ঢাকা, সোমবার ০৬ জুলাই ২০২৬,   আষাঢ় ২২ ১৪৩৩

যুবরাজ দেববর্মা

প্রকাশিত: ২০:২৮, ৬ জুলাই ২০২৬

সিলেট গণভোটের বিস্মৃত ইতিহাস লেখা

এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।

বৃহত্তর সিলেট বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। এই অঞ্চল যেমন ভূপ্রাকৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় তেমনি ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের দিক থেকে অনন্য। সিলেট একটি প্রাচীন জনপদ যার ইতিহাস আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। প্রাচীনকালে এটি 'শ্রীহট্ট' নামে পরিচিত ছিল এবং বিভিন্ন সময়ে কামরুপ রাজ্য, জৈন্তিয়া রাজ্য, ত্রিপুরা রাজ্য, চন্দ্র, বর্মণ, সেন রাজাদের শাসনাধীন ছিল। ১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ:) ও ৩৬০ আউলিয়ার আগমনের পর থেকে এটি আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।  

সুলতানি আমলে এই শ্রীহট্ট জালালাবাদ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৭৭২ সালের ১৭ মার্চ বৃটিশ আমলে সিলেট আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রশাসনিক জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৪ সালে একে তৎকালীন আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে সিলেট ভারতের আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়।

ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ঘোষণার অধীনে এবং ভারত স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭- এর ধারা ৩ অনুযায়ী এই ভোট কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সিলেট গণভোট- এর মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত সিলেট জেলাটি ভারতের অংশ থাকবে নাকি পূর্ববঙ্গে যুক্ত হবে তা নির্ধারিত হয়। 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রবর্তিত দ্বিজাতিতত্ত্ব অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষদিকে দেশভাগের ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলের হিন্দু  সম্প্রদায়ভুক্ত অগণিত মানুষ ভারতে পাড়ি জমান তেমনি ভারত ছেড়ে মুসলিমরা আসেন পূর্ব বাংলায়। জন্মভূমি ছেড়ে ভিনদেশে আসা মানুষের এ এক মর্মন্তুদ বেদনার ইতিহাস। দেশভাগের অংশ হিসেবে তখন সিলেটও ভাগ হয়েছিল। কারণ এখানে হয়েছিল গণভোট। এই জেলার ছিল পাঁচটি মহকুমা,  যথা- উত্তর শ্রীহট্ট( সিলেট), দক্ষিণ শ্রীহট্ট (মৌলভীবাজার), হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও করিমগঞ্জ। 

ভারতবর্ষ ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে ভাগ হলেও সিলেট জেলা ভারতে নাকি পাকিস্তানে থাকবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গণভোটের আয়োজন করা হয়। এটিই 'সিলেট রেফারেন্ডাম' বা 'সিলেট গণভোট' নামে পরিচিতি পায়। নির্বাচনে কংগ্রেস 'কুঁড়েঘর' প্রতীক নিয়ে ভারতের পক্ষে এবং মুসলিম লীগ 'কুড়াল' প্রতীক নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিল। রেফারেন্ডাম কমিশনার হিসেবে ব্রিটিশ আমলা এইচ. সি. স্টর্ককে নিযুক্ত করা হয়। নির্বাচনে ২৩৯ টি কেন্দ্রে ৪৭৮ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং ১ হাজার ৪৩৪ জন পোলিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। সর্বমোট ভোটার ছিলেন ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫ জন। ভোট দিয়েছিল ৭৭ শতাংশ মানুষ। 

