নূরুর রহিম নোমান, যুক্তরাজ্য
মনু প্রকল্প: বাঁধে বন্দী নদী-হাওর
বন্যার আতঙ্ক, নদী ব্যবস্থাপনার সংকট ও টেকসই সমাধানের সন্ধানে
এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।
পূর্ববর্তী পর্বে আমরা দেখেছি, মনু নদীর ভৌগোলিক পরিচয় এবং ১৯৫০-এর দশকের ধারাবাহিক ভয়াবহ বন্যার পর ক্রুগ মিশন, ডাচ বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ এবং আইবিআরডি (বর্তমান বিশ্বব্যাংক)-এর মূল্যায়ন কীভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি তৈরি করেছিল। সে সময়ের পরিকল্পনার মূল দর্শন ছিল বাঁধ নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং সেচব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন (Flood Control, Drainage and Irrigation—FCDI)।
মনু নদী সেচ প্রকল্প: পাকিস্তান আমলের ডাইক থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের মহাপরিকল্পনা
মৌলভীবাজারের মনু নদী সেচ প্রকল্পও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই প্রকল্প একদিনে বা এক ধাপে গড়ে ওঠেনি। পাকিস্তান আমলে নদীর তীর ঘেঁষে সীমিত পরিসরে প্রতিরক্ষা ডাইক নির্মাণের মাধ্যমে যার সূচনা, স্বাধীনতার পর সেটিই উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পে পরিণত হয়।
দুটি সময়, দুটি অধ্যায়
মনু নদী প্রকল্পের ইতিহাস নিয়ে সরকারি নথি, গবেষণা এবং বিভিন্ন বিশ্বকোষীয় সূত্রে দুটি ভিন্ন সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। কোথাও প্রকল্পের সূচনা ১৯৬৯ সালে বলা হয়েছে, আবার বাংলাপিডিয়াসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে ১৯৭৫–৭৬ অর্থবছরকে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি পরস্পরবিরোধী মনে হলেও বাস্তবে তা নয়। বরং এটি একই প্রকল্পের দুটি পৃথক ধাপের ইতিহাস। প্রথমটি পাকিস্তান আমলের সীমিত প্রতিরক্ষা ডাইক নির্মাণের পর্যায় এবং দ্বিতীয়টি স্বাধীন বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প হিসেবে পুনর্গঠনের অধ্যায়।
১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (EPWAPDA) মনু নদীর তীরবর্তী এলাকাকে বার্ষিক বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য সীমিত আকারে মাটির প্রতিরক্ষা ডাইক নির্মাণ শুরু করে। স্থানীয় প্রবীণদের কাছে এটি এখনো "পুরোনো মনু ডাইক" নামে পরিচিত।
সে সময় নদীর ওপর কোনো ব্যারেজ, সেচখাল বা পাম্পিং স্টেশন ছিল না। মূল উদ্দেশ্য ছিল বর্ষার পানি যাতে সহজে লোকালয় ও কৃষিজমিতে প্রবেশ করতে না পারে। ডাইকগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন এবং সীমিত পরিসরের। ফলে কোথাও নদীর পানি উপচে পড়ত, আবার কোথাও বাঁধ ভেঙে যেত। তাই বন্যা নিয়ন্ত্রণে এগুলোর কার্যকারিতা ছিল সীমিত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মতো এই প্রকল্পের কাজও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর নতুন মহাপরিকল্পনা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষির পুনর্গঠন।
১৯৭২ সালে বিশ্বব্যাংকের Land and Water Sector Study প্রতিবেদনে কৃষি উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর লক্ষ্যে মাঝারি ও ছোট আকারের সেচ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) পাকিস্তান আমলের সীমিত ডাইক প্রকল্পকে পুনর্গঠন করে একটি পূর্ণাঙ্গ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ (FCDI) প্রকল্পে রূপ দেয়। ১৯৭৫–৭৬ অর্থবছরে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং ১৯৮২–৮৩ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ের প্রধান অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
কেন মনু নদীকে বেছে নেওয়া হয়েছিল?
