Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ এপ্রিল ২০২৬,   চৈত্র ১৯ ১৪৩২

মায়মুন শরীফ রাইয়ান

প্রকাশিত: ১৯:৩৪, ২ এপ্রিল ২০২৬

অপতথের আগ্রাসন

সত্যের সংকট ও সামাজিক বিভেদের রাজনীতি

মায়মুন শরীফ রাইয়ান

মায়মুন শরীফ রাইয়ান

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মানুষের হাতের মুঠোয় এসে গেছে সমগ্র বিশ্ব। স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে যেকোনো খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি একটি ভয়াবহ অভিশাপও আমাদের গ্রাস করেছে- অপতথ্য বা মিথ্যা তথ্যের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার। বাংলাদেশে এই সমস্যা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে এটি একটি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপতথ্যের এই মহামারি সামাজিক বন্ধন ছিন্ন করছে, রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাড়াচ্ছে এবং ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদাকে ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে।

দেশের তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪ হাজার ১৯৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে শুধু ফেসবুকেই ছড়িয়েছে তিন হাজার ৮০৬টি ভুল তথ্য- প্রতিদিন গড়ে দশটিরও বেশি। সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি দেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও ১১০টি ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৫ সালে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা আগের বছরের তুলনায় পাঁচ শতাংশ বেশি। এই তথ্যগুলো কেবল সংখ্যা নয়- এগুলো প্রমাণ করে যে অপতথ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সুসংগঠিত ও ক্রমবর্ধমান সংকট।

অপতথ্য বলতে শুধু ভুল তথ্য নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা অর্ধসত্য তথ্য প্রচার করাকে বোঝায়, যার লক্ষ্য থাকে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, ভয় দেখানো বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল করা। অপতথ্যের কিছু সাধারণ রূপ আমরা প্রতিদিনই দেখি- পুরনো বা বিদেশের ছবি-ভিডিওকে বর্তমান ঘটনা হিসেবে চালানো, বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে মিথ্যা উদ্ধৃতির ফটোকার্ড প্রচার, সত্য ঘটনার বিকৃত ব্যাখ্যা এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিবেশিত সম্পূর্ণ বানোয়াট গল্প। ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের বড় অংশই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বাচনী মৌসুমে এই প্রবণতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাস্তব পরিসংখ্যানও তেমনি ইঙ্গিত দেয়-২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অন্তত ১০৫৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরিত্রহনন পুরোনো হাতিয়ার হলেও ডিজিটাল যুগে এটি ভয়ংকর মাত্রা পেয়েছে। বিরুদ্ধ দলের নেতা-কর্মীদের নামে মিথ্যা অভিযোগ, বানোয়াট কেলেঙ্কারি ও মর্যাদাহানিকর বিষয়বস্তু অবিরাম ছড়িয়ে দেওয়া হয়- লক্ষ্য একটাই, প্রতিপক্ষকে হেয় করা। চরিত্রহননের শিকার কেবল রাজনীতিকরাই নন; সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নারী উদ্যোক্তা-কেউ এর বাইরে নন।

রাজনৈতিক দলগুলোর অনুগত সাইবার বাহিনী এই অপপ্রচার সংগঠিতভাবে পরিচালনা করে। নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ, ট্রলিং এবং ফেইক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়। এই কৌশলকে বলা হয় 'অ্যাস্ট্রোটার্ফিং'- যেখানে মনে হয় জনমত স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠছে, কিন্তু আসলে সবই পরিকল্পিত।

অপতথ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে আমাদের সামাজিক সংহতিতে। একটি মিথ্যা সংবাদ মুহূর্তেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ জ্বালিয়ে দিতে পারে। ২০২১ সালে কুমিল্লার একটি ঘটনা এর মর্মান্তিক উদাহরণ- সামাজিক মাধ্যমে একটি বিকৃত ছবি ও গুজব ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একাধিক জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে আগুন লাগানো হয়। তথ্য যাচাই হওয়ার আগেই ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। এটাই অপতথ্যের সবচেয়ে বড় বিপদ।

পারিবারিক ও বন্ধুত্বের সম্পর্কেও অপতথ্য গভীর ফাটল ধরাচ্ছে। রাজনৈতিক মিথ্যা প্রচারণার কারণে পরিবারের মধ্যে বিভেদ তৈরি হচ্ছে, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ক্রমশ নিজের মতাদর্শীয় বুদবুদে বন্দী হয়ে পড়ছে এবং ভিন্নমতকে শুধু 'শত্রু' হিসেবে দেখতে শিখছে। এর পরিণতিতে সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস হ্রাস পাচ্ছে। মানুষ গণমাধ্যম, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এমনকি বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর থেকেও আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এই বিশ্বাসের সংকট যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