গণভোটের তারিখ ঘোষণার পর পরই শুরু হয় সমগ্র সিলেট জুড়ে প্রচার-প্রচারণা। উভয় পক্ষ ভোটার ও জনসাধারণকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে সেই সাথে পাড়া-মহল্লায় স্লোগানে- স্লোগানে মুখরিত থাকে। মুসলিম লীগের কর্মী- সমর্থকেরা ' আসামেতে যাব না, সাপ-ব্যাঙ খাব না', 'আসামে আর থাকব না, গুলি খেয়ে মরব না', 'ভূতের ঘরে কুড়াল মারো, পাকিস্তান আজাদ করো', 'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান' ইত্যাদি স্লোগান দিত। অন্যদিকে কংগ্রেস কর্মীরা দিত 'বেঙ্গলে যাব না, ভাতের ফ্যান খাবো না', 'পাটের দেশে যাব না, ভাতের মাড় খাব না', 'ঘরের লাগা শিলং শিলচর, আপনজনও হইবে পর', 'সুখে যদি থাকতে চাও, ঘরের বাক্সে ভোট দাও' সহ নানা স্লোগান। দুই পক্ষই বিভিন্ন প্রচার- পুস্তিকা প্রকাশ করে। পক্ষে- বিপক্ষে অসংখ্য গান- কবিতা রচিত হয়।

গণভোটের ডাকে কেবল সিলেট নয়, সমগ্র আসাম ও বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গেল। দেশজুড়ে এক মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে গেল। বাংলাদেশে হাজার-হাজার মুসলিম লীগ কর্মী, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়লো সারা সিলেটে। 

মূলত হিন্দুধর্মাবলম্বী নেতারা কংগ্রেসের পক্ষে এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বী নেতারা মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচার- প্রচারণায় অংশ নেন। তবে দলিত- তফসিলি ও নিম্নবর্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু নেতা গণভোটে মুসলিম লীগের পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে জমিয়তে উলানায়ে হিন্দ ছিল কংগ্রেসঘেঁষা। উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের দ্বন্দ্বের কারণে কংগ্রেস সবসময়ই উচ্চবর্ণের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার পরিচয় দিয়ে থাকে। হিন্দু সমাজের দলিত বা অচ্যুত বা শিডিউল কাস্টের নেতা যোগেন মন্ডল   মুসলিম লীগের সমর্থনে কাজ করার ফলে সিলেটে বসবাসরত নিম্নবর্ণের ভোট মুসলিম লীগে চলে যায়। 

সিলেট গণভোটের ফলাফল ১২ জুলাই দিল্লি পাঠানোর পর ১৮ জুলাই ভারত স্বাধীনতা আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী বিষয়টির বৈধতা দেওয়া হয়। পাকিস্তানে থাকার জন্য কুড়াল প্রতীকে ভোট পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ টি। অন্যদিকে আসামে থাকার পক্ষে কুঁড়েঘর প্রতীকে ভোট পড়েছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১টি। ফলাফল ঘোষণার পর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। গণভোটে সিলেট পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হলেও ১৮ আগস্ট র্যাডক্লিফ সীমানা কমিশনের বিতর্কিত এক মতামতের ভিত্তিতে করিমগঞ্জ মহকুমা আসামভুক্ত করা হয়।

আসামের তৎকালীন নেতারা বাংলাভাষী সিলেটিদের আসাম থেকে করে আত্মপরিচয় সংকটে ভোগা অহমিয়াদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। 

সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের একাংশের মানুষের স্বায়ত্তশাসনের দাবি বা সিলেটি ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার যে দাবি তোলা হয়, সিলেটি ভাষা- সংস্কৃতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রক্ষা ও বিকাশের জন্য ১৯৪৭ এর গণভোটের আশা, আকাঙ্খা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আলাদা মর্যাদা দিয়ে বৃহত্তর সিলেটের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তাকে স্বীকৃতিস্বরুপ প্রতিবেশী ভারতের সংবিধানের ন্যায় ৬ষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী স্বশাসিত জেলা পরিষদ বা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের আদলে একটা স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদারতা ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চরিত্র প্রশংসা কুড়াবে।

পরিশেষে বলতে চাই, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মানুসন্ধানের পথ ধরে যেমন ঔপনিবেশিক শাসনের নামকরণ করা সিলেটকে আবার শ্রীহট্ট হতে হবে তেমনি শতাব্দীর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে সিলেট গণভোটকে বিস্মৃতির অতলে গহ্বরে তলিয়ে যেতে দিলে হবে না, কারণ তা সিলেটের ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী ও অনস্বীকার্য। 

যুবরাজ দেববর্মা, অধিকারকর্মী ও গবেষক

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