ঢাকা, শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২৬,   শ্রাবণ ২৩ ১৪৩৩

আসিফ আযহার, গবেষক

প্রকাশিত: ২২:১৭, ৭ আগস্ট ২০২৬

জৈন্তিয়া রাজবাড়ি: হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

জৈন্তিয়া রাজবাড়ি। ছবিটি এআই দিয়ে এডিট করা হয়েছে।

জৈন্তিয়া রাজবাড়ি। ছবিটি এআই দিয়ে এডিট করা হয়েছে।

সিলেটের জৈন্তাপুরে অবস্থিত জৈন্তিয়া রাজবাড়ি শুধু একটি প্রত্নস্থাপনা নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন এক রাজ্যের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী। সুপ্রাচীনকাল থেকে জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজধানী ছিল জয়ন্তীপুর, বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলা সদর। ইতিহাসবিদদের মতে, দ্বাদশ শতক থেকেই জৈন্তিয়ার রাজারা এখানে বসবাস করতেন। ১৫০০ থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত রাজ্যটি সিন্টেং জনগোষ্ঠীর রাজাদের শাসনাধীন ছিল। যদিও জৈন্তিয়া পাহাড়ের নারতিয়াং পুঞ্জিতে তাদের একটি উপ-রাজধানী ছিল, তবুও মূল রাজধানী ছিল জয়ন্তীপুর।

সাধারণ বাসভবন থেকে রাজপ্রাসাদ
নিজস্ব ঐতিহ্য ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনের কারণে সিন্টেং রাজারা দীর্ঘদিন কোনো জাঁকজমকপূর্ণ রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেননি। আনুমানিক ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত তারা জয়ন্তীপুরের একটি সাধারণ পাথরের নির্মিত বাড়িতে বসবাস করতেন। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাড়িটি বর্তমান জৈন্তাপুর মডেল থানার পেছনে অবস্থিত ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে সেখানে থানা ও ডাকবাংলো নির্মিত হওয়ায় পুরোনো রাজবাড়ির আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।

ফতেহ খাঁর উদ্যোগে নতুন রাজবাড়ি
আনুমানিক ১৭৬৫ সালে জৈন্তিয়া রাজ্যের সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজা দ্বিতীয় বড়গোসাঁইয়ের ভাগিনেয় ফতেহ খাঁ। রাজার অত্যন্ত আস্থাভাজন হওয়ায় রাজ্য পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত হয়। সেই সময় তিনি জয়ন্তীপুরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের উদ্যোগ নেন।

তাঁর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৭৬৫-৬৬ সালের দিকে জয়ন্তীপুরের কেন্দ্রস্থলে একটি নতুন ও দৃষ্টিনন্দন রাজবাড়ি নির্মিত হয়। অনুচ্চ একটি টিলার ওপর বিস্তৃত সমতল তৈরি করে সেখানে রাজপ্রাসাদ ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। পুরো রাজবাড়ি ঘিরে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি সুরক্ষা প্রাচীর।

রাজবাড়ির স্থাপত্য ও বিন্যাস
রাজবাড়ির প্রধান ফটক ছিল দক্ষিণ দিকে। নিচের সমতলভূমি থেকে পাথরের প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে পৌঁছাতে হতো মূল প্রবেশপথে। সিঁড়িটি ছিল ধীরে ধীরে উঁচু হওয়া চৌদ্দটি প্রশস্ত ধাপবিশিষ্ট।

প্রধান ফটক অতিক্রম করলেই চোখে পড়ত তিন কক্ষবিশিষ্ট মূল প্রাসাদ। প্রথম কক্ষটি ছিল মেহমানখানা। পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন রাজ্য, পুঞ্জি ও পরগনার প্রধান, গোভা ও ডিমারুয়ার মতো সামন্ত রাজ্যের শাসক এবং প্রতিবেশী রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এলে এখানেই তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হতো।

দ্বিতীয় কক্ষটি ছিল সদর মহল, যেখানে রাজা এবং বিবাহিত হলে রানী বসবাস করতেন। তৃতীয় কক্ষটি ছিল অন্দর মহল, যেখানে সাধারণত রাজার বোন (রাজকুয়ঁরী) ও তাঁর স্বামী থাকতেন।

এ ছাড়া মূল প্রাসাদের বাইরে আরও কয়েকটি আবাসিক কক্ষ ছিল। রাজবাড়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল পারিবারিক মন্দির, যা আজও প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। পাশাপাশি একটি পানির কূপ (ইন্দারা), দক্ষিণের প্রধান ফটক এবং প্রাচীরের কিছু অংশ এখনও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

