ঢাকা, শনিবার   ১৬ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ১ ১৪২৮

মোহাম্মদ আবদুল খালিক

প্রকাশিত: ২০:০৬, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
আপডেট: ২১:০৮, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন ও তাঁর অগ্নিযুগের ইতিকথা

শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন (১৮৯৮-১৯৯০) ত্রি-রাজত্বকালদর্শী এক প্রাজ্ঞ পুরুষ। জন্মের পর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরাধীনতার যাতাকলে পিষ্ট বৃটিশ-ভারত রাজত্বে কাটিয়েছেন। এরপর সিকি শতাব্দীর মত অতিবাহিত হয়েছে শোষণ-নিপীড়ন আক্রান্ত পাকিস্তানি শাসনামলে। আর জীবনের শেষ পর্যায়ের প্রায় দুই দশকের সাক্ষী ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে।

প্রায় শত-অব্দ প্রাচীন এই মানুষটির সঙ্গে পূর্বাপর আরো অর্ধশত বছরের  জানা-শোনা, চিন্তা-চেতনাজাত অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বলা যায় পৃথিবীতে সার্ধশতবছরেরও অধিক সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। জ্ঞানে-গরিমায়, চিন্তা-ভাবনায়, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের চর্চা ও লালনে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন। তাঁর জীবদ্দশাতে মানুষ তৈরির পেশাগত দায়িত্ব তথা শিক্ষকতার সঙ্গে সংযুক্ত থেকে কিংবা সৃজন ও মননশীল লেখালেখির মাধ্যমে আমাদের জন্য যে আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলিত করে গিয়েছেন সেই চেতনার উত্তাপে আমরা আজও ঋদ্ধ হতে পারি। তাঁর সম্পর্কে বাংলা কথাসাহিত্যের খ্যাতিমান পুরুষ মিরজা আবদুল হাই বলেন-

‘একবার কাশীনাথ হাইস্কুলে রবীন্দ্র জয়ন্তী উৎসব হল। ঐ স্কুলেরই শিক্ষক বাবু ব্রজেন্দ্র অর্জুন রবীন্দ্র কাব্যের দু একটি দিকের উপর গভীর আর জ্ঞান সমৃদ্ধ আলোকপাত করলেন। বিশেষ করে উর্বশী কবিতার পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কবিতার দুর্বল স্থানগুলিও অকাট্য যুক্তি সহকারে তুলে ধরলেন। রবীন্দ্র প্রতিভা তখনও বিদ্বান সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ মারা গেছেন উনিশ শ’ একচল্লিশে। তেতাল্লিশের এক মফস্বল শহরে প্রবীন শিক্ষাবিদের মুখে এমন মোহমুক্ত আলোচনা সবাইকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছিল।’

[মিরজা আবদুল হাই: হে অতীত, তুমি হৃদয়ে আমার কথা কও, শতাব্দী: মৌলভীবাজার মহকুমা শতবর্ষ পূর্তি স্মরণিকা, নভেম্বর, ১৯৮২]

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, চর্চায়-অনুধাবনে-অনুসন্ধানে কিংবা তাঁর সৃষ্ট দুর্লভ সম্পদের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমরা উত্তরসুরী হিসেবে যথার্থ দায়িত্ব পালন বা গুরুত্ব আরোপ করতে পেরেছি কী? আমাদের কী মনে হয় না তিনি হারিয়ে যেতে বসেছেন সমগ্র সৃষ্টিসমেত বিস্মৃতির অতলে? তবে আমরা বিশ্বাস করি, হয়তো সময় একেবারে ফুড়িয়ে যায়নি। আন্তরিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় প্রজ্ঞাবান শিক্ষক, মনন ও সৃজনশীল লেখক শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনকে স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত করে আমরা তাঁর কাছ থেকে আজও পাঠ গ্রহণ করতে পারি।

১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় তেরো কিলোমিটার দূরে রাজনগর উপজেলার নন্দিউড়া গ্রামে ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন জন্মগ্রহণ করেন। কথিত আছে তাঁর পূর্বপুরুষ ‘নন্দীশ্বর অর্জুন’ এর নামানুসারে গ্রামের নাম নন্দীউড়া বলে পরিচিতি পেয়েছে। পিতা স্বর্গীয় গোবিন্দ চন্দ্র অর্জুন, মাতা স্বর্গীয় সূর্য্যমনি অর্জুন। তিন ভাই এক বোন- মোট চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ভাই বোনেরা যথাক্রমে- ১. সুরেন্দ্র নাথ অর্জুন ২. গোপেন্দ্র নাথ অর্জুন ৩. চারু বিশ্বাস এবং ৪. ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন।