মনু নদীকে ঘিরে বৃহৎ FCDI প্রকল্প গ্রহণের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।
কাওয়াদীঘি হাওরের কৃষি উন্নয়ন
মনু ও কুশিয়ারা নদীর মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ কাওয়াদীঘি হাওরকে আকস্মিক বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা করে সেখানে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়ানো ছিল অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
পাহাড়ি ঢল থেকে সুরক্ষা
প্রতিবছর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। সেই ক্ষতি কমানোও ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
স্বাভাবিক সেচ সুবিধা
মনু নদী থেকে প্রাকৃতিক ঢাল বা Gravity Flow-এর মাধ্যমে সহজেই খালের মাধ্যমে হাওর ও আশপাশের কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ করা সম্ভব ছিল। এতে তুলনামূলক কম ব্যয়ে বৃহৎ এলাকা সেচের আওতায় আনা সম্ভব বলে বিবেচিত হয়।
খাদ্য নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কাওয়াদীঘি হাওরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ছিল প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই লক্ষ্যেই দীর্ঘ প্রতিরক্ষা বাঁধ, সেচ ও নিষ্কাশন খাল, স্লুইসগেট এবং পরবর্তীকালে মনু ব্যারেজ ও কাশিমপুর পাম্পিং স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
পুরোনো ডাইক থেকে নতুন বাঁধ
পাকিস্তান আমলের প্রতিরক্ষা ডাইক নির্মিত হয়েছিল নদীর তীর ঘেঁষে। কিন্তু স্বাধীনতার পর নতুন নকশায় অনেক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নদীর মূল তীর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করা হয়।
সরকারি নথিতে এ সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা না থাকলেও নদী প্রকৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণা করা হয়, সর্পিলাকার পাহাড়ি নদীর ভবিষ্যৎ তীরভাঙনের ঝুঁকি কমানো এবং সেচ ও রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে এই সিদ্ধান্তের সামাজিক ও ভৌগোলিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
নতুন বাঁধ নির্মাণে বিপুল পরিমাণ উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করতে হয়। অনেক পরিবার ভূমি হারায় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাবের মুখে পড়ে।
এ ছাড়া নদী এবং নতুন প্রতিরক্ষা বাঁধের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা বাঁধের বাইরে থেকে যাওয়ায় তা স্থায়ী প্লাবনাঞ্চলে পরিণত হয়। এসব এলাকায় বহু মানুষের বসতবাড়ি ও কৃষিজমি থেকে যায়। ফলে প্রতি বর্ষায় তারা নিয়মিত বন্যার মুখোমুখি হতে থাকেন।
একদিকে বাঁধের ভেতরের এলাকা তুলনামূলক সুরক্ষা পেলেও অন্যদিকে বাঁধের বাইরের মানুষের জন্য বন্যা ঋতুভিত্তিক দুর্যোগ নয়, বরং স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়।
ডাচ বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
১৯৬০-এর দশকেই ডাচ পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জে. থ. থিজেস সতর্ক করেছিলেন, কোনো গতিশীল ও পলিবাহী নদীকে দীর্ঘদিন কৃত্রিম বাঁধের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখলে পলি আর স্বাভাবিক প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। ফলে নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্যতা কমে যায়, নদীতল উঁচু হয়ে ওঠে এবং পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়।
তাঁর মতে, কেবল বাঁধনির্ভর বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত প্লাবন (Controlled Flooding), নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা এবং অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কিন্তু বাস্তবে পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ উভয় ক্ষেত্রেই অবকাঠামোকেন্দ্রিক নদী ব্যবস্থাপনাই প্রাধান্য পায়। মনু নদীও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
পরবর্তী কয়েক দশকে মনু নদীতে পলি জমা, নাব্যতা হ্রাস, নদীতল উঁচু হয়ে যাওয়া এবং পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা যায়, অনেক গবেষকের মতে তা ডাচ বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তার সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে সে সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, খাদ্য উৎপাদনের তীব্র প্রয়োজন এবং স্বাধীনতাপরবর্তী পুনর্গঠনের বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকেরা অবকাঠামোভিত্তিক এই পদ্ধতিকেই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সূচনা
১৯৮২–৮৩ অর্থবছরে মনু নদী সেচ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের প্রধান অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়। তখন এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, বন্যা নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে এবং কৃষি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
কিন্তু প্রকল্পের প্রথম পর্যায় শেষ হওয়ার পরের বছরই, ১৯৮৪ সালে, মৌলভীবাজার আবারও ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যে প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের অল্প সময়ের মধ্যেই কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো? এটি কি কেবল একটি অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল, নাকি প্রকল্পের নকশা, নদীর স্বাভাবিক পরিবর্তন, পলি জমা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো বিষয়গুলোও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তখন পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। তবে পরবর্তী চার দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মনু নদী সেচ প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পের ইতিহাস নয়; এটি মানুষ, নদী এবং প্রকৌশলের পারস্পরিক সম্পর্কেরও এক জটিল ইতিহাস।
পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে মনু ব্যারেজ, কাশিমপুর পাম্পিং স্টেশন, বিস্তৃত সেচ ও নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, প্রকল্পের ব্যয়, কত জমি সেচের আওতায় এসেছে এবং বাস্তবায়নের কয়েক বছরের মধ্যেই কেন নতুন নতুন সংকট সামনে আসতে শুরু করেছিল।
ধারাবাহিক ফিচার (পূর্ব প্রকাশিতের পর), তৃতীয় পর্ব
(চলবে...)
ইএন/এসএ
- বাংলাদেশে শিশু শ্রম: কারণ ও করণীয়
- পনেরো আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্ধ
মোশতাক বললেও মন্ত্রীদের কেউ সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের সঙ্গে যায়নি! - ২০২৩ সালে কী সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
- করোনা যেভাবে চিকিৎসকদের শ্রেণীচ্যুত করলো
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
- ফিলিস্তিনে প্রাণ হারাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কুকুর স্থানান্তরকরণ ও ভবিষ্যৎ
- শরীফার গল্প পড়তে আমাদের এতো কেন সমস্যা?
- মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যমের ভূমিকা
- রেমডেসিভির একটি অপ্রমাণিত ট্রায়াল ড্রাগ






















