ঢাকা, শুক্রবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ২ ১৪২৮

আরাফাত আজাদ

প্রকাশিত: ১৯:৫৩, ১০ মে ২০২০
আপডেট: ২০:৫৯, ১০ মে ২০২০

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা

উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের সবার দৃষ্টিই নিমজ্জিত রয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে। প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের পর চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এখন কড়া নাড়ছে মানব সভ্যতার দোরগোড়ায়। বলা হচ্ছে, যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এখন রয়েছে আতুরঘড়ে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যেই তাকে আমরা পূর্নশক্তিতে পাবো। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে শুধু বিজ্ঞান নয়; আমরা বাস করবো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জগতে! আপনি আজকে কল্পনা করে দেখুন, ভালো বোধ করছেন না বিধায় আপনি একটি পিল সেবন করলেন আর সাথে সাথে তা আপনার রক্তের কনায় কনায় মিশে গিয়ে ন্যানো পরিমাণ তথ্য ও পৌঁছে দিচ্ছে আপনার-ই স্মার্ট ফোনে। স্মার্ট ফোনে চলে আসা আপনার সাস্হ্যগত সকল তথ্য বিশ্লেষণ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(এআই)। এআই জগতের সকল আধুনিক মেডিকেল সাময়িকীর তথ্য উপাত্ত ঘেটে তার ভিত্তিতে সম্পন্ন করছে আপনার জন্য প্রয়োজনীয় সকল শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা; এবং তা করছে একজন রক্ত-মাংসের শরীরের ডাক্তারের চেয়েও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। আপনার জিনগত তথ্যের ভিত্তিতে এআই আপনাকে যে ঔষধটি নিতে বলছে সেটিও তৈরী হয়ে যাচ্ছে কোন থ্রিডি প্রিন্টারে। এ সব কিছুই সম্ভব হতে চলেছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রত্যয়টির প্রথম ব্যবহার করেন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান ক্লাউস শোয়াব ২০১৫ সালে 'ফরেন অ্যাফেয়ার্স' সাময়িকীতে প্রকাশিত তাঁর এক নিবন্ধে। ২০১৬ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম থেকে প্রকাশিত ক্লাউস শোয়াবের 'দ্যা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভুলেশন' বইটিকে বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বাইবেল। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সহযোগিতায় ইতোমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ সংক্রান্ত সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স ও অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, ব্লক চেইন, থ্রিডি প্রিন্টিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানো টেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, শক্তি সঞ্চয়, বায়োটেকনোলজি, ম্যাটেরিয়াল সাইন্সের মতো বিষয়গুলোর অভাবনীয় ও অকল্পনীয় অগ্রগতি এবং উন্নতি যেমন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে শক্তিশালী করছে পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত ও দৈনন্দিন জীবনে এই সকল বিষয়ের উন্নত প্রযুক্তিগত ব্যবহার-ই যে হবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূল চেহারা তা ক্রমশ স্পষ্ট করছে।

মানব সভ্যতার আজকের এই চমকপ্রদ অবস্থান, কল্পনাতীত ভবিষ্যতের হাতছানি শুধুই বর্তমানের অর্জন নয়। প্রচন্ড মেধা, পরিশ্রম আর ত্যাগ দিয়ে মানুষ একের পর এক বিপ্লবের ইতিহাস রচনা করেছে। প্রাক শিল্প যুগের আলোচনায় বিপ্লব শব্দটিকে পাওয়া যায় নবোপলীয় বিপ্লব(নব্য প্রস্তর যুগ) এবং নগর বিপ্লব এই দুইটি প্রত্যয়ে।বস্তুত নব্য প্রস্তর যুগে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়সহ সব ক্ষেত্রে যে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয় তার কারণেই ভি. গর্ডন চাইল্ড নব্য প্রস্তর যুগকে নবোপলীয় বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছেন।নবোপলীয় বিপ্লব মানব ইতিহাসের প্রথম বিপ্লব। এ যুগেই মানুষ তার যাযাবর জীবন ত্যাগ করে কৃষির সূত্রপাত ঘটায় অর্থাৎ খাদ্য সংগ্রহ থেকে খাদ্য উৎপাদন অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। বনের পশুকে পোষ মানিয়ে গৃহপালিত পশুতে পরিণত করতে শেখে; ঐতিহাসিক ক্লার্ক যাকে দেখেছেন প্রকৃতির উপর মানুষের কর্তৃত্ব হিসেবে। একদিকে কৃষিকাজ অন্যদিকে পশুপালন এই দুইয়ের প্রয়োজনেই মানুষের নির্দিষ্ট ঠিকানার প্রয়োজন হয় এবং গৃহনির্মাণ করতে শেখে। এ যুগেই মানুষ চাকার আবিষ্কার করে ও চক্রাকার গতিকে ব্যবহার করতে শেখে। আগুনে খাবার ঝলসে খেতে শেখার পাশাপাশি করতে থাকে আগুনের ব্যাপক ও বিস্তৃত ব্যবহার। সুতা তৈরীর যন্ত্র, চরকা,তাঁত আবিষ্কারের মাধ্যমে নবোপলীয় যুগে মানুষ বস্ত্র উৎপাদনে প্রবেশ করে।রাষ্ট্র ও পরিবার ব্যবস্হার উদ্ভব ঘটে এবং বিবাহ প্রথার প্রচলন হয়। কৃষিভিত্তিক খাদ্য উৎপাদন অর্থনীতির কারণে পূর্বের চেয়ে জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটে। কৃষিতে উদ্বৃত্ত উৎপাদন এবং অস্থিতিশীল সমাজ ও প্রকৃতির কারণে শ্রেণিভেদ প্রথার সূত্রপাত হয়। সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা ও উত্তরাধিকার প্রথা প্রতিষ্ঠা পায়, বিনিময় অর্থনীতির সূচনা হয়। মালামাল পরিবহনে পশুচালিত যানের পাশাপাশি ব্যবহার করতে শেখে পালতোলা নৌযানের। প্রকৃতির অনিশ্চিত ও রহস্যময় আচরণের কারণে কুসংস্কার ও যাদুবিদ্যা নির্ভর ধর্মীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

নবোপলীয় বিপ্লবের পরবর্তী বিপ্লবকে গর্ডন চাইল্ড বলছেন নগর বিপ্লব যা কৃষকদের স্বয়ংসম্পূর্ণ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামগুলোকে জনবহুল নগরীতে পরিণত করে। নবোপলীয় যুগে মানুষের অগ্রগতি ও অর্জনের প্রেক্ষিতে জীবনযাত্রার যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্পন্ন হয় সেটাই হচ্ছে নগর বিপ্লব। নগরে উন্নত যোগাযোগ, আবাসন, ধাতুর ব্যবহার ও উদ্বৃত্ব উৎপাদনের ব্যবস্হা গড়ে উঠেছিলো; আরো ছিল ক্ষুদ্র সৈন্যদল, ব্যবসায়ী, কারিগর, পুরোহিত, প্রশাসক, পেশাজীবী শ্রেণি যা নগরগুলো কে তৎকালীন গ্রামগুলো থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যদান করে। নগরগুলো থেকেই নগর রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। নগর পরিচালনার জন্য তৈরী হয় আইন, আবির্ভাব হয় রাজার।পুরোহিতরা জনসমাজে রাজাকে ঈশ্বরের প্রতিনিধিরূপে তুলে ধরেন বিনিময়ে শাসক শ্রেণি তাদের কে উঁচু সামাজিক মর্যাদা দান করেন।সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিরা রাজার আনুকূল্য পেয়ে অভিজাত হয়ে ওঠে আর কৃষক, কুমার, মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সাধারণ সৈন্য এবং অন্যান্য পেশার লোকেরা দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর সামাজিক জীবন প্রাপ্ত হয়। শক্তিশালী নগর রাষ্ট্র কর্তৃক দূর্বল নগর রাষ্ট্র কে আক্রমণ সামরিকবাদী চেতনার বিকাশ ঘটায় ও পেশীশক্তি ব্যবহারের শক্ত ভিত্তি তৈরী করে। নগরের জীবন গনিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞানচর্চার পথ প্রশস্ত করে দেয়।