রাজাদের আবাস
আনুমানিক ১৭৬৬-৬৭ সালে নতুন রাজবাড়িতে রাজপরিবারের বসবাস শুরু হয়। দ্বিতীয় বড়গোসাঁই ছিলেন এর প্রথম বাসিন্দা। ১৭৭০ সালে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করে জৈন্তিয়া পাহাড়ের লখডং পুঞ্জিতে চলে গেলে নতুন রাজা হন ছত্রসিংহ। এরপর পর্যায়ক্রমে রাজা যাত্রানারায়ণ (১৭৭৪-১৭৮৫), বিজয়নারায়ণ (১৭৮৫-১৭৮৮), লক্ষ্মীসিংহ এবং দ্বিতীয় রামসিংহ এই রাজবাড়িতে বসবাস করেন।

দ্বিতীয় রামসিংহ ১৭৯০ থেকে ১৮৩২ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন এবং তিনিই এই রাজবাড়ির সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি রাজেন্দ্র সিংহ (ইন্দ্র সিংহ নামেও পরিচিত) ছিলেন জৈন্তিয়ার শেষ রাজা।

ব্রিটিশ শাসন ও রাজপরিবারের দুর্দিন
১৮৩৫ সালে ব্রিটিশরা জৈন্তিয়া রাজ্য দখল করে রাজা রাজেন্দ্র সিংহকে বন্দি করে। ১৮৬১ সাল পর্যন্ত তিনি সিলেট শহরের উপকণ্ঠে জমিদার মুরারী চাঁদের বাড়িতে গৃহবন্দি ছিলেন। এ সময় রাজপরিবারের সদস্যরা জয়ন্তীপুরের রাজবাড়িতেই বসবাস করতেন।

রাজ্য হারানোর পর রাজপরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তারা রাজবাড়ির দক্ষিণ পাশে একটি হাট প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে জৈন্তাপুর সদর বাজার হিসেবে পরিচিত। আনুমানিক ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ হাট গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বন্দি রাজার ভগ্নিপতি উখাট কুওর ও লংবর কুওর। হাটের ব্যবসায়ীরা বিক্রয়লব্ধ আয়ের একটি অংশ রাজপরিবারকে দিতেন। পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকারও রাজপরিবারের জন্য সামান্য মাসিক ভাতা চালু করে।

উত্তরাধিকার ও ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প
১৮৬১ সালে বন্দি রাজার মৃত্যুর পর তাঁর ভাগিনেয় নরেন্দ্র সিংহ রাজপরিবারের অভিভাবক হন। তিনি প্রতীকী রাজা হিসেবে রাজবাড়িতে বসবাস করতেন। ১৮৮৫ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর নাবালক নরসিংহ নৃপ ও ছত্রসিংহ নৃপকে সিলেটের জজ বাহাদুর নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে যান।

তারা ১৮৯৭ সালে রাজবাড়িতে ফিরে এলেও এর আগেই ১২ জুনের ভয়াবহ ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজবাড়ির মূল প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে যায়। তবে মন্দিরসহ কয়েকটি ছোট স্থাপনা টিকে ছিল।

শেষ অধ্যায়
পরবর্তীতে ছত্রসিংহ নৃপ ত্রিপুরা রাজপরিবারের এক কন্যাকে বিয়ে করেন। তাঁকে পাহাড় ও সমতলের মানুষ প্রতীকী রাজার মর্যাদা দিতেন এবং ব্রিটিশ সরকারও তাঁকে মাসিক ভাতা প্রদান করত। তাঁর দুই কন্যা ছিলেন মলিনা দেবী ও ইরা দেবী।

১৯৩৮ সালে ছত্রসিংহ নৃপের মৃত্যুর পর ইরা দেবী ছিলেন রাজবাড়ির শেষ বাসিন্দা। দেশভাগের পর তিনি শিলং ও জয়ন্তীপুরে যাতায়াত করতেন। সর্বশেষ ১৯৬৫ সালে তিনি দীর্ঘ সময় রাজবাড়িতে অবস্থান করেন। ১৯৮১ সালে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জৈন্তিয়া রাজবাড়ির আবাসিক ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে।

আজকের জৈন্তিয়া রাজবাড়ি
বর্তমানে রাজবাড়ির মূল অংশ ছাড়া অধিকাংশ জায়গায় বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। মূল প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, পারিবারিক মন্দির, ইন্দারা, দক্ষিণ ফটক এবং কিছু প্রাচীর এখনও অতীতের স্মৃতি বহন করছে।

রাজবাড়ির দক্ষিণে অবস্থিত ঐতিহাসিক পুকুরটি একসময় পরিত্যক্ত হয়ে পড়লেও সরকারি উদ্যোগে পুনঃখননের মাধ্যমে তা আবারও ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। একসময় রাজপরিবারের নিত্যপ্রয়োজনের পানির প্রধান উৎস ছিল এই পুকুর।

জৈন্তিয়া রাজবাড়ি আজ শুধু একটি প্রত্নস্থাপনা নয়, বরং জৈন্তিয়া রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাস, রাজপরিবারের উত্থান-পতন এবং উত্তর-পূর্ব বাংলার ঐতিহ্যের এক মূল্যবান নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও সমৃদ্ধভাবে তুলে ধরা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: গবেষক আসিফ আযহারের গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে।

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়