আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আপডেট: ১৬:৫২, ৮ ডিসেম্বর ২০২০
ইসরাইলকে সমালোচনা: কোন পথে হাঁটছে সৌদি আরব?
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বাদশাহ সালমান- সংগৃহীত ছবি
ইসরাইলের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সম্পর্কের অস্থিরতা দীর্ঘ দিনের। দেশটির সঙ্গে আরব মিত্রদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নেয় সৌদি আরব। আহ্বানে এগিয়ে আসে মিত্র দেশগুলোও। কিন্তু ইসরাইলের ফিলিস্তিন বিরোধ সমাধানে শক্ত অবস্থানে সৌদি। তারা চায় ফিলিস্তিন স্বাধীন রাষ্ট্র হোক। এতে ইসরাইলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। মিত্র দেশগুলোকে সামনে ঠেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে- আসলে কোন পথে হাঁটছে সৌদি আরব?
গত দুদিনে সৌদি রাজপরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই সদস্যের মুখে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যা শোনা গেছে তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ইসরাইলি নেতারা। সৌদি আরব পিছিয়ে গেলে বাকি আরব দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের ভবিষ্যত কী দাঁড়াবে তা নিয়েও তাদের মনে উদ্বেগ ঢুকছে- এতে সন্দেহ নেই।
গত মাসে সৌদি আরবের নিওম শহরে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সৌদি যুবরাজ মোহামেদ বিন সালমানের মধ্যে গোপন এক বৈঠকের পর পর্যবেক্ষকরা বলতে শুরু করেন যে- সৌদি আরব-ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। যদিও সৌদি আরব ওই বৈঠক হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। কিন্তু ইসরাইল সরকারের মৌনতা ও পশ্চিমা গোয়েন্দাদের ইঙ্গিতের ভিত্তিতে প্রায় সবাই নিশ্চিত যে বৈঠকটি হয়েছিল।
কিন্তু বাহরাইনের রাজধানী মানামায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে এক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে শনিবার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সল বিন ফারহান বার্তা সংস্থা এফপির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যেসব কথা বলেন, তাতে সৌদি মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রিন্স ফয়সল বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র না হলে ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের স্বাভাবিক সম্পর্ক হবে না। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সৌদির অবস্থান শক্ত।
‘সৌদি আরব এ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থানে যে- সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলে ফিলিস্তিন বিরোধ সমাধান করতে হবে, ২০০২ সালে আরব শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীন টেকসই একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হতে হবে।’
কারণ সৌদি মন্ত্রী বলেন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের বিরোধ না মিটলে এই অঞ্চলে সত্যিকারের শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসবে না।
২০০২ সালে সৌদি উদ্যোগে ওই শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে- ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূমি ইসরাইলকে ছেড়ে দিতে হবে এবং পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ইসরাইল সবসময় এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের যুক্তি এতে তাদের নিরাপত্তা দারুণভাবে বিঘ্নিত হবে।
সৌদির এই অবস্থানের ফলে তো ইসরাইলের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে স্বাভাবিক সম্পর্কের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যাবে? এই প্রশ্নে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফিলিস্তিন বিরোধের সমাধানের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।
বাহরাইনে ওই সম্মেলনে আরো আক্রমণাত্মক কথা বলেন সৌদির সাবেক গোয়েন্দা প্রধান এবং রাজপরিবারে প্রভাবশালী সদস্য প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সল; যিনি সৌদি প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন। তিনি সৌদি বাদশাহ সালমানের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
সরাসরি ইসরাইলের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইসরাইল সবসময় নিজেদেরকে দেখায় তারা ছোট একটি দেশ আর চারদিকে শত্রু দেশগুলো সবসময় তাদের ধ্বংস চায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইসরাইল নিজে একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।
প্রিন্স তুর্কি বলেন, এখনো ইসরাইল জবরদস্তি করে ফিলিস্তিনিদের ঘরছাড়া করছে, তাদের গ্রাম ধ্বংস করছে।
‘আব্রাহাম চুক্তি (ইসরাইলের সঙ্গে ইউএই এবং বাহরাইনের চুক্তি) ঐশ্বরিক কোনো দলিল নয়। শরীরে ঘা থাকলে তা ব্যথার ওষুধ দিয়ে সারানো যায় না।’
বাবা ও ছেলের বিভেদ
প্রশ্ন হচ্ছে সৌদিরা তাদের উপসাগরীয় মিত্রদের ঠেলে দিয়ে নিজেরাই এখন কেন পিছিয়ে যাচ্ছে?