ভাইয়েরাও অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। নিজ গ্রামের পাঠশালাতেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার সূত্রপাত। এখানে তিনি ছাত্রবৃত্তিও লাভ করেছেন। পরবর্তী সময়ে মৌলভীবাজার শহরে তাঁর শিক্ষাগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়। ছাত্রাবস্থাতেই বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের সাহায্যে সংগঠিত হয়ে কাজ করার জন্য মৌলভীবাজার শহরে তরুণ সংঘের একটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর প্রথমবার মৌলভীবাজার আগমনের সময়ে তিনি ওই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্থানীয় টাউন হলে জন নায়ক অনঙ্গমোহন দাস মহোদয়ের সভাপতিত্বে নেতাজীর সম্মানে  যে বিরাট সভা অনুষ্ঠিত হয়  সেখানে ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন নিজের হাতে লেখা একখানা মানপত্র নেতাজীকে প্রদান করেন। তরুণ সংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন তাঁকে কৌশলে বেশ কিছুদিনের জন্য বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মৌলভীবাজার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে তিনি এন্ট্রান্স পাশ করেন। একপর্যায়ে মোক্তারশীপ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন ঠিকই কিন্তু ওই সময়টাতে মৌলভীবাজারে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেকে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেন  যে ওখান থেকে উদ্ধার পাওয়া তাঁর আর হয়ে ওঠেনি। প্রতিষ্ঠালগ্ন অর্থাৎ ২ জানুয়ারি ১৯১৭ খ্রি. থেকেই তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত ‘কাশীনাথ মধ্য ইংরেজী স্কুল’ এর দ্বিতীয় শিক্ষক পদে কাজে যোগদান করেন। তাঁর লেখা একটি পুস্তিকার ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেন-

‘পূর্ব্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা বিভাগ উচ্চ বিদ্যালয় সমূহের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রণয়নের নির্দ্দেশ দেওয়ায় এ ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্রকাশের উদ্যোগ করা হইয়াছে। কাশীনাথ আলাউদ্দিন হাই স্কুল কর্তৃপক্ষ লেখকের ন্যায় অনভিজ্ঞের উপর এই গুরু-দায়িত্ব-ভার অর্পনের একমাত্র কারণ তাঁহারা জানেন লেখক এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে আবাল্য জড়িত ও পরিচিত।’

[ভূমিকা, কাশীনাথ আলাউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস]।

আকৈশোর জ্ঞান আহরণ ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে তিনি যা অর্জন করেছেন তা-ই বিলানোর চেষ্টা করেছেন তাঁর কর্মকালীন ক্লাশরুমে ছাত্রদের মধ্যে এবং লেখালেখির মাধ্যমে সমাজের অন্যান্য স্তরের মানুষের কাছে। এই বিতরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল আমৃত্যু প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। প্রখর স্মৃতি-শক্তির অধিকারী ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গীতিকার, ইতিহাসবিদ ও বাগ্মী হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি ও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

অনেকের মতে চট্টগ্রামে বিপ্লবী সূর্য্যসেন যেভাবে মাস্টারদা বলে খ্যাত ছিলেন ঠিক একইভাবে মৌলভীবাজারে ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন ‘মাস্টারবাবু’ হিসেবেই সর্বমহলে পরিচিতি লাভ করেন ও সমাদৃত হন। রাজনীতি ক্ষেত্রে  বিপিন চন্দ্র পাল, সি আর দাশ, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু, সূর্য্যসেন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তিনি স্বীকার করেন সন্ত্রাসবাদী অনেকের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা জন্মেছিল। এটা সর্বজনবিদিত যে, পারিবারিকভাবে মুক্ত জ্ঞান চর্চার একটা পরিবেশ ও ছিল ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনদের। এক সময় বাড়িতে লাইব্রেরি ও ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এখান থেকে ‘রক্তের লেখা’ এবং ‘জলন্ত মশাল’ নামে হাতে-লেখা দু’খানা পত্রিকাও বিপ্লবী ছাত্র-তরুণদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হত। ছেলে বেলা থেকেই বই পত্রিকা পড়ার বাতিক ছিল ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনের। আর কেবল পাঠ নয় তখন থেকেই পত্রিকায় প্রকাশার্থে প্রবন্ধ লেখার অভ্যাসও তৈরি হয়েছিল তাঁর মধ্যে। সেই সময় সিলেট শহর থেকে প্রকাশিত বিপিন চন্দ্র পাল প্রতিষ্ঠিত অধুনালুপ্ত ‘পরিদর্শক’ পত্রিকার সম্পাদক প্যারীমোহন দাস মহোদয় ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন প্রেরিত প্রবন্ধগুলো তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ করতেন এবং মাঝে মধ্যে পত্র দ্বারা প্রবন্ধ লেখার জন্য উৎসাহ প্রদান করতেন। ‘পরিদর্শক’ পত্রিকায় একসময় তাঁর মেঝদাদা গোপেন্দ্রনাথ অর্জুনও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। গোপেন্দ্রনাথ অর্জুনের কবিতা ও প্রবন্ধ লেখায় হাত ছিল। তাঁর কাব্য ‘বিষের বাঁশী’ ও অন্যান্য গ্রন্থ সেই সময়ে যথেষ্ঠ সুনাম অর্জন করেছিল। ওই সময়টাতে পত্রিকায় প্রকাশিত চিঠির কারণে একটা ঘটনা ঘটল। সিলেট জেলা বারের উকিল সর্গীয় ক্ষীরোদ চন্দ্র দত্ত বিএল মহোদয় সম্পাদকের বিরুদ্ধে মান হানির মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তখনকার দিনে ‘চিমটি কাটার মোকদ্দমা’ নামে সমগ্র জেলায় প্রসিদ্ধি লাভ করে। নিম্ন আদালতে মামলার রায়ে গোপেন্দ্রনাথ অর্জুনের তিনশত টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে ছয় মাস কারাদদণ্ডের আদেশ হয়। অবশ্য আপীলে সে দণ্ড আর বহাল থাকেনি।

ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন ও সুরবালা অর্জুনের তিন মেয়ে তিন ছেলে। ক্রমানুসারে তাঁরা হলেন-

১. সতীপ্রভা দত্ত কানুনগো

২. বিনয়েন্দ্র নাথ অর্জুন

৩. বনেন্দ্র নাথ অর্জুন

৪. সন্ধ্যা বিশ্বাস

৫. সবিতা সোম

৬. মানবেন্দ্র অর্জুন।

বড় ছেলে বিনয়েন্দ্র নাথ অর্জুন সিলেটের বাগবাড়ি অঞ্চলে বসবাস করেন। তাঁর এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলে বিশ্বজিৎ অর্জুন রূপক সিলেটের একটি আইটি ফার্মের ইনচার্জ। ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনের দ্বিতীয় ছেলে বনেন্দ্রনাথ অর্জুন গ্রামের বাড়ি নন্দিউড়ায় বাস করেন। তাঁর এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলে বিবেকানন্দ অর্জুন একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তাঁর ছোট ছেলে মানবেন্দ্র অর্জুন ১৯৯৭ সালে অকাল প্রয়াত। তাঁর তিন মেয়ে। ছোট মেয়ে সোনিয়া অর্জুন সিলেটের একটি কলেজে প্রভাষক পদে কাজ করছেন। ব্রজেন্দ্র নাথ অর্জুনের বড় মেয়ে সতীপ্রভা দত্ত কানুনগো’র দুই মেয়ে ও তিন ছেলে।

বড় ছেলে ডা. পার্থ সারথি দত্ত কানুনগো ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয় ছেলে সিদ্ধার্থ শংকর দত্ত কানুনগো সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এবং ছোট ছেলে সব্যসাচী দত্ত কানুনগো সিলেট সরকারি কলেজে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। ১৯৯৬ সালে সতীপ্রভা দত্ত কানুনগো মারা যান। ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনের দ্বিতীয় মেয়ে সন্ধ্যা বিশ্বাসের এক মেয়ে সৌমিত্রী বিশ্বাস টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে সবিতা সোম ভারতের শিলচরে বসবাস করেন। তাঁর এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে প্রকৌশলী এবং মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর ‘ভারতের বহ্নি বিপ্লব’ বইটি ছোট মেয়ে শিলচর থেকে প্রকাশ করেন। বইটি সেখানকার পাঠক সমাজে বেশ সমাদৃত হয় এবং শিলচর বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের পক্ষ থেকে এটিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর ছিল অফুরন্ত শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আস-পাশের অনেকে ভয়ে ভারতে পাড়ি জমালেও তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতেই থেকে যান এবং সাধ্যমত মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা ও প্রেরণা যোগান। অবশ্য একটা পর্যায়ে হানাদার বাহিনি কিংবা তাঁদের দোসরদের হিংস্র থাবা থেকে তাঁর বাড়িঘর, সহায় সম্পত্তি রক্ষা পায়নি। বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিলে দীর্ঘদিনের সঞ্চিত দুর্লভ বই পত্রিকার বিশাল সংগ্রহশালাটি পুড়ে ছাঁই  হয়ে যায়। 

আশৈশব পড়াশুনার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ ছিল । পারিবারিক ঐতিহ্য ও নিজেদের বিপুল বই পুস্তক, পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদির সংগ্রহ তাঁর পড়াশুনা ও জ্ঞান আহরণের ইচ্ছাকে তাতিয়ে তুলেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তিনি জানান-

