কবির য়াহমদ
তোফায়েল আহমেদ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের এক জীবন্ত স্মারক
তোফায়েল আহমেদের জানাজা শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তোলা অত্যন্ত স্বাভাবিক। জানাজা শেষে এই স্লোগান না উঠে সেখানে কি কেউ কান্নার রোল কিংবা ‘নারায়ে তকবির’ স্লোগান শোনার আশা করেছিলেন?
তোফায়েল আহমেদ একজন খাঁটি রাজনীতিক। তিনি ব্যক্তি তোফায়েল থেকে কিংবদন্তি রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ হয়েছেন ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে ধারণ করেই। সেখানে এই স্লোগান না তোলা হলে বরং সেটাই অস্বাভাবিক হতো।
যাদের হাত ধরে বাংলাদেশের জন্ম, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সেই তালিকার অন্যতম নাম। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জন্মের রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছে, অথচ বাংলাদেশে এখন দলটিকে রাজনীতি করতে দেওয়া হচ্ছে না। তাদের অপরাধ—জুলাই আন্দোলন হয়েছিল তাদের সরকারের বিরুদ্ধে।
অথচ খেয়াল করে দেখুন, জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময়ে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে তার পূর্ণ সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে আন্দোলনের মুখোমুখি হয়নি; দলকে সেভাবে মাঠে নামায়নি। বরং দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যরাও ছিল এই আন্দোলনের অংশ। আওয়ামী লীগ দলীয় শক্তি দিয়ে জুলাই আন্দোলন দমনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলে ওই আন্দোলন আগস্টে পৌঁছানোর আগেই হয়তো স্তিমিত হয়ে যেত। সেই রাজনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক অবস্থা তাদের ছিল।
চব্বিশের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে আওয়ামী লীগ বর্তমানে একটি ‘মজলুম রাজনৈতিক দল’। চব্বিশের আন্দোলন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি নেতাকর্মী হতাহত হয়েছেন তাদেরই। বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি। আর সেই ‘মজলুমেরা’ গতরাতে জানাজা শেষে স্লোগান দিয়েছে বলে পুলিশ গণগ্রেপ্তার চালিয়েছে।
পুলিশের প্রসঙ্গ যখন এসেই যাচ্ছে, তখন বলা দরকার—জুলাইয়ে যত লোকের মৃত্যু হয়েছে, তার একটি অংশ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে; অন্য অংশ নিহত হয়েছে আন্দোলনকারীদের দ্বারা (যে-কারণে ফ্যাসিস্ট ইউনূস দায়মুক্তি অধ্যাদেশ দিয়েছিল এবং পরে বিএনপির সরকার সেটাকে আইনে পরিণত করেছে)। পুলিশ নিজেও আন্দোলনকারীদের দ্বারা আক্রান্ত ও নিহত হয়েছে। পুলিশ কর্তৃক এই মৃত্যুর কথা সবাই বলে— সরকার বলে, আন্দোলনকারীরাও বলে। এখানে যদি কারও ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ করার প্রশ্ন আসে, তবে তা তো পুলিশেরই হওয়ার কথা, তাই নয় কি!
বিচারিক ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে সরকারি কৌঁসুলিরা যখন দাবি করেন— আওয়ামী লীগের এই নেতা বা ওই মন্ত্রী সরাসরি গুলি ও মানুষ মারার নির্দেশ দিয়েছেন, তখন এর পেছনে কতখানি সত্যতা আর কতখানি রাজনৈতিক বয়ান লুকিয়ে আছে, সেটা পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে সবাই বোঝে। এখানে মাত্র দুইটা নাম দেখুন— হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন; এঁরা আওয়ামী লীগের কেউ নন, সরকারের অংশ ছিলেন না; ছিলেন কেবল রাজনৈতিক নির্বাচনি জোটের অংশ, অথচ তাঁদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে, বিচার চলছে এবং শাস্তি দেওয়ার আয়োজন চলছে।
‘বিজয়ীর গল্পে পরাজিতদের’ যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তৎকালীন সরকার সেভাবে দলীয় শক্তি দিয়ে এই আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেনি; যতটুকু করেছে তার প্রায় সবটুকুই হয়েছে প্রশাসনিক বা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। তখন সরকার চাইলে রাজপথে নিজেদের রাজনৈতিক দলকে নামাতে পারত, কিন্তু নামায়নি; কারণ আন্দোলনকারীদের মধ্যে তাদের নিজেদের পরিবারের লোকজনও শামিল ছিল। তবু বলি—এখানে যদি আওয়ামী লীগের কেউ সত্যিই জড়িত থাকেন, তবে তাঁদের বিচার চাইতে আপত্তি নেই, আমরাও বিচার চাইব। তবে বর্তমানে যে আয়োজন চলমান, তাতে বিচারের চেয়ে শাস্তির ঝোঁকটাই বেশি; এবং এটি স্পষ্টতই এক ধরনের ‘পলিটিক্যাল ক্লিনজিং’!
তোফায়েল আহমেদ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের এক জীবন্ত স্মারক। তাঁর জানাজা শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তাই কোনোভাবেই অস্বাভাবিক নয়। এমনকি তাঁর কবরের এপিটাফেও যদি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি লেখা হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
ঐতিহাসিকভাবে ‘জয় বাংলা’ দলীয় স্লোগান নয়; এটি আমাদের স্বাধিকার-স্বাধীনতা ও মুক্তির স্লোগান, একাত্তরের স্লোগান। এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ধারণ করেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। একাত্তর থেকে ছাব্বিশ—যারাই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের বিপরীতে দাঁড়াবে, তারা আদর্শিকভাবে গণহত্যাকারী পাকিস্তানেরই অনুসারী।
কবির য়াহমদ, লেখক, সাংবাদিক
ইএন/এসএ
- বাংলাদেশে শিশু শ্রম: কারণ ও করণীয়
- পনেরো আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্ধ
মোশতাক বললেও মন্ত্রীদের কেউ সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের সঙ্গে যায়নি! - ২০২৩ সালে কী সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
- করোনা যেভাবে চিকিৎসকদের শ্রেণীচ্যুত করলো
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
- ফিলিস্তিনে প্রাণ হারাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কুকুর স্থানান্তরকরণ ও ভবিষ্যৎ
- শরীফার গল্প পড়তে আমাদের এতো কেন সমস্যা?
- মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যমের ভূমিকা
- রেমডেসিভির একটি অপ্রমাণিত ট্রায়াল ড্রাগ
























