ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৯ মে ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪৩৩

আব্দুল্লাহ্ আজমী

প্রকাশিত: ২৩:১৬, ১৮ মে ২০২৬
আপডেট: ২৩:৫৭, ১৮ মে ২০২৬

চীনের শাসন ও উন্নয়ন মডেল: এক নীরব বিপ্লবের গল্প

গত কয়েক দশকে চীন এমন এক উন্নয়নের গল্প লিখেছে, যা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ধারণাকেই নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। দারিদ্র্য থেকে প্রযুক্তি, অবকাঠামো থেকে বৈশ্বিক প্রভাব-চীনের উত্থান আজ আধুনিক বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বাস্তবতা।

প্রথমে মনে হয়-এটা কোনো দেশ নয়, এটা যেন এক বিশাল নিঃশ্বাস, যা থেমে ছিল বহু বছর... তারপর হঠাৎ করে জেগে উঠেছে।

রাস্তার ধুলো, গ্রাম্য কাঁচা ঘর, ক্ষুধার নীরবতা-সবকিছু একসময়চীনের বাস্তবতা ছিল। কিন্তু সময়ের কোনো এক নিঃশব্দ ভাঁজে সেই দেশ বদলাতে শুরু করে, এমনভাবে বদলাতে থাকে যে পরিবর্তনটা চোখে পড়ে না, শুধু টের পাওয়া যায়।

একটা প্রশ্ন সবসময় ঘুরে বেড়ায়-কীভাবে?

উত্তরটা সহজ নয়। কারণ চীনের শাসন ও উন্নয়ন মডেল কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল নয়। এটা যেন সময়ের ভেতর ধীরে ধীরে দাড়িয়ে ওঠা এক বিশাল প্রাচীর-যার প্রতিটি ইট একটি নীতি, প্রতিটি স্তর একটি পরিকল্পনা, আর পুরো কাঠামোর ভেতরে মিশে আছে কঠিন বাস্তবতা, দীর্ঘ অপেক্ষা আর হিসেবি সিদ্ধান্তের নীরব ভার।

এই প্রাচীরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন Xi Jinping-যার শাসনকালকে অনেকেই বলেন "দ্রুত সিদ্ধান্তের যুগ”। এখানে সময় নষ্ট করার সুযোগ কম, কারণ পরিকল্পনা শুধু কাগজে নয়-মাটিতে নামাতে হয়, মানুষকে বদলাতে হয়, শহরকে নতুন করে লিখতে হয়।

কিন্তু এই গল্প শুরু হয়েছিল আরও আগে...

একজন মানুষ-Deng Xiaoping। শান্ত কণ্ঠে তিনি একদিন বলেছিলেন, "বিড়াল কালো না সাদা তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সে ইঁদুর ধরতে পারে কি না।” কথাটা ছিল ছোট, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক নতুন যুগের দরজা। সেই একটি বাক্য যেন চীনের পুরোনো চিন্তাধারায় প্রথম ফাটল ধরায়, আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় এক ভিন্ন ভবিষ্যতের যাত্রা।

তারপর যেন একে একে খুলতে শুরু করল বহুদিন বন্ধ থাকা দরজাগুলো। বিদেশি বিনিয়োগ ঢুকে পড়ল শহরের ভেতর, কারখানাগুলো জেগে উঠল লোহা আর মেশিনের শব্দে, শ্রমিকদের ঘামে বদলাতে লাগল অর্থনীতির চেহারা। আকাশের নিচে ধীরে ধীরে উঁচু হতে লাগল কংক্রিটের নতুন স্বপ্ন।

চীনের উন্নয়ন মডেলের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হয়তো এর গতি-নীরব, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। এখানে একটি নীতি শুধু কাগজে আটকে থাকে না; কিছুদিনের মধ্যেই সেটি বদলে দেয় পুরো একটি শহরের মুখ। কোথাও রাতারাতি দাঁড়িয়ে যায় সেতু, কোথাও ছুটতে শুরু করে দ্রুতগতির রেললাইন। মনে হয়, কেউ যেন গভীর রাতে পুরোনো মানচিত্রের ওপর নতুন এক দেশের রেখা এঁকে দিচ্ছে।

আজ বিশ্বের বৃহত্তম হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক চীনের। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশটি কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার বাইরে নিয়ে এসেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি-যা শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার এক বাস্তব উদাহরণ।

কিন্তু এই উন্নয়নের আরেকটি দৃশ্যও আছে-গ্রামের সেই মানুষ, যিনি সকালে উঠে প্রথমবার বিদ্যুৎবাতির আলো দেখে চুপ করে দাড়িয়ে থাকেন। তার চোখে বিস্ময়, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। এই নীরব বিস্ময়ইচীনের আসল গল্প।

অবকাঠামো শুধু লোহা-সিমেন্ট নয়-এটা যোগাযোগ, এটা গতি, এটা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মানুষের স্বপ্ন পৌঁছে দেওয়া। দ্রুতগতির রেললাইন যেন সময়কে ছোট করে দিয়েছে। দূরত্ব এখন আর দূর নয়, বরং এক কাপ চায়ের সময়।

তবুও এই মডেল নিখুঁত নয়। কিছু প্রশ্ন বাতাসে ঝুলে থাকে-স্বাধীনতা, মত প্রকাশ, ব্যক্তিগত পরিসর। কিন্তু উন্নয়নের আলো আর বাস্তবতার ছায়া-দুটোই একসাথে হাঁটে এখানে, পাশাপাশি, কখনো খুব কাছাকাছি। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়-এই দেশ শুধু অর্থনীতি তৈরি করেনি, তৈরি করেছে একটি গতিশীল মানসিকতা। যেখানে থেমে থাকা মানে পিছিয়ে পড়া।

বাংলাদেশও চীনের এই উন্নয়ন যাত্রাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ দেখায়, দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতারও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

চীন এখন আর শুধু একটি দেশের নাম নয়-এটা যেন চলমান সময়ের ভেতরে তৈরি হওয়া এক জীবন্ত শক্তি, যা প্রতিদিন নিজেকেই নতুন করে গড়ে তোলে। এখানে ভবিষ্যৎ কোনো দুরের স্বপ্ন নয়; তা নির্মিত হয় প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি সেতুতে, প্রতিটি দ্রুত ছুটে চলা ট্রেনের শব্দে।

একসময় মানুষ জানতে চাইত "কীভাবে তারা এত দ্রুত বদলে গেল?" কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে সেই প্রশ্নটাও পুরোনো হয়ে যায়। তার জায়গায় জন্ম নেয় আরেকটি অস্বস্তিকর, কিন্তু গভীর প্রশ্ন- "এই যাত্রার শেষ কোথায়?"

আর ঠিক তখনই বোঝা যায়, গল্পটা শেষ হওয়ার জন্য লেখা হয়নি। বরং প্রতিটি সমাপ্তির আড়ালে চীন নিঃশব্দে খুলে দেয় আরেকটি নতুন দরজা, যেখানে ভবিষ্যৎ এখনও লেখা হচ্ছে-ধীরে, কিন্তু অবিশ্বাস্য নিশ্চয়তায়। হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাস একদিন লিখবে-২১শ শতাব্দীতে বিশ্ব শুধু চীনের উত্থান দেখেনি, দেখেছিল উন্নয়নের ধারণাটাই কীভাবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে পারে।

আব্দুল্লাহ্ আজমী (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের ছাত্র)।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়