‘ছেলে বেলায় পাঠ্যপুস্তক অপেক্ষা পাঠ্য তালিকা বহির্ভূত বহি পাঠে মনোযোগ দিতাম বেশী। অষ্টমমান শ্রেণীরপাঠ সমাপনের পূর্বেই ‘বিদ্যাসাগর’, ‘বঙ্কিম চন্দ্র’, ‘মধুসূদন’, ‘রমেশচন্দ্র’, ‘হেমচন্দ্র’, ‘নবীনচন্দ্র’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘শরৎচন্দ্র’, ‘দ্বিজেন্দ্রলাল’, ‘গিরীশচন্দ্র’, ‘অমৃতলাল’, ‘স্বর্ণকুমারী’ পড়িয়া ফেলিয়াছিলাম। বাইরের বই পাঠে অতিরিক্ত মনোনিবেশ হেতু ছাত্রত্বের মর্যাদা সঠিকভাবে রক্ষা হয় নাই সত্য- তবে আমার সহাধ্যায়ী ও বন্ধুবান্ধব প্রায় সকলেই বলিতেন- তাঁহাদের তুলনায় সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা অর্জিত হইয়াছিল আমার সমধিক সেই কিশোর বয়সেই।’ [ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন- লেখকের নিবেদন, অগ্নিযুগের ইতিকথা, ঢাকা ১৯৭৯]

ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন আজীবন নানা সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি যেসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিশেষ করে শিক্ষা বিস্তারের  কাজে সময় দিয়েছেন, অবদান রেখেছেন এরকম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম-

১. দক্ষিণ শ্রীহট্ট লোকাল বোর্ড

২. কাশীনাথ আলাউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়

৩. রাজনগর পোর্টিয়াস হই স্কুল

৪. রাজনগর মেহেরুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়

৫. রাজনগর ডিগ্রি কলেজ।

প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সাহিত্যকর্ম:

বিভিন্নসূত্রে আমরা ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনের যেসব বই পুস্তকের নাম পেয়েছি তা থেকে বুঝা যায় সংখ্যার দিক দিয়ে তা একেবারে কম ছিল না। এর বাইরে হয়তো আরও থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তিন-চারটি বই-ই ইদানিং ঘুরে ফিরে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অধিকাংশেরই খোঁজ-খবর আমরা অনেকেই জানি না। পরিচিত বই-পুস্তকগুলোও আজকাল বাজারে দুর্লভ। কাজেই তাঁর প্রকাশিত বইয়ের পুন:প্রকাশ এবং পান্ডুলিপি সংগ্রহ সাপেক্ষ অপ্রকাশিত বইগুলোর প্রকাশের প্রচেষ্টার মাধ্যমে ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনের বহুমুখি সৃজন ও মনন এর সঙ্গে আমাদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নিম্নে বিষয়ওয়ারি কিছু বইয়ের তালিকা দেওয়া হল-

  • নাটক:

১. পলাশী (১৯৬৯),

২. আওরঙ্গজেব,

৩. শিবাজী,

৪.  রণজিৎ সিংহ,

৫. যুগ পরিবর্তন।

  • কাব্য/সঙ্গীত

১.জয়বাংলা,

২.গান ও কবিতা সংকলন

  • ইতিহাস

১. অগ্নিযুগের ইতিকথা (১৯৭৯),

২. স্বাধীনতার ইতিহাস-দুই খন্ড, 

৩. ভারতের বহ্নি-বিপ্লব,

৪. নেতাজী সুভাস চন্দ্রের আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন ও পূর্বভারত আক্রমণ,

৫. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

৬. রাজনগরের প্রাচীন ইতিহাস,

৭. কাশীনাথ আলাউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১৯৬৮)।

  • জীবনী

১. কবি ষষ্টীবর দত্তের জীবনী,

২. রাজনগরের পীর সাধু ও ভক্ত জীবনী।

  • ভ্রমণ কাহিনি

১.এক নজরে গয়াকাশী।

  • প্রবন্ধ

১.বিবিধ প্রবন্ধ ইত্যাদি।

তাঁর ছাত্র জীবনে লেখা একটি পান্ডুলিপির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন যার শিরোনাম ছিল ‘ছেলেদের কংগ্রেস’ যেখানে তিনি ‘মহাত্মা গান্ধীর অহিংসবাদ পার্থিব জগতে অচল আর সুতা কাটিয়া দেশের স্বাধীনতা অর্জন অসম্ভর’ বলে মন্তব্যও করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক হল গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে বাড়িতে পুলিশি তল্লাসীর কারনে অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ধংস হয়ে যায়। এর মধ্যে এই পান্ডুলিপিটিও ছিল।

দীর্ঘ চাকুরি জীবনের অধিকাংশ সময় বড় ভাইয়ের ছোট ছেলে অ্যাডভোকেট রনেন্দ্রনাথ অর্জুনের সঙ্গে শান্তিবাগস্থ বাসায় একত্রে কাটিয়েছেন। অবসরকালীন শেষ জীবন গ্রামের বাড়ি নন্দীউড়াতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে থাকতেন। ১৯৯০ সালের ২০ মে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বিরানব্বই বছর বয়সে পরলোক গমন করেন।

দুই.

