ঢাকা, রোববার ০৯ আগস্ট ২০২৬,   শ্রাবণ ২৪ ১৪৩৩

নূরুর রহিম নোমান, যুক্তরাজ্য

প্রকাশিত: ২২:৫০, ৮ আগস্ট ২০২৬

ধারাবাহিক ফিচার: চতুর্থ পর্ব

বন্যার আতঙ্ক, নদী ব্যবস্থাপনার সংকট ও টেকসই সমাধানের সন্ধান

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

পূর্ববর্তী পর্বে আমরা দেখেছি, কীভাবে পাকিস্তান আমলের সীমিত পরিসরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা স্বাধীন বাংলাদেশে এসে একটি পূর্ণাঙ্গ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ (Flood Control, Drainage and Irrigation—FCDI) মেগা-প্রকল্পে রূপ নেয়। সেই পর্বে আলোচনা হয়েছিল প্রকল্পের প্রাথমিক রূপরেখা, কাওয়াদীঘি হাওরকে কৃষির আওতায় আনার লক্ষ্য এবং নদী থেকে কিছুটা দূরে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে।

মনু নদী সেচ প্রকল্প কেবল একটি সাধারণ নদী শাসন প্রকল্প নয়; এটি একই সঙ্গে একটি নদী, একটি বিস্তৃত হাওর এবং একটি কৃষিনির্ভর জনপদকে পুনর্গঠনের রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান উদাহরণ।

এই পর্বে আমরা দেখব প্রকল্পের মূল অবকাঠামোগত বাস্তব রূপ—কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় গিয়ে শেষ হলো এর বিশাল প্রতিরক্ষা বাঁধ, প্রকল্প এলাকার ভৌগোলিক বিস্তার কতটুকু, মনু ব্যারেজ, ফিশ পাস ও কাশিমপুর পাম্প হাউসের কারিগরি বিবরণ এবং ঠিক কত জমিতে পৌঁছাল এই ব্যবস্থার সুফল।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও রূপান্তর
১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মনু নদীকে ঘিরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি উন্নয়নের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯৬২ সালে তৈরি সম্ভাব্যতা রিপোর্টের (Feasibility Report) ভিত্তিতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রকল্পটি নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ FCDI মেগা-প্রকল্পে রূপ লাভ করে।

স্বাধীনতার পর প্রকল্পটি শুধু একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবেও বিবেচিত হয়। পরবর্তী দুই দশকে ধাপে ধাপে নির্মিত হয় নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ, মাতারকাপন এলাকায় মনু ব্যারেজ, বিস্তৃত সেচ খাল, কাশিমপুর পাম্প হাউস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রকৌশল অবকাঠামো।

প্রকল্পের অবস্থান, সীমানা ও পরিধি

ভৌগোলিক অবস্থান: মনু নদী সেচ প্রকল্পটি ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ৯১°৪০’ থেকে ৯২°০০’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২৪°৩০’ থেকে ২৪°৪০’ উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) নথি অনুযায়ী, এই মেগা-প্রকল্পটি মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলা এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গঠিত।

প্রকল্প এলাকার ভৌগোলিক সীমানা—
• পূর্বে: ভাটেরা পাহাড়
• উত্তরে: কুশিয়ারা নদী
• পশ্চিম ও দক্ষিণে: মনু নদী
এই তিনটি প্রাকৃতিক সীমারেখার মাঝখানেই বিস্তৃত ঐতিহাসিক কাওয়াদীঘি হাওর। বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা সূত্রে কাওয়াদীঘি হাওরের অন্তর্ভুক্ত ছোট-বড় বিল ও সংযোগ খালের সংখ্যা ৪৮ থেকে ৬৩টির মধ্যে উল্লেখ করা রয়েছে।

এর মধ্যে 'পটাসিংড়া বিল' (স্থানীয় উচ্চারণে ফাটাইংরার বিল) অন্যতম প্রধান ও সমৃদ্ধ জলাভূমি, যা একসময় দেশীয় মাছের অনন্য অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত ছিল। মূলত এই হাওর এবং এর চারপাশের উর্বর কৃষিজমিকে মনু ও কুশিয়ারা নদীর বিধ্বংসী বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পানির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করে মৎস্য, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনই ছিল এই সমন্বিত প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য।

