নূরুর রহিম নোমান, যুক্তরাজ্য
আপডেট: ০০:৩৬, ১৮ জুলাই ২০২৬
মনু প্রকল্প: সমাধান নাকি সংকট?
এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি।
নদী, মানুষ ও বন্যার সঙ্গে সহাবস্থানের দীর্ঘ লড়াই— আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই যে শব্দটির সঙ্গে আমার সবচেয়ে নিবিড় পরিচয়, তার নাম ‘বন্যা’। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি নিজে বন্যা দেখছি, বন্যার গল্প শুনেছি এবং সর্বস্ব হারানো মানুষের বুকফাটা হাহাকার প্রত্যক্ষ করেছি। আমার জন্মের বহু আগে থেকেই হয়তো এই জনপদে বন্যার এই প্রলয়নাচন একইভাবে চলে আসছে।
একসময় যে নদী ছিল কৃষি, নৌ-যোগাযোগ ও সামগ্রিক জনজীবনের প্রধান অবলম্বন, আজ সেই নদীই বর্ষা এলে স্থানীয় মানুষের গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বারবার বাঁধ ভাঙন, নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্যতা হ্রাস, কৃত্রিম জলাবদ্ধতা এবং পানি ব্যবস্থাপনার নানাবিধ সীমাবদ্ধতা নতুন করে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে —নদীকে ভালোবেসে, তার চরিত্র বুঝে তার সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, নাকি কেবল যান্ত্রিক অবকাঠামোর মাধ্যমে তাকে জোরপূর্বক শাসন করার চেষ্টা করা হয়েছে?
একটি নদীমাতৃক দেশের মানুষ হিসেবে বছরের পর বছর আমরা বন্যা আক্রান্ত হচ্ছি, চোখের সামনে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনির সোনালি ফসল পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখছি, আর নিমিষেই তছনছ হতে দেখছি মানুষের আজীবনের স্বপ্নের সাজানো ঘরবাড়ি। অথচ, দশকের পর দশক পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত একটি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ। এ দেশে ধমনীর মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলোর সঙ্গে আমাদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মেই এখানে বর্ষায় পানি বাড়ে, বন্যা আসে। তাই বন্যাকে সম্পূর্ণ ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা কিংবা লোহার খাঁচায় বন্দি করার প্রকৌশলগত চিন্তাটিই হয়তো দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি—এমন প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে। যেখানে প্রয়োজন ছিল নদীর সঙ্গে সহাবস্থান (Co-existence), বন্যার পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে মেনে নিয়ে নিজেদের জীবনযাত্রাকে মানিয়ে নেওয়া; সেখানে আমরা বারবার চেষ্টা করেছি কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে নদীকে শাসন করতে।
অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশগত বাস্তবতা, স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিয়ে যখন অবকাঠামোকেন্দ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তখন কাঙ্ক্ষিত ফল অনেকাংশেই পাওয়া যায়নি। কোথাও কোথাও বন্যা কমার পরিবর্তে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী কৃত্রিম জলাবদ্ধতা, আবার বাঁধ ভাঙার ফলে দেখা দেয় আকস্মিক মহাবিপর্যয়। মনু নদী এবং এর আশপাশের পাশের হাওর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতাও সেই প্রশ্নগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে।
দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য বিস্তারের খেসারত এবং নদীর সঙ্গে বৈরিতার বদলে কীভাবে সহাবস্থানের মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধান খোঁজা সম্ভব—সেই লক্ষ্যে ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমার এই লেখার সূচনা।
সংকটের নেপথ্যে: উন্নয়ন বনাম পরিবেশ
নদীমাতৃক বাংলাদেশের বাস্তবতায় বন্যা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক জলচক্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যখন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি পরিবহন, পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ এবং মানুষের বসতি ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন সেই স্বাভাবিক বন্যাই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ ও মহাবিপর্যয়ের রূপ নেয়।
মৌলভীবাজারের মনু নদী সেই বাস্তবতার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। একসময় যে নদী ছিল কৃষি, নৌ-যোগাযোগ ও সামগ্রিক জনজীবনের প্রধান অবলম্বন, আজ সেই নদীই বর্ষা এলে স্থানীয় মানুষের গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বারবার বাঁধ ভাঙন, নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্যতা হ্রাস, কৃত্রিম জলাবদ্ধতা এবং পানি ব্যবস্থাপনার নানাবিধ সীমাবদ্ধতা নতুন করে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে —নদীকে ভালোবেসে, তার চরিত্র বুঝে তার সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, নাকি কেবল যান্ত্রিক অবকাঠামোর মাধ্যমে তাকে জোরপূর্বক শাসন করার চেষ্টা করা হয়েছে?
