ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৭ মে ২০২২,   জ্যৈষ্ঠ ৩ ১৪২৯

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

প্রকাশিত: ২২:৪৯, ৯ মে ২০২২
আপডেট: ১২:২৮, ১০ মে ২০২২

বঙ্গবন্ধুর চেতনা সন্ধান

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে কয়েক হাজার গ্রন্থ-স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যদিও সত্যিকার চেতনাস্নাত ও মানসম্মত প্রকাশনা সীমিত-হাতেগোনা। কারণও সবার জানা অধিকাংশ প্রকাশনা যত না বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে, তার চেয়ে অধিক সরকারি সুবিধা লাভের বাসনা থেকে। সেকারণে ওখানে নেই বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা-সত্যানুসন্ধান; শুধু আছে প্রশ্নহীন প্রশংসা কিংবা আবেগময় বন্দনা।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের বিচিত্র অনুষঙ্গ অধ্যয়নের মাধ্যমে আমাদের আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রাণিত করতে এই বইয়ের অবদান রাখেবে। বইটির প্রাপ্তিস্থান কিংবা পরিবেশক থাকলে পাঠক সহজে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক এমন প্রয়োজনীয় বইটি সহজেই সংগ্রহ করতে পারতেন। বঙ্গবন্ধুর চেতনার সন্ধান দেওয়া বইটি পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে রবীন্দ্রনাথ যেমন ব্যক্তি থেকে একটি বিষয়, তেমনি অচিরেই বঙ্গবন্ধুও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উন্নীত হবেন অচিরেই।

এমন বাস্তবতার ব্যতিক্রম বলা যায় মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত ‘খুঁজে পাই চেতনার বাতিঘর’ (২০২১) স্মারকগ্রন্থটি। সম্পাদনা পর্ষদ প্রকৃতপক্ষে অন্তরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-চেতনাকে ধারণ করেন বলেই প্রত্যন্ত জেলা পর্যায় থেকে এমন উন্নতমানের প্রকাশনা সম্ভব সেটা প্রমাণ করেছেন। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাণীসহ চারটি বাণী, ছাপ্পান্ন প্রবন্ধ ও চৌদ্দটি কবিতা নিয়ে সাজানো চারশো আটাশি পৃষ্ঠার গ্রন্থটির আঙ্গিক সৌষ্ঠব দৃষ্টিনন্দন নিঃসন্দেহে। প্রতিটি প্রবন্ধের শুরুতে একটি করে কবিতাংশ কবির নামসহ, তার আগের পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর একেকটি ছবির নিচে উদ্ধৃত একেকটি বাণী এবং প্রতিটি প্রবন্ধ-কবিতার শেষে লেখকের ছবিসহ সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সম্পাদনা পর্ষদের নিবিড় নিষ্ঠার স্বাক্ষর। সম্পাদনা পর্ষদ প্রধান মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান। তবে অভিজ্ঞতালব্ধ অনুমান আসল কাজ লেখা-সংগ্রহ ও সম্পাদনা করতে হয়েছে সম্পাদনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দকে। বিশেষত যখন মৌলভীবাজারের একদল নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যকর্মী : মল্লিকা  দে, অপূর্ব কান্তি ধর, তানিয়া সুলতানা, মোহাম্মদ আবদুল খালিক, রুমানা ইয়াসমিন, আহমদ সিরাজ,  মো. মেহেদী হাসান, ড. মো. ফজলুল আলী, সাবরীনা রহমান, আকমল হোসেন নিপু, মো. জসীম উদ্দীন মাসুদ,  দীপংকর মোহান্ত, হাসানাত কামাল ও কাওসার ইকবাল থাকেন সম্পাদনা পর্ষদে।