এর পরে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে রচিত হয় শিল্প বিপ্লবের ইতিহাস।প্রথম শিল্প বিপ্লব জন্মলাভ করে গ্রেট ব্রিটেনে। ১৭৬০ সালে জন কে (John Kay) যে উড়ন্ত মাকু (Flying Shuttle) আবিষ্কার করেন বস্ত্রবয়ন শিল্পে তা ব্যবহার করার ফলে আগে যে কাপড় বুনতে দু'জন কারিগরের প্রয়োজন হতো তখন তা একজনেই করতে পারলো। ১৭৮২ সালে জেমস ওয়াটের বাষ্পচালিত ইঞ্জিন এবং ১৭৮৪ সালে কার্টরাইটের বাষ্প-ইঞ্জিন চালিত তাঁত (Power Loom) এর ব্যবহার উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করে। বাষ্প ইঞ্জিনকে টেকসই করতে ভারী এবং শক্ত ধাতু হিসেবে লোহার ব্যবহার করা হয় ফলে লোহার উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ও
লৌহ খনন, নিষ্কাশন, প্রক্রিয়াজাতকরণের উন্নত কৌশল আবিষ্কৃত হয়। উৎপাদনের এই নতুন ধারায় দৈহিক শক্তির স্থান দখল করে যন্ত্রশক্তি। উৎপাদন যন্ত্র ভারী ও ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়াতে তা আর গৃহে স্থাপনের উপোযোগী না থাকায় পুঁজির মালিক উদ্যোক্তারা কাঁচামাল প্রাপ্তির সুবিধাজনক স্থানগুলোতে
কল-কারখানা গড়ে তোলে;এখন যাকে আমরা বলছি শিল্পনগর। কাজের সন্ধানে শ্রমিকেরা গৃহত্যাগ করে এই শিল্প নগরগুলোতে আসতে শুরু করে সেইসাথে আসতে থাকে কাঁচামাল ব্যবসায়ীরা ফলে এই নগরগুলো একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। শিল্পের মালিক অত্যন্ত ক্ষমতাবান এবং আইন শ্রমিকের স্বার্থের বিপক্ষে থাকায় শ্রমিক শোষন অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে। যোগাযোগ ব্যবস্হার উন্নতিতে শিল্পের প্রসার ঘটে এবং কারখানাগুলোতে নারী,পুরুষের পাশাপাশি শিশু শ্রমিকেরাও কাজ করতে শুরু করে। ১৭৬৯ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের রেল আবিষ্কৃত হয় তবে ১৮২৫ সাল থেকে মূলত এটি পুরোদমে চলতে শুরু করে। একইভাবে নৌপথে বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত জাহাজ চলাচল শুরু করার ফলে পন্য পরিবহনে নতুন গতির সঞ্চার হয় এবং উৎপাদন চাহিদাও বৃদ্ধি পায়।

প্রথম শিল্প বিপ্লবের পূর্বে মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন ছিল কৃষিকাজ,জমির মালিকানা ছিল সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রধান উৎস কিন্তু শিল্প বিপ্লব নতুন সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস তৈরী করে।শিল্পের মালিক পুঁজিপতিরা সামন্ত প্রভুর স্থান দখল করে।ঠিক একইভাবে নগর জীবনের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়, গ্রামের গুরুত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে।উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে কাঁঠের পরিবর্তে কয়লা জনপ্রিয়তা লাভ করে।জ্বালানি ও প্রযুক্তির পরিবর্তনে শিল্পে যে নতুন দিগন্তের সূচনা হয় তাতে করে প্রথমবারের মতো প্রাকশিল্প যুগের সময়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল থাকা জনসংখ্যা ও মাথাপিছু আয়ে পরিবর্তন আসে। এই সময়ে জনসংখ্যা ও মাথাপিছু আয় দুটোই বৃদ্ধি পায়।শুরু হয় প্রবৃদ্ধির হিসাব-নিকাশ।

মোটামুটিভাবে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এই সময় পর্যন্ত দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সময়কাল। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সময়কালে শিল্পায়ন হতে থাকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিশেষত গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান কে কেন্দ্র করে শিল্পনির্ভর অর্থনীতি বিশ্বে তার শক্ত অবস্থান তৈরী করে। এই সময়ে তড়িৎ শক্তির আবিষ্কার ও তার ব্যবহার প্রথম শিল্প বিপ্লব থেকে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবকে আলাদা মহিমা দান করে। মানুষ কৃত্রিম আলোয় পৃথিবীকে আলোকিত করতে সমর্থ্য হয়। কারখানা থেকে শুরু করে বসতবাড়ি ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসতে শুরু করে যা কর্মপরিবেশ ও জীবনমানে গুনগত পরিবর্তন নিয়ে আসে।নগরগুলোতে শৌচাগার,বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্হা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্হার ফলে জনস্বাস্হ্যের ব্যাপক উন্নতি ঘটে। সংক্রামক রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব কমতে থাকে, মৃত্যুহার হ্রাস পায়। নগরগুলোর জনসংখ্যা অতিদ্রুত বৃদ্ধি পায়।যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে যা বিশ্বায়নের নতুন ঢেউ তৈরী করে।টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, রেডিওর ব্যবহার এই সময়ের সমাজচিত্রকেই বদলে দেয়।রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যাপক প্রসারলাভ করে।বাণিজ্যিকভাবে রাবার উৎপাদন জনপ্রিয়তা পায়।রাবারের তৈরী টায়ার সড়ক যোগাযোগে নয়া মোড় তৈরী করে।বাইসাইকেল,মোটর সাইকেল,মোটরগাড়ি সড়কগুলোতে জায়গা করে নেয়।সড়কগুলো মোটরযান চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়;শুরু হয় জ্বালানি হিসেবে পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার।বাষ্পচালিত টার্বাইন সস্তা হয়ে যাওয়ায় প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সহজ হয়। টাইটেনিক এর মতো দ্রুতগতির আধুনিক সামুদ্রিক জাহাজ তৈরী হয়।সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে প্রথমবারের মতো স্থাপিত হয় তার যোগাযোগ।আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, বড়সড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ অর্থনীতির সংরক্ষণে শুল্ক আরোপ করতে থাকে। লোহা ও স্টীলের ব্যাপক চাহিদা তৈরী হয় এবং ব্যবহারের দিক থেকে স্টীল লোহাকে পেছনে ফেলে দেয়।উদ্ভিদের জন্য রাসায়নিক সারের ব্যবহার আর চাষাবাদের জন্য ট্রাক্টর এর ব্যবহার শুরু হয় দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবকালেই। প্রচুর পরিমানে উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়নে দ্রুতগতি, কৃষিতে অগ্রগতির কারণে বাজারের প্রায় সকল পণ্যেরই মূল্য হ্রাস পায়। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের ফলে এই যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন সংঘটিত হয় তা থেকে উদ্ভব ঘটে বৃহৎ পেশাজীবী, মধ্যবিত্ত শ্রেণির।শিশুশ্রম হ্রাস পায়, ভোগবাদী ও বস্তুগত সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।যন্ত্র মানুষের স্থান দখল করে অর্থাৎ প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সনাতন ধারার শ্রমিকের চাহিদা হ্রাস পায় এবং একই সঙ্গে পুরোনো ধারার জাহাজ, কারখানা, ব্যবসা ও পুঁজির নিরাপদ বিনিয়োগগুলো অপাংক্তেয় হয়ে পরে। কাঠ থেকে কাগজ উৎপাদন করতে পারায় কাগজের দাম কমে যায়,বাষ্পশক্তি চালিত ঘূর্ণমান মুদ্রনযন্ত্র উদ্ভাবন হয়,প্রচুর পেন্সিল বিক্রি হতে থাকে আর উদ্ভাবন হয় ফাউন্টেনপেনের।এসবের ফলে বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই সহ প্রচুর গল্প, উপন্যাসের বই, সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে যা মানুষের অবস্তুগত সংস্কৃতির বিকাশে অত্যন্ত শক্তিশালী অবদান রাখে।

সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকাল। জার্মানরা গোপন বার্তা প্রেরণকারী যন্ত্র এনিগমা মেশিনে রেডিও সংকেত দিয়ে দূর্বোধ্য কোডে সৈন্যদের কাছে আক্রমণের নির্দেশ পাঠাচ্ছে। কোডগুলো ভাঙার জন্য ব্রিটিশরা ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞ অ্যালান টিউরিংকে ডেকে নিলেন।টিউরিং দেখলেন মানুষের পক্ষে এনিগমার কোড ভাঙা সম্ভব নয় তাই পোলিশদের কাছে থেকে পাওয়া 'বোম্বা' নামক ইলেকট্রো মেকানিক্যাল যন্ত্রের উপর ভিত্তি করে তৈরী করলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি যন্ত্র 'বোম্বে'।অনেকের মতে যন্ত্রটির নাম রাখা হয় 'ক্রিস্টোফার'। ক্রিস্টোফার মরকম ছিলেন সমকামি টিউরিং এর একান্ত বন্ধু এবং প্রথম ভালবাসা। অ্যালান টিউরিংয়ের এই 'ক্রিস্টোফার' যন্ত্রটি ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দৈর্ঘ্যকে দুইবছর কমিয়ে আনে এবং ১৪ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। অ্যালান টিউরিং বিশ্বাস করতেন "যেকোনো গণনাযোগ্য গাণিতিক সমস্যাই সমাধানযোগ্য যদি তা এলগরিদমে দেয়া হয়।" এই ধারণাকে ভিত্তি করেই তিনি তৈরী করেন 'ইউনিভার্সাল টিউরিং মেশিন' নামে হাইপোথেটিক্যাল যন্ত্র। টিউরিংয়ের এই মেশিনটির আধুনিকরূপ হচ্ছে আজকের কম্পিউটার।১৯৪৮ সালের দিকে অ্যালান টিউরিং 'টিউরিং টেস্ট' বা যন্ত্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ শুরু করেন। টিউরিং টেস্টের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো যন্ত্র কি মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। আর এই সকল আবিষ্কারের কারণেই অ্যালান টিউরিং কে বিবেচনা করা হয় তাত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক হিসেবে।অ্যালান টিউরিং এর জীবন নিয়ে নির্মিত 'দ্যা ইমিটেশন গেম' চলচ্চিত্রটি যেন তাঁর এই সকল অবদানের এক অনন্য কীর্তিগাঁথা।তাঁর এই সকল মহান কীর্তির কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গর্ভে জন্ম নেয় তৃতীয় শিল্প বিপ্লব।

তৃতীয় শিল্প বিপ্লব মূলত কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লব।মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয় সর্বত্রই কম্পিউটারের জয় জয়কার।মানুষ চন্দ্র বিজয় করতে যেমন সক্ষম হয়েছে তেমনি তৈরী করেছে কৃত্রিম উপগ্রহ,শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির সুপারসনিক বিমান,দূর্বার গতির রেল, অভাবনীয় কার্যদক্ষতার সব কম্পিউটার।তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে মানুষ গতি দিয়ে সময়কে জয় করেছে,ন্যানো সেকেন্ডের হিসাবও যেখানে গুরুত্বপূর্ণ।তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে 'বিশ্বগ্রাম' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে নয়া পর্যায়ে।একের পর এক গড়ে উঠেছে আধুনিক শিল্প শহর,শিল্প পার্ক।এই সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অতি নির্ভরশীলতা ও তার যথেচ্ছ ব্যবহার পরিবেশ আন্দোলনকে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী করেছে।ইন্টারনেটের ব্যবহার যোগাযোগ ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ধারাকেই আমূল বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে।প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্হা বিশ্ব পরিমন্ডলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরী করেছে।কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগ গোটা বিশ্বকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।যে চিঠি মানুষ হাতে লিখতো তা হয়ে গেলো ইমেইল,ক্ষুদে বার্তা।বই,সংবাদপত্র স্থান করে নিলো ইন্টারনেট জগতে।সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে মহাদেশগুলো নিজেদের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেলো।মানুষ ও পণ্য পরিবহনে আকাশ পথ বহুল ব্যবহৃত হতে লাগলো।রঙিন টেলিভিশন, সিডি প্লেয়ার, ডিভিডি প্লেয়ার,শৌখিন ক্যামেরা পৌঁছে গেলো পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।বাচ্চারা খেলতে শুরু করে দিলো কম্পিউটার গেমস।মহাকাশে স্থাপিত হলো একের পর এক স্যাটেলাইট, তৈরী করা হলো ভয়ংকর সব মারণাস্ত্র।পারমানবিক গবেষনায় দেয়া হলো অধিক গুরুত্ব।মানুষের হাতে এলো মোবাইল ফোন। ইন্টারনেটে তথ্য প্রবাহের কারণে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা,রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার পূর্বতন রক্ষণশীল নীতি ক্ষয় হতে শুরু করলো।কম্পিউটার শিল্প বিশ্ব বাজারে দাপটের সাথে নিজের স্থান করে নিলো।

কম্পিউটার,ইন্টারনেট, মোবাইল,টেলিভিশনের বিস্তৃতি, কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনের মাধ্যমে টেলিভিশনে স্যাটেলাইট সম্প্রচার পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগের যে নাটকীয় দিশা তৈরী করলো বস্তুত সে কারণেই তৃতীয় শিল্প বিপ্লবকে বলা যেতে পারে মানুষকে মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে মিলিয়ে দেয়ার বিপ্লব।তৃতীয় শিল্প বিপ্লব তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের সাথে মানুষের নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধন তৈরী করতে পারলেও মুদ্রার উল্টোপিঠে বিশ্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশী অনিরাপদ হয়েছে। বিশেষত যে পরিবেশগত ঝুঁকি শিল্প বিপ্লবের কালে কালে অপরিণামদর্শী উন্নয়ন মডেলের মধ্যে দিয়ে ক্রমান্বয়ে সংঘটিত হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে তৃতীয় শিল্প বিপ্লব সংকীর্ণ পথেই হেঁটেছে।পাশাপাশি এই সময়ে অর্জিত প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ জন্ম দিয়েছে নতুন নতুন চ্যালেন্জের।তথ্যের নিরাপত্তার প্রশ্ন,প্রযুক্তি আসক্তি,সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, উন্নত বিশ্বের বাণিজ্য নীতি জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নবোধক চিহ্নের আবার জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবেলায় তৃতীয় শিল্প বিপ্লব যেন এক ঠুঁটো জগন্নাথ।

তৃতীয় শিল্প বিপ্লবকালেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে জন্ম নিরোধক এর ব্যবহার জনপ্রিয় করা হয়েছে,মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরে 'তৃতীয় বিশ্ব' তকমা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিল্পে অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো পরিবেশ ও পরিস্থিতির চাপে যে আমদানি নির্ভর অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলে তা শুধু শিল্পোন্নত দেশসমূহকে ধনী থেকে আরো ধনী-ই করেনি আর্থিক ঋন,প্রযুক্তি সহায়তা বা কারিগরি সহায়তার নামে বিশ্বে মোড়লগিরি করার অবাধ স্বাধীনতাও দান করে।পাশাপাশি 'তৃতীয় বিশ্বের' এই দেশগুলো শিল্পে অনভিজ্ঞ ও অনুন্নত হওয়ায় বর্তমান অবস্থার এক দ্রুত সমাধান হিসেবে এবং তাৎক্ষনিক চাহিদার আশু যোগান মেটাতে যে হ য ব র ল প্রক্রিয়ায় শিল্পায়ন করতে থাকে তা শুধু শিল্প দূষণ-ই ঘটায় নি জন্ম দিয়েছে এক সামগ্রিক অব্যবস্হাপনার। তৃতীয় শিল্প বিপ্লবকালে বিশ্বে আয়বৈষম্য প্রকট হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের এই তৃতীয় স্তরেই জন্মলাভ করে বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশসমূহের সংগঠন জি-৭,বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা,বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম। তৃতীয় শিল্প বিপ্লবকালে বিশ্ব অতিক্রম করে বিশ্বায়নের ২.০ ভার্সন।

