অরুণ কুমার দাশ
আপডেট: ২৩:০৭, ২৬ মে ২০২৬
চক্ষুলজ্জার বিসর্জন: আধুনিকতার নামে আমরা আসলে কী হারাচ্ছি?
অরুণ কুমার দাশ
চক্ষুলজ্জা বলতে আমরা বুঝি লোকলজ্জা বা সামাজিক সংকোচ। অন্যের সামনে কোনো অশোভন কাজ করতে বা কথা বলতে যে দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ হয়, তাই চক্ষুলজ্জা। অন্যদিকে সৌজন্যবোধ হলো সামাজিক জীবনে অন্যের সঙ্গে মেলামেশার সময় আমাদের মার্জিত আচরণ। সমাজে যদি লোকলজ্জার ভয় বা সৌজন্যবোধ না থাকতো, তবে জনজীবন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়তো।
ঘটনা-১:
একবার এক পরিচিতের বাসায় গেলাম বিশেষ প্রয়োজনে। পরিচিতের মেয়েটি দরজা খুলল। যেহেতু সে আমাকে চেনে, তাই দরজা খুলেই ড্রয়িংরুমের খাটে আধশোয়া হয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মনে হলো আমার উপস্থিতিতে তার কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। সে পুনরায় তার স্মার্টফোনে ডুবে গেল। আমি সোফায় বসে ভদ্রলোককে মিসকল দিলাম; তিনি বুঝলেন যে আমি এসেছি। কাজ শেষে আমি একাই ফিরে এলাম।
ঘটনা-২:
এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। যৌথ পরিবার। সন্ধ্যায় বসে চা খাচ্ছি, এমন সময় দেখলাম ছোট বৌদি ভাসুরের সামনে সোফায় দু’পা তুলে আয়েশ করে গল্প করছেন—যা একদম স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন তারা। বিষয়টি আমার কাছে বেশ দৃষ্টিকটু মনে হলো। পরে জানতে পারলাম, ওই বৌদি নাকি এমনই, তাই তার চলাফেরায় এখন আর কেউ কিছু মনে করেন না।
ফিরে তাকাই আমার শৈশবে। বাবা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের ডিড-রাইটার ছিলেন, সে কারণে সকাল-বিকাল-দুপুর বাড়িতে নিয়মিত মানুষের আনাগোনা ছিল। আমাদের দায়িত্ব ছিল চা-পান পরিবেশন করা। একটি বড় কেটলি সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি চুলায় চড়ানো থাকতো। কেউ এলে আদাব বা নমস্কার দিয়ে বারান্দার বেঞ্চে বসানো এবং প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করা ছিল আমাদের কৈশোরের নিয়মিত কাজ।
ঘটনা-১ এবং ২-এর মতো শত শত ঘটনার মুখোমুখি আপনারাও হয়তো হয়েছেন। আপনারা কি বিব্রত হননি? মনে কি প্রশ্ন জাগেনি—চক্ষুলজ্জা কিংবা সৌজন্যবোধ কেন মানুষ হারিয়ে ফেলছে? এসব দেখে আমার খুব আফসোস হয়। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মানুষের জীবনধারা কতটা পাল্টে গেল!
"I don’t care", "লোকে মন্দ বললে আমার কী?", "আমি কারো খেয়ে পরে বাঁচি না"—এসব বলতে বলতে মানুষ যখন চক্ষুলজ্জার সীমা অতিক্রম করে, তখন সে ভয়ংকর নির্লজ্জ হয়ে ওঠে। পরিচিত মানুষজন চোখের সামনে কেমন বদলে যাচ্ছে! কী এক সময় ছিল, আর এখন কী সময় এল!
