ঢাকা, রোববার   ১৪ জুন ২০২৬,   জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪৩৩

মুজাহিদ আহমদ

প্রকাশিত: ২৩:৫১, ১৬ মার্চ ২০২১
আপডেট: ০০:১৫, ১৭ মার্চ ২০২১

আকমল হোসেন নিপুর জন্মদিন : উচ্ছ্বাসে-উল্লাসে ভরে উঠুক

আকমল হোসেন নিপু আক্ষরিক অর্থেই একজন মাটির মানুষ। কোনো ঝাল-জেদ নেই। কথা-কবিতা যাপনই যার লক্ষ্যগুলোর একটি এবং এ লক্ষেই অনেকটা স্থির। যান্ত্রিক যন্ত্রণা থেকে সময় বের করে অক্ষর নিয়েই খেলেন, শব্দ দিয়ে লিখেন তাড়িত-পীড়িত মানুষের ভিতর বাহির। মাঝে মাঝে নিজেকেও আঁকেন সেই অক্ষরে, শব্দে।

অতি মাত্রার নীরব এই মানুষটিকে যতদিন হয় দেখছি- দেখে আসছি জীবনের ছোটো-বড় দাগ, রেখাচিহ্নগুলো কাগজ-কলমে মুড়িয়ে সময়ের জন্য তুলে রাখছেন গূঢ়-নৈঃশব্দ্যে। মাঝে মাঝে পেছনের দিকেও তাকান তিনি কিন্তু কতটা সময় দীর্ঘ হয় সে তাকানো পরিমাপ করা যায়না।

অনেকটা সচেতনভাবেই ধরা দেননা সময়ের কাছে, স্বজনের কাছে। পাঠ ও পঠনের পাড় ধরে হাঁটতে পছন্দ করেন।হাঁটেন কখনো একা কখনো কানের কাছে শিষ দেওয়া ভোরের পাখির সাথে।তবে- মেকি অথবা আরোপিত সভা-সমিতি তাকে খুব একটা টানে না। তিনিও চান না এসবের সাথে ঘেঁষতে-মিশতে। পছন্দ করেন না প্রদর্শন কিংবা প্রদর্শিত হতে। পোশাকী হৈচৈ, হৈ-হুল্লোড় থেকে দূরে থাকতে, সরে থাকতে চেষ্টা করেন। ভীড়ে নেই স্বভাবের এই মানুষটির ৫৯তম জন্মদিন ছিলো ১৫ মার্চ । আসুন, জন্মদিনকে বিশেষ দিন-দিবস হিসেবে না দেখা মানুষটিকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাই।

দুই অগ্রজ- মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক পান্না দত্ত ও কবি নুরুল নাভেদ (নুরুল ইসলাম)-এর সাথে শলা-পরামর্শ হলো, বইয়ের কোরাস আয়োজিত বইমেলা প্রাঙ্গণেই গত বছরের মতো এবারও কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু'র জন্মদিন পালন করা হবে। তবে খুব নীরবে-

ঘুঘু পাখির মতো পদক্ষেপে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। খুব গোপনে প্রস্তুতি।নিপু ভাই যেনো বিষয়টি না জানেন। ঘুনাক্ষরে টের পেলেই হলো- শহর ছেড়ে পালাবেন। টেলিফোনে- কাউকে আড্ডা, কাউকে কবিতা পাঠ, কাউকে এমনিতে বসবো, গল্প করবো এমনটি বলে আমন্ত্রণ জানানো হলো বইমেলা প্রাঙ্গণে আসার। মাত্র কয়েক জনকে বলা হয়েছে আকমল হোসেন নিপুর জন্মদিন, আসুন জড়ো হয়ে সকলে মিলে শুভেচ্ছা জানাবো। এইতো এই ছিলো প্রস্তুতি। এর বেশি প্রস্তুতি নেওয়া যায়নি-কারণ, যাকে নিয়ে আয়োজন তিনি তো এসব পছন্দ করেন না।তাঁকে ঘিরে কোনো আয়োজনে বরাবরই অনাগ্রহ দেখিয়েছেন, এড়িয়ে গেছেন।

সহকর্মীদের সাথে সাংবাদিক আকমল হোসেন নিপু। ছবি : মুজাহিদ আহমদ

আকমল হোসেন নিপুর অসংখ্য পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষি, বন্ধু-স্বজন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন।আমাদের আয়োজন বড় হয়নি, সামগ্রিক হয়নি বলে কষ্ট পাচ্ছেন, অতৃপ্তি প্রকাশ করছেন অনেকেই। চাইছেন আকমল হোসেন নিপুকে নিয়ে বড় করে আয়োজন হোক, পার্টি হোক, আড্ডা হোক। আমরাও চাই। নিপু ভাইকে নিয়ে বড় করে অনুষ্ঠান হোক। কিন্তু কথা হলো- নিপু ভাইকে নিয়ে কোনো অনুষ্ঠান করতে গেলে তিনি অস্বস্তিবোধ করেন। এসবে তো তিনি সায়-সম্মতি দেন না বা দিলেও অনেক সময় ক্ষেপণ করেন। আমরা ছোটোখাটো এসব আয়োজন করে তাঁকে অভ্যস্ত করে তুলবার চেষ্টা করছি বা মহড়া দিচ্ছি বলা চলে।মন খারাপের কিছু নেই- আসুন, উদ্যোগ নিন, সাথে থাকবো, আকমল হোসেন নিপুর জন্মদিনোত্তর আনন্দ আড্ডার ব্যবস্থা করুন। আমরা জমিয়ে একটা দিন উপভোগ করি, হাসি উল্লাস করি।নিপু ভাইকে ঘিরে, তাঁর সাহিত্য কর্মকে ঘিরে দিনপ্যাপী কথা হোক। পাশাপশি মুখরোচক কিছু খানাপিনাও করি।দায়িত্ব নিয়ে সামনে আসুন।

