ঢাকা, রোববার   ১৪ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪৩৩

রিপন দে

প্রকাশিত: ১৬:৪৫, ৮ মার্চ ২০২১
আপডেট: ০০:০৬, ৯ মার্চ ২০২১

নারী শ্রমিকদের প্রাপ্তি নেই আছে বঞ্চনা

নারী চা শ্রমিক

নারী চা শ্রমিক

চা শ্রমিকদের দুর্দশা বঞ্চনা আর কৃতদাসের জীবন সেই শুরু থেকেই। দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে সেই সাথে পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন হলেও চা বাগান যেন একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এখানে পৌঁছে না আধুনিকতার আলো, মিলে না জীবন ধারণের ন্যুনতম সুযোগ সুবিধা।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের সূত্রমতে, দেশে মোট নিবন্ধিত চা বাগান ১৬৭টি। তাতে বসবাস করেন প্রায় ১০ লাখ জনগোষ্ঠী। এসব বাগানে নিবন্ধিত শ্রমিক প্রায় ১ লাখ, অনিয়মিত শ্রমিক আরো ৪০ হাজার। দেশের মোট চা বাগানের মধ্যে ৯২ টি চা বাগানের অবস্থান মৌলভীবাজারে। 

চা শ্রমিকদের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী। মাত্র ১২০ টাকা মজুরিতে তারা প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করেন। ১২০ টাকার বেতন আর সপ্তাহে ৩ কেজি চাল বা আটা রেসন হিসেবে পান তারা। যা ৫/৬ জনের পরিবারে মৌলিক চাহিদা পূরণের অপূর্ণতার পাশাপাশি বেঁচে থাকার মত সুযোগও পাচ্ছেন না। ফলে শিশু মৃত্যু, মাতৃমৃত্যুসহ অপুষ্টির কারণে এখানে গড় আয়ুও কম। আর্থিক টানা পোড়ন নিয়ে জীবন কাটালেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চা উৎপাদন ধরে রেখেছেন চা কন্যারা।

প্রসূতী ও গর্ভবতী সেবার সক্ষমতা নেই ৯০ শতাংশ বাগানের 

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাম ভোজন কৈরী বলেন, প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ কেজি চা–পাতা তুলতে হয় নারী শ্রমিকদের। বাড়তি চা-পাতা তুললে যে পরিমাণ টাকা পাওয়ার কথা, তাও পান না বেশির ভাগ নারী। কাজের স্থানে নারী শ্রমিকদের জন্য কোনো শৌচাগার নেই। নেই বিশুদ্ধ পানি,বিশ্রামাগার কিংবা টয়লেট ব্যবস্থা। প্রতিটি বাগানে ডিসপেনসারি থাকার কথা এবং তাতে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও ৯০ শতাংশ বাগানে সেই সুবিধা নেই। ৭০/৮০ শতাংশ বাগানে নাম মাত্র থাকলে সেখানে প্যারাসিটামল আর নাপা ছাড়া কোন চিকিৎসা মিলেনা। চা নারী শ্রমিকদের সর্বরোগের ঔষধ প্যারাসিটামল।   

শিশু সদন নেই ৬০ শতাংশ বাগানে

প্রতিটি বাগানে শিশু সদন থাকার কথা থাকলে তা আছে মাত্র ৪০ শতাংশ বাগানে। ফলে ২ মাসের ছোট একটি বাচ্চাকে আরেকটি ৭/৮ বছরের বাচ্চার অধীনে রেখে কাজে যেতে হচ্ছে।

১৫ থেকে ২৫ শতাংশ নারী শ্রমিক জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকিতে

চা বাগানের নারী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করেছে এমন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে চা বাগানে নারীদের মধ্যে জরায়ূ ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের প্রার্দুভাব বেশি।