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম রচিত ‘পনের আগস্ট পঁচাত্তর ও রক্তাক্ত ঘটনাপঞ্জি’ প্রবন্ধের অর্ধেকাংশ জুড়ে আছে লেফটেনেন্ট কর্ণেল (অব.) এম এ হামিদ রচিত তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ (১৯৯৯) গ্রন্থের উদ্ধৃতি। উপসংহারে এক স্তবকে কেবল ‘নব্য মীরজাফর খন্দকার মোস্তাক আহমদ-এর কুকীর্তি ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার কথা বণিত হয়েছে। সদ্য প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘এক সচেতন আমলার চোখে শেখ মুজিব’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু কখনও আইয়ুবের কাছে হাত জোড় করেননি। এই রেকর্ড সারা পাকিস্তানে কোনো দ্বিতীয় রাজনৈতিক নেতার ছিল না (পৃ. ৪০)। মো. শাহাব উদ্দিন এমপি ‘চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার দৃষ্টান্তে দৃষ্টিপাত করেছেন। উপাধ্যক্ষ ড. মো. আবদুস শহীদ এমপি রচিত ‘আমার দেখা বঙ্গবন্ধু’ আসলে স্মৃতিচারণমূলক রচনা। নেছার আহমদ এমপি, সৈয়দা জোহরা আলাউদ্দিন এমপি ও উপাধ্যক্ষ রেমন্ড আরেং রচিত প্রবন্ধতিনটি অংশগ্রহণমূলক মনে হয়েছে। তবে এডভোকেট আফজাল হোসেন তাঁর প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর খুনীরা কখন কীভাবে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে  সেসব তথ্য উপস্থাপন করেছেন। 

আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘বিদ্যাপীঠ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হোক’ লেখাটি গ্রন্থভুক্ত হবার কারণ কেবলমাত্র সম্পাদনা পর্ষদ প্রধানের প্রসঙ্গ ছাড়া পুরোটাই অপ্রাসঙ্গিক ঠেকছে। বিশেষত তাঁর বঙ্গবন্ধু বিষয়ক মূল্যবান প্রবন্ধ যেখানে প্রচুর। রামেন্দু মজুমদার ‘বঙ্গবন্ধুর কাছে খোলা চিঠি’তে স্মরণ করেছেন ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এ বাংলা একাডেমিতে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গ, ভারতের শরণার্থী শিবিরে হিন্দু রমনীগণের বঙ্গবন্ধুর ছবিতে ভাইফোঁটা দিয়ে মঙ্গল কামনাসহ নানান প্রসঙ্গ। অতাউর রহমান ‘অনিঃশেষ বঙ্গবন্ধু’ রচনায় আক্ষেপ করেছেন যে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড কেন ঘটিয়েছিল তার উত্তর আমরা দেশবাসী আজও পাইনি। হাশেম খান ‘ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর শেষ উচ্চারণ’ রচনায় লিখেছেন যে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ‘জয় বাংলা’ই আমাদের এগিয়ে নিতে পারে প্রগতির পথে। সেলিনা  হোসেন ‘বাংলার মাটি আমার মাটি’ প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন ভাষণ থেকে উদাহরণ উল্লেখ করে দেখিয়েছেন বাংলার মাটির সঙ্গে আত্মশক্তি অনুভবের মাত্রায় তাঁর অনন্যতা। 

