Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, বুধবার   ২৫ মার্চ ২০২৬,   চৈত্র ১১ ১৪৩২

সংগ্রাম দত্ত

প্রকাশিত: ১৭:৪৬, ২৫ মার্চ ২০২৬

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কোনো একদিনে গড়ে ওঠেনি। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরেই বাঙালি জাতি অর্জন করেছে স্বাধীনতা। জাতীয় এই গৌরবময় ইতিহাসে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মতো মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই অঞ্চলের বহু সংগ্রামী মানুষের অবদান এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে।

শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামের রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে চার দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত থেকে দৈনিক সংবাদসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখির মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনা ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। ষাটের দশক থেকেই তিনি ছিলেন একজন সাহসী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক।

১৯৬৩ সালে শ্রীমঙ্গলে বালিশিরা পাহাড় কৃষক আন্দোলনে তিনি অন্যতম সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। বালিশিরা পাহাড় পুনরুদ্ধার কমিটির নেতৃত্বে থেকে স্থানীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই আন্দোলনকে সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সেই সময়ের দুই সহযোদ্ধা নেতা আজ আর বেঁচে নেই, তবে তিনি এখনো সেই আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে চলেছেন।

শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল দায়ের করা পাকিস্তান ভাঙার অভিযোগে তথাকথিত “জয় বাংলা” মামলাও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতার আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে পাকিস্তান সরকার ওই সময় শ্রীমঙ্গলের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, ন্যাপ নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম এবং এস এ মুজিব।

এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শ্রীমঙ্গলজুড়ে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলন দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং শেষ পর্যন্ত জনরোষের মুখে কর্তৃপক্ষ তাদের নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী শ্রীমঙ্গলে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন এবং একটি মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্যাম্পে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত সরকারকে সহযোগিতা করায় তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে সম্মানসূচক সনদও লাভ করেন।

তবে এসব অবদান সত্ত্বেও তিনি এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাননি। শ্রীমঙ্গল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটির সভাপতি সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এমপি ও কমিটির কয়েকজন সদস্য তাঁর আবেদনের বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য লিখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে প্রতিবেদন পাঠান। ফলে তিনি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।

স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে প্রধান বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। স্থানীয় জনগণ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অনুরোধে তিনি শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

ন্যাপ নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়াও ছিলেন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় এক কর্মী। সীমিত আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যেও তিনি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে এবং জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এম এ রহিম ১৯৬৮ সালে শ্রীমঙ্গল থানায় ছাত্রলীগের থানা কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলে ছাত্ররাজনীতির একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয় এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী হয়। তাঁর জনপ্রিয়তাও ছিল তুঙ্গে। পরবর্তীকালে তিনি ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে পরপর দুইবার শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। ছাত্রলীগ নেতা এস এ মুজিব মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তী সময়েও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই তিনজন নেতাই জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শ্রীমঙ্গলের মানবিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও কয়েকজন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পৌরসভার সাবেক কমিশনার শহিদুল আলম স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন এবং স্থানীয় মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ রইস মিয়া, যিনি স্থানীয়ভাবে ময়না মিয়া নামে পরিচিত, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় মানুষকে সংগঠিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

আওয়ামী লীগ নেতা কমলেশ ভট্টাচার্য ১৯৭১ সালে গঠিত সংগ্রাম পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সংগঠন গড়ে তোলা ও সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে গিয়ে তিনি নিজের সহায় সম্পত্তি পর্যন্ত বিক্রি করে দলীয় কর্মকাণ্ডে ব্যয় করেছিলেন। বর্তমান সময়ে যখন চারদিকে লুটপাটের নানা অভিযোগ উঠে আসে, তখন তাঁর সেই আত্মত্যাগী ভূমিকা অনেকের কাছেই এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও শ্রীমঙ্গলের চিকিৎসকদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। আওয়ামী লীগ নেতা ডা. রমা রঞ্জন দেব ভারতে অবস্থান করে শরণার্থী শিবিরে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। একই সময়ে ডা. সুধাংশু রঞ্জন দাশও শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সহায়তা দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর দেওয়া সনদ ও প্রত্যয়ন ব্যবহার করা হলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ ইসমাইল হোসেনও স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সংগঠনের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করলেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতার কথাও উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলা যাচাই বাছাই কমিটির সভাপতি সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এমপি এবং কমিটির কয়েকজন সদস্য "মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি" মর্মে মন্তব্য লিখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠান বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। এর ফলে রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, এম এ রহিম, মোহাম্মদ শাজাহান মিয়া, মোঃ রইস মিয়াসহ আরো অনেক আবেদনকারী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন। বয়সজনিত দুর্বলতা, অসুস্থতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকেই পরে আপিল প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরাও আইনি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে আসতে পারেননি।

তবে রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়। অশীতিপর এই প্রবীণ ব্যক্তি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আপিল আবেদন করেন। তাঁর বড় ছেলে সংগ্রাম দত্ত ২০২৪ সালের ১৯ মে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ফ ম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি শুনানির অনুরোধ জানান। পরে বিষয়টির অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটির কার্যক্রমে কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে। সচেতন মহলের মতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ এবং প্রকৃত অবদানকারীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জাতীয় দায়িত্বের অংশ।

শ্রীমঙ্গলের এই সংগ্রামী ব্যক্তিত্বদের অনেকেই সরকারি আহ্বানের সময় মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য আবেদন করতে পারেননি। কেউ আবেদন করলেও তথ্যপ্রমাণ সংক্রান্ত মন্তব্যের কারণে আবেদন বাতিল হয়েছে। বয়স ও সামাজিক জটিলতার কারণে অনেকের পরিবারও পরে আপিল প্রক্রিয়ায় যেতে পারেনি।

স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও সচেতন মহলের মতে, শ্রীমঙ্গলের এই সংগ্রামী সন্তানদের অবদান সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা জরুরি। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সামগ্রিক ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে।

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়