ঢাকা, সোমবার   ০৮ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪৩৩

মোহাম্মদ মকিস মনসুর

প্রকাশিত: ২৩:৩৫, ৭ জুন ২০২৬

বাঙালির মুক্তির সনদ

ঐতিহাসিক ৬ দফা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সোপান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৬৬ সালের ৭ জুন ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সোপান।

বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ছয় দফা কোনো রাতারাতি প্রণীত কর্মসূচি ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রস্তুতি। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা, ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয় এবং ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ছয় দফার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ছিল এমন একটি রাজনৈতিক সেতুবন্ধন, যার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা মূলত ছয় দফার মধ্যেই নিহিত ছিল। তাই ৭ জুন শুধু একটি দিবস নয়, এটি বাঙালির সাহস, আত্মমর্যাদা ও মুক্তির প্রেরণার প্রতীক।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফা আন্দোলন নতুন গতি পায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং বাঙালির অকুণ্ঠ সমর্থনে স্বাধীনতার রূপরেখা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছয় দফার মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার স্বপ্নের বীজ অঙ্কুরিত হয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে ১১ দফা আন্দোলন, শুরু হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জানায়।

কিন্তু নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির ডাক দেন।

পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এরপর সারা দেশে এই দাবির পক্ষে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে।

ছয় দফার মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে একটি প্রকৃত ফেডারেল রাষ্ট্রে রূপান্তর করা এবং প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। পরবর্তীকালে এই দাবিই বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

ছয় দফার মূল দাবি
প্রথম দফা: পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল ও সংসদীয় রাষ্ট্র। কেন্দ্রীয় আইনসভা গঠিত হবে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।

দ্বিতীয় দফা: কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিতে।

তৃতীয় দফা: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক মুদ্রা ব্যবস্থা অথবা এমন ব্যবস্থা থাকবে যাতে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সম্পদের পাচার বন্ধ করা যায়।

চতুর্থ দফা: কর আরোপ ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে।

পঞ্চম দফা: বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হিসাব ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট প্রদেশের হাতে থাকবে।

ষষ্ঠ দফা: জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে প্রদেশগুলোকে মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।

ছয় দফার জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। বঙ্গবন্ধু জনগণের কাছে এই কর্মসূচি পৌঁছে দিতে মাত্র ৩৫ দিনে ৩২টি জনসভায় বক্তৃতা করেন। ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন যত বাড়তে থাকে, ততই শুরু হয় দমন-পীড়ন। বঙ্গবন্ধুকে একের পর এক গ্রেপ্তার করা হয়। মাত্র তিন মাসে তিনি আটবার গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে টানা ৩৩ মাস কারাবন্দি থাকেন।

ছয় দফা আন্দোলন দমনে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু জনগণের আন্দোলন আরও বেগবান হয়।

বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ৭ জুন দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। সেদিন ঢাকা, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন শহীদ হন। এই আত্মত্যাগই পরবর্তী গণআন্দোলনের শক্তি হয়ে ওঠে।

১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি ঘটে। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে "বঙ্গবন্ধু" উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি জাতি ছয় দফার পক্ষে তাদের চূড়ান্ত রায় দেয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের রায় মেনে না নেওয়ায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

আজ ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি ছিলেন ছয় দফার স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি এবং বাঙালি জাতির মুক্তির পথপ্রদর্শক। প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে তিনি চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবেন।

বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়েছেন একটি স্বাধীন দেশ, একটি পতাকা এবং একটি মানচিত্র। তাঁর নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের কারণেই আমরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক।

দুঃখজনকভাবে, যাঁদের অবদানে বাংলাদেশের জন্ম, সেই জাতীয় নেতাদের অনেকেই আজ যথাযথ মর্যাদা পান না। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদের জানাজা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত হতে দেওয়া হয়নি। এমনকি জাতীয় শহীদ মিনারেও তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি।

আজ বাংলাদেশ নানা সংকটের মুখোমুখি। সমাজে উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও বিভাজন বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেক মানুষ নিজেদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এমন সময়ে ছয় দফার মূল শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। জাতীয় ঐক্য, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং জনগণের ক্ষমতায়নের যে চেতনা ছয় দফার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজও তা সমান প্রাসঙ্গিক।

তাই আজকের এই দিনে আমাদের শপথ হোক ঐক্যের, গণতন্ত্রের এবং একটি মানবিক বাংলাদেশের।

আঁধার কেটে ভোর হোক।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
প্রাণের বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

মোহাম্মদ মকিস মনসুর, লেখক ও সাংবাদিক, চেয়ারম্যান, ইউকে বিডি টিভি, সভাপতি, যুক্তরাজ্য ওয়েলস আওয়ামী লীগ

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়