অগ্নিযুগের ইতিকথা (১৯৭৯) ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন এর পরিশ্রমলব্ধ, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূরণ ও উল্লেখযোগ্য সময়ের ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে লেখা এক ঐতিহসিক এবং ভৌগোলিক দলিল। ‘ইতিহাসকে ইমানুয়েল কান্ট দেখেছেন সময়ের স্রোতধারায় মানুষের কার্যক্রমের দলিল হিসেবে আর ভূগোলকে দেখেছেন মানুষের আবাসিক পরিমন্ডলের পরিবর্তনের নিদর্শন হিসেবে। যেহেতু মানুষের কর্মকাণ্ড এক বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশে সংঘটিত হয়, তাই ভূগোলই ইতিহাসের ভিত্তি।’ [প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি-আব্দুল মুমিন চৌধুরী, বর্ণায়ন, ঢাকা ২০০২]

কাজেই অনেকে মনে করেন ‘অগ্নিযুগের ইতিকথা’ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময়কার আমাদের ভূগোলকে আলোড়িত করার এক তথ্য ও তত্ত¡ সমৃদ্ধ বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস। গ্রন্থখানির একটা সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এখানে আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আগামী দিনের পাঠকরা এই সুখপাঠ্য গ্রন্থ থেকে জেনে নেবেন তাঁদের সংগ্রামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। ‘অগ্নিযুগের ইতিকথা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন চিত্তরঞ্জন সাহা, মুক্তধারা প্রকাশনি, ৭৪ ফরাশগঞ্জ, ঢাকা-১ থেকে। প্রকাশকাল ডিসেম্বর ১৯৭৯ খ্রি.। প্রচ্ছদ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, মূল্য সতের টাকা, মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৬৮। পরবর্তীতে এর আর কোনো সংস্করণ বেড়িয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। এখন বাজারেও তা দূর্লভ। ‘উৎসর্গ পত্র’-এ যা লেখা হয়েছে-

স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা অগ্নিযুগের বীর বিপ্লবীদের পূণ্য-স্মৃতির উদ্দেশে মৎপ্রণীত এই ক্ষুদ্র পুস্তক, ‘অগ্নিযুগের ইতিকথা’ উৎসর্গিত হইল।

লেখকের নিবেদন ছাড়া মোটা দাগে যে কয়টি শিরোনামযুক্ত পরিচ্ছদ বা অধ্যায়ে গ্রন্থটি বিন্যস্ত হয়েছে তা নিম্নরূপ-

১.       উপক্রমণিকা

২.      প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম

৩.     সন্ত্রাসবাদের সূচনা ও ক্রমবিকাশ

৪.       ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিপ্লব প্রসার

৫.      প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ও বিপ্লবীদের বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির প্রচেষ্ঠা

৬.      পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ

৭.       জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড ও পাঞ্জাব প্রদেশে অনুষ্ঠিত অনাচার

৮.      চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও পাহাড়তলীর যুদ্ধ।

বর্ণিত এই আটটি শিরোনামের প্রতিটি পরিচ্ছদ বা অধ্যায়ে বিবৃত বিষয়বস্তুকে আবার প্রায় প্রতি পৃষ্ঠার বাম পাশে ছোট ফন্টে লিখে আরো প্রায় একশ’টির মত উপ-শিরোনামেও বিভাজিত করে বর্ণিত হয়েছে। যেমন উপক্রমণিকা অংশে আছে-

‘ফকির বিদ্রোহ’, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ওহাবী আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদের সূচনা ইত্যাদি নয়টি উপ শিরোনাম, সন্ত্রাসবাদের সূচনা ও ক্রমবিকাশ অধ্যায়ে রয়েছে- মৌলভীবাজার শহরে গর্ডন হত্যার প্রচেষ্টা, বাঘা যতীন, বড়লাটের উপর বোমা নিক্ষেপ এজাতীয় বিশটি উপ-শিরোনাম। যে গুলোর সাহায্যে গ্রন্থে আলোচিত বিষয়বস্তুর একটা সামগ্রিক ধারণা লাভ করা যায়। ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন তাঁর মেধা ও শ্রমের ফসল এ গ্রন্থটি সম্পর্কে জানান-

‘উপাদান সংগ্রহ করিতে আমাকে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছে। বিপ্লবীদের কথিত কাহিনী, পুরাতন পত্রিকার প্রাপ্ত বিবরণী, আনন্দবাজার, যুগান্তর, দেশ, বসুমতী ও নিজের স্মৃতিমাত্র অবলম্বন করিয়াই আমি ঘটনাবলী বিবৃত করিয়াছি। ভুল-ত্রæটি থাকিতেও পারেÑযদি থাকে সেই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য সুধীজন সমীপে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’

