Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ এপ্রিল ২০২৬,   চৈত্র ১৯ ১৪৩২

জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি

প্রকাশিত: ১৯:২১, ২ এপ্রিল ২০২৬
আপডেট: ২০:৪৪, ২ এপ্রিল ২০২৬

দৌলতদিয়া ট্র্যাজেডি ও করুণ বাস্তবতা

জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি

জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি

বাংলাদেশে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা যেন এখন এক নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানির খবর সামনে আসছে। ঈদ আসলে যেন এমন দুর্ঘটনা দেশবাসীকে আরও বেশি তাড়া করে বেড়ায়। এমন নিদারুণ বাস্তবতায় ২৫ মার্চ রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। যা পুরো দেশবাসীকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক দুর্ঘটনা আমাদের চরম উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কোথাও বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় প্রাণহানি, কোথাও ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, আবার কোথাও নৌপথে দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই কারণগুলো বারবার উঠে আসে—অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বল তদারকি।

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যায় ভয়াবহ বিপর্যয়। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করা হলেও অধিকাংশ যাত্রীকে আর জীবিত পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় অন্তত ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী এবং শিশুও রয়েছে।

এইসব ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর যথারীতি দেশ জুড়ে তোলপাড় হয়। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যায় আমাদের রাষ্ট্রের সীমাহীন অব্যবস্থাপনা। শুধুই নিছক একটি দুর্ঘটনা বলে পার পাওয়া কঠিন। এগুলো দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক দুর্ঘটনা আমাদের চরম উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কোথাও বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় প্রাণহানি, কোথাও ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, আবার কোথাও নৌপথে দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই কারণগুলো বারবার উঠে আসে—অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বল তদারকি।

তবে এই প্রেক্ষাপটে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাস্তবায়িত পদ্মা সেতু বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এই সেতুর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে, যা অনেকাংশে ফেরিনির্ভরতা কমিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও রাজধানী শহর ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হতো, তাহলে দৌলতদিয়ার মতো ফেরিঘাটগুলোতে চাপ আরও বেশি থাকত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যেত। অর্থাৎ এমন মেগা উন্নয়ন প্রকল্প দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করে দিয়েছে। শুধু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নত নয়, পুরো দেশের অর্থনীতি ও জিডিপি বৃদ্ধিতে এমন উন্নয়ন-প্রকল্পের অবদান অপরিসীম।

তবে দৌলতদিয়ার এই দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগে জিরো টলারেন্স এবং অনমনীয় দায়িত্বশীলতা। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, অধিকাংশক্ষেত্রে দেখা গেছে এইসব কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে এইসব দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশগুলো গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

প্রতিটি দুর্ঘটনা শুধু কিছু পরিসংখ্যান নয়; একটি পরিবারের স্বজন হারানোর করুণ গল্প, তিলে তিলে বোনা কত পরিবারের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। তাই এই শোককে শুধু সাময়িক আবেগ প্রকাশে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের রাষ্ট্রের উচিত প্রতিটি দুর্ঘটনাকে একটি শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনা। পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আমরা একটি সত্যিকারের নিরাপদ ও বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে পারি। সেটাই হোক আমাদের প্রত্যয়। কবি সুকান্তের ভাষায় বলতে হয়, 

জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
 

জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি লন্ডন, যুক্তরাজ্য

ইএন/এসএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়