মায়মুন শরীফ রাইয়ান
যে ক্ষুধা কখনো মেটে না
লেখক: মায়মুন শরীফ রাইয়ান
আপনি কি কখনো লক্ষ করেছেন- কিছু একটা না বুঝলে মনের ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নেয়? এটা ঠিক দুঃখও না, ঠিক চাওয়াও না-এর মাঝামাঝি কিছু। যেন মাথার ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য চুলকানি, যা কেবল উত্তর খুঁজে পেলেই থামে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল একে সহজ ভাষায় বলেছিলেন: “সব মানুষ স্বভাবগতভাবেই জানতে চায়।” হাজার বছর আগে লেখা এই বাক্যটি আজও মানুষ হওয়ার অর্থকে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালীভাবে ধারণ করে। জানার এই কৌতূহল কোনো বিলাসিতা নয়; এটাই সেই পথ, যার ভেতর দিয়ে মানুষ এক অনিশ্চিত পৃথিবীতে নিজের বোধের একটি ঘর তৈরি করে।
গত দুই দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কে কৌতূহলের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করছেন, এবং তাদের আবিষ্কার বিস্ময়কর। যখন কেউ উপলব্ধি করে যে তার জানা আর না-জানার মধ্যে একটি ফাঁক আছে, তখন মস্তিষ্কের পুরস্কারকেন্দ্র সক্রিয় হয়ে ওঠে- ঠিক সেই অংশ, যা সুস্বাদু খাবার, প্রিয় সুর বা প্রিয়জনের সান্নিধ্যে জ্বলে ওঠে। অর্থাৎ কৌতূহল কেবল একটি মানসিক অভ্যাস নয়; এটি আমাদের স্নায়বিক কাঠামোর ভেতরে প্রোথিত এক বাস্তব চাহিদা।
মনোবিজ্ঞানী জর্জ লোয়েনস্টাইন দেখিয়েছেন, কৌতূহল সম্পূর্ণ অজ্ঞতা থেকে জন্মায় না; বরং জন্মায় তখন, যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের জ্ঞানের ভেতর একটি নির্দিষ্ট শূন্যতা আছে। একটি শিশু পাথরের নিচে কী আছে জানে না- তাই সে সেটি তুলে দেখে। একজন বিজ্ঞানী প্রায় বুঝে ফেলেছেন- কিন্তু পুরোপুরি নয়-; তাই তিনি সেই ফাঁক পূরণে ব্যাকুল হন। এই ফাঁক যেন এক ছোট্ট ক্ষত; আর জ্ঞান হলো তার ওষুধ। যখন অবশেষে আমরা বুঝতে পারি, সেই মুহূর্তের স্বস্তি শুধু অনুভূতিই নয়- বিজ্ঞানীরা সেটিকে মস্তিষ্কে পরিমাপ করতেও সক্ষম।
তবে শেখার আকাঙ্ক্ষা শুধু জীববিজ্ঞান বা মনোবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এর গভীরে রয়েছে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক মাত্রা, যা ইতিহাসের গতিপথকে বারবার বদলে দিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শেখার অধিকার ছিল সংগ্রামের বিষয়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের আগে দাসপ্রথার যুগে দাসদের পড়তে শেখা আইনত নিষিদ্ধ ছিল। কারণ ক্ষমতাসীনরা জানতেন, জ্ঞান ও দাসত্ব একসঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ইতিহাসে আমরা বারবার দেখি- বই নিষিদ্ধ করা হয়, গ্রন্থাগার পোড়ানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রশ্ন করতে শেখা জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
স্বৈরাচারীরা তা সবসময় বুঝেছে; স্বাধীন সমাজ মাঝেমধ্যে তা ভুলে যায়।
ফ্রেডেরিক ডগলাস শিশু বয়সে দাসত্বের মধ্যেই গোপনে পড়তে শিখেছিলেন। পরে তিনি লিখেছিলেন, সাক্ষরতাই ছিল তার স্বাধীনতার পথ। এটি কোনো অলংকারমূলক বক্তব্য ছিল না। শেখা তাকে দেখিয়েছিল- তার অবস্থান স্বাভাবিক বা অপরিবর্তনীয় নয়; এটি মানুষের তৈরি, এবং মানুষের তৈরি জিনিস মানুষই বদলাতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, জ্ঞানের ক্ষুধা ও মর্যাদার ক্ষুধা আসলে একই স্রোতের দুটি রূপ।
সব কৌতূহল একরকম নয়।মনোবিজ্ঞানীরা অন্তত দুটি প্রধান রূপের কথা বলেন। প্রথমটি “বিচিত্র কৌতূহল”- এক ধরনের অস্থির, ক্ষুধার্ত আগ্রহ, যা এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ের দিকে ছুটে যায়। দ্বিতীয়টি “জ্ঞানমূলক কৌতূহল”- গভীর, ধৈর্যশীল, এবং সত্যিকার বোঝার প্রতি নিবেদিত। প্রথমটি আপনাকে বইয়ের দোকানে দোকানে ঘুরিয়ে রাখে; দ্বিতীয়টি আপনাকে গভীর রাতে একটি পাদটীকার সূত্র ধরে আরেকটি বইয়ে নিয়ে যায়, যেখানে নতুন করে আরও প্রশ্ন জন্ম নেয়।
