ঢাকা, শুক্রবার   ২২ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৭ ১৪২৮

ড. হাফিজুর রহমান

প্রকাশিত: ১৫:১৪, ২৯ মে ২০২০
আপডেট: ১৫:২১, ২৯ মে ২০২০

অনলাইন পাঠদান বাস্তবতা ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে করণীয়

করোনা মহামারীর কালে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠান বিমুখ হওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রাম-গঞ্জে ঝরে পড়ার হারের আশঙ্কা বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় সরকার অনলাইন পাঠদানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সারা বিশ্ব তাই করছে। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী দুই পক্ষের আর্থ-সামাজিক সক্ষমতা ও বাস্তবতা নিয়ে ভাবা জরুরি। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশ। ইন্টারনেট বা অনলাইনের মাধ্যমে এই মুহুর্তে দেশের সকল শিক্ষার্থীকে পাঠদান স্বপ্নবিলাস বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। অনলাইনে পাঠদান ঢাকাসহ বিভাগীয় শহর এবং জেলা শহরের কিছু অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভব হতে পারে কিন্তু গ্রাম বাংলায় বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এ অসম্ভব এবং অবাস্তবপ্রায়।

শহরের ছেলেমেয়েরা তুলনামূলক তাদের শিক্ষিত সচেতন অভিভাবকদের কল্যাণে পারিপার্শ্বিক সুবিধা ভোগ করে করোনাকালে স্কুল বন্ধের ক্ষতি চাইলে পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু গ্রামের শিক্ষার্থীরা কোনভাবেই এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে না।

অন্য দিকে, টেলিভিশন মাধ্যমে পাঠদান প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। কেননা অনেক ঘরে ইন্টারনেট প্রযুক্তি সহজলভ্য না হলেও টেলিভিশন আছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এখন গ্রামাঞ্চলেও ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছালেও সবার ঘরে টেলিভিশন নাই। গ্রামগঞ্জে বিদ্যুৎ সেবাও নিরবিচ্ছিন্ন না। এই বাস্তবতাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। তা ছাড়া, পাঠদান প্রক্রিয়া নিয়মিত যথাযথভাবে অনুসরণ করাও বেশ চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব। কেননা, অভিভাবকেরা এখনও এতটা শিক্ষিত ও সচেতন না। বিশেষ করে মফস্বলে ও গ্রামগঞ্জে। তাই এ মুহুর্তে অবশ্যই আমাদের দ্রুত কার্যকরী বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। না হলে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শহরের ছেলে মেয়েদের থেকে পিছিয়ে যাবে বহুগুণে। আশঙ্কা আছে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকলে অনেকে হয়তো আর বিদ্যালয়েও ফিরবে না।

শহরের ছেলেমেয়েরা তুলনামূলক তাদের শিক্ষিত সচেতন অভিভাবকদের কল্যাণে পারিপার্শ্বিক সুবিধা ভোগ করে করোনাকালে স্কুল বন্ধের ক্ষতি চাইলে পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু গ্রামের শিক্ষার্থীরা কোনভাবেই এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে না। তাদের পরিবার ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুকূল না। অনেক প্রতিকূলতা ও কঠিন বাস্তবতা মোকাবেলা করে তারা বিদ্যায়তনে যায়। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ না রেখে কিছু বিকল্প নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার।

