ঢাকা, রোববার   ১৪ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪৩৩

মোহাম্মদ মকিস মনসুর

প্রকাশিত: ২২:৪৯, ১৩ জুন ২০২৬

এগারো মাস কারারুদ্ধ জীবন ও দিনবদলের সনদ

মোহাম্মদ মকিস মনসুর

মোহাম্মদ মকিস মনসুর

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১১ জুন একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ২০০৮ সালের এই দিনে দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস কারাবাসের পর মুক্তি পান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর মুক্তি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর কারামুক্তি ছিল না, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে এটি ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক প্রতীকী মুহূর্ত।

সত্যকে সাময়িকভাবে আড়াল করা যায়, কিন্তু চিরদিন চাপা রাখা যায় না। ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে বাঙালি জাতি অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ২০০৭ সালের ১/১১-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে ধানমন্ডির সুধা সদন থেকে গ্রেপ্তার করে। তাঁকে প্রথমে আদালতে এবং পরে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগারে নেওয়া হয়। সেই সময় দেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মামলা দায়ের করা হচ্ছিল। 

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল সীমিত, আর দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছিল গভীর অনিশ্চয়তা।

কারাবন্দি অবস্থায় শেখ হাসিনার চিকিৎসা ও পারিবারিক যোগাযোগ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের দাবি ছিল, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছিল। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় পাওয়া আঘাতও তখন তাঁকে ভোগাচ্ছিল। ২০০৮ সালের মার্চে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে তিনি চিকিৎসা না পাওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

তবে ব্যক্তিগত দুর্ভোগের মধ্যেও দেশের মানুষের দুর্দশা তাঁর চিন্তার বাইরে ছিল না। ২০০৭ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। কারাগারে থেকেও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পায়।

শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে দেশে ও বিদেশে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আন্তর্জাতিক মহলে জনমত গঠনের চেষ্টা চালান। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য এবং ইউরোপীয় রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে ২০০৮ সালের ১১ জুন শেখ হাসিনা মুক্তি লাভ করেন।

আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে, তাঁর সেই মুক্তি ছিল গণতন্ত্রের মুক্তি। কারণ দলটির বিশ্বাস ছিল, শেখ হাসিনাকে আটক করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাজনীতিকেই সংকুচিত করা হয়েছিল। তাই ১১ জুন আওয়ামী লীগের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নেতৃত্বহীন ও বিভক্ত আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী চার দশকে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

তাঁর সমর্থকদের মতে, উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সমালোচকেরা তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। তবে এটুকু অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনা একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র।

১১ জুন তাই কেবল একটি তারিখ নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মারক। কারাবাস, রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণতন্ত্রের প্রশ্ন এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা—সবকিছুর সঙ্গে দিনটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

গণতন্ত্রের শক্তি শেষ পর্যন্ত জনগণের মধ্যেই নিহিত থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসও সেই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। সময়ের নানা বাঁক পেরিয়ে দেশ এগিয়ে যায়, কিন্তু কিছু দিন ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকে। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ১১ জুন তেমনই একটি দিন।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

মোহাম্মদ মকিস মনসুর, লেখক ও সাংবাদিক চেয়ারম্যান, ইউকে বিডি টিভি সভাপতি, যুক্তরাজ্য ওয়েলস আওয়ামী লীগ

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়