মফিদুল হক ‘শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু : নতুন আলোকে নেতৃত্বের অনন্যতা বিচার’  প্রবন্ধে বঙ্গন্ধুর নেতৃত্বের বিশিষ্টতা বিশ্লেষণ করে লিখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মুচলেকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর না করার ঘটনার উল্লেখ বদরুদ্দীন উমর করেননি ভিন্ন চেতনায় উদ্ভূত হয়ে। নাসির উদ্দিন ইউসুফ ‘মুজিব: নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের প্রতীক’ প্রবন্ধে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র আলোকে আলোকপাত করেন, পাকিস্তানের নিপীড়কদের সমর্থক কতিপয় বাঙালি রাজনীতিবিদ ও দলের অভ্যন্তরে ব্যক্তিস্বার্থ অগ্রাধিকারী নেতৃত্ব যৌথভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের গণসম্পৃক্ততা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অনালোচিত ইতিহাস। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘এই অগস্টে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে’ শিরোনামের লেখায় গল্পের মতো করে তত্ত্বকথা শোনান: সংবিধানে যে চার মূলনীতি সংযোজিত হয়েছিল, সেগুলো ছিল সভ্য মানুষের অস্ত্র। এই অস্ত্র পশ্চিমের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা জোগান দেয় না, এটি তৈরি হয় বাংলাদেশের সংস্কৃতি-ইতিহাস ও সৃজনচিন্তায় (পৃ. ১২২)। ড. আতিউর রহমান ‘রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু : যুদ্ধের ছাইভস্ম থেকে সমৃদ্ধির পথে’ প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের (১৯৭৫) প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা ব্যাখ্যা করেছেন বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিতে। মুহমদ জাফর ইকবাল ‘অভিশপ্ত আগস্ট’ রচনায় আকর্ষণীয় ভাষাভঙ্গিতে তুলে এনেছেন পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট কীভাবে এদেশ মুহূর্তের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের সকল আদর্শকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ধর্মান্ধ একটি কানাগলিতে হারিয়ে যেতে বসেছিল সে কাহিনি। সাথে ১৫ আগস্ট ২০১৭ সালে আরেকটি জঙ্গি হামলা পুলিশ পণ্ড করবার তথ্যও পাঠক অবহিত হন।

গোলাম কদ্দুছ ‘কবি নজরুল ও শেখ মুজিব : বাংলার দুই সাহসী সন্তান’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, নজরুল ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে যেমনটা প্রত্যাশা করেন ‘বাঙলা বাঙালির হোক/ বাংলার জয় হোক’; বঙ্গবন্ধুও তেমনি বৃহত্তর ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও শরৎচন্দ্র বসুর অনুসারী হয়ে ভারত বিভক্তির সময়ে (১৯৪৭) ‘যুক্ত বাংলা’ বা ‘বঙ্গদেশ’ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কংগ্রেস ও মুসলীম লীগ নেতৃত্বের বিরোধিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধু রাজনীতির কবি হয়ে একাত্তরে বাঙালির স্বাধীন বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক আনন জামান রচিত ‘শ্রাবণ ট্রাজেডি’ (২০১৮)-এর মঞ্চায়ন ও সাহিত্য-সমালোচনা নিয়ে ড. আফসার আহমদ লিখেছেন ‘শ্রাবণ ট্রাজেডি: নাট্যমঞ্চে জ্যোতির্ময় বঙ্গবন্ধু’ শিরেনামে। আহমেদ ইকবাল হায়দার এর ‘সুবর্ণ জয়ন্তীতে স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রাপ্তিযোগ’, মিনার মনসুর রচিত ‘বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু ও বই’ এবং কানাই চক্রবর্তীর ‘বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনীতির লক্ষ্যই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা’ প্রবন্ধগুলোর নামেই বিষয়ের আভাস অনুমেয়। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ (২০০৮) নাটক মঞ্চায়নের কাহিনি-প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছেন মো. আব্দুল আজিজ। তাঁর রচনার শিরোনাম: ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক। শহীদ বুদ্ধিজীবী-কন্যা ডা. নুজহাত চৌধুরী, ‘পিতা’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দেন: ‘সহস্র বছরের ইতিহাসে বাঙালি প্রথমবারের মতো নিজের পলিমাটি থেকে উঠে আসা ভূমিপুত্রের নেতৃত্বে নিজস্ব এক স্বাধীন দেশ পেয়েছিল ১৯৭১ সালে। মীর নাহিদ আহসান তাঁর ‘বঙ্গবন্ধুর অনুশাসন: গণমুখী জনপ্রশাসন’ নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন: ১৫ই জানুয়ারি ১৯৭৫-এ রাজারবাগে পুলিশ সপ্তাহে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু শপথ করিয়েছিলেন, ‘প্রতিজ্ঞা করুন, আমরা দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকব। দুর্নীতিবাজদের খতম করব, আমরা দেশকে ভালোবাসবো দেশের মানুষকে ভালোবাসবো’ (পৃ. ১৯৫)। সেই প্রতিজ্ঞা পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টেই অকস্মাৎ চোখের পলকে পালিয়েছে।