প্রতিরক্ষা বাঁধ: সুরক্ষাবলয়ের বিস্তার
মনু নদী প্রকল্পের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হলো এর প্রায় ৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ, যা মনু ও কুশিয়ারা—উভয় নদীর তীর ঘেঁষে এক বিশাল বেষ্টনী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাঁধই কার্যত প্রকল্প এলাকার মূল সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে, যার আওতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও নিষ্কাশনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।

বাঁধের সূচনাস্থল ও ভৌগোলিক পথ বোঝার ক্ষেত্রে দুটি স্থান আলাদাভাবে জানা জরুরি:

সাধারণ বন্যা-প্রতিরক্ষা বাঁধের সূচনা (শরীফপুর সীমান্ত): মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়ন থেকেই সাধারণ বন্যা নিয়ন্ত্রণ মাটির ডাইকের সূচনা। মনু নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পরপরই সীমান্ত-সংলগ্ন এই পাহাড়ি এলাকা থেকে নদী প্রতিরক্ষার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

মূল প্রকৌশলগত অংশের সূচনা(হরিপাশা উজিরপুর,  রাজনগর): তবে পূর্ণাঙ্গ মনু সেচ প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট   প্রকৌশলগত কাঠামো এবং সেচ-অবকাঠামোর মূল অংশটি দৃশ্যমান হয় রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের হরিপাশা–উজিরপুর অঞ্চল থেকে।

এটিই প্রকল্পের সবচেয়ে সংবেদনশীল, জটিল ও প্রকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উল্লেখ্য, নদীটির বাঁক ও পাহাড়ি ঢলের সরাসরি আঘাতের কারণে হরিপাশা এবং রাজনগরের এই পুরো অংশটি শুরু থেকেই অত্যন্ত ভাঙনপ্রবণ (Erosion-Prone) হিসেবে চিহ্নিত; এমনকি বছরের পর বছর ধরে বর্ষাকালে এখানেই সবচেয়ে বেশি বাঁধ ভাঙন ও ফাটলের বিপর্যয় দেখা দেয়।

হরিপাশা-উজিরপুর থেকে মূল প্রতিরক্ষা বাঁধটি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে মনু নদীর উত্তর তীর অনুসরণ করে রাজনগর অতিক্রম করে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যেখানে মনু নদী কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

মনুমুখ থেকে উজানে, কুশিয়ারার দক্ষিণ তীর ধরে: প্রকল্পের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মনুমুখে এসে থেমে যায়নি। মনুমুখ থেকে বাঁধটি কুশিয়ারা নদীর দক্ষিণ (বাম) তীর ধরে আবার পূর্বদিকে উজানের দিকে বিস্তৃত হয়েছে এবং কাওয়াদীঘি হাওরকে প্রায় পূর্ণাঙ্গ বলয়ে বেষ্টন করে ভাটেরা পাহাড়ের পাদদেশ (হলদিকূল সংলগ্ন অঞ্চল) পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে।

এই অংশের মূল কাজ হলো কেবল মনু নদীর পাহাড়ি ঢল ঠেকানো নয়; বরং বর্ষাকালে কুশিয়ারা নদীর উল্টো স্রোতের পানি (Backwater Effect) যাতে পেছন দিক থেকে ঘুরে কাওয়াদীঘি হাওরে ঢুকতে না পারে, তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা।

বাঁধের মূল প্রবাহপথ: > শরীফপুর (সীমান্ত) → হরিপাশা–উজিরপুর (রাজনগর) → মৌলভীবাজার সদর → মনুমুখ (কুশিয়ারার সঙ্গম) → কুশিয়ারার দক্ষিণ তীর ধরে উজানে ভাটেরা পাহাড় (হাওর সুরক্ষাবলয়)।

নদীটির সর্পিল (Meandering) গতিপথ এবং ভবিষ্যৎ ভাঙনের ঝুঁকি বিবেচনায় অনেক স্থানে মূল নদীতীর থেকে কয়েকশ মিটার দূরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর ফলে নদী ও বাঁধের মাঝখানে বিস্তৃত একটি প্লাবনভূমি রয়ে যায়, যা পরবর্তীকালে প্রকল্পের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মনু ব্যারেজ ও কাশিমপুর পাম্পিং স্টেশন: দুটি প্রধান কারিগরি স্থাপনা