সত্তর ও আশির দশকে মৌলভীবাজার জেলার কৃষি উন্নয়ন এবং মনু নদীর বাৎসরিক আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) থেকে কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলাকে রক্ষা করার এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘মনু নদী সেচ প্রকল্প’। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মহৎ ছিল—শুকনো মৌসুমে কৃষিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বর্ষাকালে শক্তিশালী বাঁধের মাধ্যমে ফসল ও জনপদকে সুরক্ষা দেওয়া।
প্রকল্পটি শুরুর দিকে কৃষি উন্নয়ন ও সেচ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও, চার দশক পর এসে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত দূরদর্শিতার অভাব, নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়া, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের তীব্র ঘাটতি এবং নদীশাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই প্রকল্প অনেক ক্ষেত্রেই তার প্রত্যাশিত সুফল ধরে রাখতে পারেনি।
স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণে এমন একটি ধারণা উঠে আসে যে, পাকিস্তান আমলের পুরোনো ও নদীঘেঁষা কার্যকর ডাইকের পরিবর্তে কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে নির্মিত নতুন বাঁধ, হাওর ও প্লাবনভূমির স্বাভাবিক জলপ্রবাহের রূপান্তর এবং আধুনিক ফসল সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবের নির্মম মাশুল আজ এই অঞ্চলের কৃষক ও সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নীতিগত মূল্যায়নের অবকাশ রয়েছে।
ধারাবাহিক লেখার পরিধি ও উদ্দেশ্য—
এই ধারাবাহিক ফিচারে মনু নদী প্রকল্পের আদি ইতিহাস, পাকিস্তান আমলের পুরোনো ডাইকের রূপরেখা, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাঁধ ও সেচব্যবস্থার বিবর্তন, মনু ব্যারেজ, ধলাইসহ সংশ্লিষ্ট নদ-নদী ও ছড়ার অববাহিকাগত সংকট, নাব্যতা হ্রাস, মৌলভীবাজার শহরের বন্যা-ঝুঁকি, নদীশাসন প্রকল্প, প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য দিকগুলো তথ্যভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
আজকের এই প্রারম্ভিক নোটের মাধ্যমে ধারাবাহিকটির সূচনা করা হলো। পরবর্তী পর্বগুলোতে বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে বিশদভাবে উপস্থাপন করা হবে—মনু নদীর উৎপত্তিস্থল ও ইতিহাস থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৃত রূপ, নদী ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য টেকসই সমাধানের নানা দিক নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে।
স্থানীয়ভাবে যাঁরা নদী-হাওর পরিবেশ-জলবায়ু নিয়ে সচেতন এবং কাজ করছেন তাঁদের মতামতও তুলে ধরতে চাই এই ধারাবাহিক লেখায়।
এই ধারাবাহিকটি প্রস্তুত করতে সরকারি নথি, বিভিন্ন গবেষণা ও প্রকাশিত তথ্য, স্থানীয় ইতিহাস, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং নদীতীরবর্তী মানুষের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে। যেসব বিষয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা আনুষ্ঠানিক সরকারি নথি এখনো সীমিত, সেসব ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের মানুষের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবতার আলোকে সম্ভাব্য যৌক্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা, তথ্য ও নীতিগত পর্যালোচনা সংযোজনের সুযোগ উন্মুক্ত আছে।
সর্বোপরি, এই লেখা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিশেষ প্রকল্পকে ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য করে সমালোচনা করার উদ্দেশ্যে রচিত নয়; বরং নদী ব্যবস্থাপনার জন্য মানুষের অভিজ্ঞতা, মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতা এবং আধুনিক পরিবেশ-বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মনু নদীর বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা ও টেকসই সমাধান নিয়ে একটি গঠনমূলক জনআলোচনা ও নীতিনির্ধারণী সচেতনতা সৃষ্টি করাই এই ধারাবাহিক লেখার মূল উদ্দেশ্য।
এই আলোচনা যদি ভবিষ্যতে আরও গবেষণা, নীতিগত পর্যালোচনা এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সামান্যও ভূমিকা রাখতে পারে, তবেই এই প্রয়াস সার্থক হবে।

নূরুর রহিম নোমান, যুক্তরাজ্য
ইএন/এসএ
- দুলাভাইয়ের ধর্ষণের শিকার শ্যালিকা
- মৌলভীবাজারের রাজনগরে
আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বিধবা রুবির বিউটি পার্লার - `প্রধানমন্ত্রীর কথা বলে আমাদের ধোকা দেওয়া হচ্ছে`
- রাখাল নৃত্যের মধ্য দিয়ে কমলগঞ্জে রাস উৎসব শুরু
- কমলগঞ্জে মাদকবিরোধী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত
- মেয়ের বাড়িতে ইফতার: সিলেটি প্রথার বিলুপ্তি চায় নতুন প্রজন্ম
- দেশের চতুর্থ ধনী বিভাগ সিলেট
- অবশেষে ক্লাস করার অনুমতি পেল শ্রীমঙ্গলের শিশু শিক্ষার্থী নাঈম
- শ্রীমঙ্গল টু কাতারে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালি নেটওয়ার্ক
মৌলভীবাজারে অনলাইন জুয়ায় রাতারাতি কোটিপতি সাগর - এসএসসির ফলাফলে বিভাগে ৩য় স্থানে মৌলভীবাজার























