Bilas Moulvibazar, Bilas

ঢাকা, রোববার   ১৫ মার্চ ২০২৬,   ফাল্গুন ৩০ ১৪৩২

সংগ্রাম দত্ত

প্রকাশিত: ২২:৪০, ১৪ মার্চ ২০২৬

চোখে দেখা ইতিহাস

রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সংগ্রামের গল্প

ছবি: আই নিউজ

ছবি: আই নিউজ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা বড় বড় ঘটনার ধারাবিবরণী নয়। এই ইতিহাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রাম, সম্পর্ক, স্মৃতি এবং সময়ের নীরব সাক্ষ্য। অনেক সময় একটি পরিবারের অভিজ্ঞতাই হয়ে ওঠে একটি সময়ের ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।

আমার শৈশব, আমার পিতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর রাজনৈতিক সংগ্রাম, শ্রীমঙ্গল শহরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকায় আমাদের মাটির দেওয়ালের ঘর, স্টেশন রোডের ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সেই দোকানের পেছনের আড্ডাঘর—সব মিলিয়ে যেন বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। সে সময় তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার পিতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন।
পরবর্তীকালে ১৯৬৩ সালে সংঘটিত বালিশিরা পাহাড় কৃষক আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেই আন্দোলনের তিন নেতার মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছেন কেবল তিনিই। অন্য দুই নেতা—মোহাম্মদ চান মিয়া মিরাশদার এবং মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া—অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন।

১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল পাকিস্তান সরকার একটি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করে, যা স্থানীয়ভাবে “জয় বাংলা” মামলা নামে পরিচিত। এই মামলায় চারজন রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে ফেলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। আমার পিতা ছিলেন সেই চার অভিযুক্তের একজন এবং বর্তমানে তিনিই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। মামলার অন্য আসামিরা ছিলেন—ন্যাপ নেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া, ছাত্রলীগ নেতা এম. এ. রহিম এবং ছাত্রলীগ নেতা এস. এ. মুজিব।

পাকিস্তান সরকার তাদের গ্রেপ্তার করে মৌলভীবাজার কারাগারে পাঠায়। কিন্তু কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রজনতার আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার পিতা স্বাধীনতার পক্ষে একজন সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। তিনি ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে ভূমিকা রাখেন। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে সম্মানসূচক সনদ প্রদান করে। অথচ ২০১৭ সালে তাঁর আবেদনের মন্তব্য ঘরে "মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি" বলে  আবেদনটি জামুকা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়।

শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে আরও যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন—শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. রহিম, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ রইস মিয়া এবং ন্যাপ নেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া। তারা সবাই স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার মুখে পড়েন।

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় শ্রীমঙ্গলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি সংগ্রাম পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা কমলেশ ভট্টাচার্য, যিনি ২০০৭ সালের দিকে মৃত্যুবরণ করেন। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ ইসমাইল হোসেন স্বাধীনতার পূর্বকাল থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন সংগঠক হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক কমিশনার শহিদুল আলমও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

এছাড়া ১৯৭০ সালের পাকিস্তান ভাঙা তথা “জয় বাংলা” মামলায় পাকিস্তান সরকারের পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে মৌলভীবাজার কারাগারে প্রেরিত এস. এ. মুজিবও স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী ছিলেন।

শ্রীমঙ্গল শহরের জয়নগর পাড়া আবাসিক এলাকার স্বনামধন্য চিকিৎসক ডা. সুধাংশু রঞ্জন রায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বালিগাঁও ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা, শরণার্থী এবং আহত মানুষদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। তাঁর এই মানবিক ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে স্মরণ করা হয়। ডা. সুধাংশু রঞ্জন রায়ের প্রদত্ত সনদের ভিত্তিতে অনেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পরবর্তীকালে সরকারের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন—এমন তথ্যও বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখিত হয়েছে। এছাড়া শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান এম. এ. মোসাব্বির স্বাধীনতার পর একবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

অন্যদিকে শ্রীমঙ্গল শহরের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী এবং শ্রীমঙ্গল পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান ক্ষীরোদ বিহারী দেব চৌধুরীও স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তাদের অনেকেই  ২০১৪ সালের  আগেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন না থাকায় সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবিদার রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠকদের খোঁজ নিয়ে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে যাঁদের অবদানের কারণে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তাঁদের অনেকের নামই বর্তমান প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে গেছে।

১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল পরিবর্তিত হয়। সেই সময় আমার পিতাও গ্রেফতার হন। পরিবারের ওপর নেমে আসে কঠিন সংকট। সংসার চালানোর জন্য আমার মা সেলাইয়ের কাজসহ নানা উপায়ে সংগ্রাম করে পরিবারকে টিকিয়ে রাখেন। চা বাগানের ম্যানেজার রামচন্দ্র করের সন্তানরা আমার পিতার কাছে প্রাইভেট পড়তেন। সেই সূত্রে রামচন্দ্র করের পরিবারও আমাদের কঠিন সময়ে সহযোগিতা করেন।

এছাড়া তৎকালীন শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সচিব সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের পরিবারও বিভিন্নভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মাটির দেওয়ালের ঘর ও স্টেশন রোডের আড্ডা শ্রীমঙ্গল শহরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকায় আমাদের মাটির দেওয়ালের ঘর এবং স্টেশন রোডের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার পাঠশালা। এখানে বসে আমার পিতা, প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতারা দেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং সাংবাদিকতার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতেন।

