ঢাকা, রোববার   ২০ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৬ ১৪২৮

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩:১৮, ২৪ মে ২০২১
আপডেট: ২৩:৫৭, ২৪ মে ২০২১

অসুস্থ বাবাকে আশ্রয় দেয়নি ছেলে-মেয়ে, হাসপাতালে নিল পুলিশ

মৌলভীবাজার শহরের পুরাতন হাসপাতাল রোডের শাহ মোস্তফা মঞ্জিলে বসবাস করতেন অরুণ দেব (৭৫)। যৌবন এবং জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন পরিবারের খরচ মেটাতে। 

এই ঘটনায় বাবাকে আশ্রয় না দেয়ার পেছনে বৃদ্ধের ছেলে বিপ্লব দেব কারণ হিসেবে বলেন, তার আর্থিক অবস্থা ভাল না, তাই তিনি নিতে পারবেন না। অথচ তিনি তার ৩ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। ৩ সন্তান, স্ত্রী নিয়ে থাকতে পারলেও সেই ঘরে বাবার জায়গা হবেনা।

তাঁর দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন শহরের সৈয়ারপুর এলাকায়, মেয়ে জামাই শহরের একটি জুয়েলারি শপের ম্যানেজার। বড় ছেলে বিপ্লব দেব সুনামগঞ্জে ব্যবসা করেন। তিনি ছোট ছেলে এবং ছেলের বউয়ের সাথে থাকতেন। কিন্তু ১০ বছর আগে ছোট ছেলে মারা যাওয়ায় সংসারে নেমে আসে অন্ধকার। বড় ছেলে এবং মেয়ের জামাই ও মেয়ে তার কোন ভরণ পোষণ করতেন না। ছোট ছেলের বউ বিভিন্নভাবে কষ্ট করে যা উপার্জন করতেন তা দিয়ে  শ্বশুরকে এত দিন লালন পালন করেছেন। অভাবের কারণে সেও বিরক্ত।

এরমধ্যে গত ৩-৪ দিন ধরে আশ্রয়হীনভাবে ভবঘুরে জীবন কাটাচ্ছিলেন অরুণ দেব। গতকাল রোববার (২৩ মে) দুপুরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে দীর্ঘ সময় পরে থাকেন শহরের কুসুমবাগ এলাকার একটি হোটেলের সামনে। এই হোটেলের মালিক শেষ মুহূর্তে বিকেলের দিকে একটি রিকশা করে ঠিকানা দিয়ে বাসায় পাঠায়। কিন্তু বাসায় নিতে আপত্তি জানান ছোট ছেলের বউ। তিনি জানান দীর্ঘদিন লালন পালন করেছেন। এখন আর তিনি কোনভাবেই বৃদ্ধের দায়িত্ব নিতে পারবেন না। বাসার সামনে মাটিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে আশেপাশের উৎসাহী লোকজন জড়ো হয়েও অনেক অনুরোধ করেন, কিন্তু ঘরে তুলে নেননি ছোট ছেলের বিধবা বউ।

এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগে বৃদ্ধের বড় ছেলে সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ী বিপ্লব দেবের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তিনি বাবার দায়িত্ব নিতে পারবেন না বলে জানান। পরে যোগাযোগ করা হয় মেয়ে এবং মেয়ের জামাই’র সাথে। তারাও দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানান। 

এদিকে অসুস্থ বৃদ্ধ পরে আছেন মাটিতে। দ্রুত হাসপাতালে না নিলে ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। পরে একজন সরকারী কর্মচারী অজয় রায় যোগাযোগ করেন ৯৯৯ নাম্বারে। ফোন পেয়ে মৌলভীবাজার সদর থানার ওসি তদন্ত গোলাম মূর্তজা আসেন। তিনি নিজেও পরিবারের সবার সাথে যোগাযোগ করেন এবং জানান পুলিশের উদ্যোগে হাসপাতালে নেওয়া হবে। তবে পরিবারের কেউ একজন অন্তত সাথে গেলে হাসপাতালে চিকিৎসা করতে সুবিধা হবে।  তারা আশ্রয় না দিলেও শুধু সাথে গেলেই হবে। পুলিশের অনুরোধেও ছেলে, মেয়ে, মেয়ের জামাই এবং ছোট ছেলের বিধবা বউ কেউ রাজি হয়নি। পরে সন্ধ্যার পর মৌলভীবাজার সদর থানার পুলিশ সদস্যরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় বৃদ্ধকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন। তবে এখনো পরিবারের কেউ তার পাশে যায়নি।

এই ঘটনা জানাজানি হলে  পিতার প্রতি সন্তানদের  এমন অবহেলায় হতবাক হয়েছেন সাধা্রণ মানুষ। যে পরিবারের জন্য সারা জীবন রক্ত ঘাম এক করেছেন সেই পরিবারেই শেষ বয়সে বোঝা হয়েছেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা এবং যিনি ৯৯৯ নাম্বারে প্রথম যোগাযোগ করেন সেই অজয় রায় জানান, এমন ঘটনায় আমরা হতবাক। আমাদের সমাজে এমনটা আমরা কল্পনাও করতে পারিনা। ছোট ছেলের বউ তার জন্য অনেক করেছে। যেহেতু সে নিজেই অনেক কষ্টে এত বছর শ্বশুরকে দেখাশোনা করেছে, তাই সে বিরক্ত হলেও কিছুটা মানা যায়। কিন্তু নিজের ছেলে এবং মেয়ে কেনো আসলনা তা অস্বাভাবিক ঘটনা। আমি নিজে উনার ছেলে মেয়ের সাথে যোগাযোগ করেছি, তারা সবাই দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানায়।

পরে আমি ৯৯৯ এ যোগাযোগ করি এবং পুলিশ এসে হাসপাতালে নিয়ে যায়। একজন পিতা ৪-৫ ঘণ্টা রাস্তায় পরে ছিলেন। এই বিষয়টা নিজের চোখে দেখে কাল সারারাত আমি ঘুমাতে পারিনি। এমন ঘটনার সাক্ষী হয়ে মানসিক ট্রমায় আছি। কতটা জঘন্য হতে পারে মানুষ তার প্রমাণ এই ঘটনা ।

এই ঘটনায় বাবাকে আশ্রয় না দেয়ার পেছনে বৃদ্ধের ছেলে বিপ্লব দেব কারণ হিসেবে বলেন, তার আর্থিক অবস্থা ভাল না, তাই তিনি নিতে পারবেন না। অথচ তিনি তার ৩ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। ৩ সন্তান, স্ত্রী নিয়ে থাকতে পারলেও সেই ঘরে বাবার জায়গা হবেনা।

অন্যদিকে মেয়ে না আসার পেছনেও মেয়ের জামাইয়ের আপত্তি ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা জানান, আমরা যোগাযোগ করার পর জানতে পারি। মেয়ের জামাই মেয়েকে বলেছে যদি তুমি যাও আর ফিরতে পারবেনা।

মৌলভীবাজার মডেল থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) গোলাম মুর্তজা জানান, আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই এবং তাদের সবার সাথে যোগাযোগ করি। অনেকভাবে তাদের অনুরোধ করি। কিন্তু কেউই এই বৃদ্ধের দায়িত্ব নিতে এমনকি একটু আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি। পরে আমরা মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করি এবং আমার সাধ্যমত আর্থিক সাহায্য করি। এই ঘটনাটি একটি চরম অমানবিক ঘটনা।

Green Tea
সর্বশেষ
জনপ্রিয়