প্রস্তাবনা 

বন্ধ না রেখে শিগগিরই সীমিত পরিসরে হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করতে হবে। ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিদিন একটি করে ক্লাস হবে। সকাল ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ক্লাস। স্কুলে পৌঁছে শৃঙ্খলা বজায় রেখে সবাই হাত ধুয়ে শ্রেণি কক্ষে ঢুকবে এবং ক্লাস শেষ করে শারীরিক দূরত্ব মেনে প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করবে। এসব নিয়ম কানুন ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই সুযোগে অনুশীলন করে একটা পরিচ্ছন্ন স্বাস্থ্য ও শৃঙ্খলাবোধও তাদের মধ্যে গড়ে উঠবে। প্রতিদিন সব শ্রেণির ক্লাস না নিয়ে প্রতিদিন একটি শ্রেণির শুধু ক্লাস হবে। যেমন-রবিবার শুধু ১ম শ্রেণি, সোমবার ২য় শ্রেণি, মঙ্গলবার ৩য় শ্রেণি, বুধবার ৪র্থ শ্রেণি, বৃহস্পতিবার ৫ম শ্রেণি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা মোটামুটি ২০-৫০ জনে সীমাবদ্ধ। ছাত্রসংখ্যা অনুসারে ৪-৫টি গ্রুপে বিভক্ত করে ক্লাসে ৮-১০ জন সামাজিক দূরত্ব মেনেই বসতে পারবে। একই ক্লাসের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে ভাগ হয়ে ৪-৫টি গ্রুপে ক্লাস করবে। ক্লাস শেষে ছাত্ররা নির্দিষ্ট ক্লাস রুমে বসে থাকবে। শিক্ষক পরিবর্তন হবেন। একজন শিক্ষক একই পাঠক্রম প্রতিটি গ্রুপে আলোচনা করবেন। যেহেতু ছাত্র সংখ্যা সীমিত থাকবে তাই শিক্ষক নিবিড় যত্ন নিয়ে পাঠক্রম বুঝিয়ে দিতে পারবেন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা সীমিত হওয়ায় শিক্ষক গতানুগতিক দায়সারা পাঠদানের পরিবর্তে আনন্দময় ও আন্তরিক পরিবেশে ক্লাস নিতে সক্ষম হবেন।

তাছাড়া, আরেকটি আরেকটি ধারণা হচ্ছে Flipped Learning. এই পদ্ধতিতে ছাত্র-ছাত্রীরা বাসা থেকে পড়াশোনা করে আসবে। ক্লাসে এসে ছাত্ররা শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করবে। তার মতামত ব্যক্ত করবে। আমাদের বর্তমান গতানুগতিক পদ্ধতিতে শিক্ষকরা শুধু পড়িয়ে যান আর শিক্ষার্থীরা শুনে যায়। এটা হচ্ছে Monologue System. এটা অংশগ্রহণমূলক(Participator) না। Flipped Learning হলো Dialogue নির্ভর। এ পদ্ধতিতে দুই পক্ষই বলবে দুই পক্ষই শুনবে। এটা আলোচনা নির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক। এতে শিক্ষার্থীরা বিরক্ত হবে না এবং ক্লাসে মনোযোগ হারাবে না। একই সঙ্গে অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্মাবে এবং উৎসাহ পাবে। এই পদ্ধতি খুবই কার্যকর এবং ফলপ্রসূ। এটা অনেকটা Group Discussion এর মতো। শিক্ষক ছাত্রদের বাসায় পড়তে বলবেন। ছাত্ররা পরবর্তী ক্লাসে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পারফরমেন্সের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে।

শুক্রবার স্কুল যথারীতি বন্ধ থাকবে। শনিবার স্কুলে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলবে। অবশ্যই জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হবে। শিক্ষকদের বাইরে স্কুল কমিটি এসব তদারকি করবে। এক্ষেত্রে উপজেলা প্রাথমিক, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারেরা নিজ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় তৈরি একটি গাইডলাইন সরবরাহ করতে পারেন। এতে যে উপকারটা হবে সপ্তাহে একদিন হলেও শিক্ষার্থীরা একাডেমিক একটা পরিবেশের মধ্যে থাকবে। বাকি দিনগুলির জন্য হোমওয়ার্ক দিয়ে দেয়া হবে। সেগুলো বন্ধের দিনগুলিতে বাড়িতে অনুশীলন করে পরের সপ্তাহে জমা দেবে। এতে করে অন্তত তারা বিদ্যালয় বিমুখ হবে না। পড়াশোনায় অনাগ্রহী হয়ে উঠবে না। তা নাহলে এক নাগাড়ে দীর্ঘদিন বন্ধ বা পড়াশোনায় বিরতি ঝরে পড়ার হার বাড়িয়ে দেবে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। স্থান সংকুলান কঠিন হবে। সেক্ষেত্রে প্যারাডাইম শিফটের মাধ্যমে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

আর অনলাইন পাঠদানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ভিডিও লেকচার আহ্বান করা হবে। সেখান থেকে সেরা লেকচারটি একটি বাছাই কমিটি নির্ধারণ করবে। সেগুলো ইউটিউবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে যে ক্ষতি হবে তা কোনদিন আমরা পুষিয়ে উঠতে পারব না।

লেখক : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষক

  • খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। eyenews.news-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে eyenews.news আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়