ঢাকা, সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬,   শ্রাবণ ১২ ১৪৩৩

মায়মুন শরীফ রাইয়ান

প্রকাশিত: ১৯:৫৬, ২৭ জুলাই ২০২৬

উচ্চ-মাধ্যমিকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ: বাস্তবতা ও সম্ভাবনা

মায়মুন শরীফ রাইয়ান

মায়মুন শরীফ রাইয়ান

শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়ন, মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু শিক্ষার মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। পাঠ্যক্রম, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত সুবিধা যত উন্নতই হোক, যোগ্য শিক্ষক ছাড়া সেগুলোর সুফল শিক্ষার্থীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তাই আরও বেশি। এই স্তর একদিকে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের শেষ প্রস্তুতি, অন্যদিকে ব্যক্তিত্ব, চিন্তাশক্তি ও মূল্যবোধ গঠনের সময়।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল শিক্ষা, গবেষণাভিত্তিক পাঠদান এবং দক্ষতাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এখন শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষককে তাই শুধু নিজের বিষয়ে দক্ষ হলেই চলে না। তাঁকে আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং জীবনদক্ষতা বিকাশের কৌশলেও পারদর্শী হতে হয়। এই দক্ষতা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো ধারাবাহিক ও মানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণ।

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা কৈশোর থেকে পরিণত বয়সে পদার্পণ করে। এই সময়েই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, আইন, ব্যবসায় কিংবা অন্যান্য পেশাগত শিক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে। একই সঙ্গে তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। এই পর্যায়ের শিক্ষা তাই কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও এই স্তরের শিক্ষকদের ওপর বর্তায়। শিক্ষক যদি বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং আধুনিক শিক্ষাদান কৌশলে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত না হন, তবে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ করে। শিক্ষক নিজের বিষয়ে যত গভীর জ্ঞান রাখবেন, তত সহজে জটিল বিষয় শিক্ষার্থীদের কাছে বোধগম্য করে তুলতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করে। বক্তৃতানির্ভর একমুখী পাঠদানের বদলে এখন অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা, দলীয় কার্যক্রম, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, সমস্যা সমাধানমূলক কার্যক্রম, উপস্থাপনা, গবেষণামুখী শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান অধিক কার্যকর বিবেচিত হচ্ছে। এসব কৌশল আয়ত্তে আনতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।

তৃতীয়ত, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বিশ্বজুড়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার বদলে এখন বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং বাস্তবজীবনে জ্ঞানের প্রয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব পদ্ধতি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

চতুর্থত, প্রশিক্ষিত শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সহায়তা, লিঙ্গসংবেদনশীল শিক্ষা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অধিক দক্ষ হয়ে ওঠেন। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে এসব বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ক্লাসরুম, ভার্চুয়াল ল্যাব, ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন মূল্যায়ন এবং ব্লেন্ডেড লার্নিং এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এগুলো বর্তমান বাস্তবতা। প্রশিক্ষিত শিক্ষকই এসব প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন।

বাংলাদেশে শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা বেড়েছে। শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহারও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। এই মানোন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো শিক্ষক প্রশিক্ষণকে আরও কার্যকর ও সর্বজনীন করা।

সরকারি কলেজের শিক্ষকদের জন্য জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও তা সবসময় নিয়মিত বা প্রয়োজনভিত্তিক নয়। দেশের অধিকাংশ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে বেসরকারি কলেজে। সেসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন চাকরি করেও মানসম্মত প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না। ফলে একই বিষয়ে পাঠদান করলেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকের দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থেকে যায়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয়, সরকারি চাকরিতে আত্তীকৃত অনেক কলেজ শিক্ষকও দীর্ঘদিন নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। চাকরির নিয়মিতকরণ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত বিলম্বে তাঁদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। অথচ তাঁরা দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছেন। এই বৈষম্য দূর না করলে শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সীমিত থাকে। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু বাস্তব ও বৃহৎ শ্রেণিকক্ষের সমস্যার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষক অর্জিত জ্ঞান শ্রেণিকক্ষে কতটা প্রয়োগ করছেন, তার কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ফলে প্রশিক্ষণের প্রত্যাশিত সুফল অনেক সময় পুরোপুরি পাওয়া যায় না।

প্রশিক্ষণের মান অনেকাংশে প্রশিক্ষকের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষকদের মানও প্রত্যাশিত পর্যায়ের হয় না। ফলে প্রশিক্ষণ তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে। শ্রেণিকক্ষের বাস্তব সমস্যা, আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয় না। তাই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রশিক্ষকদের নির্বাচন, দক্ষতা উন্নয়ন ও নিয়মিত মূল্যায়নেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

করোনা মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া আধুনিক শিক্ষা পরিচালনা সম্ভব নয়। তবুও অনেক শিক্ষক এখনো ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, অনলাইন মূল্যায়ন, ভার্চুয়াল ক্লাস পরিচালনা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাসহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহারে পর্যাপ্ত দক্ষ নন। ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এখানে একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে চাকরির আনুষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে নয়, বরং সারাজীবনের পেশাগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষকরা নিয়মিত কর্মশালা, গবেষণা, মেন্টরিং, সহকর্মীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ক্রমাগত উন্নত করেন। অনেক দেশে প্রশিক্ষণকে পদোন্নতি, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং পেশাগত স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে শিক্ষকরা নতুন দক্ষতা অর্জনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগ্রহী হন।

বাংলাদেশেও শিক্ষক প্রশিক্ষণকে ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শুধু এককালীন প্রশিক্ষণ আয়োজন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত, বিষয়ভিত্তিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে এই স্তরের পাঠ্যক্রম, শিক্ষার্থীদের মানসিক বৈশিষ্ট্য এবং উচ্চশিক্ষার চাহিদা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়।

এক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ জরুরি। প্রথমত, সরকারি ও বেসরকারি—উভয় পর্যায়ের সকল কলেজ শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগের পরপরই মৌলিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। তৃতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, অনলাইন মূল্যায়ন, গবেষণাভিত্তিক পাঠদান এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষকদের সুবিধার্থে শক্তিশালী অনলাইন প্রশিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করে অর্জিত দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পদোন্নতি, স্বীকৃতি ও প্রণোদনার সঙ্গে প্রশিক্ষণকে যুক্ত করলে তাঁদের পেশাগত আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে।

সর্বোপরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণকে ব্যয় নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আজকের প্রশিক্ষিত শিক্ষকই আগামী দিনের দক্ষ বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক এবং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির কারিগর।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে সেই অর্জনকে গুণগত উৎকর্ষে রূপ দেওয়ার। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণকে পরিকল্পিত, যুগোপযোগী, গবেষণাভিত্তিক এবং সর্বজনীন করা গেলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষ ও উদ্ভাবনী বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রধান শর্তই হলো—দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও আত্মবিশ্বাসী শিক্ষক।

লেখক- প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড সরকারি মডেল কলেজ

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়