ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬,   ভাদ্র ৯ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩:০৬, ১৬ জুলাই ২০২০
আপডেট: ১৩:০৭, ১৬ জুলাই ২০২০

মৌলভীবাজারে পর্যটন সংশ্লিষ্ট সাড়ে ৩ হাজার মানুষ বেকার

চলমান করোনা সংকটে মৌলভীবাজারে বেকার হয়ে পড়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ৩৫০০ হাজার মানুষ, সেই সাথে ঋণের জালে বন্দি দেড় শতাধিক রিসোর্ট-কটেজের মালিকরা।

পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারে তেমন কোন শিল্পকারখানা নেই । হাওর বাওর আর চাবাগান বেষ্টিত এই এলাকায় প্রধান শিল্প পর্যটন, প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক আসেন। বর্ষা মৌসুমে সবুজ প্রকৃতি যখন আরও সবুজ ডানা মেলে তখন পর্যটকদের আকৃষ্ট করে এই সবুজ এবং হামহাম ও মাধবকুন্ড ঝর্ণা যৌবন ফিরে পায় বর্ষা মৌসুমে।

কিন্তু করোনার সংকটে বর্তমানে একদিনে যেমন পর্যটন বন্ধ অন্যদিকে এর সাথে সংশিষ্ট সাড়ে ৩ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন রিসোর্ট কটেজের ২৫০০ কর্মচারীর বড় একটি অংশ ছাটাই হয়েছেন।

পর্যটন সেবা সংস্থার শ্রীমঙ্গলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক জানান, মৌলভীবাজার জেলায় মোট হোটেল রিসোর্ট প্রায় দেড়শ । এই সব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন প্রায় ২৫০০ কর্মকর্তা কর্মচারী । এর বাইরে পর্যটকদের ঘিরে বিভিন্ন ব্যবসা পরিবহন গাইডসহ আনুমানিক আরও ১ হাজার মানুষ আছেন যাদের আয়ের প্রধান উপায় ছিল পর্যটন।

কিন্তু বর্তমানে এদের বড় একটি অংশ বেকার । খুঁজ নিয়ে জানা গেছে কর্মচারীদের বড় একটি অংশকে ছাটাই করা হয়েছে। শুধু বড় বড় প্রতিষ্ঠানে যেহেতু রক্ষণা বেক্ষণের জন্য জনবল বেশী প্রয়োজন হয় তাদের কর্মচারীর একটি অংশ এখনো কাজ করলেও ছোট এবং মাঝারি প্রতিষ্ঠান ছাটাই করেছে গণহারে।

অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু নিরাপত্তারক্ষীদের রেখে বাকি সবাইকে ছাটাই করেছে। যারা কাজ করছেন তাদেরকেও দেওয়া হচ্ছে অর্ধেক বেতন । ছাটাই হওয়া এসব কর্মচারীরা পড়েছেন মহা বিপদে, চাইলেও করোনা সংকটের কারণে অন্য কোন কাজ পাচ্ছেন না।

অন্যদিকে কোন আয় না থাকায় পরিবারের নির্ভরশীল তবে এদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন যাদের নিজের আয়ে পরিবার চলত।

শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টে চাকরী করতে আশরাফুল আলম তিনি জানান, মালিক নিজের পকেট থেকে কত আর বেতন দেবে তাই আমাদের ছাটাই করা হয় আমরাও মেনে নিয়েছি কিন্তু পেটত মানতে পারছেনা। বর্তমানে বাড়িতে আছি অভাবের সংসারে আমার যখন সাহায্য করা কথা ছিল তখন আমি তাদের দিকে চেয়ে আছি ।

ছাটাই করার বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে রাজি নয় এবং দায়িত্বশীলরা বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত আলাপে করোনা সংকটের কারণে কর্মকর্তা কর্মচারীদের একটি অংশকে ছাটাই করা হয়েছে , বেতন বন্ধ আছে বলে জানিয়েছেন একটি ৫ তারকা মানের রিসোর্টের কর্মকর্তা তবে এ বিষয়ে গনমাধ্যমের সাথে কথা না বলতে মালিক পক্ষ থেকে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে তাই তারা তথ্য দিতে চাইছেন না।

আরেকটি কারণে বেতন না পাওয়া এবং ছাটাইয়ের বিষয়টি নিয়ে নীরব আছেন কর্মচারীরা । তারা মনে করেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদের প্রতিষ্ঠান তাদেরকে আবারও ডাকবে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে নতুন চাকরি নিতে গেলেও পূর্বের প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন পত্র লাগবে ।