তৃতীয় শিল্প বিপ্লব নিয়ে এই সকল আলোচনার ডামাডোলের মধ্যেই ক্লাউস শোয়াব চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এর আগমন ধ্বনি শোনালেন। বলা হচ্ছে তৃতীয় থেকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে যাত্রার যে রুপান্তর প্রক্রিয়া তা মোটামুটিভাবে ২০০০ সালের পর থেকেই শুরু হয়ে গেছে।
কি এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব?কি তার বৈশিষ্ট্য?কেমন হতে যাচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পৃথিবী?এমন নানা প্রশ্ন এখন পৃথিবীর দেশে দেশে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে এক কথায় সজ্ঞায়িত করা কঠিন কেননা চতুর্থ শিল্প বিপ্লব একটি বহুমাত্রিক বিষয়।আবার চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে কেউ কেউ দেখেন তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের বর্ধিতরুপ হিসেবে কেননা যে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের আধুনিক প্রযুক্তি তৃতীয় শিল্প বিপ্লব প্রসব করেছে তার উপরে ভিত্তি করেই তো চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। কিন্তু আমরা আর একে তৃতীয় শিল্প বিপ্লব না বলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলছি কারণ এর গতি,পরিধি ও আকৃতি একটি ভিন্ন আর্থ-সামাজিক চিত্র তৈরী করতে যাচ্ছে যা পৃথিবী পূর্বে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। প্রথম শিল্প বিপ্লবে যেখানে বাষ্পীয় ইঞ্জিন, পানি, কয়লা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মূখ্য ভূমিকা রেখেছে সেখানে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব ব্যববহার করেছে তড়িৎ শক্তি, খনিজ তেল আর তৃতীয় শিল্প বিপ্লব নির্ভরতা দেখিয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস, পারমাণবিক শক্তি, জীবাশ্ম জ্বালানির উপর এবং এই সকল ভিন্ন ভিন্ন উৎপাদন শক্তির উপর ভিত্তি করেই একেকটি শিল্প বিপ্লব একেক ধরনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরী করেছে।প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় শিল্প বিপ্লবকালে প্রযুক্তির সক্ষমতা বেড়েছে গাণিতিক হারে কিন্তু এখন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।কম্পিউটারের মাইক্রো-প্রসেসরের ক্ষমতা এখন জ্যামিতিক হারেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।এই গতির কারণেই আগামী ১০ বছরে আমরা এমন এক ডিজিটাল বিশ্ব পেতে যাচ্ছি যা বিগত ৫০ বছরেও সম্ভব হয়নি।বিগত শিল্প বিপ্লবগুলোতে যেখানে মানুষ নিজে যন্ত্রকে ব্যবহার বা পরিচালিত করেছে সেখানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে মানুষ যন্ত্রকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্বৃদ্ধ করছে যাতে করে যন্ত্র নিজেই নিজেকে পরিচালিত করতে পারে।

ইন্টারনেট অব থিংস(আইওটি) মানুষ এর দৈনন্দিন জীবনকেই বদলে দেবে। এর মাধ্যমে গৃহের নিত্য ব্যবহার্য ফ্রিজ, টিভি এসি, ওয়াশিং মেশিনের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলো কম্পিউটারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং যন্ত্রগুলো পরষ্পর ইন্টারনেট এর মাধ্যমে সংযোগ রক্ষা করবে। আপনার রসুইঘরে যে রোবটটি কাজ করবে তাকে ফ্রিজ খুলে দেখতে হবে না কি কি বাজার রয়েছে, কি কি কিনতে হবে বরং ফ্রিজ নিজে থেকেই রোবটকে জানাবে এবং ই-কমার্সেই প্রয়োজনীয় বাজারকাজ সেরে নেবে,আপনার মস্তিষ্ক ও শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত খাদ্য তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে আপনার জন্য প্রস্তুত রাখবে, আপনার গাড়ি আপনার গৃহের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র কে তথ্য পাঠিয়ে জানিয়ে দেবে আপনি কোথায় আছেন। গৃহে পৌঁছেই আপনি পাবেন শীতল কক্ষ, আপনার শরীরের তাপমাত্রা বুঝে নিয়ে এসি নিজে থেকেই তাপ নিয়ন্ত্রণ করবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে এভাবে প্রতিটি যন্ত্রই ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে পরষ্পরের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করবে। আইওটি শুধু গৃহ ব্যবস্হাপনার জন্যই নয় আইওটির মূল লক্ষ্য কিন্তু 'স্মার্ট সিটি' তৈরী করা। যেখানে সিটির ট্রফিক ব্যবস্হাপনা থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্হাপনা পর্যন্ত আইওটির মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।গুগল হোম, এ্যামাজনের আলেক্সারের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই আইওটির ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে প্রায় ২০০ বিলিয়ন যন্ত্র আইওটির মাধ্যমে যুক্ত হবে এবং বাজার দখল করে নেবে।

ক্লাউড কম্পিউটিং পূর্বে ডেটা সংরক্ষণ, ডেটা প্রক্রিয়াকরণে কম্পিউটার হার্ডডিস্কের যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা দূর করেছে।বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাউড সার্ভারে যুক্ত হয়ে ডেটা সংরক্ষণ,ডেটা প্রসেসিং এর কাজ করা যাচ্ছে। কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক নষ্ট হয়ে ডেটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিন্তু ক্লাউড সার্ভারে ডেটা থাকে নিরাপদ। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের কাজগুলো খুব সহজে যেকোনো স্থানে বসে মোবাইলেই করা যায় এবং এর সফটওয়্যারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আপডেট হয়ে যায়। ক্রমাগত ডিজিটালাইজেশনের কারণে প্রচুর ডেটা উৎপন্ন হচ্ছে।ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হয়ে স্মার্ট যন্ত্রগুলোতে আমরা যেভাবে সময় ব্যয় করছি তার সবকিছুই 'বিগ ডেটা' উৎপন্ন করছে ও সংরক্ষিত থাকছে।এসব বিগ ডেটা পূর্বে হার্ডডিস্কের মেমোরির সীমাবদ্ধতার কারণে সংরক্ষণ করা না গেলেও এখন ক্লাউডে স্বল্পব্যয়ে সহজেই সংরক্ষণ করা যায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(এআই) রোবট থেকে শুরু করে আপনার গৃহের প্রবেশদ্বারকেও স্বনিয়ন্ত্রিত করবে। আপনার বাড়ির দরজা আপনাকে দেখেই চিনতে পারবে, বন্ধ দরজা খুলে যাবে আপনার উপস্থিতিতে, কৃত্রিম কন্ঠে আপনাকে জানাবে স্বাগতম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষরুপী রোবট আপনার বাচ্চাকে গনিত শেখাবে, আপনার বাচ্চার খেলার সাথী হবে, আপনার বাচ্চাকে স্কুলেও নিয়ে যাবে, দেবে আপনার ও আপনার বাড়ির নিরাপত্তা।এরকম অসংখ্য কাজ এআই সম্পন্ন মেশিন দ্বারাই সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই এআই এর সুবিধা আমরা ভোগ করছি। গুগলসার্চে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।কম্পিউটারের সঙ্গে আপনি যে দাবা খেলছেন সেখানেও রয়েছে এআই।আমাজন কোম্পানি চীনে তাদের গুদামে শেলফ থেকে মালামাল নামাতে ব্যবহার করছে রোবট।বর্তমানে এরকম প্রায় আড়াই মিলিয়ন রোবট কাজ করছে।দিন যত যাবে এসব উদাহরণের পাল্লা তত ভারী হতে থাকবে।আমাদের ভৌত জগৎ,ডিজিটাল জগৎ আর জীবজগতের বৃহৎ অংশজুড়ে থাকবে এআই,রোবটিক্স এর বিস্তৃতি।

