মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২১:৩৩, ১৯ মে ২০২০
আপডেট: ২২:২১, ১৯ মে ২০২০
আপডেট: ২২:২১, ১৯ মে ২০২০
করোনার দুর্দিনে মানবিক পুলিশিংয়ে অনন্য মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ
মৌলভীবাজার শহরের এক গৃহশিক্ষক। না পারছেন কারো কাছে হাত পাততে, না পারছেন লাইনে দাঁড়াতে। উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খেয়ে-না খেয়ে কাটাতে হচ্ছে তাকে। খবর পেয়ে গোপনে তাকে চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি খাবার পৌঁছে দিলো মৌলভীবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ।
বিপদের বন্ধু পুলিশ
বিপদের সময়- পরম বন্ধু চেনা যায়। পুলিশ যে জনগণের বন্ধু- করোনার সংকটাকলীন সময়ে যখন মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন, জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। ঠিক তখন বিপদের বন্ধুকে হারে হারে চিনলো বাংলাদেশের মানুষ।
কার ঘরে খাবার নেই। কার ডাক্তার লাগবে। আবার বাইরে ঘোরাফেরা করা বুঝেও-অবুঝ-মানুষদের ঘরে পাঠাতে হবে। কে মাস্ক পড়েনি, কোথায় গণজমায়েত- দেখতে হবে সেটাও।
ঘর ভাড়া দিতে না পারায় বের করে দেয়া ভাড়াটেকে ঘরে তুলে দেয়া। যখন স্বজন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে শেষ গোসল দেওয়া, কবর দেয়া, শ্মশানে নিয়ে যাওয়া; সমাহিত করার দায়িত্ব ওই পুলিশের। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে কাজটি করতে হচ্ছে পুলিশকেই।

সারাদেশের মতো মৌলভীবাজারেও মানুষের চরম বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা পুলিশ। যেন সত্যিকারের বিপদের বন্ধু, দুর্দিনে আপনজন।
করোনার দুর্দিনে মানবিক পুলিশ
করোনার দুর্দিনে নিরলস কাজ করে চলেছে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ। চুরি, ডাকাতি, খুন-ধর্ষণ ইত্যাদি আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি করোনা মোকাবেলায় গড়েছে মানবিক পুলিশিংয়ে অনন্য নজির।
বর্তমান পৃথিবীতে এক আতঙ্কের নাম ‘করোনা ভাইরাস’। কোন প্রতিষেধক বের না হওয়ায় ভাইরাসটি যেমন পৃথিবীবাসীকে ভোগাচ্ছে। তারচেয়ে, বেশী ভোগাচ্ছে ভাইরাসটি থেকে বাঁচতে কোন ধরনের সাবধানতা অবলম্বন না করায়।

তবে সাবধানতার মাধ্যমে ভাইরাসটি থেকে এদেশের মানুষদের রক্ষায় ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ এক অন্যান্য ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর ক্ষেত্রে বাংলাদশে পুলিশের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আর এক্ষেত্রে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ নিয়েছে অনন্য সব উদ্যোগ।
মৌলভীবাজারে পুলিশের যত উদ্যোগ
মৌলভীবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউর রহমান বলেন, পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদের নির্দেশনায় করোনা মোকাবেলায় নানা কার্যকরি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে মৌলভীবাজার পুলিশ। বিশেষ করে বাজারসমূহ উন্মুক্ত স্থান বা রাস্তাঘাটে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা। সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে প্রতিটি বাজারে জনসাধারণ যেন কেনাকাটা করে সে বিষয়ে নিয়মিত প্রচারাভিযান করে যাচ্ছে। জনসাধারণের ভিড় কমানোর লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাজারসমুহে মানুষজনের চলাচল একমুখীকরণ, জরুরি পণ্যসামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জামাদি, অন্যান্য জরুরি পরিষেবা পরিবহনে সহযোগিতা প্রদান, সকল মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও সরকারের নির্দেশনাসমুহ প্রচার করে যাচ্ছে।
জেলার সকল প্রবেশপথে থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে আগতদের তাপমাত্রা পরীক্ষা, হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বাড়িতে সাইনবোর্ড, লাল পতাকা উত্তোলন, স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্তকরণ, সকল ইউনিটের কুইক রেসপন্স টিম গঠন, করোনা আক্রান্ত রোগীর দাফনে সংশ্লিষ্টদের সহায়তা প্রদান, চিকিৎসকদের যানবাহন সুবিধা প্রদান।

তিনি বলেন- ধানকাটার শ্রমিকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন এবং নিরাপদ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত দায়িত্ব পালন এবং এক্ষেত্রে স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ জোরদার করা এবং সারা জেলায় জনসাধারণের সচেতনতায় হাজার হাজার লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।

“মানবতার আধার” সংগ্রহশালা
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউর রহমান বলেন- প্রতিটি ইউনিয়নের বিট অফিসার হিসেবে একজন সাব ইন্সপেক্টর নিয়োগ করা আছে। তার মাধ্যমে কোন প্রকার সাহায্য পায়নি এ ধরনের লোকদের তালিকা সংগ্রহ এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আনা। সম্ভব হলে নিজেদের পক্ষ থেকে সাহায্য করা। বিভিন্ন সোর্স এবং ফোনকলের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভাবী লোকজনের নিকট খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের মাধ্যমে ত্রাণ সাহায্য পায়নি এরকম মানুষজনের সন্ধান করে তাদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিটি থানায় "মানবতার আধার" সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