পাঁচ তারকামানের হোটেল যেমন গ্র্যান্ড সুলতান ও দোসাই সহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান , হোটেল-রিসোর্ট বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় হাতেগোনা কর্মচারী  রেখে বাকীদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে ।

দোসাই রিসোর্ট এন্ড স্পার এইচ আর মাহাবুব হোসেন জানান, রক্ষণাবেক্ষনের যে কর্মচারী প্রয়োজন তা ছাড়া সবাইকে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। আমাদের প্রায় ২০০ জনবল রয়েছে। কাউকে ছাটাই করা হয়নি আমরা সবাইকে বেতন দিয়ে যাচ্ছি তবে সবাইকে পুরো বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা।

এ দিকে একই প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিষয়টি নিয়ে গনমাধ্যমে কথা বলা নিষেধ আছে, আমি যতটা জানি বেশ কিছু কর্মচারীকে ছাটাই করা হয়ছে এবং অনেকের বেতন মার্চ থেকে বন্ধ আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের এইচ আর বলেন, আমরা কাউকে ছাটাই করিনি । গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গলফ এর এ জি এম আরমান খান বলেন, সবার মত একই অবস্থা আমাদেরও আমরা সরকারের প্রনোদনা পাওয়ার চেষ্টা করছি। কর্মচারীদের একটি অংশ বাড়িতে আছে তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে । এর বেশী তথ্য গনমাধ্যমে আমরা দিতে চাচ্ছিনা। তবে আমরা এখন ভুর্তকি দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বহন করছি ।

এই প্রতিষ্ঠানের সহকারী পাবলিক রিলেশন অফিসার শাহ আরিফ আলী নাসিম জানান, আমাদের প্রতিষ্ঠান মার্চের ২৬ তারিখ থেকে একেবারে বন্ধ। আমাদের ৪৫০ কর্মচারী রয়েছেন তবে সবার বেতন দেওয়া হচ্ছে। তাদের বড় একটি অংশ বাড়িতে আছেন । সব থেকে বেশী বিপদে পড়েছেন যারা লোন নিয়ে এবং ভাড়া ভবন নিয়ে হোটেল বা রিসোর্ট করেছেন তারা ।

শ্রীমঙ্গলের হোটেল মেরিনার পরিচালক নাজমুল হাসান মিরাজ বলেন, এই হোটেলটি ভাড়া নিয়ে চালাই আমি। মাসিক ভাড়া এক লাখ ২০ হাজার টাকা। কর্মচারীদের বেতনসহ মাসিক খরচ আড়াই লাখ টাকা। করোনার সঙ্কটে সব তছনছ। ঋণে জড়িয়ে পড়েছি। “এসকেডি আমার বাড়ি” রিসোর্টের পরিচালক সজল দাশ বলেন, আমার ব্যাংক লোন আছে দুই কোটি ২০ টাকা। ১১ মার্চ থেকে আমার রিসোর্ট বন্ধ। কর্মচারীদের ছুটি দিয়েছি। কিন্তু তাদের বেতন তো দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিলের জন্যও চাপ আসছে, আছে ভুতুড়ে বিল। সবকিছু মিলিয়ে ঋণের জালে যেভাবে আটকে যাচ্ছি; সরকারের সহযোগিতা ছাড়া বের হতে পারব না। পুঁজি হারানোর ভয়ে আছি আমরা।

এ দিকে ব্যবসায়ীরা সরকারের থেকে কোন সহযোগিতা পাচ্ছেন না জানিয়ে লেমন গার্ডেন রিসোর্টের পরিচালক সেলিম আহমেদ বলেন, আমার মাসিক খরচ ২৭ লাখ টাকা। এত টাকা প্রতি মাসে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এভাবে আর কিছু দিন চললে দেউলিয়া হয়ে যাব। আমাদের টিকে থাকতে হলে সরকারের সহযোগিতা দরকার। বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করা দরকার।

টুরিজমের সাথে ঝড়িয়ে আছে স্থানীয় ট্যুর গাইডদের জীবীকা। তারা ৩ মাস ধরে বেকার। লাউয়াছড়া ট্যুর গাইড এ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক তাপস পাল জানান, কয়েকটি সংগঠন রয়েছে শুধু আমাদের সংগঠনে আছে ২০ জনের মত যাদের পরিবার নিভর্শীল এই টুরিজমের উপর। বর্তমানে সবাই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে এবং বিকল্প আয়ের পথ খুজতেছে। পর্যটনকে কেদ্রকরে যারা যারা বিভিন্ন মৌসুমী ব্যবসা করতেন তারা পুঁজি হারিয়ে নতুন কাজ খুঁজছেন।

Green Tea
সিলেট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়