১৫ মার্চ বেলা আড়াইটা। জানলাম বিষয়টি নিপু জেনে গেছেন এবং তিনি গবেষক আহমদ সিরাজের বাড়ি কমলগঞ্জের পথে রওয়ানা হচ্ছেন- তখন মাথার ওপর সূর্যটা খুলে পড়লো যেনো। পুনরায় কবি নুরুল নাভেদের সাথে কথা বললাম, তিনি আশ্বস্ত করলেন যেভাবেই হোক নিপু ভাইকে আটকাবেন- এই আশ্বাসে স্বস্তি পেলাম।

সন্ধ্যায় নিপু ভাইকে শুভেচ্ছা জানাতে একে একে জড়ো হন- মৌলভীবাজার পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক, সাহিত্যের ছোটো কাগজ 'ফসল' সম্পাদক মুহাম্মদ আবদুল খালিক। বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের অবৈতনিক সাধারণ সম্পাদক, কবি সৈয়দ মোসাহিদ আহমদ চুন্নু। মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি, ছড়াকার আবদুল হামিদ মাহবুব। মৌলভীবাজার জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা, লেখক জসিম উদদীন মাসুদ। মৌলভীবাজার সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, মো. মোতাহার বিল্লাহ। মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সহ সভাপতি, অশোক কুমার দাস। সাধারণ সম্পাদক পান্না দত্ত। ইলেকট্রনিক্স জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন (ইমজা)এর সাধারণ সম্পাদক বকসী মিছবাউর রহমান। সাহিত্যের ছোটো কাগজ 'অনার্য'র প্রধান সম্পাদক ও সমকালের সাংবাদিক নুরুল নাভেদ। সময় টেলিভিশনের মৌলভীবাজর প্রতিনিধি শাহ অলিদুর রহমান। সাপ্তাহিক মনুবার্তা সম্পাদক মো. জসিম উদ্দন। আকমল হোসেন নিপুর ঘর-সংসারসঙ্গী শিক্ষক ফাতেহা বেগম উর্মি। কবি ও শিল্পী নির্বেন্দু নির্ধুত তপু।প্রগতী লেখক সংঘ মৌলভীবাজারের সাধারণ সম্পাদক কবি মহিদুর রহমান। প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও কবি জাহাঙ্গীর জয়েস। সাহিত্যের ছোটো কাগজ 'স্বনন' সম্পাদক, কবি সুনীল শৈশব। শিক্ষক ও শিল্পী চৈতালী ভট্টাচার্য। প্রাক্তন ছাত্রনেতা ইফ্ফাত আরা নিপা। সাপ্তাহিক পূর্বদিকের সহযোগী সম্পাদক কবি সালাহউদ্দিন ইবনে শিহাব। সাংবাদিক ও সংগঠক আব্দুর রব, সাহিত্যের ছোটো কাগজ সম্পাদক 'দাহপত্র' সম্পাদক, কবি অপূর্ব সোহাগসহ লেখক, পাঠক, আকমল হোসেন নিপুর শুভাকাঙ্ক্ষী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ।

অনাড়ম্বর এই আয়োজন চলতে থাকে। কথা বলতে থাকেন উপস্থিত প্রায় সকলেই। সর্বশেষ কথা বলেন এবং কেক কাটেন যাকে নিয়ে আমাদের এতো উচ্ছ্বাস, আনন্দ, উল্লাস সে মানুষ আকমল হোসেন নিপু। তিনি তাঁর সদ্য লেখা একটি কবিতাও পড়ে শোনান।

কর্মস্থলে কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আকমল হোসেন নিপু

উল্লেখ্য, ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে ১৫ মার্চ আকমল হোসেন নিপুর জন্ম। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের ধাইসার গ্রামেই তাঁর প্রথম মাটিতে পা ফেলানো । গ্রাম, প্রাণ-প্রকৃতি আর নাগরিক আবহেই বেড়ে ওঠেছেন এই কথাসাহিত্যিক।বর্তমানে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ: গল্পের বই- জলদাসের মৎস্য ঘ্রাণ (১৯৯৮), বুড়ি চাঁদ ডুবে যাবার পরে (২০০৩), আমরা খুব খারাপ সময়ে বেঁচে আছি (২০০৬), সাদা কাপড়ের শোক (২০১০), রাতটা পূর্ণিমার ছিল (২০১৬), তার চোখের সামনে (২০১৭)  কবিতার বই: মেঘে যে তোমার বাড়ি (২০০৪), দুঃখের কোনো প্রতিবেশী নেই (২০১৬) উপন্যাস: হলুদ পাখির ডাক অথবা অন্ধকারের নদী (২০০৮), ভূমিপুত্র অথবা হাওর পূরাণ (২০০৯), হীরামতি ও তার রাঁধুনীকাল (২০১৬), হাড়ের পাখি (২০১৮) এবং আপাতত মলাটবদ্ধ সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ- আকমল হোসেন নিপুর নির্বাচিত গল্প(২০২০)। আকমল হোসেন নিপুর সুস্থ, দীর্ঘ জীবন কামনার পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিকর্মের প্রসারতা প্রত্যাশা করছি। উচ্ছ্বাসে-উল্লাসে ভরে উঠুক এই কথাসাহিত্যিকের বাকিটা জীবন।

মুজাহিদ আহমদ, লেখক, কবি ও সাংবাদিক

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়