[দ্র:লেখকের নিবেদন অ যু ই]

অধ্যক্ষ রসময় মোহান্ত এ বই প্রসঙ্গে বলেন-

‘ইতিহাসের এক নির্মোহ সেবক হিসেবে ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন দেশের ইতিহাস পরিচর্যায় যে যুক্তিবাদিতা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা অনেক তথাকথিত বড় বড় ডিগ্রীধারী ইতিহাসবিদের মধ্যেও দেখা যায় না। স্তাবকতা, ব্যক্তিপূজা ও প্রচারধর্মিতার জঞ্জাল ভেদ করে সঠিক তত্ত¡ ও তথ্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর একাগ্রতা অসাধারণ।’

[রসময় মোহান্ত: স্মরণ-ঘোষপুর, ১৪০১- নন্দলাল শর্মার মৌলভীবাজারের সাহিত্যাঙ্গন গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত]

বইটির প্রথম কয়েকটি পরিচ্ছদ অধ্যাপক সুনির্মল কুমার দেব (মীন) সম্পাদিত এবং মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘বন্যা’য় বেরিয়েছে। পরবর্তীতে অগ্নিযুগের ইতিকথা গ্রন্থের অধিকাংশ ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। বইটির রচনার পরিপূর্ণতা দান ও গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য তাঁর বন্ধুবান্ধব অনেকেই উৎসাহিত করেছেন। বিশেষ করে হবিগঞ্জের ‘আহরণী’ সম্পাদক প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক জনাব গোলাম মোর্তাজা চৌধুরীর আগ্রহপ্রকাশ ও উৎসাহ দান এক্ষেত্রে তাঁকে এগিয়ে নিয়ে£ গেছে। এছাড়া বইখানি লেখার ও প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব একটা তাগিদও কাজ করেছে। তিনি বলেন-

‘যে সকল বীর যুবক দেশের জন্য তিলে তিলে দেহ প্রাণ ক্ষয় করিয়াছেন, শরীরের শেষ রক্ত বিন্দুটি পর্য্যন্ত নিঃশেষে দান করিয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছেন, অনাদরে উপেক্ষায়, অনাহারে-অনিদ্রায় বনে-জঙ্গলে, পথে-ঘাটে, নদী-নালায় জীবন বিসর্জন দিয়াছেন, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়াইয়াও জীবনের জয়গান গাহিয়াছেন, তাঁহাদের নাম-নিশানাও আজ স্বাধীন দেশে লুপ্তপ্রায়। ... তাঁহাদের অমর স্মৃতি দেশবাসীর চিত্তপটে আঁকিয়া রাখাই আমার এ ক্ষুদ্র পুস্তক লেখার উদ্দেশ্য।’ [

লেখকের নিবেদন অ যু ই]  

ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন গ্রন্থের উপক্রমনিকা অধ্যায়টি শুরু করেন এভাবে-

‘অগ্নিযুগের বৈপ্লবিক ঘটনাবলী বর্ণনার পূর্বে কি অবস্থার প্রেক্ষিতে এ দেশের যুব সমাজ সশস্ত্র বিপ্লব তথা সন্ত্রাসবাদেও প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হইল, তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ না দিলে পূর্বাপর সামঞ্জস্য রক্ষিত হয় না। ১৭৫৭ সালে দেশ ইংরেজ কবলিত হওয়ার পরবর্তীকালীন দেশের অবস্থা ও দেশের স্বাধীনতা লাভের জন্য দেশবাসীর উগ্র বাসনা এবং পুণ: পুণ: ব্যর্থ প্রয়াসের একটা ধারাবাহিক বিবরণ সংক্ষেপে উপক্রমণভাগে প্রদত্ত হইল’(পৃ: ৯)।

এ অংশে যেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে-

  • বিপ্লব অর্থ
  • ইংরেজ অবদান
  • নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ও তৎপরবর্তী দেশের অবস্থা
  • নবাব মীর কাসেম
  • নবাব হায়দার আলী টীপু সুলতান
  • ফকির বিদ্রোহ
  • সন্ন্যাসী বিদ্রোহ
  • ওহাবী আন্দোলন
  • তীতুমীর ইত্যাদি।

ভাষাসহ জনকল্যাণ ও সংস্কারমুখি বিভিন্ন ভাল কাজে ইংরেজ অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি ইংরেজ ও পাকিস্তানী রাজত্বের একটা তুলনামূলক চিত্র দাঁড় করান-