বইটির কবিতা অংশে স্বীকার করতে হয় আমলাগণের আধিপত্য। গ্রন্থভুক্ত কবি ও কবিতার সূচি এমন: কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে পরম শ্রদ্ধায়’, রুবী রহমান,  ‘জাতির জনক’, মুহম্মদ নূরুল হুদা ‘সুবর্ণজয়ন্তী তিথি’, মুহাম্মদ সামাদ,‘মুজিব’, ড. মোহাম্মদ সাদিক ‘বঙ্গবন্ধুর পাইপ’, কামাল চৌধুরী, ‘টুঙ্গিপাড়ায় ঘুমাও বাংলাদেশ’, আ ফ ম ইয়াহিয়া চৌধুরী ‘রক্তস্নানে শক্তিমান স্বাধীনতা সম্মান’, আসাদ মান্নান,  ‘একটি স্বপ্নের নাম : বঙ্গনীড়’, তারিক সুজাত ‘আঁধারে আলোর আঁখি’, হাসনাত লোকমান, ‘জনকের ছবি’, উম্মে সালমা তানজিয়া ‘মাতৃ রূপেন সংস্থিতা’, কাজী শাহজাহান ‘খোকা’, নাসের মাহমুদ ‘আগস্ট শোকগাথা’, সাবরীনা রহমান ‘প্রত্যাবর্তন’।

‘জয় বাংলা’ উপশিরোনামে সন্নিবেশিত প্রবন্ধগুলোর প্রাবন্ধিক তালিকায় বৃহত্তর সিলেট-সমতট ও বরাক অঞ্চলের গবেষক-লেখকের সমাহার। অপূর্ব কান্তি ধরের ‘বঙ্গবন্ধুর অতল ভালোবাসা’, সাইয়্যিদ মুজীবুর রহমানের ‘সার্বভৌম তর্জনী’, রসময়  মোহান্তের ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ এবং নৃপেন্দ্রলাল দাশ রচিত ‘বঙ্গবন্ধুর সাহিত্য চর্চা’ রচনাগুলো অনেকাংশে অংশগ্রহণমূলক। নন্দলাল শর্মা ‘সিলেটে বঙ্গবন্ধু’ প্রবন্ধে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনী প্রচারণায় বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর সম্পর্কে তথ্যের অপর্যাপ্ততার জন্য আফসোস করেছেন। ড. রনজিত সিংহ বাংলাদেশের সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ প্রবন্ধ। অধ্যাপক ড. মো. ফজলুল আলী ‘বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন ও আজকের বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা বর্তমান বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিতায় বিশ্লেষণ করেছেন। স্বপন নাথ তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী- সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নির্মাণের নকশা’ প্রবন্ধে যথার্থই বলেন, ‘বাঙালির স্বতন্ত্রসত্তার বাস্তব অবয়ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। যতই ইনিয়ে বিনিয়ে, ফন্দি করে কথা বলা হোক না কেন, মূলত বাঙালি নিজ বাসভূমে প্রত্যাবর্তন করেছে তাঁরই নেতৃত্বে। দীপংক মোহন্ত ‘চা শ্রমিকদের বঙ্গবন্ধু : চা শিল্পে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখেন, বঙ্গবন্ধুর প্রেরণায় বহুভাষিক চা-শ্রমিক বাঙালি জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ড. শ্যামল কান্তি দত্ত  ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাভাষা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ভাষাগত জাতীয়তা বঙ্গবন্ধুর সমগ্র সংগ্রাশি জীবনের মূলমন্ত্র। তিনি এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েই  গোপনে সৃষ্টি করলেন ‘জয় বাংলা’। তপন পালিত তাঁর ‘বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচিন্তা’ প্রবন্ধে স্মরণ করিয়ে দেন ম্যাকাভেলিই প্রথম ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে যুক্তিভিত্তিক বাস্তব রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেন। জয়দীপ দে  কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধের আলোকে বঙ্গবন্ধুর বঙ্গভাষীর নেতা হয়ে ওঠার কাহিনি বর্ণনা করেন ন্যাশনাল ডিজিটাল লাইব্রেরি অব ইন্ডিয়ার তথ্যভান্ডার ঘেটে কথাসাহিত্যিকের কমনীয় ভাষায়। 