মূল বাঁধের পাশাপাশি প্রকল্পের সামগ্রিক কার্যকারিতা নির্ভর করে দুটি মূল অবকাঠামোর ওপর—একটি নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের জন্য, অন্যটি বর্ষায় জমে থাকা পানি অপসারণে।

১. মনু ব্যারেজ — প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র

প্রকল্পের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হলো মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মাতারকাপন এলাকায় মনু নদীর ওপর নির্মিত মনু ব্যারেজ, যা স্থানীয় মানুষের কাছে "সুইচগেট" নামে পরিচিত। ১৯৮৬ সালে নির্মিত ৮৬ মিটার প্রশস্ত এই ব্যারেজ অবকাঠামোর প্রধান কারিগরি প্রক্রিয়াগুলো হলো:

স্লুইস গেট (Sluice Gates): নদীর পানির প্রবাহ ও উচ্চতা ধরে রাখার জন্য ব্যারেজের মূল কাঠামোর ভেতরে ৬ মিটার প্রশস্ততার স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এই গেটগুলোর মাধ্যমেই নদীর মূল পানি আটকানো বা ছেড়ে দেওয়া হয়।

ব্যারেজ রেগুলেটর (Barrage Regulator): নদী থেকে আটকানো পানি প্রথমে 'ব্যারেজ রেগুলেটর'-এর মাধ্যমে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ব্যারেজের নিজস্ব জলাধারে প্রবেশ করানো হয় এবং সেচের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়।

বিনয়শ্রী রেগুলেটর (Binayshree Regulator) ও সেচ প্রবাহ: ধরে রাখা পানি সেচকাজে ব্যবহারের জন্য 'বিনয়শ্রী রেগুলেটর'-এর মাধ্যমে বিনয়শ্রী খালে প্রবাহিত করা হয়। এই বিনয়শ্রী খালটিই মূলত প্রধান সেচ খাল হিসেবে কাজ করে, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন শাখা ও উপ-সেচ খালের মাধ্যমে বিস্তৃত কৃষিজমিতে পানি পৌঁছে দেয়।

মৌসুমভিত্তিক ভূমিকা: শুষ্ক মৌসুমে স্লুইস গেট বন্ধ রেখে কৃত্রিমভাবে পানির স্তর উঁচুতে তুলে 'গ্র্যাভিটি ফ্লো' (Gravity Flow) পদ্ধতিতে সেচ নিশ্চিত করা হয়। আবার বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল ও অতিরিক্ত পানির চাপ তৈরি হলে স্লুইস গেটগুলো খুলে দিয়ে নদীর স্বাভাবিক নিষ্কাশন পথ খুলে দেওয়া হয়।

২. কাশিমপুর পাম্পিং স্টেশন — কাওয়াদীঘি হাওরের হৃদপিণ্ড

মনু সেচ প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জটিল ও বিশাল প্রযুক্তিগত স্থাপনা হলো কুশিয়ারা নদীর তীরে নির্মিত কাশিমপুর পাম্পিং স্টেশন (Kasimpur Pumping Station)। রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদরের বিস্তৃত কাওয়াদীঘি হাওরের (যার পরিধি প্রায় ২২,৫৮০ হেক্টর এবং ৪৮ থেকে ৬৩টি বিল সমন্বিত) জমে থাকা জলজট নিরসন ও অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য এটি মূলত প্রকল্পের কেন্দ্রীয় নিষ্কাশন অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে।

কাশিমপুর পাম্প হাউসের কারিগরি কাঠামো:

উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প: পাম্প হাউসে বসানো হয়েছে ৮টি শক্তিশালী এক্সিয়াল ফ্লো পাম্প (Axial Flow Pumps)।

বিপুল নিষ্কাশন ক্ষমতা: পাম্পগুলোর মোট পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ৩৪ কিউমেক (Cubic Meters per Second), যা হাওরের জমা পানি সহজেই সেচে কুশিয়ারা নদীতে ফেলে দিতে সক্ষম।