নিজেদের সুরক্ষা উদ্যোগ
জিয়াউর রহমান বলেন- এধরনের কাজের কাজের ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি জোর দেওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা অপর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে তাদেরকেই বেশি মিশতে হচ্ছে। জানা যায়, সারাদেশে আড়াই হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাছাড়া, মৌলভীবাজার জেলায় এখন পর্যন্ত পুলিশসহ সবমিলে ৬১জন নাগরিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
এ অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের নিজেদের নিরাপত্তার উদ্যোগ নিয়েছেন পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ। পুলিশ সদস্যদের পিপিইসিহ রেইনকোট সরবরাহ করা হয়েছে। জেলা পুলিশে কর্মরত সকল সদস্যদের জন্য নিজেদের উদ্যোগে মাক্স-হেডক্যাপ, হ্যান্ড গ্লোভস তৈরি করে তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। পুলিশের সকল স্থাপনায় জীবাণুনাশক সলিউশন তৈরির মাধ্যমে স্থাপনা কম্পাউন্ড জীবনাণুমুক্ত করা হয়েছে। সকল স্থাপনায় তাবু /অস্থায়ী কামরা নির্মাণ করা হয়েছে। যাতে সবাই ডিউটি শেষে পোশাক পরিবর্তন করে ঝুঁকিমুক্ত হয়ে ব্যারাকে প্রবেশ করতে পারে। থানা, ফাঁড়িসহ সকল স্থাপনায় থার্মাল স্ক্যানার ব্যবহার শুরু হয়েছে। থানায়/ফাঁড়িতে আগত সকল সেবাপ্রার্থীদেরকে যথাযথভাবে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সকল সদস্যকে মিনি সাবান এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করা হয়েছে। নিজেদের মাধ্যমে "সোপি ওয়াটার" তৈরি করে পুলিশ ইউনিটসমূহে হাত ধোয়ার কাজে ব্যবহার করা, সকল ইউনিটে পান করার জন্য গরম পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রত্যেক থানায় নিকটবর্তী হোটেল/কমিউনিটি সেন্টারে অফিসার/ফোর্স এর আবাসন ব্যবস্থা করা হয়েছে।

করোনাযোদ্ধা প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে সকল সদস্যকে প্রতিদিনের খাবার তালিকায় ডিম, দুধ, ভিটামিন A-Z/ সিভিট ট্যাবলেট, ফলমূল বাড়তি সরবরাহ করা হয়েছে। ডিউটিতে যাওয়ার আগে এবং ডিউটি থেকে আসার পর ব্যবহৃত প্রতিটি যানবাহন জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রত্যেক স্থাপনার প্রবেশমুখে হাত ধোয়ার সাবান/ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি ইউনিটে সচেতনতামুলক লিফলেট বিলি করা হয়েছে। করোনা সচেতনতায় ব্যানার টাঙানো, পুলিশ সদস্যদের সবার জন্য "ফেস শিল্ড" সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় "ফেস শিল্ড" দেয়া হয়েছে।
জিয়াউর রহমান বলেন, ‘পুলিশ সুপার স্যারের নেতৃত্বে এই কাজগুলো গ্রহণের মাধ্যমে জেলার সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি, বেসরকারি দপ্তর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে করোনা মোকাবিলায় মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।’
জনগণের সাথে পুলিশের বন্ধুত্ব, মেলবন্ধন
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার ফারুক আহমদ বলেন, পুলিশ সবসময়ই জনগণের বন্ধু। মানুষের সকল দুর্দিনে পুলিশ পাশে থাকে। করোনা মোকাবেলায় আমরা চেষ্টা করছি জনগণের পাশে থেকে কাজ করতে। এজন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে সাধারণ জনগণের জন্য যেমন কাজ করে যাচ্ছি, একইভাবে পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষায়ও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আশা করছি সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমরা করোনা মোকাবেলা করতে পারবো।
তিনি বলেন- মৌলভীবাজার প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। প্রথমে অনেক প্রবাসী আসছিলেন। তাদের ঘরে পাঠানো, কোয়ারিন্টন নিশ্চিত করার কঠিন কাজগুলো করতে হয়েছে।
জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি করোনা মোকাবেলায় নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টিও ছিলো। মৌলভীবাজারের অনেক পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছিলেন, যদিও এখন অনেকেই সুস্থ হয়েছেন।

আইনশৃংখলা রক্ষা ও রুটিন কাজের পাশাপাশি মানবতার আধার সংগ্রহশালা প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন- এই উদ্যোগে জনগণের সাথে পুলিশের বন্ধুত্ব, মেলবন্ধন আরো দৃঢ় করেছে। মানুষের বিপদে আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি- এটাই মানবিকতা। এতে করে সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হয়েছে। আর এতে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। একটা মানবিক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠছে।
এইচকে/ আই নিউজ
আরও পড়ুন
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
- দুলাভাইয়ের ধর্ষণের শিকার শ্যালিকা
- মৌলভীবাজারের রাজনগরে
আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বিধবা রুবির বিউটি পার্লার - `প্রধানমন্ত্রীর কথা বলে আমাদের ধোকা দেওয়া হচ্ছে`
- রাখাল নৃত্যের মধ্য দিয়ে কমলগঞ্জে রাস উৎসব শুরু
- কমলগঞ্জে মাদকবিরোধী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত
- মেয়ের বাড়িতে ইফতার: সিলেটি প্রথার বিলুপ্তি চায় নতুন প্রজন্ম
- দেশের চতুর্থ ধনী বিভাগ সিলেট
- অবশেষে ক্লাস করার অনুমতি পেল শ্রীমঙ্গলের শিশু শিক্ষার্থী নাঈম
- শ্রীমঙ্গল টু কাতারে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালি নেটওয়ার্ক
মৌলভীবাজারে অনলাইন জুয়ায় রাতারাতি কোটিপতি সাগর - এসএসসির ফলাফলে বিভাগে ৩য় স্থানে মৌলভীবাজার
সর্বশেষ
জনপ্রিয়