অটোমেশন পদ্ধতিতে অটোমেশন কারখানার সব মেশিন এমন এক সিস্টেমের সাথে যুক্ত থাকবে যার মাধ্যমে মেশিনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত হবে ও উৎপাদন করবে,যন্ত্র চালনায় শ্রমিকের প্রয়োজন হবে না ফলে উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে।

ডিজিটাল মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনকে নিরাপদ ও আস্থাশীল করতে সবার দৃষ্টি এখন ব্লক চেইন প্রযুক্তির দিকে।বিশেষত বিটকয়েন নিয়ে মানুষের আগ্রহ ও ক্রিপ্টোকারেন্সির জনপ্রিয়তা ব্লক চেইন প্রযুক্তিকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে।এই প্রক্রিয়ায় লেনদেনের তথ্য লেজারে লিপিবদ্ধ করা হয়।একেকটা লেনদেন একেক ব্লক তৈরী করে।

ব্লক চেইনে লেজারটি ছড়িয়ে দেয়া হয় সব অংশগ্রহণকারীর মধ্যে যার ফলে কেউ জালিয়াতি করতে পারে না।ব্লক চেইন যেমন আর্থিক লেনদেন এর জন্য নিরাপদ তেমনি ডিজিটাল চুক্তি,ডিজিটাল দলিল বিনিময়ের জন্যও অধিক উপযোগী।ব্লক চেইনে লেনদেন যেমন মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের কাজ কমিয়ে দেবে তেমনি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও বৃদ্ধি করবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আরেক প্রাণ থ্রিডি প্রিন্টার।চার্লস ডব্লিউ. হাল আধুনিক থ্রিডি প্রিন্টারের আবিষ্কারক।এই প্রিন্টার ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক মুদ্রণের কাজ করে।গয়না প্রস্তুত,পাদুকা শিল্প,ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন,স্থাপত্য,প্রকৌশল ও নির্মাণ, মহাকাশ,দন্ত,চিকিৎসা শিল্প,পুরকৌশল এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।১৯৯৯ সালে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে কৃত্রিম মুত্রথলি তৈরী করা হয়,২০০৪ সালে থ্রিডি প্রিন্টার দিয়েই থ্রিডি প্রিন্টার তৈরী করা হয়,২০০৮ সালে মানুষের জন্য তৈরী করা হয় থ্রিডি প্রিন্টেড পা,২০১১ সালে তৈরী করা হয়েছে থ্রিডি প্রিন্টারের এয়ারক্রাফট,সম্প্রতি এই থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেই তৈরী করা হয়েছে বাড়ি।দিন যত যাবে মানুষের এর উপর নির্ভরতা যেমন বাড়বে তেমনি থ্রিডি প্রিন্টার নিকট ভবিষ্যতেই অবিশ্বাস্য সবকিছুর প্রিন্ট নিয়ে হাজির হবে আমাদের সামনে যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে ভিন্নমাত্রা এনে দেবে।ত্রিমাত্রিক মুদ্রণের এই প্রযুক্তিতেই যেমন তৈরী হবে মানব দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ তেমনি তৈরী হবে ঔষধ থেকে শুরু করে ভৌত অবকাঠামো।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞান, ইলেক্ট্রনিক্স, শক্তি উৎপাদন সহ নানা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।রিচার্ড ফাইনম্যানকে বলা হয় ন্যানো প্রযুক্তির জনক।এক মিটার এর একশ কোটি ভাগের এক ভাগকে বলা হয় ন্যানো মিটার।যে সমস্ত প্রযুক্তি ন্যানোমিটার স্কেলের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেগুলোকে বলা হচ্ছে ন্যানো প্রযুক্তি।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আমরা যন্ত্রপাতির সুক্ষতা পরিমাপ করেছি মিলিমিটার স্কেলে।এর পর ট্রানজিস্টর এর আবিষ্কার হয় এবং মাইক্রোমিটারের হিসাব নিয়ে আসে মাইক্রো টেকনোলজি।১৯৮০ সালে এসটিএম যন্ত্র দিয়ে অনুর গঠন পর্যন্ত দেখা সম্ভব হয় যা ন্যানো প্রযুক্তিকে সম্ভব করে তোলে।ন্যানোটেকনোলজির ক্ষেত্রে টপ টু ডাউন পদ্ধতি হলো কোন জিনিসকে কেটে ছোট করে নির্দিষ্ট আকার দেয়া আর ডাউন টু টপ হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারের ছোট জিনিস দিয়ে বড় জিনিস তৈরী করা।যত বেশী ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার হবে তত বেশী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বা হালকা-পাতলা ইলেক্ট্রনিক্স তৈরী হবে।একসময় কম্পিউটার কি বিশাল আকৃতির ছিলো অথচ আজকে আপনার মুঠোফোনটিই যেন একটি কম্পিউটার আর এগুলোকে সম্ভব করছে ন্যানোপ্রযুক্তি।অদূর ভবিষ্যতে আপনার ছোট্ট হাতঘড়িটি হয়তো হয়ে যাবে একটি সুপার কম্পিউটার এই ন্যানো প্রযুক্তির কল্যাণে।ন্যানোটেকনোলজি পদার্থবিজ্ঞান থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞান সবধরনের গবেষনাতেই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।বাংলাদেশ পাটের জিন রহস্য উন্মোচন করেছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ন্যানোটেকনোলজি বর্তমানে ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। সামনের দিনগুলোতে এই প্রযুক্তি যে আমাদেরকে আরও বিস্ময় উপহার দেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় মাউন্টেন ভিউয়ে কড়া নিরাপত্তা ও কঠিন গোপনীয়তায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে গবেষনা চালাচ্ছে গুগল,চেষ্টায় রয়েছে আইবিএম,মাইক্রোসফট।এই প্রতিযোগিতায় সামিল হয়েছে চীনা আলীবাবা এবং হুয়াওয়ে।টেলিগ্রাফের দাবী অনুযায়ী কোয়ান্টাম গবেষনায় যুক্তরাজ্যই সবচেয়ে বেশী অর্থ বিনিয়োগ করছে।ইতোমধ্যেই জাতীয় পর্য়ায়ে কোয়ান্টাম ইনফরমেশন সাইন্সভিত্তিক পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করতে ১০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে চীন।আগামী পনের থেকে বিশ বছরের মধ্যেই আমরা পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার পেয়ে যেতে পারি।আর তা যদি হয় কোয়ান্টাম কম্পিউটার বদলে দেবে পুরো প্রযুক্তিবিশ্ব।সাধারণ কম্পিউটার যেখানে শুধুমাত্র দুটি বাইনারি সংখ্যা ০ ও ১ নিয়ে কাজ করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সময়ে একই সঙ্গে ০ ও ১ এর প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে আর এই অনবদ্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার জটিল গাণিতিক সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারবে।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে,দুরারোগ্য ব্যাধির ঔষধ তৈরীতে,দ্রুতগামী উড়োজাহাজ তৈরীতে,নতুন টেকসই নির্মান সামগ্রী তৈরীতে আর সব অকল্পনীয় অর্জনের সহায় হবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার।