লন্ডনে ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রধান ড সাদি হামদি বিবিসি বাংলাকে বলেন, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সলের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে বাদশাহ সালমান এবং তার ছেলে যুবরাজ মোহাম্মদের মধ্যে কতটা মতভেদ রয়েছে।
‘প্রিন্স তুর্কি বাদশাহ সালমানের খুবই ঘনিষ্ঠ। তিনি মানামায় ইসরাইলকে আক্রমণ করে যা বলেছেন তা সৌদি বাদশাহের মনোভাবের প্রতিফলন। ফিলিস্তিনিদের কিছু না পাইয়ে দিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সৌদি বাদশাহর তীব্র আপত্তি রয়েছে।’
তিনি বলেন, সৌদি নেতৃত্বের বড় একটি অংশ এখনো সাধারণ আরব জনগণের মতামত নিয়ে চিন্তিত। তারা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে চিন্তিত।
‘তলে তলে ইসরাইলের সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে নানা সম্পর্ক থাকলেও সৌদি নেতৃত্বের এ অংশটি এখনো দেখাতে চায় যে মক্কা ও মদিনার মসজিদের রক্ষক হিসাবে ফিলিস্তিন সমস্যার মতো মুসলিম বিশ্বের মূল কিছু বিষয়কে সৌদি আরব গুরুত্ব দেয়। সুতরাং এটা প্রজন্মের বিভেদ, বাবা ও ছেলের মধ্যে বিভেদ।’
ইসরাইল কতটা উদ্বিগ্ন?
সৌদি প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সল যখন বাহরাইনের মানামায় রোববার ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করছিলেন তখন জেরুজালেম থেকে ভিডিও কলের অন্য প্রান্তে বসে তা শুনছিলেন ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যাবি আশকেনাজি। তার বক্তব্যের শুরুতেই ইসরায়েলি মন্ত্রী সৌদি প্রিন্সের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, আমি মনে করি না সৌদি প্রতিনিধির এই ধরনের বক্তব্য তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
ইসরাইলি মন্ত্রী বলেন, আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ চাপা দেওয়া হচ্ছে। বরঞ্চ আব্রাহাম চুক্তি এই সংকট সমাধানের সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন কোনো শর্ত ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে মীমাংসা আলোচনায় এগিয়ে আসেন, যদিও এ ধরনের আহ্বানের কোনো গুরুত্বই নেই।
দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা আলোচনা ২০১৪ সালের পর থেকে বন্ধ হয়ে রয়েছে। সম্মেলনে ভাষণ শেষ করে মি. আশকেনাজি টুইট করেন, ‘মানামার সম্মেলনে সৌদি প্রতিনিধির অভিযোগ ভিত্তিহীন। তার বক্তব্য আমি প্রত্যাখ্যান করছি। এই ধরনের দোষারোপের দিন শেষ হয়েছে। আমরা নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছি। এই যুগ শান্তির যুগ।’
ইসরাইলে নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা জেরুসালেম ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটি‘র (জেআইএসএস) গবেষক ড. জনাথন স্পায়ার বিবিসি বাংলাকে বলেন, সম্পর্ক নিয়ে সৌদিদের এই দ্বিধা অবশ্যই ইসরায়েলের কাছে কিছুটা উদ্বেগের। কারণ সৌদি আরব ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ একটি দেশ। অন্য কয়েকটি দেশ তাদের সিদ্ধান্তের জন্য রিয়াদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেমন, মরক্কো।
ড. স্পায়ার বলেন, ইসরাইল বুঝতে পারছে, সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে একটি প্রজন্মগত বিরোধ চলছে এবং আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক হতে সময় লাগবে। কিন্তু তিনি মনে করেন, বেশ কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে গোপনে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে সহযোগিতা চলছে তা অব্যাহত থাকবে।