পরিচিতজনকে সম্মান জানিয়ে দরজা খোলার পর বসার জন্য বলার নূন্যতম ভদ্রতাটুকুও এ প্রজন্ম হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ও সৌজন্যবশত কাউকে ভেতরে আসার আমন্ত্রণটুকু জানাতে দ্বিধা করে মানুষ। বড়দের সামনে মার্জিত আচরণ করার অভ্যাসও আজ বিলুপ্তপ্রায়।
আগে যে মধ্যবিত্ত সমাজ এসব সংস্কার লালন করত, আজ সেই মধ্যবিত্ত সমাজ যেন নৈতিক অবক্ষয়ের আস্তাকুঁড়ে পর্যবসিত হয়েছে। আমরা মধ্যবিত্তরা এখন উচ্চবিত্তের সাথে পাল্লা দিই। দুপুরে ভাত খাওয়ার বদলে 'লাঞ্চ' আর রাতের খাবারের বদলে 'ডিনার' শব্দ ব্যবহারে আভিজাত্য খুঁজি। বেড়াতে যাওয়ার নাম দিয়েছি 'হ্যাং আউট'। আধুনিক ও উচ্চবিত্ত হওয়ার অভিনয় করতে করতে আমরা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ আর ইতিহাস-ঐতিহ্য—সব জলাঞ্জলি দিতে বসেছি।
ছোটবেলায় সামাজিক বিজ্ঞানে পড়েছি—মা, বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, চাচা-চাচিকে নিয়েই পরিবার গঠিত হয়। এখন কি বইয়ে পরিবারের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে? বর্তমান প্রজন্ম বিয়ের পর নিজের মা-বাবাকে পরিবারের অংশ মনে করে কি? "আমি কেন স্যাক্রিফাইস করব? কেন?"—এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতা এই প্রজন্মের অন্তরে কারা ঢুকিয়ে দিল? একা কখনো ভালো থাকা যায় না—একথা এরা কীভাবে বুঝবে? জীবন সুন্দর করতে মা-বাবা, ভাই-বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জন লাগে। লাগে আনন্দ-উৎসব, ত্যাগ ও ভালোবাসা বিনিময়ের মানসিকতা। সুন্দর সম্পর্ক আর স্বার্থত্যাগের বিনিময়েই জীবন সার্থক হয়।
অনার্স পড়ার সময় আমাদের শ্রদ্ধেয় মোয়াজ্জেম স্যারকে (অর্থনীতি বিভাগ) প্রশ্ন করেছিলাম, "আমি অর্থনীতি নিয়ে পড়ছি, তবে বিসিএস-এ কেন আমাকে বাংলা, ইংরেজি বা সাধারণ জ্ঞানের উত্তর দিতে হবে? আমি তো অর্থনীতির ছাত্র!"
স্যার জবাব দিয়েছিলেন, "একটি মোটরসাইকেল প্রস্থে সর্বোচ্চ দুই ফুট, আর চাকা দশ-বারো ইঞ্চি। তুমি কি মাত্র দুই ফুট প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে দীর্ঘক্ষণ বাইক চালিয়ে যেতে পারবে? বহুদূর যেতে হলে তোমার প্রশস্ত রাস্তা লাগবে।" একজন এডমিন ক্যাডারকে জেলার দায়িত্ব নিতে হয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের হাল ধরতে হয়; তাকে অবশ্যই সব বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখতে হবে।
জীবনও ঠিক তেমনি। সুখী হতে হলে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা বাদ দিয়ে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সমাজ এবং নিজের সংস্কৃতির শুদ্ধতম পাঠ হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। সবকিছুর সমন্বয়েই জীবন সুন্দর। বেয়াদব, গোয়ার, অসামাজিক ও সংস্কৃতিহীনদের জীবন তো বন্য পশুদের মতো।
অরুণ কুমার দাশ, সংস্কৃতিকর্মী ও প্রিন্সিপাল অফিসার, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, মৌলভীবাজার।
- বাংলাদেশে শিশু শ্রম: কারণ ও করণীয়
- পনেরো আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক দ্বন্ধ
মোশতাক বললেও মন্ত্রীদের কেউ সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের সঙ্গে যায়নি! - ২০২৩ সালে কী সত্যিই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসছে?
- করোনা যেভাবে চিকিৎসকদের শ্রেণীচ্যুত করলো
- চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
- ফিলিস্তিনে প্রাণ হারাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা
- ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কুকুর স্থানান্তরকরণ ও ভবিষ্যৎ
- শরীফার গল্প পড়তে আমাদের এতো কেন সমস্যা?
- মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যমের ভূমিকা
- রেমডেসিভির একটি অপ্রমাণিত ট্রায়াল ড্রাগ
