অধ্যাপক কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পনেরোই আগস্ট, ৭৫-কিছু অভিজ্ঞতা ও অভিঘাত’, সৈয়দ মোসাহিদ আহমদ চুন্নুর ‘আমার দেখা মৌলভীবাজারে বঙ্গবন্ধু’, ড. সেলু বাসিতের, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের আন্দোলন-১৯৪৯ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’, আবুল ফতেহ ফাত্তাহর ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও শেরপুর জনযুদ্ধ’, আব্দুল মতিনের ‘মৃত্যুঞ্জয়ী  বোধিবৃক্ষ মনীষী মহীরূহ’, তাজুল মোহাম্মদের ‘প্রয়োজন আরেকজন ক্যারিসমেটিক লিডার’, আহমদ সিরাজের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচার আলোকে বঙ্গবন্ধু’, রজত গোস্বামীর ‘অনুপ্রেরণার বাতিঘর’, জসীম উদ্দীন মাসুদের ‘বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলা ও তাঁর শিশু উন্নয়ন ভাবনা’, ড. আশফাক হোসেনের ‘১৯৭০-এর নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা’, ড. মোস্তাক আহমদ দীনের ‘বন্ধু থেকে পিতা অথবা কাক কবুতর ও হলদে পাখির গল্প’, মামুন সিদ্দিকীর ‘একাত্তরের গণহত্যা-নির্যাতনের স্বরূপ-বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা ও ভাষণে’,  হাসান  মোরশেদের ‘বঙ্গবন্ধু এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসন পুনর্গঠন কর্মসূচি’, মহিদুর রহমানের ‘শিশু-কিশোরদের প্রাণোচ্ছল বঙ্গবন্ধু’, আজিজুল পারভেজের ‘বিয়ানীবাজারে বঙ্গবন্ধু’, জয়নাল আবেদীন শিবুর ‘রাজনগরে বঙ্গবন্ধু’, সুমনকুমার দাশের ‘সুনামগঞ্জের তিন সাধকের বাউলগানে বঙ্গবন্ধু’ এবং সবশেষে হাসানাত কামালের ‘মৌলভীবাজারে বঙ্গবন্ধু: খুঁজে ফিরি পিতার পদচিহ্ন’ প্রবন্ধগুলোতে নানান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বঙ্গবন্ধুর দর্শনের বিচিত্র বিষয় উঠে এসেছে। 

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের বিচিত্র অনুষঙ্গ অধ্যয়নের মাধ্যমে আমাদের আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রাণিত করতে এই বইয়ের অবদান রাখেবে। বইটির প্রাপ্তিস্থান কিংবা পরিবেশক থাকলে পাঠক সহজে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক এমন প্রয়োজনীয় বইটি সহজেই সংগ্রহ করতে পারতেন। বঙ্গবন্ধুর চেতনার সন্ধান দেওয়া বইটি পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে রবীন্দ্রনাথ যেমন ব্যক্তি থেকে একটি বিষয়, তেমনি অচিরেই বঙ্গবন্ধুও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উন্নীত হবেন অচিরেই। অবশ্য ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ ও মুক্তিযুদ্ধ’ এখনই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধু যেখানে সমার্থক সেখানে তিনি পাঠ্য হয়েই আছেন বৈকি। আলোচ্য স্মারকগ্রন্থ বঙ্গবন্ধুর প্রতি পাঠকের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি করবে এবং বইটিও পাঠকপ্রিয়তা পাবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত,সহযোগী অধ্যাপক, সিইউএফ কলেজ, চট্টগ্রাম

 

দেখুন আইনিউজ ভিডিও

জাফলংয়ে পর্যটকদের ওপর হামলায় ৫ জন কারাগারে

জাফলংয়ে পর্যটক পেটানো সেই স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানালেন এসপি

সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় এ ঈদগাহে নামাজ পড়বে ১৬ হাজার মানুষ

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়