বিদ্যুৎ চাহিদা: পাম্প হাউসটি পূর্ণ সক্ষমতায় সার্বক্ষণিক চালাতে প্রায় ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।

কার্যক্রম: বোরো ধান পাকার ও কাটার উৎসবে (এপ্রিল-মে) পাহাড়ি ঢল বা অতিবৃষ্টিতে জমে থাকা পানি দ্রুত সেচে ফেলে সোনার ফসল রক্ষা করাই এর প্রধান কাজ।

সুবিধা প্রাপ্ত এলাকা: পাম্প হাউসের সফল কার্যক্রমের ফলে কুশিয়ারার বাম তীরে কাওয়াদীঘি হাওর অঞ্চলের প্রায় ৪,২৫০ হেক্টর (১০,৫০০ একর) জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে নিবিড় বোরো চাষের আওতায় আসে।

তবে স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ—
সংকটকালে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব, যান্ত্রিক গোলযোগ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে পাম্প হাউসটি অনেক সময়ই তার পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারে না।

ফিশ পাস (Fish Pass) ও ব্যারেজের পর্যটন সম্ভাবনা

সেচ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণের ফলে নদী ও কাওয়াদীঘি হাওরের প্রাকৃতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, যার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে স্থানীয় মৎস্য সম্পদের ওপর। এই সমস্যা আংশিক লাঘবের জন্য ১৯৯৫-৯৬ সময়কালে কুশিয়ারা নদী ও হাওরের সংযোগস্থলে কাশিমপুর ফিশ পাস (Fish Pass) নির্মাণ করা হয়। এর ফলে নদীর রুই, কাতলাসহ দেশীয় প্রজাতির মাছের মুক্ত চলাচল ও হাওরের বিলে প্রজননের পথ পুনঃস্থাপিত হয়—যা প্রমাণ করে সময়ের সাথে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বাস্তুতন্ত্রের প্রতি কিছুটা সংবেদনশীলতা যোগ হয়েছিল।

তবে ফিশ পাস নির্মাণকে বিশেষজ্ঞরা একটি আংশিক প্রতিকার হিসেবে দেখেন; কারণ প্রকল্পের ফলে পরিবর্তিত জলপ্রবাহ ও জলাভূমির পরিবেশ পুরোপুরি আগের মতো থাকেনি। ফিশ পাস নির্মাণের পরও নদী ও হাওরের প্রাকৃতিক জলজ সংযোগ আর পূর্বাবস্থায় পুনঃস্থাপিত হয়নি।

অন্যদিকে, মাতারকাপন ব্যারেজ এলাকায় নদী শাসন ও খননের ফলে সৃষ্ট বিশাল কৃত্রিম জলাধার এবং এর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ কালক্রমে স্থানীয় ও দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সেচ খাল ও প্রকল্পের ভৌগোলিক আয়তন

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পুরো মনু প্রকল্পকে কার্যকর রাখতে নদী ও হাওরজুড়ে এক বিস্তৃত অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ১০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা সেচ খাল (Canal Network), ৭টি বৃহৎ নিষ্কাশন স্লুইস (Drainage Sluices), ৯টি নিষ্কাশন সাইফন (Drainage Siphons) এবং ৩০৯টি বিভিন্ন সহায়ক ছোট-বড় প্রকৌশল কাঠামো (Structures)।

প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই ১০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল নেটওয়ার্কই ছিল পুরো প্রকল্পের প্রাণ, যার মাধ্যমেই ব্যারেজে সংরক্ষিত পানি ধাপে ধাপে বিভিন্ন রেগুলেটর অতিক্রম করে কৃষিজমিতে পৌঁছাত। নদী থেকে সংগৃহীত পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়া এবং অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সারা বছর কৃষি উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পটির মোট আয়তন ২২,৬৭২ হেক্টর (যদিও বাংলাপিডিয়াসহ কিছু তথ্যসূত্রে তা ২২,৫৮০ হেক্টর হিসেবে উল্লেখিত, যা মূলত পরিমাপ পদ্ধতি বা হিসাবের সময়ের সামান্য তারতম্যের কারণে)। এই বিশাল আয়তনের মধ্যে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১৯,২৭৮ হেক্টর এবং সরাসরি সেচ সুবিধার আওতাভুক্ত জমি ১২,১৪৬ হেক্টর।