অপতথ্য ও রাজনৈতিক বিভেদ পরস্পরকে পুষ্ট করে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিভেদ যত বাড়ে, ততই মানুষ নিজের দলের পক্ষের যেকোনো তথ্যকে সত্য বলে গ্রহণ করতে এবং বিরোধী দলের তথ্যকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করতে প্রস্তুত হয়। মনোবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে 'কনফার্মেশন বায়াস বলে অভিহিত করেন।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন ডিজিটাল অপতথ্যের কারণে এখন আরও গভীর হচ্ছে। প্রতিটি পক্ষের জন্য আলাদা 'তথ্য বাস্তবতা' তৈরি হয়ে গেছে, যেখানে একই ঘটনা দুটি দল সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে উপস্থাপন করে এবং তাদের সমর্থকরা কেবল নিজেদের পছন্দের সংস্করণটিই বিশ্বাস করে। এই বিভেদের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি আর শুধু রাজনৈতাক মতপার্থক্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং মানবিক শত্রুতায় পরিণত হচ্ছে। বিরোধী মতের মানুষকে 'দেশদ্রোহী', 'চাঁদাবাজ', 'রাজাকার' বা 'ফ্যাসিস্টের দোসর' বলে গালি দেওয়া হচ্ছে। এই ভাষা গণতান্ত্রিক সংলাপের পরিবেশকে সম্পূর্ণ বিষিয়ে তুলছে।

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছে। তবে এসব আইনের প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও মুক্তচিন্তক ব্যক্তিরা এই আইনের শিকার হয়েছেন, অথচ প্রকৃত অপতথ্য প্রচারকারীরা পার পেয়ে গেছেন। আইন থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না, যদি সেই আইনের প্রয়োগ নিরপেক্ষ না হয়।

রিউমর স্ক্যানার, ফ্যাক্টওয়াচ ও এএফপি ফ্যাক্ট চেকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মিথ্যা তথ্য খণ্ডন করার কাজ করে যাচ্ছে। তবে অপতথ্য যে গতিতে ছড়ায়, তার তুলনায় ফ্যাক্ট-চেকিং এখনও অনেকটাই পিছিয়ে।

অপতথ্য কোনো নতুন সমস্যা নয়, কিন্তু ডিজিটাল যুগে এর বিধ্বংসী ক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি তরুণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এই সংকট বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সামাজিক সংহতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি সম্ভব নয়, আর অপতথ্য এই দুটিকেই ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চাই বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপ। সবচেয়ে জরুরি হলো মিডিয়া সাক্ষরতা বৃদ্ধি। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা, কমিউনিটি পর্যায়ে কর্মশালা পরিচালনা করা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের এই প্রচেষ্টায় যুক্ত করা জরুরি। কোনো খবর শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই করা, ছবির বিপরীত অনুসন্ধান করা এবং একাধিক সূত্রে তথ্য মেলানো- এই সহজ পদক্ষেপগুলোই অপতথ্যের আগ্রাসন ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে।

ভারতসহ বিদেশ থেকে আসা অপতথ্য মোকাবেলায় বাংলাদেশের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করা দরকার। একই সঙ্গে ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা জরুরি- কারণ বাংলা ভাষায় অপতথ্য শনাক্তে এসব প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম এখনও অনেক পিছিয়ে।

গণমাধ্যমকেও নিজের দায় স্বীকার করতে হবে। সেনসেশনালিজম ও ক্লিকবেট সংস্কৃতির লোভে পড়ে যাচাই না করে সংবাদ পরিবেশন করা শুধু দায়িত্বহীনতা নয়, এটি অপতথ্যের সহযোগিতাও বটে।

অপতথ্য প্রতিরোধে কঠোর আইন থাকাই যথেষ্ট নয়; সেই আইনের প্রয়োগ হতে হবে দলমত নির্বিশেষে ও নিরপেক্ষভাবে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সাইবার আইন প্রকৃত অপতথ্য প্রচারকারীদের ছেড়ে দিয়ে বিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। এই বৈষম্য দূর না হলে আইন সমস্যার সমাধান না করে নতুন সমস্যা তৈরি করবে।

তবে সব উদ্যোগের মূলে থাকতে হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। সাইবার বাহিনী দিয়ে অপপ্রচার চালানো যতদিন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে টিকে থাকবে, ততদিন অন্য কোনো পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে কাজে আসবে না। অপতথ্যের সমস্যা শেষ বিচারে একটি নৈতিকতার সমস্যা এবং এর সমাধানও নৈতিক সাহসের মধ্যেই নিহিত।

অপতথ্যের বিরুদ্ধে প্রতিটি নাগরিকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 'শেয়ার করার আগে যাচাই করুন - এই একটি অভ্যাসই অপতথ্যের বিস্তার কমাতে সক্ষম। একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক পক্ষপাত সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। আমরা স্বাভাবিকভাবেই নিজের মতাদর্শের পক্ষের তথ্যকে সত্য ধরে নিই- এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সজাগ থেকে বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিকেও বিবেচনায় নিলে মিথ্যার ফাঁদ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে সত্যের পক্ষে লড়াই- এটি কোনো দলের জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রশ্ন। বাংলাদেশের মতো একটি তরুণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক বিশ্বাস অমূল্য সম্পদ- অপতথ্য প্রতিদিন সেই সম্পদ নীরবে খেয়ে ফেলছে। প্রতিটি সচেতন নাগরিক, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজকে তাই মিথ্যার বিরুদ্ধে এই কঠিন লড়াইয়ে এগিয়ে আসতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সহনশীল ও বিভেদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই হোক সকল নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব।

লেখক- সহকারি অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড সরকারি মডেল কলেজ

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়