’ইংরেজ বণিককুল আর পাকিস্তানী শাসকবর্গ লুণ্ঠন করিয়াছে আমাদের সর্বস্ব-দুই দল দুমুখো নীতি অবলম্বন করিয়া। ইংরেজ লইয়াছে ছলে-কৌশলে আর পাকিস্তানীরা লইয়াছে জোরে-বলে, পাশবিক শক্তি প্রয়োগে। ইংরেজ তাজমহলের মণিমাণিক্য খুলিয়া লইলেও কৃত্রিম প্রস্তরাদি সংযোজনে সৌন্দর্যটুকু অক্ষুন্ন রাখার প্রয়াস পাইয়াছে; আগ্রার ‘শ্রী’ নষ্ট করিলেও সৃষ্টি করিয়াছে নতুন দিল্লী; মুর্শিদাবাদ ধ্বংস করিলেও পত্তন করিয়াছে কলিকাতার। কিন্তু আমাদের পশ্চিমা দরদীরা আগুন জ্বালাইয়া শ্মশান করিয়াছে সোনার বাংলা; ... বাংলার অর্থে নির্মিত হইয়াছে পাকিস্তানের শ্বেত-শুভ্র-সৌধরাজী, সৃষ্টি হইয়াছে প্রশস্ত-উন্নত রাস্তাঘাট, শস্যশ্যামলা হইয়াছে উষর-প্রান্তর-মরুভূমি’ (পৃ:১২)।

প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম অধ্যায়ে তিনি এটাকে প্রকৃত নির্দেশনা ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হওয়া এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও রাজা ওমরাহদের অসহযোগিতার কারনে অচিরেই ইংরেজ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ভয়ংকর নিষ্ঠুরতায় অনেক জীবন ও রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে বিদ্রোহের অবসান ঘটে। তবে এর একটা সুদূর প্রসারি ফলাফল, কল্যাণী সম্ভাবনার দিকটিও ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনের মূল্যায়নে উঠে এসেছে বলে মনে হয়েছে-

‘১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দের বিপ্লব সম্পূর্ণ সার্থক না হইলেও এদেশে আনিয়াছিল এক বিরাট পরিবর্তন- সামান্য এক ব্যবসায়ী কোম্পানীর ‘ডিরেক্টর বোর্ড’ শাসন যন্ত্রের নিষ্পেষণ হইতে মুক্ত হইয়া উপমহাদেশ ইংল্যান্ডের নিয়মতান্ত্রিক নৃপতির শাসনাধীনে আসিয়াছিল। ইংল্যান্ডেশ্বরী মহারানী ভিক্টোরিয়া ১৮৫৮ খ্রীস্টাব্দে এক ঘোষণাপত্র জারী করিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করেন। উক্ত ঘোষণাপত্রে মহারানী জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ভারতীয় জনসাধারণের প্রতি সমব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষিত না হওয়াই হইল ভারতবাসীর চিত্ত বিক্ষোভের কারণ- তারই ফলে হয় সন্ত্রাসবাদ আন্দোলনের অভ্যূদয়’ (পৃ: ২৩)।

আলোচ্য গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে ‘সন্ত্রাসবাদের সূচনা ও ক্রমবিকাশ’ সম্পর্কিত মোটামুটি একটা দীর্ঘ আলোচনা। তারই একটা অংশে ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন অরবিন্দ-বারীন্দ্র-ভূপেন্দ্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। শ্রী অরবিন্দ প্রসঙ্গে তিনি লিখেন-

‘শ্রী অরবিন্দ ছিলেন দেশপ্রেমের জ্বলন্ত বিগ্রহ। তিনিই বাংলাদেশে বিপ্লবমন্ত্রের উদঘাতা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ শ্রী অরবিন্দের উদ্দেশে একটি অমর কবিতা লিখিয়া তৎপ্রতি আপন শ্রদ্ধা রিনবেদন করিয়াছেন। কবিতাটির প্রথম কয়েক পংক্তি নিম্নে উদ্ধৃত হইল-

অরবিন্দ! রবীন্দ্রের লহ নমস্কার।

হে বন্ধো! হে দেশ বন্ধো! স্বদেশ আত্মার

বাণীমূর্তি তুমি। তোমা লাগি নহে ধন

নহে মান ...   বিধাতার

শ্রেষ্ঠ দান আপনার পূর্ণ অধিকার

চেয়েছ দেশের হয়ে অকুণ্ঠ আশায়

সত্যের গৌরব-দীপ্ত প্রদীপ্ত ভাষায়

অখন্ড বিশ্বাসে’

(পৃ: ২৬-২৭)। 

ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিপ্লব প্রসার অধ্যায়টি যেসব উপ শিরোনাম নিয়ে আলোচিত হয়েছে তা হলো- ১. বিলাতে কার্জন ওয়ালি হত্যা ২. মাদ্রাজ বিপ্লব ৩. এলাহাবাদ ৪. অরুণাচল আশ্রম ও ঠাকুর দয়ানন্দ ৫. শ্রীহট্ট গৌরব মহেন্দ্রনাথ ৬. দয়ানন্দের ঘোষণা ৭. বিপ্লবী হরদয়াল ও গদ্দর আন্দোলন ৮. কামাগাটামারু ও বাবা গুরুজিৎ সিং ৯. ভারতব্যাপী বিদ্রোহ প্রচেষ্টা ১০. লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা ১১. রাসবিহারীর দেশত্যাগ ১২. ভারত রক্ষা আইন ১৩. ব্রহ্মদেশে বিপ্লব ইত্যাদি। ‘শ্রীহট্ট-গৌরব মহেন্দ্রনাথ’ সম্পর্কে তিনি জানান-

