ঢাকা, রোববার   ১৯ এপ্রিল ২০২৬,   বৈশাখ ৬ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪:০৩, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পথে পথে ভোট, সাহসের গল্পে ব্যতিক্রমী এক নারী প্রার্থী

চা-শ্রমিকদের মধ্যে প্রচারপত্র বিতরণ করছেন সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী। ছবি: আই নিউজ

চা-শ্রমিকদের মধ্যে প্রচারপত্র বিতরণ করছেন সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী। ছবি: আই নিউজ

হাতে প্রচারপত্র, সঙ্গে অল্প কয়েকজন কর্মী। কখনও পায়ে হেঁটে, কখনও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে হাট-বাজার, গ্রাম আর চা-বাগান ঘুরে ঘুরে ভোট চাইছেন সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার জেলার একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে তার এই প্রচারণা রাজনীতির চিরচেনা দৃশ্যপটের বাইরে দাঁড়িয়ে সাহস ও দৃঢ়তার এক ভিন্ন গল্প হয়ে উঠেছে।

মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া উপজেলা) আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত এবং গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে ‘কাঁচি’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাদিয়া নোশিন। কুলাউড়া উপজেলার লস্করপুর এলাকার বাসিন্দা এই নারী প্রার্থী স্থানীয় রাজনীতির মাঠে শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় শোডাউন, ব্যয়বহুল প্রচারণা বা ক্ষমতার প্রদর্শনের রাজনীতিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না সাদিয়া নোশিন। বরং চায়ের দোকানের আড্ডা, হাটের ভিড় কিংবা চা-বাগানের শ্রমিক লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট, ন্যায্য অধিকার আর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা শোনাতেই বেশি আগ্রহী তিনি।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, মৌলভীবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী সাদিয়া নোশিন। মৌলভীবাজার-২ আসনে তার সঙ্গে আরও সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির শওকতুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর মো. সায়েদ আলী, জাতীয় পার্টির আবদুল মালিক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল কুদ্দুস, স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাস খান, ফজলুল হক খান এবং এম জিমিউর রহমান চৌধুরী।

নিজের রাজনৈতিক পথচলার কথা বলতে গিয়ে সাদিয়া নোশিন জানান, এমসি কলেজে অধ্যয়নকালেই রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। সে সময় তিনি বাসদের ছাত্রসংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের এমসি কলেজ শাখার আহ্বায়ক ছিলেন। পরবর্তীতে সিলেট নগর শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। পড়াশোনা শেষ করে ছাত্ররাজনীতি থেকে সরে এসে মূল রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি বাসদের কেন্দ্রীয় নারী সংগঠনের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রচারণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “হাট-বাজারে গিয়ে যখন প্রচারপত্র দিই, তখন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। অনেকে বলেন মেয়ে হয়ে সাহস করে দাঁড়ানোই বড় কথা। এই কথাগুলোই আমাকে আরও শক্তি আর সাহস দেয়।”

এলাকার সমস্যাগুলোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাদিয়া নোশিন বলেন, চা-শ্রমিক, খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠী দেশের নাগরিক হয়েও আজও ভূমির মালিকানার অধিকার থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে এই জনগোষ্ঠীগুলো। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভবন থাকলেও চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার যন্ত্রপাতির অভাবে মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভেঙে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আর রেলযোগাযোগের অব্যবস্থাপনায় স্টেশন ও লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

নারী উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি বলেন, “দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। এই জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।” চা-শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখেই তারা রাজনীতির মাঠে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

জয়-পরাজয়ের হিসাবের চেয়ে মানুষের কথা তুলে ধরাকেই বড় লক্ষ্য হিসেবে দেখেন এই নারী প্রার্থী। তার ভাষায়, “মানুষের দাবি সংসদে তুলে ধরাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।”

কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তার নিরবচ্ছিন্ন এই প্রচারণা ইতোমধ্যেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক ভোটারের চোখে সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী হয়ে উঠছেন ভিন্ন ধারার রাজনীতির এক প্রতীক যেখানে ক্ষমতার নয়, অগ্রাধিকার পায় মানুষের কথা।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়