ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬,   আষাঢ় ১১ ১৪৩৩

ড. আজিজুল আম্বিয়া

প্রকাশিত: ১৬:১৩, ২৫ জুন ২০২৬

আশুরা: ইতিহাসের শিক্ষা, সত্যের বিজয় ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান

ড. আজিজুল আম্বিয়া

ড. আজিজুল আম্বিয়া

হিজরি নববর্ষের সূচনালগ্নেই মুসলিম উম্মাহ এমন একটি দিনের মুখোমুখি হয়, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আল্লাহর সাহায্য, নবীদের সংগ্রাম, সত্যের বিজয় এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য ইতিহাস। দিনটি হলো আশুরা, অর্থাৎ মুহাররম মাসের দশম দিন।

আমাদের সমাজে আশুরা নিয়ে নানা আলোচনা হয়। কেউ একে শুধু রোজার দিন হিসেবে জানেন, কেউ কারবালার শোকের দিন হিসেবে স্মরণ করেন, আবার কেউ বিভিন্ন লোকাচার ও দুর্বল বর্ণনার সঙ্গে এ দিনের পরিচয় খুঁজে পান। কিন্তু কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে আশুরার প্রকৃত পরিচয় আরও গভীর ও বিস্তৃত। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক দিবস নয়; বরং ঈমান, কৃতজ্ঞতা, ন্যায়, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধির এক চিরন্তন শিক্ষা।

মুহাররম: আল্লাহ ঘোষিত সম্মানিত মাস

মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি… এর মধ্যে চারটি সম্মানিত।”
(সূরা আত-তাওবা, ৯:৩৬)

মুফাসসিরগণ একমত যে এই চারটি মাস হলো জিলকদ, জিলহজ্জ, মুহাররম ও রজব। ইবন কাসির তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেন, এই মাসগুলোতে পাপ থেকে আরও বেশি সতর্ক থাকা এবং নেক আমলের প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া মুমিনের কর্তব্য।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)

এ হাদিস প্রমাণ করে যে মুহাররম কেবল হিজরি বছরের প্রথম মাসই নয়; বরং ইবাদতের বিশেষ মৌসুম।

আশুরার ইতিহাস: মুসা (আ.)-এর বিজয়

আশুরার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি লক্ষ্য করলেন যে ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, “এই দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) এ দিন রোজা রেখেছিলেন।”

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “মুসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমাদের অধিকারই বেশি।”

এরপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।

(সহীহ আল-বুখারী, হাদিস: ২০০৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩০)

এই হাদিস ইসলামের একটি মৌলিক আকিদা স্পষ্ট করে। ইসলাম নতুন কোনো ধর্ম নয়; বরং আদম (আ.) থেকে শুরু করে নূহ (আ.), ইবরাহিম (আ.), মুসা (আ.), ঈসা (আ.) এবং সর্বশেষ মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে একই তাওহীদের দাওয়াতের ধারাবাহিকতা।

কুরআনের আলোকে মুক্তির শিক্ষা

মুসা (আ.)-এর ঘটনাকে কুরআন বহু স্থানে বর্ণনা করেছে। যখন বনি ইসরাঈল সাগরের সামনে এসে পড়ল এবং ফেরাউনের বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলল, তখন সঙ্গীরা বলেছিল, “আমরা তো ধরা পড়েই গেলাম।”

কিন্তু মুসা (আ.) উত্তর দিলেন, “কখনোই নয়। নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে আমার রব আছেন; তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন।”

(সূরা আশ-শু’আরা, ২৬:৬১–৬২)

এরপর আল্লাহর নির্দেশে সাগর দ্বিখণ্ডিত হয় এবং মুমিনরা নিরাপদে পার হয়ে যায়। ফেরাউন ও তার বাহিনী ডুবে যায়।

এই ঘটনা কেবল একটি ঐতিহাসিক অলৌকিকতা নয়। এটি শেখায়, মানুষের সব পথ বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর সাহায্যের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।

আশুরার রোজার ফজিলত

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।”

(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

ইমাম আন-নাওয়াবি ব্যাখ্যা করেছেন যে, এখানে ছোটখাটো (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা হওয়ার আশা করা হয়েছে। বড় গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য আন্তরিক তাওবা অপরিহার্য।

কেন ৯ ও ১০ মুহাররম?

রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ দিকে বলেন, “আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম দিনও রোজা রাখব।”

(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)

আলেমগণ বলেন, এর উদ্দেশ্য ছিল ইহুদিদের অনুকরণ থেকে বিরত থেকে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা। তাই সুন্নত হলো ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখা।

দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা সম্পর্কে সতর্কতা

আশুরাকে ঘিরে অনেক বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে, যেমন এই দিনে আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল হয়েছিল, নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পর্বতে ভিড়েছিল, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, ইবরাহিম (আ.) আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন ইত্যাদি। এসব ঘটনার কিছু ইসলামী ঐতিহ্যে উল্লেখ থাকলেও অধিকাংশের সনদ সহীহ নয় বা অত্যন্ত দুর্বল। তাই এগুলোকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।

একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো কুরআন ও সহীহ হাদিসে প্রমাণিত বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া।

আমাদের প্রথম শিক্ষা

আশুরার প্রথম শিক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা। যখন মানুষের দৃষ্টিতে সব পথ বন্ধ, তখনও একজন মুমিন আশা হারায় না।

দ্বিতীয় শিক্ষা কৃতজ্ঞতা। মুসা (আ.) বিজয়ের পর রোজা রেখেছিলেন। অর্থাৎ আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা কেবল মুখের কথায় নয়, ইবাদতের মাধ্যমেও প্রকাশ পায়।