‘ইসরাইলকে সৌদি আরবের প্রয়োজন। যুবরাজ মোহাম্মদ তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বদ্ধপরিকর। ইসরাইলের প্রযুক্তি তার দরকার। ইরানের হুমকি রয়েছে। এছাড়া সৌদি নেতারা খুব ভালো জানেন, মানবাধিকার বা বিভিন্ন ইস্যুতে যে ভাবমূর্তির সংকট পশ্চিমা বিশ্বে তাদের রয়েছে ওয়াশিংটনে দেন-দরবার করে তার কিছুটা সুরাহা করে দেওয়ার ক্ষমতা ইসরাইলের রয়েছে।’
ড. সাদি হামদিও মনে করেন, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের শর্ত হিসেবে ফিলিস্তিনিদের প্রসঙ্গ নিয়ে আসার অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের অবস্থানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হচ্ছে।
‘মিসর ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর তৎকালীন সৌদি বাদশাহ যে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিলেন ইউএই'র বেলায় তো তা দেখছি না। সৌদি বাদশাহ কি ইউএই’র নিন্দা করেছেন? সৌদির সবুজ সংকেত ছাড়া বাহরাইন এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই নিতে পারতো না। ইসরাইলের বিমানের জন্য সৌদি আকাশ খুলে দেয়া হয়েছে।’
‘সৌদি নেতাদের কাছ থেকে যা শুনছি তার কিছুটা অভ্যন্তরীণ মতভেদের বহিঃপ্রকাশ এবং কিছুটা জনসংযোগের চেষ্টা।’
তাহলে সৌদিদের বক্তব্য-বিবৃতিতে ফিলিস্তিনিদের খুশি হওয়ার তেমন কি কোনো কারণ নেই?
ড. সাদি হামদি মনে করেন, কিছুটা স্বস্তির কারণ হলেও ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের সুরাহার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফিলিস্তিনিরা হয়ত কিছুটা স্বস্তি পাবে যে তাদের ইস্যুটি একদম মাটির নিচে চলে যায়নি। একটা চাপ তো অবশ্যই ইসরাইলের ওপর তৈরি হবে। কিন্তু তা খুব সামান্যই।
ড. জনাথন স্পায়ারও মনে করেন, সৌদি বাদশাহ চাইছেন বলেই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে ইসরাইল উদ্যোগ নেবে সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সমস্যা খুবই জটিল। একটি বৈঠক বা কারো দাবিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন সেখানে হবে না। ফিলিস্তিনিরা নিজেরাও বিভক্ত। গাজায় হামাস আর পশ্চিম তীরে ফাতাহর মধ্যে কোনো যোগাযোগ কথাবার্তা নেই। এই অচলাবস্থা অদূর ভবিষ্যতে কাটবে না।
ড. হামদি বলেন, ইসরাইলিরা জুয়া খেলবে। অপেক্ষা করবে বাদশাহ সালমানের মৃত্যুর জন্য। তারা এটাও জানে জো বাইডেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বদল চাইবেন না।
- আইয়ুব খানের পদত্যাগের দিন আজ
- টাই পরা বাদ দিয়ে জ্বালানি সাশ্রয় করতে চান স্পেনের প্রধানমন্ত্রী
- যুদ্ধবন্দী কারাগারে বোমা হামলা, পরস্পরকে দোষছে রাশিয়া-ইউক্রেন
- আবারও মক্কায় কালো পাথর স্পর্শ-চুম্বনের সুযোগ পাচ্ছেন মুসল্লিরা
- মাঙ্কিপক্স ঠেকাতে পুরুষদের সেক্স পার্টনার কমানোর পরামর্শ
- ভারতের স্বাধীনতা দিবস শনিবার
- গাজায় অ্যাম্বুলেন্সে হা*মলা, নি হ ত ৯ হাজার ছাড়িয়েছে
- ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের মালিক রাকেশ ঝুনঝুনওয়ালা মারা গেছেন
- মালিতে সন্ত্রাসী হামলায় ৪২ সেনার মৃত্যু
- ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য হিও গ্রাঞ্জে দো সুলে বনায় ৫৬ জন নি হ ত
