প্রাণ রসায়নের সবচেয়ে আধুনিক শাখা জিন প্রকৌশল।বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে একটি কোষ থেকে সুনির্দিষ্ট জিন নিয়ে অন্য কোষে স্থাপন ও কার্যকর করার ক্ষমতাকে জিন প্রকৌশল বলে।এটি মূলত উন্নত বৈশিষ্ট্যধারী উদ্ভিদ ও প্রাণি সৃষ্টিতে কাজ করে।ইনসুলিন তৈরী,উন্নতমানের ফসল উৎপাদন,রোগের চিকিৎসা,হরমোন তৈরী,ভাইরাসনাশক,মৎস্য উন্নয়ন,জেনেটিক ত্রুটিসমূহ নির্ণয় প্রভৃতি ক্ষেত্রেই এর জ্ঞান ব্যবহার করা হচ্ছে।জিন প্রকৌশল এর উত্তরোত্তর অগ্রগতি মানুষের বংশগত রোগ নির্মুলে যেমন ভূমিকা রাখবে তেমনি মানব দেহের জন্মগত ত্রুটিকেও বিদায় জানাবে পাশাপাশি মানুষ এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দৈহিক দিকও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।সমাজ ও সভ্যতার প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত উপায়ে একেক ধরনের জিনগত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষের জন্ম হবে;যা হবে এক চূড়ান্ত বিস্ময়।

পরিবেশ দূষন,জীবাশ্ম জ্বালানির অপ্রতুলতা মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে সবুজ শক্তির দিকে যা একই সাথে পরিবেশবান্ধব এবং নবায়নযোগ্য।সৌর শক্তি,বায়ু শক্তি,জৈব শক্তি,সমুদ্র তরঙ্গ শক্তি,সমুদ্র তাপ শক্তি,জোয়ার ভাটা শক্তি,ভূ-তাপ শক্তি, জলবিদ্যুৎ, শহুরে আবর্জনা, হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল, হাইড্রোজেন ফিউশন নিউক্লিয়ার পাওয়ার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস।চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে গড়ে তুলবে 'স্মার্ট সিটি'।স্মার্ট সিটির প্রতিটি ভবন নিজস্ব ব্যবস্হাপনায় উৎপাদিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করবে।

খ্যাতনামা তাত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং বিরল মোটর নিউরন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে পুরোপুরি অসমর্থ্য হয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি পুরো পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের কাজটি সারতেন হুইল চেয়ারের সাথে সংযুক্ত কম্পিউটারের মাধ্যমে।আর এজন্য তাকে ন্যূনতম হলেও পেশীর ব্যবহার করতে হতো।এখন পর্যন্ত কম্পিউটারে ইনপুট দেয়ার জন্য মানুষকে কোন না কোন অঙ্গ-প্রতঙ্গের বা পেশী শক্তির ব্যবহার করতে হয়।কিন্তু কেমন হবে যদি কম্পিউটার থেকে আউটপুট পাওয়ার জন্য ইনপুট হিসেবে আপনার মস্তিষ্কের চিন্তাই যথেষ্ট হয়ে যায়!হ্যাঁ,এখন বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন এই ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস(বিসিআই) তৈরীর জন্য।

কম্পিউটার এবং মানব মস্তিষ্ক আলাদা গঠনের হলেও আমাদের মস্তিষ্কের নিউরন কাজ করার সময় ইলেকট্রিক সিগন্যাল তৈরী করে আবার ইলেকট্রোনিক্সও ইলেকট্রিক সিগন্যালের উপর কাজ করে।এই ইলেকট্রিক সিগন্যালের উপর ভিত্তি করেই মানব মস্তিষ্ক কে কম্পিউটারের সাথে বা কম্পিউটার কে মানব মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।ইতোমধ্যেই গুগল গ্লাসে ব্যববহৃত মাইন্ডআরডিআর অ্যাপ্লিকেশনটি সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনার উপর ভিত্তি করে গুগল গ্লাসের ক্যামেরার সাহায্যে ছবি তুলে ফেসবুক ও টুইটারে শেয়ার করতে সক্ষম।মাইন্ডফ্লেক্স ও মাইন্ডআরডিআর এই দুটি অ্যাপ্লিকেশনই ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেসের(বিসিআই) উপর ভিত্তি করে তৈরী।বিসিআই প্রযুক্তি শুধু স্টিফেন হকিং এর মতো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন মানুষদের জন্যই নয়া ভোর হবে না একই সাথে গোটা মানব সভ্যতার জন্যই হবে এক দূর্দান্ত সূচনা।এর মাধ্যমে একদিকে যেমন অ্যালঝেইমার, ডিমেনশিয়া,পারকিন্সন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্মৃতি কম্পিউটার মেমোরিতে জমা রেখে দেয়া যাবে আবার একইভাবে হারানো স্মৃতিগুলোকে কম্পিউটারের সাহায্যে মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়ে ব্যক্তিকে সাধারণ জীবনযাপন করানো সম্ভব হবে।বিসিআই প্রযুক্তি মানুষের জন্য নিয়ে আসতে পারে টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা।মানুষের সাথে মানুষের যে যোগাযোগ এখন গ্যাজেটের মাধ্যমে হচ্ছে বিসিআই প্রযুক্তিতে তা হতে পারবে চিন্তার মাধ্যমে।মানব মস্তিষ্কেই তৈরী হবে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি।মানবদেহে স্থাপিত কৃত্রিম অঙ্গ-প্রতঙ্গের সাথে সরাসরি মস্তিষ্কের যোগাযোগ স্থাপন করবে এই বিসিআই প্রযুক্তি।মানব মস্তিষ্কে কম্পিউটার প্রযুক্তির এই অন্তর্ভুক্তিকরণ যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্যলাভ করতে পারে তাহলে একসময় হয়তো একেকটি মানুষ হবে একেকটি কম্পিউটার,'মানুষ মাত্রই ভুল করে' এই বাক্যটিকে হয়তো আর বাস্তবে পাওয়া যাবে না!

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে এই ধরণের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে এবং অসম্ভব কে সম্ভব করার হাতছানিতে যেমন উৎপাদন যন্ত্র, উৎপাদন প্রক্রিয়া, উৎপাদন ব্যবস্হাপনা ও পরিচালনা নতুন অবয়ব পেয়েছে ঠিক তেমনি আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি এবং জীবন দর্শনের যে নৌকা এতকাল বয়ে চলেছে গাণিতিক গতিতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সেই নৌকার পালে ঝড়ো হাওয়া দিয়ে বয়ে নিয়ে চলছে জ্যামিতিক গতিতে।

ভি আই লেলিনকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল বিপ্লব কি? তিনি উত্তরে বলেছিলেন বিপ্লব হলো দ্রুত বিদ্যুতায়ন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হলো ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার মতোই বাড়িতে বাড়িতে ইন্টারনেট সেবা, মানুষের হাতে হাতে স্মার্ট ফোন নামক মিনি কম্পিউটার পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে ডিজিটাল বিশ্ব গড়ে তোলার বিপ্লব।

প্রথম শিল্প বিপ্লবের নির্দেশক যন্ত্র স্পিন্ডেল ইউরোপের বাইরে বিস্তৃত হতে সময় লেগেছে যেখানে ১২০ বছর সেখানে ইন্টারনেট পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরতে সময় লেগেছে ১০ বছরেরও কম।

২০১৫ সালে মিডিয়া স্ট্রাটেজিস্ট টম গুডউইন টেকক্রাঞ্চে লিখেছেন," বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাক্সি কোম্পানি উবারের নিজস্ব কোন ট্যাক্সি নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিডিয়া ফেসবুক নিজে কোন কনটেন্ট তৈরী করে না। পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাইকার আলিবাবার কোন গুদাম নেই এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসন সরবরাহকারী এয়ারবিএনবির নিজেদের কোন রিয়েল এস্টেট নেই।" এই রকম অসম্ভবও সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল শিল্প বিপ্লবের কারণেই।