ছোটবেলায় আমি সেখানে চা পরিবেশন করতাম। সেই আড্ডার পরিবেশ, আলোচনা এবং লেখালেখি আমাকে ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার প্রতি আকৃষ্ট করে। আশির দশকের শেষ দিকে জেনারেল এরশাদের শাসনামলে জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক খবর-এ সাংবাদিকতার মাধ্যমে আমার পেশাজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে লিখেছি আজকের কাগজ, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক সংবাদ, চিত্রবাংলা এবং ইংরেজি দৈনিক The Independent-এ।

আমার পিতা ছিলেন ন্যাপের একজন সংগঠক ও সক্রিয় নেতা। স্বাধীনতার পূর্বে মুসলিম লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ন্যাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শৈশবে দেখেছি ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পীর হাবিবুর রহমান এবং বেগম মতিয়া চৌধুরী বহুবার শ্রীমঙ্গলে এসেছেন।

এছাড়াও পংকজ ভট্টাচার্য, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ আরও অনেক নেতা আমাদের বাড়িতে আসতেন। সেখানে তারা রাজনৈতিক আলোচনা, জনসভা পরিকল্পনা এবং সংগঠনের নানা বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতেন। সময়ের প্রবাহে একসময়ের শক্তিশালী বিরোধী দল ন্যাপ ধীরে ধীরে প্রভাব হারায়। অনেক নেতা মৃত্যুবরণ করেন, কেউ কেউ অন্য দলে যোগ দেন। নতুন প্রজন্মের কাছে দলটির ইতিহাস এখন অনেকটাই অতীতের গল্প।

১৯৮০ সালের শেষ দিকে লিডার স্টোরস প্রোগ্রামের অধীনে আমার পিতা প্রায় দেড় মাস সোভিয়েত রাশিয়া সফর করেন। দেশে ফিরে স্থানীয় জনগণ ও নেতাকর্মীদের অনুরোধে তিনি ১৯৮৩ সালে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং বিপুল ভোটে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সময়ে নেওয়া উন্নয়নমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ আজও অনেক মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দলীয় দ্বন্দ্ব প্রায়ই আলোচনায় এসেছে।

২০০৭–২০০৮ সালে ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশাসন পুনর্গঠন, দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের কথাও শোনা গেছে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত  দেড় বছরের শাসনকাল অনেকের কাছে এক হতাশাজনক সময় হিসেবে আলোচিত হয়েছে।

এই সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিভিন্ন স্থানে জ্বালাও-পোড়াও ও ভাঙচুরের ঘটনা সমাজকে উদ্বিগ্ন করেছে। ধর্মীয় উস্কানিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এবং মানুষ হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি এক পর্যায়ে প্রকাশ্য দিবালোকে সংবাদপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে—যা গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

২০১৪ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন আহ্বান করা হলে আমার পিতাও আবেদন করেন। ২০১৭ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়— “মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।” এই মন্তব্যসহ প্রতিবেদন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)-এ পাঠানো হলে আমার পিতাসহ আরও কয়েকজন—এম. এ. রহিম, মোঃ রইস মিয়া এবং মোঃ শাহজাহান মিয়া—রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন।

অশীতিপর বয়সেও আমার পিতা থেমে থাকেননি। ২০২২ সালের অক্টোবরে তিনি জামুকায় আপিল করেন। দীর্ঘদিন শুনানির নোটিশ না পাওয়ায় ২০২৪ সালের ১৯ মে আমি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ফ. ম. মোজাম্মেল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। পরে বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় হাইকোর্টে বিচারাধীন হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটির যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক বিতর্ক শোনা গেছে। মৌলভীবাজার–৪ (শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ) আসনের প্রবীণ রাজনীতিবিদ উপাধ্যক্ষ ড. আব্দুস শহীদ দীর্ঘদিন জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে হুইপ, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ, সরকারদলীয় চিফ হুইপ এবং সর্বশেষ কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকার কারণে এলাকায় কারা প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন—সে সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট ধারণা ছিল বলে স্থানীয় মহলে ধারণা প্রচলিত। তবে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সিলেট বিভাগের দায়িত্ব এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ভূমিকা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন ও আলোচনা দেখা দেয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি তাঁর নিজ দলের কিছু প্রবীণ সংগঠকের আবেদনপত্রেও যাচাই-বাছাই প্রতিবেদনের মন্তব্য ঘরে “মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি”—এমন মন্তব্য লিখে সেগুলো জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)-এ পাঠানো হয়। এই তালিকায় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান এম. এ. রহিম, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ন্যাপের সংঘটক রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ রইস মিয়া ও ন্যাপের রাজনীতিবিদ মোঃ শাহজাহান মিয়াসহ আরও কয়েকজনের নাম ছিল। 

উল্লেখযোগ্য যে, এম. এ. রহিম ১৯৬৮ সালে ছাত্রলীগের থানা কমিটির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন এবং এলাকায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁদের অবদান এলাকায় সুপরিচিত ছিল। তবুও যাচাই-বাছাই প্রতিবেদনে এ ধরনের মন্তব্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

বিশেষ করে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে এম. এ. রহিমের মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তারা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা উল্লেখ করেন, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা সম্ভব হয়নি—যা তাঁদের মতে একজন প্রবীণ রাজনৈতিক সংগঠকের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা।

শ্রীমঙ্গল শহরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকায় আমাদের মাটির দেওয়ালের ঘর এবং স্টেশন রোডের ছোট দোকান কেবল একটি পরিবার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়। এটি ছিল রাজনীতি, সাংবাদিকতা এবং মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য পাঠশালা। আমার পিতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী আজও জীবিত। তাঁর জীবনসংগ্রাম, রাজনৈতিক পথচলা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য দীর্ঘ লড়াই বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বাস্তব দলিল হয়ে আছে।

ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না—ইতিহাস লেখা থাকে মানুষের জীবন, সম্পর্ক এবং সংগ্রামের ভেতরেও।

ইএন/এসএইচএ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়