এর পাশাপাশি আছে “সহানুভূতিশীল কৌতূহল”- অন্য মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা। এই কৌতূহলই মহান সাহিত্যকে সম্ভব করে তোলে। এ কারণেই ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন শতাব্দীতে লেখা একটি উপন্যাসও আমাদের কাছে আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমরা কেবল তথ্য জানতে চাই না; আমরা জানতে চাই- অন্য কেউ হয়ে থাকা কেমন।
যদি শেখার তাড়না এতটাই মৌলিক হয়, তাহলে কেন তা এত সহজে নিস্তেজ হয়ে যায় বলে মনে হয়? যে শিশুরা হাজার প্রশ্ন নিয়ে স্কুলে প্রবেশ করে, তারা কীভাবে ধীরে ধীরে প্রশ্নহীন হয়ে বের হয়? এর উত্তর অস্বস্তিকর। মুখস্থনির্ভর ও নিয়মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের শেখায় তথ্য পুনরাবৃত্তি করতে, প্রশ্ন করতে নয়। দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য ছোট অভিজ্ঞতার মাধ্যমে একটি নীরব বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়- জ্ঞান একটি স্থির ভান্ডার, যা গ্রহণ করতে হবে; এটি কোনো জীবন্ত, পরিবর্তনশীল ও বিতর্কযোগ্য প্রক্রিয়া নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা জানার ভান করতে শেখে, সত্যিকার অর্থে জানতে নয়। তবু এটিও সত্য যে, সব শিক্ষক বা সব শিক্ষাপ্রয়াস একরকম নয়; অনেকেই এখনো শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, ভিন্নভাবে ভাবতে, এবং কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট। আর এই প্রচেষ্টাগুলোই আমাদের আশাবাদী করে।
সংস্কৃতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেখানে বৌদ্ধিক কৌতূহলকে অদ্ভুত বা অস্বস্তিকর মনে করা হয়, কিংবা প্রশ্ন করাকে কর্তৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে শেখার ক্ষুধা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। মানুষ সামাজিক প্রাণী; গ্রহণযোগ্যতার আকাঙ্ক্ষা প্রবল। যদি গ্রহণযোগ্য হতে হলে নিশ্চিততার অভিনয় করতে হয়, তবে অনেকেই সত্যিকারের কৌতূহল বিসর্জন দেয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক এক সংকট- তথ্যের অতিরিক্ততা। এমন এক যুগে আমরা বাস করছি, যেখানে প্রায় যেকোনো প্রশ্নের উত্তর মুহূর্তে পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু গবেষক দেখাচ্ছেন, এতে জন্ম নিচ্ছে “জ্ঞানীয় অলসতা”- উত্তর খুঁজে পাওয়ার সক্ষমতাকে বোঝার সমতুল্য মনে করার প্রবণতা। আমরা দ্রুত জানতে পারি, কিন্তু গভীরভাবে বুঝতে পারি কি? স্ক্রিনে স্ক্রল করে আমরা সাময়িকভাবে কৌতূহল মেটাই, কিন্তু সেই তৃপ্তি ক্ষণস্থায়ী।
তবুও জানার ক্ষুধা কখনো সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। এটি কখনো চাপা পড়ে, কখনো পথ বদলায়, কিন্তু হারিয়ে যায় না। মধ্যবয়সে হঠাৎ জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রেমে পড়া মানুষ, অবসরে নতুন ভাষা শেখা শিক্ষক, বা দুপুরের বিরতিতে দর্শন পড়া শ্রমিক- এরা ব্যতিক্রম নয়; এরা মানব প্রকৃতিরই স্বাভাবিক প্রকাশ।
গবেষণা বলছে, কিছু নির্দিষ্ট পরিবেশে কৌতূহল সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়। স্বাধীনতা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ- মানুষ তখনই গভীরভাবে শেখে, যখন সে কী ও কীভাবে শিখবে সে বিষয়ে কিছুটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সম্প্রদায়ও জরুরি- আলোচনা, বিতর্ক ও যৌথ অনুসন্ধান জ্ঞানকে গভীর করে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থবোধ- যখন একটি প্রশ্ন ব্যক্তিগতভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে, তখন শেখার মান সম্পূর্ণ বদলে যায়।