তৃতীয় শিক্ষা সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। ফেরাউনের শক্তি ছিল সীমাহীন, কিন্তু সত্যের সামনে তা টিকতে পারেনি। কুরআনের ভাষায়, “বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।”

(সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮১)

এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে সত্য, ন্যায় ও আল্লাহর প্রতি ভরসাই একজন মুমিনের প্রকৃত শক্তি।

কারবালা: সত্যের জন্য আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

পবিত্র আশুরার সঙ্গে ইসলামের ইতিহাসে আরেকটি ঘটনা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ৬১ হিজরির ১০ মুহাররমে ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ও অল্পসংখ্যক সঙ্গী শাহাদাত বরণ করেন। মুসলিম ইতিহাসের এটি অন্যতম মর্মান্তিক অধ্যায়।

হজরত হুসাইন (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অত্যন্ত স্নেহভাজন। সহীহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের নেতা।”
(জামি আত-তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৬৮; হাদিসটি সহীহ)

আরও এসেছে, “হে আল্লাহ! আমি তাদের ভালোবাসি, আপনিও তাদের ভালোবাসুন।”
(সহীহ আল-বুখারী, হাদিস: ৩৭৪৭)

এ কারণে কারবালার ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর বেদনার বিষয়। তবে এই বেদনাকে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী সংযম, ধৈর্য এবং ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারের মাধ্যমে ধারণ করতে হবে।

কারবালার প্রকৃত শিক্ষা

কারবালার শিক্ষা কোনো সম্প্রদায়গত বিভেদ সৃষ্টি করা নয়। বরং এটি শেখায় যে সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করা একজন মুমিনের কাজ নয়। হজরত হুসাইন (রা.) ক্ষমতার জন্য নয়, বরং ন্যায়নীতি ও উম্মাহর কল্যাণের প্রশ্নে নিজের অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।

তবে ইসলামের প্রামাণ্য উৎসে কোথাও আশুরাকে শোকানুষ্ঠান, মাতম, আত্মপ্রহার বা আত্মনির্যাতনের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি গালে আঘাত করে, জামা ছিঁড়ে এবং জাহেলি যুগের মতো আহ্বান জানায়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
(সহীহ আল-বুখারী, হাদিস: ১২৯৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩)

অতএব, কারবালার স্মরণ হবে দোয়া, শিক্ষা গ্রহণ, আত্মসমালোচনা এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকারের মাধ্যমে, আত্মনির্যাতনের মাধ্যমে নয়।

আশুরার সুন্নাহভিত্তিক আমল

কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে আশুরায় বিশেষভাবে যে আমলগুলো প্রমাণিত, সেগুলো হলো:

১. রোজা রাখা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখা। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ।

২. তাওবা ও ইস্তিগফার।
যদিও আশুরার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ দোয়া বা নামাজ সহীহ হাদিসে নেই, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, কুরআন তিলাওয়াত এবং নফল ইবাদত করা সর্বদা প্রশংসনীয়।

৩. আত্মসমালোচনা।
আশুরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একজন মুমিনের জীবন কেবল ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; নৈতিক চরিত্র, আমানতদারি এবং মানুষের হক আদায়ও ইবাদতের অংশ।

আশুরাকে ঘিরে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা আমাদের সমাজে আশুরাকে কেন্দ্র করে কিছু প্রচলিত রীতি রয়েছে, যেগুলোর শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই।

প্রথমত, আশুরার রাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক নফল নামাজ বা বিশেষ দোয়ার ফজিলত সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো প্রচলিত, সেগুলোর অধিকাংশই জাল বা অত্যন্ত দুর্বল।

দ্বিতীয়ত, আশুরার দিনকে কেবল শোকের দিন বা কেবল আনন্দের দিন হিসেবে পালন করা, উভয়ই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তৃতীয়ত, তাবিজ, বিশেষ খাবার রান্না করলে নির্দিষ্ট ফজিলত পাওয়া যাবে, অথবা এ দিনে বিশেষ লোকাচার পালনের মাধ্যমে সওয়াব অর্জিত হবে, এমন ধারণারও কোনো সহীহ দলিল নেই।

মুসলমানের জন্য সর্বোত্তম পথ হলো, ইবাদতের ক্ষেত্রে কেবল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর অনুসরণ করা।

আশুরা ও নৈতিক সমাজ

আজকের বিশ্বে আশুরার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নৈতিকতার পুনর্জাগরণ। দুর্নীতি, মিথ্যাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক বৈষম্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা আমাদের সমাজকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

মুসা (আ.)-এর ঘটনা শেখায়, জুলুম স্থায়ী নয়।

কারবালা শেখায়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য অনেক বড় হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সত্যকেই সম্মান করে।

এই দুই শিক্ষা মিলেই আশুরার প্রকৃত চেতনা গড়ে ওঠে।

আজকের মুসলমানের জন্য করণীয়

আশুরা উপলক্ষে আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের জীবনকে নতুন করে মূল্যায়ন করা।

আমরা কি কর্মক্ষেত্রে সৎ?
আমরা কি মানুষের অধিকার রক্ষা করি? আমরা কি পরিবারে ন্যায়বিচার করি? আমরা কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকি? আমরা কি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে, আশুরা আমাদের জীবনে কেবল একটি তারিখ, নাকি একটি জীবন্ত শিক্ষা।

আশুরা আমাদের শেখায়, ঈমান মানে শুধু বিশ্বাস নয়; বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা এবং অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার দৃঢ়তা।

ড. আজিজুল আম্বিয়া, কলাম লেখক ও গবেষক

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়