২০০৪ সালে জন্ম নেয়া ফেসবুক বছরপ্রতি এক বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আদায় করতে সময় নিয়েছে মাত্র ছয় বছর আর গুগল নিয়েছে মাত্র পাঁচ বছর।১৯৯০ সালে যখন সিলিকন ভ্যালির উত্থান হয়নি আমেরিকার ভারিশিল্পের কেন্দ্র ডেট্রয়েট নগরীর শীর্ষ তিন কোম্পানির বাজার মূলধন ছিল তিন হাজার ছয়শ কোটি ডলার, রাজস্ব ছিল পঁচিশ হাজার কোটি ডলার এবং কর্মী ছিল মাত্র বারো লক্ষ। আর ২০১৪ সালে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ তিন কোম্পানির বাজার মূলধন এক লক্ষ নয় হাজার কোটি ডলার। রাজস্ব প্রায় চব্বিশ হাজার সাতশো কোটি ডলারের কাছাকাছি কিন্তু কর্মীর সংখ্যা দশ ভাগের নয় ভাগ কমে মাত্র এক লক্ষ সাঁইত্রিশ হাজার জন।

অ্যাপ নির্মাণ অর্থনীতির শুরুটা করেছিলেন স্টিভ জবস ২০০৮ সালে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই এটি এখন একশ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য যা শতাব্দী প্রাচীন চলচ্চিত্র শিল্পকেও পেছন ফেলে দিচ্ছে।আমরা এখন এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেই দৈনিক ত্রিশ বিলিয়ন বার্তা আদান-প্রদান হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাতাশি শতাংশ তরুণ সার্বক্ষনিক স্মার্টফোন সঙ্গে রাখে এবং তাদের চুয়াল্লিশ শতাংশই প্রতিদিন মোবাইল ক্যামেরা ব্যাবহার করে।এখনকার একটি সাধারণ ট্যাবলেট কম্পিউটার কার্যদক্ষতায় আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বের পাঁচ হাজার ডেস্কটপ কম্পিউটারের সমান।

মানব জিন সিকোয়েন্স প্রকল্পে যেখানে ১০ বছরেরও বেশী সময় ধরে দুই দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে সেখানে এখন আপনি এটি পেতে পারেন কয়েক ঘন্টা সময়ের মধ্যেই তাও আবার মাত্র এক হাজার ডলারের চেয়েও কম খরচে।

পৃথিবীর ত্রিশ শতাংশের বেশী মানুষ তথ্য আদান-প্রদান, পরষ্পরের সাথে যুক্ত হওয়া এবং শেখার প্লাটফর্ম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে। একশো মিলিয়ন টেলিফোন ব্যবহারকারী পেতে যেখানে আমাদের সময় লেগেছিল পঁচাত্তর বছর সেখানে ইনস্ট্রাগ্রামের লেগেছে মাত্র দুই বছর আর পোকেমনের লেগেছে মাত্র এক মাস।

বিশাল প্রতিষ্ঠান মানেই এখন আর বিশাল অফিস নয়।যেমন দেখুন ব্রিটেন-ভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি অটোম্যাটিকের কর্মী সংখ্যা ৯৩০ অথচ এত বড় প্রতিষ্ঠানের কোন অফিস নেই।প্রতিটি কর্মী তাদের নিজ বাড়িতে বা অন্যত্র বসে কাজ করছে।

অটোম্যাটিক পৃথিবীর ৭০ টি দেশে কাজ করে।দ্রুতগতির ইন্টারনেট, মেসেজিং,ভিডিও অ্যাপ এবং তদারকি ও নজরদারি করার বিভিন্ন সফটওয়্যারের বদৌলতে গতানুগতিক অফিস করার আর প্রয়োজন হচ্ছে না।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক প্রতিষ্ঠানেরই এখন কেন্দ্রীয় কোন অফিস নেই।এতে করে কর্মীদের যেমন অফিস যাওয়ার চাপ নেই তেমনি একজন উদ্যোক্তার জন্য নিউইয়র্ক,লন্ডন,টোকিও বা ঢাকার মতো বড় বড় শহরগুলোতে অফিস নেয়ার যে খরচ তা সাশ্রয় হচ্ছে।

ভার্চুয়াল মুদ্রা 'লিব্রা' নিয়ে হাজির হতে যাচ্ছে ফেসবুক। এই মুদ্রার মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন দেশে লেনদেন ও অনলাইনে কেনাকাটা করতে পারবেন।ফেসবুক এই লেনদেনকে নিরাপদ করতে ব্লক চেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।২০২০ সালের প্রথমার্ধেই 'লিব্রা' বাজারে আসবে বলে জানিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব একই সঙ্গে একটি বাস্তবতা ও একটি সম্ভাবনার নাম।চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনার ফিরিস্তি বলে বা লিখে শেষ করার মতো নয়।ডিজিটাল ওয়ালেট হয়তো কাগুজে নোটকে জাদুঘরে পাঠাবে,নিজস্ব গ্যাজেট থেকে ডিজিটাল উপায়ে ভোটদান নিশ্চিত করতে পারলে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য প্রাচীন গ্রীসের দিকে তাকাতে হবে না,চতুর্থ শিল্প বিপ্লবেই সেটি খুব সম্ভব হবে।আইন সভার যেকোন আইন পাশ করতে নাগরিকেরাই সরাসরি ভোট দিতে পারবেন।এর ফলে একটি বড় অসুবিধা দূর হবে;কারন আপনি যাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন তিনি নির্বাচিত হয়ে আইন সভায় আপনার পছন্দ অনুযায়ী ভোট নাও দিতে পারেন তার চেয়ে আইনসভার ভোটাভুটিতে স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেই নিজের ভোটটি দেবেন।অনলাইনে নিরাপদে আর্থিক লেনদেন করা সম্ভবপর হলে ভোটদানও খুব সম্ভব।আর্থিক লেনদেন অবশ্যই গোপনীয় বিষয়,নিশ্চয় ভোটদান ও গোপনীয় বিষয়।ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি,গোষ্ঠী, নাগরিক অধিকার কর্মী, মানবাধিকার কর্মী থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি সচেতন মানুষ সারা বিশ্বেই ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে নিজ নিজ মতামত প্রতিষ্ঠার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।জন্ম হয়েছে 'সিটিজেন জার্নালিজম' এর।আরব বসন্ত সম্ভব করেছে এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব।স্বয়ংক্রিয় গাড়ি তৈরী করেছে গুগল এখন যদি প্লেন/হেলিকপ্টার থেকে শুরু করে মোটর গাড়ি,ট্রেন,বাস এগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হয় তাহলে চালকের প্রয়োজন থাকছে না। যুদ্ধক্ষেত্রে বীর সেনানীর মতো যুদ্ধ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট।পাঠকের হয়তো স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রের কথা মনে পড়ে গেলো।মানব শিশু জন্ম নেবে ল্যাবরেটরিতে।চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের উন্নতিতে হয়তো সমাজ বা রাষ্ট্র তার প্রয়োজন অনুযায়ী মেধা,গুন ও বুদ্ধিমত্তার মানব শিশু জন্ম দেবে।খুব শীঘ্রই হয়তো উকিল, ডাক্তার, হিসাবরক্ষক, গ্রন্থাগারিকের মতো পেশাগুলো আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে যাবে।একইভাবে, সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে আজকে যে শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে তাদের ৬৫ শতাংশই এমন পেশায় নিযুক্ত হবে বর্তমানে যার কোন অস্তিত্ব নেই।আবার বর্তমানে চাহিদার তু্ঙ্গে রয়েছে এমন অনেক পেশা বা শিল্পেরই আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে কোন অস্তিত্ব ছিল না।আগামী ২০৫০ সালের মধ্যেই বিশ্ব জনসংখ্যা বর্তমানের ৭.২ বিলিয়ন থেকে ০৯ বিলিয়ন হবে।বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ইতোমধ্যেই ৭২ বছর স্পর্শ করেছে।পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু ১০০ বছর এখন আর খুব দূরে নয় ফলে ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে আলোচনা আরো জোরদার যেমন হবে পাশাপাশি বয়স্ক ব্যক্তিদের কেন্দ্র করে প্রযুক্তি বাজারও গড়ে উঠবে।একই সঙ্গে কায়িক শ্রমের প্রয়োজন পরে না এমন প্রযুক্তিগত কাজে তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ ও সৃষ্টি হবে। উৎপাদন ব্যবস্হা পরিবর্তনের ধাপে ধাপে অবাধ যৌনাচার থেকে মানুষ পরিবার গঠন করেছে,বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে।আবার সেই পরিবর্তনেই 'লিভ টুগেদার' করছে,বিয়ে ছাড়াই সন্তান জন্মদান করছে।চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে আরো পরিবর্তন হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।ইতালির টুরিন শহরে খোলা হয়েছে এমন এক যৌনপল্লী যেখানে নারী যৌনকর্মীর পরিবর্তে রয়েছে 'সেক্স ডল'।এই যৌন পুতুলগুলো সিলকন দিয়ে তৈরী যা দেখতে একেবারে জীবন্ত।শুধু ইটালি নয় সেক্স ডলের ব্যাবসা এখন জমজমাট স্পেন,রাশিয়া,জার্মানিসহ অনেক দেশে।এই পুতুলগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে কারণ এগুলো ব্যক্তিত্বের কোন সংঘাত তৈরী করে না,নিঃসঙ্গের সঙ্গী হয়ে থাকে আর তাদের দিক থেকে কোন চাওয়া-পাওয়া তো নেই-ই। একইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৪ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ বাঁচানো যে অ্যালান টিউরিং কে সমকামিতার জন্য তৃতীয় শিল্প বিপ্লবকালীন সমাজ অপরাধী সাব্যস্ত করেছিল ২০১৪ সালে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উন্মেষকালে ব্রিটিশ সরকার তার জন্য অফিসিয়ালি ভুল স্বীকার ও ক্ষমা ঘোষনা করে। এই সকল প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা বিবেচনায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যতটা প্রযুক্তিগত বিষয় ঠিক ততটাই অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও দর্শনগত বিষয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে বরাবর-ই সংকট এবং সম্ভাবনা পাশাপাশি হাত ধরে চলেছে।পৃথিবী যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে বরণ করছে ঠিক তখনও পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশসমূহের সংগঠন জি-৭ এর সদস্য সংখ্যা মাত্র সাত।মাত্র পাঁচজন বিলিয়নিয়ারের কাছে পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ রয়েছে যখন পৃথিবীর তিন বিলিয়ন মানুষ দারিদ্রসীমার ভেতরে বসবাস করে,প্রায় সাড়ে সাতশো মিলিয়ন মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে অথচ ২০১৭ সালে বিলিয়নিয়ারদের অর্জিত মোট পাঁচশো বিলিয়ন ডলার এখন-ই দারিদ্র শেষ করে দিতে পারে।পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রায় পঁয়ষট্টি মিলিয়ন শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে।এখনো পৃথিবীর ১.৩ বিলিয়ন মানুষের কাছে পৌছায়নি বিদ্যুৎ,বিশ্বের ৪ বিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছায়নি ইন্টারনেট।বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদনেই বলা হচ্ছে নারী এবং পুরুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সমতা অর্জিত হতে সময় লেগে যাবে আরো ১১৮ বছর।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কাছে প্রত্যাশা অনেক।চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে উৎপাদন বিস্ফোরণ ঘটাবে,বিশ্ব অর্থনীতি
ফুলে-ফেঁপে উঠবে,জিডিপি বৃদ্ধি পাবে কিন্তু সেই অর্থনীতি কতটুকু অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি হবে?চুইয়ে পড়া তত্ত্ব আর চুইয়ে পড়া উন্নয়ন নিয়েই কি পৃথিবীর নিরানব্বই ভাগ মানুষকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে?