নারী চা শ্রমীকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছায় কাজ করছে “নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফোরাম”। সেই ফোরামের আহবায়ক মারজিয়া প্রভা জানান, বিভিন্ন সময়ে ভায়া টেস্টের ফলে যে তথ্য আমরা পেয়েছি তাতে বলা যায়, বাগান ভেদে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ নারী জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকিতে আছেন।

তিনি আরও বলেন, এখানে প্রজনন স্বাস্থ্যের অবস্থা ভয়াবহ। দীর্ঘ আট ঘণ্টা প্রস্রাব চাপিয়ে কাজ করতে হয়। পাতা তোলার সেকশনগুলোতে ওয়াশরুমের ব্যবস্থা নেই দেখে এভাবেই বাধ্য হয়ে কাজ করতে হয় তাদের।  এতে জরায়ু মুখ নেমে আসে। অধিকাংশ নারী এই সমস্যায় ভুগছে। মাসিকের অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা, যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অজ্ঞতা তাদেরকে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

চা বাগানে নারীদের গর্ভধারণের সংখ্যা অধিক। গর্ভবতী থাকা অবস্থায় একদিকে যেমন পরিমিত পুষ্টির অভাব, অন্যদিকে চা বাগানের কমিউনিটি ক্লিনিকে অনুন্নত ডেলিভারি ব্যবস্থা। 

জেলার মোট মাতৃ মৃত্যুর ৪৯ শতাংশ চা বাগানে 

“বাগান মায়ের জন্য” নামের প্রজেক্ট নিয়ে চা বাগানে কাজ করছে সেন্টার ফর ইনঞ্জুরি প্রিবেনশন এন্ড রিসার্জ বাংলাদেশ। প্রজেক্টে কো অর্ডিনেটর আলতাপুর রহমান জনান, বর্তমান প্রজেক্টের মোট ডাটা এখনো আমরা তৈরি করতে পারিনি। তবে আমরা কাজ করতে গিয়ে যা দেখেছি তাতে চা বাগানে মাতৃ মৃত্যুর হার অস্বাভাবিক।

তিনি জানান, আমাদের সর্বশেষ আরেকটি প্রজেক্টের তথ্য অনুসারে মৌলভীবাজার জেলার মোট মাতৃমৃত্যুর ৪৯ শতাংশ চা বাগানে।

যা বলছেন চা বাগান সংশ্লিষ্টরা 

শ্রীমঙ্গল শ্রম দপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম এসব অভিযোগ মেনে নিয়ে বলেন, চা চাষের গোড়াপত্তন থেকে এই জনগোষ্ঠীর কপালে জুটেছে শুধু অবহেলা-নির্যাতন। উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি তাদের জীবনযাত্রায়। মাত্র কয়েকটি বাগানে নামমাত্র চিকিৎসা সেবা দেয়া হলেও বেশিরভাগ বাগানে তা নেই। তবে বর্তমান সরকার তাদের জন্য অনেক কিছু করেছে এবং প্রয়োজনীয় সব কিছু করতে পরিকল্পনা নিয়েছে।

বাংলাদেশ চা সংসদ সিলেট ভ্যালির চেয়ারম্যান জি এম শিবলি জানান, গত কয়েক বছরে চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু কাজ করা হয়েছে এবং তা অব্যাহত আছে। প্রতিটি বাগানে স্কুল এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা আমরা নিশ্চিত করেছি। কিছু সমস্যা আছে তাও সমাধান হয়ে যাবে।

মৌলভীবাজার পরিবার পরিকল্পনার উপ পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক জানান, জাতীয় র্পযায়ে মাতৃ মৃত্যুর হার ১৭৩ কিন্তু মৌলভীবাজারে ২১৬। কিন্তু চা বাগানের হিসেব বাদ দিলে আমাদের অবস্থান জাতীয় পর্যায় থেকেও অনেক কম হবে। চা বাগানের এই হার সাধারণ বসতি থেকে প্রায় দুইগুণ যার কারণে আমরা এই জেলার মাতৃ মৃত্যুর হার কমাতে পারছিনা।

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়