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়- কৌতূহল বিস্ময় থেকে পুষ্টি পায়, আর নিশ্চয়তা থেকে ক্ষুধার্ত থাকে। যারা বৌদ্ধিকভাবে জীবন্ত, তারা সাধারণত না-জানার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন- কখনো কখনো তা উপভোগও করেন। প্রাচীন সক্রেটিক ঐতিহ্য এই সত্যটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিল: প্রকৃত জ্ঞান শুরু হয় নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করার মাধ্যমে। যে মুহূর্তে আমরা মনে করি আমরা সম্পূর্ণ বুঝে গেছি, সেই মুহূর্তেই শেখা থেমে যায়। অনিশ্চয়তা, সঠিকভাবে গ্রহণ করলে, জ্ঞানের অভাব নয়- এটাই জ্ঞানের জন্মস্থান।
জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভেতরে প্রায় আধ্যাত্মিক এক অনুভূতি কাজ করে- মহাবিশ্ব যেন শুধু বাস করার স্থান নয়, বরং পাঠ করার এক বিশাল রহস্যগ্রন্থ। ইতিহাসের প্রতিটি সভ্যতা নিজস্বভাবে এই রহস্যের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। বিজ্ঞান সেই প্রাচীন অনুসন্ধানেরই আধুনিক ও সুসংগঠিত রূপ। প্রশ্নগুলো বদলেছে, পদ্ধতি বদলেছে- কিন্তু জানার তাড়না একই রয়ে গেছে।
এই তাড়না শেষ পর্যন্ত আমাদের চেতনার প্রকৃতি সম্পর্কে এক গভীর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। আমরা এমন সত্তা, যারা শুধু বেঁচে থাকি না, বরং বেঁচে থাকার অর্থ নিয়ে ভাবি; যারা শুধু পৃথিবী দেখি না, বরং প্রশ্ন করি- এটি এমন কেন; যারা শুধু টিকে থাকতে চাই না, বরং বুঝতে চাই। এই প্রবণতা কখনো অস্বস্তিকর, কখনো অশান্তিকর- কিন্তু এটাই হাজারো সৃষ্টির উৎস: কবিতা, গণিত, স্থাপত্য, চিকিৎসা, প্রযুক্তি- সবকিছুর পেছনে এই একই তাড়না কাজ করে।
তথ্যের প্রাচুর্যের এই যুগে মাঝে মাঝে মনে হতে পারে, জানার কাজ প্রায় শেষ। বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া হয়ে গেছে, এখন কেবল সূক্ষ্ম বিবরণ বাকি। বাস্তবতা ঠিক উল্টো। আমরা যত বেশি জানি, তত স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি- অজানার পরিধি আরও গভীর, আরও বিস্তৃত । প্রতিটি উত্তরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে নতুন প্রশ্নের বীজ।
এটি হতাশার কারণ নয়, বরং আশার। কারণ সত্যিকারের কৌতূহলী মানুষের জন্য এর অর্থ একটাই: জানার যাত্রা কখনো শেষ হবে না। পৃথিবী, মনোযোগ দিয়ে দেখলে, অফুরন্ত। এই মুহূর্তেও হয়তো কোথাও কোনো শ্রেণিকক্ষে, কোনো নীরব লাইব্রেরিতে, কিংবা গভীর রজনীর নিস্তব্ধতায়- কেউ একটি অজানা প্রশ্নের দিকে ঝুঁকে আছে। সে অনুভব করছে সেই পরিচিত টান- বোঝার আকর্ষণ। জ্ঞানের প্রতি মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা মানুষের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি যা তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে। আর এ কারণেই জ্ঞানের পিপাসা কখনো মেটেনা, বরং বাড়ে।
লেখক- প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড সরকারি মডেল কলেজ
ইএন/এসএ
- বাংলাদেশে শিশু শ্রম: কারণ ও করণীয়
- পনেরো আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্ধ
মোশতাক বললেও মন্ত্রীদের কেউ সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের সঙ্গে যায়নি! - ২০২৩ সালে কী সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
- করোনা যেভাবে চিকিৎসকদের শ্রেণীচ্যুত করলো
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
- ফিলিস্তিনে প্রাণ হারাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কুকুর স্থানান্তরকরণ ও ভবিষ্যৎ
- শরীফার গল্প পড়তে আমাদের এতো কেন সমস্যা?
- মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যমের ভূমিকা
- রেমডেসিভির একটি অপ্রমাণিত ট্রায়াল ড্রাগ
