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের গবেষণা বলছে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে মানুষের দুই কোটি চাকরি রোবটের দখলে চলে যাবে।রোবটের কারণে অনেকের স্বল্প দক্ষতার চাহিদাসম্পন্ন চাকরি চলে গেলেও যাঁরা উচ্চ দক্ষতার চাহিদা সম্পন্ন চাকরি করেন, তাঁদের বেশির ভাগই স্বপদে বহাল থাকবেন।তাঁদের চাকরি হারানোর হার হবে স্বল্প দক্ষতার চাহিদা সম্পন্ন চাকরিতে নিয়োজিতদের তুলনায় অর্ধেক।প্রতিটি শিল্প বিপ্লবেই পুরাতন কিছু পেশা বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা অজনপ্রিয় হয়ে গেছে কিন্তু তা সত্বেও নতুন শিল্প বিপ্লব নতুন নতুন পেশা,নতুন নতুন কর্মসংস্হান সৃষ্টি করেছে।তাই নতুন ধরনের পেশা/কর্মসংস্হান সৃষ্টির এই চ্যালেন্জটিও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে নিতে হবে।আর তা না হলে পৃথিবী এক ভয়াবহ আর্থ-সামাজিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সামনে আরও একটি বড় চ্যালেন্জ ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা।স্পাইওয়্যার প্রযুক্তি ফোনের জিপিএসের মাধ্যমে ব্যক্তিকে সব জায়গায় অনুসরণ করতে পারে,ফোনের মাইক্রোফোন বা ক্যামেরা অন করতে পারে এবং চারপাশে যা ঘটছে তার সব কিছু রেকর্ডও করতে পারে। ফোনে যত রকমের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ আছে তার সবগুলোতেই তারা ঢুকে পড়তে পারে।ছবি,কনট্যাক্ট,ক্যালেন্ডারের তথ্য,ডকুমেন্ট সবকিছুই চুরি করতে পারে।এটি কার্যত ব্যক্তির ফোনকে একটি আড়িপাতা যন্ত্রে পরিনত করে।নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অপরাধী ধরতে যেমন অত্যাধুনিক স্পাইওয়্যার ব্যবহার করছে আবার সাংবাদিক,সরকার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, আইনজীবী, নাগরিক অধিকার কর্মী, মানবাধিকার কর্মীরাও এর টার্গেট হচ্ছে।স্পাইওয়্যার প্রযুক্তি এতোটাই শক্তিসশালী হয়েছে যে এটিকে 'অস্ত্র'' হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মানুষের ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের নিরাপত্তা এখন সরাসরি সাইবার ওয়ার্ল্ডের সাথে সম্পর্কযুক্ত।চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে এই নিরাপত্তা দেয়ার চ্যালেন্জটি নিতে হবে কারণ মানুষ বরাবর-ই সেবার চেয়ে নিরাপদ সেবাকেই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।অনিরাপদ সাইবার ওয়ার্ল্ড আমাদের কারো জন্যই শুভফল বয়ে আনবে না।

যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ঘিরে এতো আকাঙ্ক্ষা সেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমাজ কি পারবে সমান সুযোগের, সমান অধিকারের, সম-মর্যাদার এক পৃথিবী নিশ্চিত করতে।যে সমাজ ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ পরিচয়, যৌন পরিচয়,ভৌগলিক পরিচয় নির্বিশেষে মানুষকে শুধুমাত্র মানুষ পরিচয়েই সুরক্ষা দেবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সামনে চ্যালেন্জ অনেক।এই চ্যালেন্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিশ্ব।দিন বদলের স্বপ্ন নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আমরাও ছুটছি কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে।চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যেন এক যাদু।যে যাদুতে সম্মোহিত হয়ে উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের সবাই ছুটে চলছে কল্পনার জগত কে বাস্তবে রুপ দিতে। যে যাদুর এতো সম্মোহনী শক্তি সেই যাদুর কাঠিটি কার কাছে কিভাবে থাকছে তার উপরেই নির্ভর করছে বাদবাকি হিসাব-নিকাশ।

মো. আরাফাত আজাদ , প্রভাষক(সমাজবিজ্ঞান বিভাগ)। মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজ, লালমনিরহাট।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়