ঢাকা, রোববার   ১৯ এপ্রিল ২০২৬,   বৈশাখ ৫ ১৪৩৩

মুক্তাদির আহমদ মুক্তা 

প্রকাশিত: ২৩:৪৩, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

মুজিবনগর দিবসে স্মরণ

বীর বিক্রম তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর অবদান ও বর্তমান বাস্তবতা

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল একটি অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার—মুজিবনগর সরকার। এই ঐতিহাসিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও সফল বাস্তবায়নের নেপথ্যে যাঁর অসামান্য ভূমিকা ছিল, তিনি মেহেরপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) বীর বিক্রম তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।

আজ মুজিবনগর দিবসের ৫৫তম বার্ষিকীতে যখন জাতি শ্রদ্ধাভরে সেই গৌরবময় দিনকে স্মরণ করছে, তখন এই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা কারাগারে বন্দি—যা অনেকের কাছেই বেদনাদায়ক ও প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবতা।

স্বাধীনতার সূচনালগ্নে দৃঢ় অবস্থান
১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল সময়েই তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী স্বাধীনতার পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. সা’দত হুসাইন তাঁর এক স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন, মার্চের শুরুতেই এক বৈঠকে তৌফিক-ই-ইলাহী বলেছিলেন—স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি সরাসরি অংশ নেবেন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই পাকিস্তানি শাসনের অধীনে কাজ করবেন না।

২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর তিনি পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ২৬ মার্চ তিনি ভারতের নদীয়া জেলার জেলা প্রশাসক ও বিএসএফ কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সহযোগিতা কামনা করেন। এটি ছিল একজন বাঙালি সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ভারতের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন চাওয়ার প্রথম উদ্যোগগুলোর একটি।

পরবর্তীতে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে তিনি অংশ নেন এবং অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম করেন। একই সঙ্গে তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিরাপদে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেন, যা পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজক
১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজনেও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পুরো অনুষ্ঠানসূচি প্রণয়ন করেন এবং শপথগ্রহণ শেষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদানে নেতৃত্ব দেন।

এই আয়োজন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভিত্তিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রণাঙ্গনে তিনি সরাসরি দায়িত্ব পালন করেন। মেজর এম এ ওসমান চৌধুরীর নির্দেশে তাঁকে ‘ক্যাপ্টেন’ পদমর্যাদায় কমিশন প্রদান করা হয়, যা তাঁর সক্রিয় যুদ্ধ-অংশগ্রহণের স্বীকৃতি।

স্বাধীনতা পরবর্তী কর্মজীবন
স্বাধীনতার পর তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং সচিব হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার পর ২০০২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে সাদাপোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁকে আটক করে। পরদিন একটি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন।

মূল্যায়ন ও প্রত্যাশা
তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; তিনি মুক্তিযুদ্ধের এক সাহসী সংগঠক, কূটনৈতিক উদ্যোগের পথপ্রদর্শক এবং মুজিবনগর সরকারের অন্যতম নেপথ্য স্থপতি। তাঁর অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অনস্বীকার্য।

মুজিবনগর দিবসের এই তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে দেশের এই বীর সন্তানকে ঘিরে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে সমাজের বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি অনেকের।

সমাপ্তি কথা
স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়, তা সম্মান ও মূল্যায়নেরও বিষয়। তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বরা সেই ইতিহাসের জীবন্ত প্রতীক। তাঁদের অবদান স্মরণ করা যেমন দায়িত্ব, তেমনি তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক কর্তব্য।

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়