কেন : কোন দেশের সোনা ভালো?
- ঢাকার মাঠ মাতানো বিদেশি ফুটবলাররা
- ২০২৩ সালে পৃথিবীর শক্তিশালী ১০টি দেশ!
- রহস্যময় গ্রামটি লাখো পাখির সুইসাইড স্পট
