প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট অবকাঠামোগত ভাগের হিসাব অনুযায়ী, মনু ব্যারেজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সেচ এলাকা হলো আনুমানিক ১২,০ ৯০ হেক্টর এবং কাশিমপুর পাম্প হাউসের মাধ্যমে নিষ্কাশন সুবিধার আওতায় আসা এলাকা প্রায় ৪,২৫০ হেক্টর (১০,৫০০ একর)। সার্বিকভাবে, এই সমন্বিত প্রকৌশল ব্যবস্থার ফলে ১০,০০০ হেক্টরেরও বেশি এলাকা সরাসরি বন্যা সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আসে।

(তথ্যসূত্র প্রসঙ্গে: প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশিত সরকারি নথি, বাংলাপিডিয়া, গবেষণাপত্র ও স্থানীয় তথ্যসূত্রে কিছু পরিসংখ্যানে সামান্য অমিল দেখা যায়। এই ধারাবাহিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; তবে যেখানে তথ্যভেদ রয়েছে, সেখানে তা পাঠকদের সুবিধার্থে উল্লেখ করা হয়েছে।)

কিছু মৌলিক প্রশ্ন—

চতুর্থ পর্বের এই বিবরণ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে—মনু নদী সেচ প্রকল্প নিছক একটি মাটির বাঁধ নয়; বরং এটি ৮টি পাম্পের বিশাল পাম্প হাউস, ব্যারেজ, ১০৫ কিমি সেচ খাল, স্লুইস, সাইফন, ফিশ পাস এবং ৩০৯টি বিভিন্ন প্রকৌশল কাঠামোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বিশাল জলব্যবস্থাপনা প্রকল্প।

কিন্তু এই বিশাল কারিগরি আয়োজন সত্ত্বেও একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগে—নদীকে নিয়ন্ত্রণের এই প্রকৌশলগত দর্শনে কি নদীর প্রাকৃতিক গতিশীলতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল?

এত কোটি কোটি টাকা ব্যয় এবং বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের পরও কেন কয়েক দশক ধরে প্রতি বর্ষায় বাঁধ ভাঙছে? কেন মনু নদীর তলদেশ পলি জমে ক্রমাগত ভরাট হয়ে যাচ্ছে? কেন নদীর স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা কমে আসছে? আর কেনই-বা নদী ও বাঁধের মধ্যবর্তী গ্রামগুলোর মানুষকে প্রতি বর্ষাকালে বন্যার আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়? কেন হাওর এলাকার কৃষকদের প্রতি বোরো মৌসুমে অকাল বন্যা ও ফসলহানির আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন থাকতে হয়?

মনু নদী সেচ প্রকল্পের চতুর্থ পর্বের শেষে এসে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—প্রকৌশলীরা একটি বিশাল অবকাঠামো নির্মাণে সফল হয়েছিলেন; কিন্তু নদীকে কি সত্যিই বোঝা গিয়েছিল? একটি জীবন্ত, সর্পিল, পলিবাহী এবং ক্রমাগত পরিবর্তনশীল নদীকে কেবল বাঁধ, ব্যারেজ ও পাম্পের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি? নাকি প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মকে উপেক্ষা করার ফলেই আজকের সংকট তৈরি হয়েছে?

পরবর্তী পর্বগুলোতে আমরা সেই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খুঁজব—মনু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি পরিবহন, নাব্যতার পরিবর্তন, বাস্তুতন্ত্রের রূপান্তর এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর গত পাঁচ দশকের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। গবেষণার তথ্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নথি, নদীর তলদেশে পলি জমা ও নাব্যতার ডেটা এবং নদী ও হাওর নির্ভর মানুষের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করব, প্রকল্পের প্রকৌশলগত নকশা কতটা নদীর প্রাকৃতিক চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, আর কোথা থেকে শুরু হয়েছে আজকের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট।

নূরুর রহিম নোমান, যুক্তরাজ্য

(চলবে…)

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়