ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ এপ্রিল ২০২৬,   বৈশাখ ১০ ১৪৩৩

প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, কমলগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০:০৯, ২৩ নভেম্বর ২০২১

কমলগঞ্জে খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী ‘খাসি সেং কুটস্নেম’ উৎসব পালিত

খাসি সেং কুটস্নেম অনুষ্ঠানে নৃত্যরত খাসিয়া তরুণ-তরুণীরা। ছবি- আইনিউজ

খাসি সেং কুটস্নেম অনুষ্ঠানে নৃত্যরত খাসিয়া তরুণ-তরুণীরা। ছবি- আইনিউজ

আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০ টায় শুরু হলেও মূল পর্ব শুরু হয় বেলা ৩টায়। ফুটবল মাঠের একপ্রান্তে বাঁশের খুঁটির উপর প্রাকৃতিক পরিবেশে নারিকেল গাছের পাতার দিয়ে ছাউনী দিয়ে আলোচনা সভার মঞ্চ তৈরি করা হয়। খাসিয়া আদিবাসী ভাষায় এ অনুষ্ঠানকে বলে ‘খাসি সেং কুটস্নেম’।

এ অনুষ্ঠানটি হচ্ছে ‘খাসি সেং কুটস্নেম’ (Khasi Seng Kutsnem)। দেশব্যাপী খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী 'খাসি সেং কুটস্নেম' উৎসব (বর্ষবরণ) পুঞ্জিগুলোতে মঙ্গলবার উৎসবের আমেজে উৎসবে মিলিত হয় তারা এই দিনে। বর্ণিত সাজে খাসিয়া সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েরা সাজে তারা। এ উৎসবের মাধ্যমে তাদের বিলুপ্ত প্রায় সংস্কৃতি ও খেলাধূলাকে তুলে ধরা হয়।

আদিবাসী খাসিয়াদের বর্ষবিদায় উৎসবের মূল আকর্ষণ ঐহিত্যবাহী খাসি পোশাক পরে মেয়েদের নাচ-গান, তৈল যুক্ত একটি বাঁশে উঠে উপরে রাখা মুঠোফোন গ্রহণ, দুটি পুকুরে বড়শী দিয়ে মাছ শিকার, তীর ধনুক খেলা, গুলতি চালানো বিভিন্ন ধরণের তাদের নিজস্ব ভাষাতে গান গেয়ে অতিথিদের আনন্দ দেওয়া হয়। বেশ বড় আকারে মেলাসহ নানা আয়োজন করা হয়েছে।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও কমলগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মাঠে মাগুরছড়া পুঞ্জির ইয়োথ ক্লাবের উদ্যোগে খাসিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জিডিসন প্রধান সুচিয়াঙ এর সভাপতিত্বে ও লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জি প্রধান ফিলা পত্মীর সঞ্চালনায় আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মণিপুরী সমাজ কল্যাণ পরিষদের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আনন্দ মোহন সিংহ। আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু, চা শ্রমিক নেতা পরিমল বাড়াইক প্রমুখ।

খাসিয়া আদিবাসী ভাষায় এ অনুষ্ঠানটি হচ্ছে 'খাসি সেং কুটস্নেম'। চায়ের রাজধানী খ্যাত পর্যটন নগরী মৌলভীবাজারে বসবাস করেন নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ। এ জনপদে রয়েছে বহুভাষা ও বৈচিত্র্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক আবহ। মৌলভীবাজার জেলায় যে কয়টি সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন তার মধ্যে খাসিয়া সম্প্রদায় একটি। এখানের খাসিয়ারা মূলত সিনতেং গোত্রভুক্ত জাতি। তাদের জীবিকার প্রধান উৎস পান চাষ। ভাত ও মাছ তাদের প্রধান খাদ্য। তারা মাতৃপ্রধান পরিবারে বসবাস করে। তাদের মধ্যে কাঁচা সুপারি ও পান খাওয়ার প্রচলন খুব বেশি।

খাসিয়াদের উৎপাদিত পান (খাসিয়া পান নামে পরিচিত) বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয়। এ অঞ্চলের অন্যান্য আদিবাসীর মতো একটি প্রাচীন সম্প্রদায় হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছে। পাহাড়ের পাদদেশে বিভিন্ন টিলা এলাকায় তাদের বসবাস।.

দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করলেও তারা অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। খাসিয়ারা এক সময় প্রকৃতির পূজারী হলেও বর্তমানে খ্রিস্টান ধর্মালম্বী অনুসরণ করছেন, তবে সিলেটের জৈন্তা এলাকায় কিছু খাসিয়ারা এখনোও প্রকৃতির পূজা করে থাকেন। খাসিয়াদের মাতৃভাষা খাসি, বর্তমানে এদের কোন লিখিত কোনো ভাষা নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে এক সময় তাদের লিখিত ভাষা ছিল কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে।

উৎসব উপলক্ষে খাসি সোশ্যাল কাউন্সিল বিভিন্ন কর্মসূচি ছিলো। সেং কুটস্নেম উৎসবের দিনব্যাপী সবাই মিলে মাছ শিকার, ঐতিহ্যগত খেলাধুলা, ঐতিহ্যগত পোশাক পরিধান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনাসহ ঐতিহ্যবাহী খাবার খেয়ে তারা আনন্দ ফুর্তি করে নিজেদের সামাজিক সম্পর্কে সুদৃঢ় করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হন। সেং কুটস্নেম উপলক্ষে মাগুরছড়া পুঞ্জির মাঠে বসেছে ঐতিহ্যগত মেলা।

বৃহত্তর সিলেটে প্রায় ৮০টির মতো খাসিয়া পুঞ্জি রয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি খাসিয়া পুঞ্জির খাসিয়ারা কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির খাসি সেং কুটস্নেম অর্থাৎ বর্ষবরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

খাসিয়া সম্প্রদায়ের পাশাপাশি এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বাঙালি ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষসহ দেশী-বিদেশী পর্যটকরা অংশগ্রহণ করে থাকেন। তবে মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুভাবের কারণে গত বছর ২০২০ সালে খাসিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান খাসি সেং কুটস্নেম উদযাপিত হয়নি।

খাসিয়াদের সম্পর্কে জানতে দেখতে পারেন আইনিউজের বিশেষ ভিডিও প্রতিবেদন-

বর্ষপুঞ্জি অনুযায়ী ১৫৭তম বর্ষকে বিদায় ও ১৫৮তম বর্ষকে বরণ করে নিলো খাসিয়া জনগোষ্ঠী। ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ২৩ নভেম্বর খাসি বর্ষ বিদায় ‘খাসি সেং কুটস্নেম’ পালন করা হয়। পরদিন ২৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয় খাসি বর্ষবরণ।

মাগুরছড়া পুঞ্জির মন্ত্রী ও খাসি সোশ্যাল কাউন্সিল এর সভাপতি জিডিশন প্রধান সুচিয়াং জানান, খাসি সেং কুটস্নেম উপলক্ষে এখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

আইনিউজ/প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ/এসডি

আইনিউজ ভিডিও-

মৌলভীবাজারে খাসি জনগোষ্ঠীর পানজুম ধ্বংস ও শারীরিক আঘাতের প্রতিবাদ

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়