মহেন্দ্রনাথ দে ১৯০৫ সালে এম.এ পরীক্ষায় গণিত শাস্ত্রে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করিয়াছিলেন। সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজী, পার্শি, গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায় তাঁহার প্রগাঢ় ব্যুৎপত্তি ছিল। তিনি স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান করেন। ঠাকুর দয়ানন্দের অনুসারী মহেন্দ্রনাথের ধারণা ছিল এদেশের গণ-আন্দোলন ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কবর্জিত অবস্থায় চলিতে পারে না। তাই তিনি স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত‘অরুণাচল’ আশ্রমে কতিপয় শিক্ষিত যুবককে দেশীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত করিয়া স্বদেশপ্রেমে দীক্ষিত করিতে উদ্যোগী হন। মহেন্দ্রণাথ এম.এ পরীক্ষায়্ উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রথমে ময়মনসিংহ কিশোরগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেন।...অতঃপর তিনি হবিগঞ্জ শহরে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করিয়া হবিগঞ্জ আসেন এবং এখান হইতে ১৯০৯ সালের এপ্রিল মাসে মাসিক পত্রিকা ‘মৈত্রী’ ও সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘প্রজাশক্তি’প্রকাশ করেন। হবিগঞ্জ হইতেই মহেন্দ্রনাথ ‘অরুণাচল’ আশ্রমে চলিয়া যান। কিছুদিন পর তদীয় জ্যেষ্ঠ সহোদর দিগেন্দ্রনাথ দে মহাশয়ও সরকারী চাকুরী পরিত্যাগ করিয়া ঠাকুর দয়ানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আরো বৎসর কাল পরে মহেন্দ্রনাথ-দিগেন্দ্রনাথ ভ্রাতাদ্বয় , মৌলভীবাজার শহর হইতে চারি মাইল পশ্চিমে অবস্থিত জগতসী গ্রামে- তাহাদের পৈতৃক বাসভবনে  পরলোকগত পিতার নামে ‘দোলগোবিন্দ আশ্রম’ প্রতিষ্ঠিত করিয়া, উক্ত ভদ্রাসনসহ তাঁহাদের সমস্ত বিত্ত-বিভব উক্ত আশ্রমের নামে দান করেন’ (পৃ: ৬৬-৬৭)।

এভাবে আমরা লক্ষ্য করব অগ্নিযুগের ইতিকথা গ্রন্থের লেখক শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন তাঁর সুলিখিত এ গ্রন্থের অপরাপর অধ্যায়গুলোও উপমহাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ সময় ও আন্দোলনের ঘটনাবলীকে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় সাজিয়েছেন এবং তাঁর স্বদেশিয়ানা ও মুন্সিয়ানাকে এরই সঙ্গে যুক্ত করে আমাদের সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে তাঁর নিজস্ব বর্ণনাভঙ্গিতে ইতিহাসের এ বিশেষ অঞ্চল পরিভ্রমণে অনেক ছোট-খাটো ঘটনাবলী স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আমাদের কাছে হৃদয়গ্রাহী ও প্রাণবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে।

তথ্য সূত্র:

শতাব্দী: মৌলভীবাজার মহকুমা শতবর্ষ পূর্তি স্মরণিকা, ১৯৮২

ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুনÑকাশীনাথ আলাউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস,১৯৬৮

ব্রজেন্দ্রনাথ অর্জুন- অগ্নিযুগের ইতিকথা, মুক্তধারা, ঢাকা ১৯৭৯

নন্দলাল শর্মা-মৌলভীবাজারের সাহিত্যাঙ্গণ, সিলেট ১৯৯৭

মাহফুজুর রহমান- নানা প্রসঙ্গ নানা ভাবনা, মুক্তধারা, ঢাকা ২০০৭

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি-আব্দুল মুমিন চৌধুরী, বর্ণায়ন, ঢাকা ২০০২

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: 

  • বিনয়েন্দ্র নাথ অর্জুন
  • পার্থ সারথি দত্ত কানুনগো
  • শর্মিলা অর্জুন

মোহাম্মদ আবদুল খালিক, সাবেক অধ্যক্ষ, মৌলভীবাজার সরকারি মহিলা কলেজ।

[ফসল-৪ ২০১৯ এ প্রথম প্রকাশিত]

  • খোলা জানালা বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। eyenews.news-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে eyenews.news আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়